📄 সালাম শরীয়তসম্মত হওয়ার দর্শন
সালাম বিক্রয় এমন একটি চুক্তি যা মানুষের প্রয়োজন হয়ে দেখা দেয়। এর মাধ্যমে মানুষের অসুবিধা ও সমস্যা মোচন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ কৃষকের নিকট অনেক সময় এতটুকু সম্পদ থাকে না যা সে ভূমি চাষযোগ্য করা এবং পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত ফসলের পরিচর্যা করার জন্য খরচ করতে পারে। এদিক লক্ষ করে সালাম বিক্রি বৈধ করা হয়েছে।
ইবনে কুদামা আল মুগনী নামক গ্রন্থে বলেন: "যেহেতু পণ্যটি ক্রয়-বিক্রয়ে দুটো বিনিময়ের একটি, সেহেতু মূল্যের ন্যায় এটিও দায়িত্বে আবশ্যক হতে পারে। তা ছাড়া, মানুষের সালাম বিক্রির প্রয়োজনও রয়েছে। কারণ, চাষী এর মাধ্যমে প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ লাভ করে উপকার পায় এবং ক্রেতাও সস্তায় ফসল প্রাপ্তির উপকার লাভে সক্ষম হয়।"
টিকাঃ
১৯. আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩০৫
📄 সালাম বিক্রি কিয়াস বা যুক্তিসম্মত হওয়ার মাত্রা
ফকীহগণ মতভেদ করেছেন যে, সালামের বৈধতা কি কিয়াসের অনুকূলে নাকি ব্যতিক্রম। হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহগণের মতে, সালাম হলো কিয়াস পরিপন্থী উপায়ে বৈধ একটি চুক্তি। কারণ এটি অস্তিত্বহীন বস্তুর বিক্রি।
বিপরীত দিকে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, সালাম হচ্ছে কিয়াসসম্মত একটি বৈধ চুক্তি। ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, বাকি সালাম হলো এক প্রকার ঋণ এবং এটি বাকি মূল্যে ক্রয়ের মতো। মহান আল্লাহ বলেন : "যদি তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদে বাকি লেনদেন করো তাহলে তোমরা তা লিপিবদ্ধ করে রাখ।” ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, সালাম হলো এমন বস্তু বিক্রি করা যা দায়িত্বে আবশ্যক, যার গুণাগুণ বর্ণনা করা হয়েছে এবং সাধারণভাবে যা হস্তান্তরযোগ্য। সুতরাং এটি কিয়াস সম্মত।
টিকাঃ
২০. কাযী আব্দুল ওয়াহহাব রচিত আল ইশরাফ, খ. ১, পৃ. ২৮০; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২০১
২১. আল বাহরুর রায়েক, খ. ৬, পৃ. ১৬৯
২২. আসনাল মাতালিব শরহু রাওজিত তালিব, খ. ২, পৃ. ১২২
২৩. ইল্লীশ রচিত মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৩
২৪. হাকিম বিন হিযামের হাদীস ইমাম তিরমিযী কর্তৃক উদ্ধৃত (তুহফাতুল আহওয়াযী, খ. ৪, পৃ. ৪৩০)
২৫. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮২
২৬. মাজমুয়াতু ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া, খ. ২০, পৃ. ৫২৯
২৭. ইলামুল মুওয়াককিইন আর রাব্বিল আলামিন, খ. ২, পৃ. ১৯
📄 সালামের রুকন এবং সালাম শুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলি
সম্মিলিত ফকীহ সম্প্রদায়ের মাযহাব হলো সালামের রুকন তিনটি: ১. শব্দ الصیغة : (ঈজাব ও কবুল: প্রস্তাব প্রদান এবং প্রস্তাব গ্রহণ) ২. চুক্তি সম্পাদনকারী দুই পক্ষ: (الْمَعْقُودَانِ) (সালামের ক্রেতা এবং সালামের বিক্রেতা (وَهُمَا الْمُسْلِمُ ، وَالْمُسْلَمُ إِلَيْهِ)) ৩. স্থান/পাত্র (الْمَعْقُودُ عَلَيْهِ) (দুই বস্তু: মূলধন (رَأْسُ الْمَال) ও পণ্য (الْمُسْلَمُ فِيهِ))। এ ক্ষেত্রে হানাফী ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন। তারা মনে করেন, সালামের রুকন হলো কেবল এমন শব্দ যা এই চুক্তি সম্পাদনে দুই ইচ্ছার মিল ও একাত্মতা প্রকাশক প্রস্তাব প্রদান এবং প্রস্তাব গ্রহণের সমন্বয়ে গঠিত।
📄 প্রথম রুকন : الصِّیغَةُ শব্দ
সালাম বা সালাফ শব্দ এবং উভয়টি থেকে নির্গত শব্দ যেমন: أَسْلَفْتُكَ "আমি তোমাকে বাকি প্রদান করলাম", أَسْلَمْتُكَ "আমি তোমাকে সালাম হিসাবে প্রদান করলাম", أَوعْطَيْتُكَ كَذَا سَلَمًا أَوْ سَلَفًا فِي كَذَا "আমি তোমাকে সালামস্বরূপ বা সালাফস্বরূপ এ পণ্যের বিপরীতে প্রদান করলাম" এ জাতীয় বাক্য দ্বারা প্রস্তাব প্রদান শুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ফকীহগণ একমত পোষণ করেছেন। কারণ এ দুটি একই অর্থ বিশিষ্ট দুই শব্দ। এবং উভয় শব্দ এই চুক্তির নাম। অনুরূপভাবে এমন যে কোনো শব্দ দ্বারা প্রস্তাব গ্রহণ শুদ্ধ হওয়ায় ফকীহগণ ঐকমত্য ব্যক্ত করেছেন। যা প্রথম ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করে। যেমন এর অর্থ আমি প্রস্তাব গ্রহণ করলাম, رضيتُ অর্থ আমি প্রস্তাবে সম্মত হলাম ইত্যাদি।
তবে শব্দ দ্বারা সালাম সংঘটিত হওয়ার আলোচনায় ফকীহগণ মতবিরোধ করে দুটি মত ব্যক্ত করেছেন:
এক. ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ, মালেকী ফকীহগণ, বিশুদ্ধতম মতের বিপরীতে শাফেয়ী ফকীহগণ এবং হাম্বলী ফকীহগণের মত হলো, بَيْع শব্দ দ্বারা সালাম সংঘটিত হবে— যদি উক্ত শব্দে সালাম উদ্দেশ্য হওয়া বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং সালামের শর্তাবলি তাতে পাওয়া যায়।
দুই. হানাফী ফকীহ ইমাম যুফার এবং শাফেয়ী ফকীহগণের ঐ মত যা ইমাম নববী এবং রাফেয়ী কর্তৃক শুদ্ধিকৃত, তা হলো, بِعْتُ শব্দ দ্বারা সালাম সংঘটিত হয় না। ইমাম যুফার রহ.-এর দলিল হলো কিয়াস অনুযায়ী সালাম সংঘটিত হতে পারে না। কারণ সালাম হচ্ছে এমন বস্তু বিক্রি করা যা মানুষের কাছে নেই। আর এরূপ বিক্রি নিষিদ্ধ। কিন্তু সালাম শব্দ দ্বারা বৈধ, যেহেতু এ সম্পর্কে শরীয়তের বর্ণনা এসেছে।
হানাফী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ সালামের শব্দের ক্ষেত্রে শর্ত করেন, শব্দটি চুক্তি চূড়ান্ত করার নিশ্চিত অর্থ জ্ঞাপক হতে হবে। ক্রেতা-বিক্রেতা কারো জন্য (গ্রহণ-প্রত্যাখ্যানের) খিয়ার স্বাধীনতা থাকবে না। কারণ এটি এমন চুক্তি যাতে খিয়ারুশ শর্ত বা চুক্তি চূড়ান্ত করার ব্যাপারে স্বাধীনতার শর্ত থাকতে পারে না। হানাফী ও অন্যান্য ফকীহদের মতে মজলিস ত্যাগের পূর্বেই মূল্য হস্তগত হওয়া আবশ্যক, নতুবা এটি কিয়াসের প্রতিকূল হবে।