📄 সালামের বৈধতা
কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমার আলোকে সালাম চুক্তির বৈধতা প্রমাণিত হয়েছে।
ক. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنْتُمْ بِدَيْنِ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى فَاكْتুবোহু "হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদে বাকিতে লেনদেন কর তখন তোমরা তা লিখে নাও।” এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন: "আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, মহান আল্লাহ নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বাকি ঋণ স্বীয় কিতাবের মধ্যে বৈধ ঘোষণা করেছেন এবং এ বিষয়টি অনুমোদন করেছেন।" আয়াতের এ বক্তব্য সালামকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
খ. সুন্নাহ: ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. যখন মদিনায় আগমন করলেন তখন লোকেরা দুই তিন বছর মেয়াদে খেজুর বাকিতে বিক্রি করত। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন: "যে বাকিতে খেজুর বিক্রি করবে সে যেন নির্দিষ্ট মেয়াদে নির্দিষ্ট পরিমাণে ও পরিমাপে বাকিতে বিক্রি করে"। হযরত আব্দুর রহমান বিন আবযা এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. বলেন, আমরা নির্দিষ্ট মেয়াদে গমের সালাম করতাম।
গ. ইজমা: ইবনুল মুনযির রহ. বলেন, আমাদের পরিচিত প্রতিটি আলেম যাদের আমরা অগাধ ইলমের অধিকারী বলে জানি, তারা সকলে একমত পোষণ করেছেন যে, সালাম বিক্রয় বৈধ।
টিকাঃ
১২. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮২
১৩. ইবনে আব্বাস রা.-এর বর্ণনা, ইমাম শাফেয়ী কর্তৃক স্বীয় মুসনাদে, খ. ২, পৃ. ১৭১; আল হাকেম (খ. ২, পৃ. ২৮৬)
১৪. ইবনুল আরাবী রচিত আহকামুল কুরআন, খ. ১, পৃ. ২৪৭
১৫. হাদীসটি বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে (ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৪২৯), মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৭
১৬. ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩০৪
১৭. আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩০৪
📄 সালাম শরীয়তসম্মত হওয়ার দর্শন
সালাম বিক্রয় এমন একটি চুক্তি যা মানুষের প্রয়োজন হয়ে দেখা দেয়। এর মাধ্যমে মানুষের অসুবিধা ও সমস্যা মোচন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ কৃষকের নিকট অনেক সময় এতটুকু সম্পদ থাকে না যা সে ভূমি চাষযোগ্য করা এবং পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত ফসলের পরিচর্যা করার জন্য খরচ করতে পারে। এদিক লক্ষ করে সালাম বিক্রি বৈধ করা হয়েছে।
ইবনে কুদামা আল মুগনী নামক গ্রন্থে বলেন: "যেহেতু পণ্যটি ক্রয়-বিক্রয়ে দুটো বিনিময়ের একটি, সেহেতু মূল্যের ন্যায় এটিও দায়িত্বে আবশ্যক হতে পারে। তা ছাড়া, মানুষের সালাম বিক্রির প্রয়োজনও রয়েছে। কারণ, চাষী এর মাধ্যমে প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ লাভ করে উপকার পায় এবং ক্রেতাও সস্তায় ফসল প্রাপ্তির উপকার লাভে সক্ষম হয়।"
টিকাঃ
১৯. আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩০৫
📄 সালাম বিক্রি কিয়াস বা যুক্তিসম্মত হওয়ার মাত্রা
ফকীহগণ মতভেদ করেছেন যে, সালামের বৈধতা কি কিয়াসের অনুকূলে নাকি ব্যতিক্রম। হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহগণের মতে, সালাম হলো কিয়াস পরিপন্থী উপায়ে বৈধ একটি চুক্তি। কারণ এটি অস্তিত্বহীন বস্তুর বিক্রি।
বিপরীত দিকে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, সালাম হচ্ছে কিয়াসসম্মত একটি বৈধ চুক্তি। ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, বাকি সালাম হলো এক প্রকার ঋণ এবং এটি বাকি মূল্যে ক্রয়ের মতো। মহান আল্লাহ বলেন : "যদি তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদে বাকি লেনদেন করো তাহলে তোমরা তা লিপিবদ্ধ করে রাখ।” ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, সালাম হলো এমন বস্তু বিক্রি করা যা দায়িত্বে আবশ্যক, যার গুণাগুণ বর্ণনা করা হয়েছে এবং সাধারণভাবে যা হস্তান্তরযোগ্য। সুতরাং এটি কিয়াস সম্মত।
টিকাঃ
২০. কাযী আব্দুল ওয়াহহাব রচিত আল ইশরাফ, খ. ১, পৃ. ২৮০; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২০১
২১. আল বাহরুর রায়েক, খ. ৬, পৃ. ১৬৯
২২. আসনাল মাতালিব শরহু রাওজিত তালিব, খ. ২, পৃ. ১২২
২৩. ইল্লীশ রচিত মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৩
২৪. হাকিম বিন হিযামের হাদীস ইমাম তিরমিযী কর্তৃক উদ্ধৃত (তুহফাতুল আহওয়াযী, খ. ৪, পৃ. ৪৩০)
২৫. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮২
২৬. মাজমুয়াতু ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া, খ. ২০, পৃ. ৫২৯
২৭. ইলামুল মুওয়াককিইন আর রাব্বিল আলামিন, খ. ২, পৃ. ১৯
📄 সালামের রুকন এবং সালাম শুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলি
সম্মিলিত ফকীহ সম্প্রদায়ের মাযহাব হলো সালামের রুকন তিনটি: ১. শব্দ الصیغة : (ঈজাব ও কবুল: প্রস্তাব প্রদান এবং প্রস্তাব গ্রহণ) ২. চুক্তি সম্পাদনকারী দুই পক্ষ: (الْمَعْقُودَانِ) (সালামের ক্রেতা এবং সালামের বিক্রেতা (وَهُمَا الْمُسْلِمُ ، وَالْمُسْلَمُ إِلَيْهِ)) ৩. স্থান/পাত্র (الْمَعْقُودُ عَلَيْهِ) (দুই বস্তু: মূলধন (رَأْسُ الْمَال) ও পণ্য (الْمُسْلَمُ فِيهِ))। এ ক্ষেত্রে হানাফী ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন। তারা মনে করেন, সালামের রুকন হলো কেবল এমন শব্দ যা এই চুক্তি সম্পাদনে দুই ইচ্ছার মিল ও একাত্মতা প্রকাশক প্রস্তাব প্রদান এবং প্রস্তাব গ্রহণের সমন্বয়ে গঠিত।