📄 প্রথম রুকন : الصِّیغَةُ শব্দ
সালাম বা সালাফ শব্দ এবং উভয়টি থেকে নির্গত শব্দ যেমন: أَسْلَفْتُكَ "আমি তোমাকে বাকি প্রদান করলাম", أَسْلَمْتُكَ "আমি তোমাকে সালাম হিসাবে প্রদান করলাম", أَوعْطَيْتُكَ كَذَا سَلَمًا أَوْ سَلَفًا فِي كَذَا "আমি তোমাকে সালামস্বরূপ বা সালাফস্বরূপ এ পণ্যের বিপরীতে প্রদান করলাম" এ জাতীয় বাক্য দ্বারা প্রস্তাব প্রদান শুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ফকীহগণ একমত পোষণ করেছেন। কারণ এ দুটি একই অর্থ বিশিষ্ট দুই শব্দ। এবং উভয় শব্দ এই চুক্তির নাম। অনুরূপভাবে এমন যে কোনো শব্দ দ্বারা প্রস্তাব গ্রহণ শুদ্ধ হওয়ায় ফকীহগণ ঐকমত্য ব্যক্ত করেছেন। যা প্রথম ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করে। যেমন এর অর্থ আমি প্রস্তাব গ্রহণ করলাম, رضيتُ অর্থ আমি প্রস্তাবে সম্মত হলাম ইত্যাদি।
তবে শব্দ দ্বারা সালাম সংঘটিত হওয়ার আলোচনায় ফকীহগণ মতবিরোধ করে দুটি মত ব্যক্ত করেছেন:
এক. ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ, মালেকী ফকীহগণ, বিশুদ্ধতম মতের বিপরীতে শাফেয়ী ফকীহগণ এবং হাম্বলী ফকীহগণের মত হলো, بَيْع শব্দ দ্বারা সালাম সংঘটিত হবে— যদি উক্ত শব্দে সালাম উদ্দেশ্য হওয়া বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং সালামের শর্তাবলি তাতে পাওয়া যায়।
দুই. হানাফী ফকীহ ইমাম যুফার এবং শাফেয়ী ফকীহগণের ঐ মত যা ইমাম নববী এবং রাফেয়ী কর্তৃক শুদ্ধিকৃত, তা হলো, بِعْتُ শব্দ দ্বারা সালাম সংঘটিত হয় না। ইমাম যুফার রহ.-এর দলিল হলো কিয়াস অনুযায়ী সালাম সংঘটিত হতে পারে না। কারণ সালাম হচ্ছে এমন বস্তু বিক্রি করা যা মানুষের কাছে নেই। আর এরূপ বিক্রি নিষিদ্ধ। কিন্তু সালাম শব্দ দ্বারা বৈধ, যেহেতু এ সম্পর্কে শরীয়তের বর্ণনা এসেছে।
হানাফী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ সালামের শব্দের ক্ষেত্রে শর্ত করেন, শব্দটি চুক্তি চূড়ান্ত করার নিশ্চিত অর্থ জ্ঞাপক হতে হবে। ক্রেতা-বিক্রেতা কারো জন্য (গ্রহণ-প্রত্যাখ্যানের) খিয়ার স্বাধীনতা থাকবে না। কারণ এটি এমন চুক্তি যাতে খিয়ারুশ শর্ত বা চুক্তি চূড়ান্ত করার ব্যাপারে স্বাধীনতার শর্ত থাকতে পারে না। হানাফী ও অন্যান্য ফকীহদের মতে মজলিস ত্যাগের পূর্বেই মূল্য হস্তগত হওয়া আবশ্যক, নতুবা এটি কিয়াসের প্রতিকূল হবে।
📄 চুক্তিসম্পাদনকারী দুই পক্ষ
চুক্তিসম্পাদনকারী দু'পক্ষের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে ফকীহগণ শর্ত করেন, তাকে চুক্তি সম্পাদনের যোগ্য হতে হবে এবং যদি সে অন্যের জন্য চুক্তি করে তাহলে তার সে ক্ষমতাও থাকতে হবে। শর্তকৃত যোগ্যতা হলো সম্পাদন করার যোগ্যতা অর্থাৎ শরয়ী বিবেচনাযোগ্য কথা সম্পাদন ও প্রকাশ করার ব্যক্তিগত যোগ্যতা। আর এই যোগ্যতাটি বাস্তবে পাওয়া যায় এমন ব্যক্তির মাঝে যে প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন এবং শরয়ী কোনো বাধার কারণে যার লেনদেন বাধাপ্রাপ্ত নয়।
অন্যের পক্ষ থেকে সালাম-চুক্তি সম্পন্নকারীর ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা হলো নিম্নোক্ত দুই পদ্ধতির যে কোনো এক পদ্ধতিতে এ ব্যাপারে শরীয়ত কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়া: এক. হয়তো ঐচ্ছিক প্রতিনিধিত্ব যা প্রতিনিধি নিয়োগ দ্বারা সাব্যস্ত হয়। দুই. হয়তো বাধ্যতামূলক প্রতিনিধিত্ব যা শরীয়তপ্রণেতা কর্তৃক নির্ধারণ দ্বারা সাব্যস্ত হয়।
অনুরূপভাবে হানাফী ফকীহগণ সালাম চুক্তিতে শর্ত করেন, চুক্তি সম্পন্নকারী দুই পক্ষের কোনো এক পক্ষ মৃত্যু-পূর্ব অসুস্থ হবে না। তারা এ ধরনের অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষতিকারক কর্মকাণ্ড থেকে পাওনাদারদের এবং উত্তরাধিকারীদের অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে তার সালামের স্বতন্ত্র বিধান প্রণয়ন করেছেন।
📄 الْمَعْقُودُ عَلَيْهِ : যার ওপর চুক্তি হয়ে থাকে
ক. একই সাথে দুই বিনিময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলি:
ফকীহগণের মাযহাব হলো, সালামের চুক্তি শুদ্ধ হওয়ার জন্য মূলধন এবং পণ্য উভয়টি মূল্যমানসম্পন্ন সম্পদ হওয়া শর্ত। অতএব এ দুইয়ের একটি মদ বা শূকর বা অন্য এমন কিছু হলে সালাম বৈধ হবে না যা শরীয়তের দৃষ্টিতে উপকারযোগ্য সম্পদরূপে বিবেচিত নয়।
খ. সালাম শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো কোনো বিনিময় এমন সম্পদ না হওয়া যার একটির সাথে অপরটির সালাম করার ক্ষেত্রে বাকি-জাতীয় সুদের উদ্ভব ঘটবে। অর্থাৎ পণ্যটি দায়িত্বে বাকি থাকাকালীন সাধারণ সুদের দুই কারণের একটিও যেন দুই বিনিময়ের কোনো একটিতে পাওয়া না যায়।
গ. মালেকী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহদের মাযহাব হলো, সব ধরনের মুনাফাই সম্পদ এবং তার মূলের মালিকানা লাভ করার দ্বারা এগুলোর মালিকানা লাভ করা যায় এবং এগুলো উপকারযোগ্য বস্তু। এ কারণে ফকীহগণ সালাম-চুক্তিতে মুনাফাকে মূলধন ও পণ্য উভয়রূপে বৈধতা প্রদান করেছেন।
ঘ. হানাফী ফকীহগণের মাযহাব হলো, সালামের দুই বিনিময়ের একটিও মুনাফা হতে পারবে না। কারণ যদিও মুনাফা মালিকানাযোগ্য, তথাপি হানাফী মাযহাবে মুনাফাকে সম্পদ বিবেচনা করা হয় না। এই ভিত্তিতে হানাফীদের মতে সালাম-চুক্তি মধ্যে মুনাফাকে বিনিময় সাব্যস্ত করা শুদ্ধ নয়।
📄 সালামের মূলধনের শর্তাবলি
ফকীহগণ সালামের মূলধনের ক্ষেত্রে দুইটি শর্ত করেছেন:
প্রথম শর্ত: মূলধনটি জ্ঞাত বিষয় হতে হবে। ফকীহদের এ কথায় কোনোরূপ মতবিরোধ নেই, মূলধনটি জ্ঞাত বিষয় হওয়া শর্ত। কারণ মূলধনটি আর্থিক বিনিময় চুক্তির একটি বিনিময়, অতএব অন্য সমস্ত বিনিময়-চুক্তির ন্যায় এখানেও এটি জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক। হানাফী ফকীহগণের মধ্যে আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ, প্রকাশ্য বর্ণনা মতে শাফেয়ী ফকীহগণ এবং হাম্বলী ফকীহগণের মতে মূলধনটি নির্দিষ্ট হলে তা দেখাই যথেষ্ট। তবে হাম্বলী ফকীহগণের নিকট নির্ভরযোগ্য মতে মূলধনের পরিমাণ এবং গুণাগুণ উল্লেখ করা আবশ্যক।
দ্বিতীয় শর্ত: চুক্তির বৈঠকে মূলধন হস্তান্তর করা। হানাফী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহগণের মাযহাব হলো, চুক্তির মজলিসে সালামের মূলধন হস্তান্তর করা সালাম শুদ্ধ হওয়ার একটি শর্ত। সুতরাং যদি হস্তান্তরের পূর্বে ক্রেতা-বিক্রেতা মজলিস ত্যাগ করে তাহলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।
মালেকী ফকীহগণ তাদের প্রসিদ্ধ মতানুসারে, চুক্তির মজলিসে সালামের মূলধন নগদ পরিশোধের শর্ত সংক্রান্ত আলোচনায় জমহুর ফকীহ সম্প্রদায়ের বিরোধিতা করেছেন। তারা বলেছেন, শর্ত সাপেক্ষে এবং বিনা শর্তে দুই তিন দিন পর্যন্ত সালামের মূলধন পরিশোধে বিলম্ব করা বৈধ।
যদি সালামের ক্রেতা সালামের বিক্রেতার দায়িত্বে থাকা ঋণকে সালামের মূলধনে পরিণত করতে চায় তাহলে হানাফী, শাফেয়ী, হাম্বলী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহগণের মতে এটি বৈধ নয়। যেহেতু এটি সালাম চুক্তিটিকে বাকির বিনিময়ে বাকি বিক্রিতে পরিণত করে। তবে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়িম রহ. এটি জায়েয বলেছেন যদি ঋণটি বর্তমানে পরিশোধ্য হয়।