📄 দ্বিতীয় প্রকার : যেসব চুক্তিতে চুক্তির সময় চুক্তিবদ্ধ জিনিস কজা করা শর্ত
এমন কিছু চুক্তি রয়েছে যেগুলোতে চুক্তির সময়ই চুক্তিবদ্ধ জিনিস দখলে নেওয়া অর্থাৎ কব্জা করা শর্ত। তা কয়েক প্রকার:
ক. এমন যাবতীয় চুক্তি যেগুলোতে মালিকানা স্থানান্তরের জন্যে কব্জা করা শর্ত। যেমন—হেবা, কর্জ বা ঋণ ও আরিয়াত বা ধারপ্রদান।
হেবা বলা হয় : هِيَ تَمْلِيكٌ فِي الْحَيَاة بغير عوض অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার জীবদ্দশায় নিজের কোনো জিনিস বিনিময় ব্যতীত অপরকে দিয়ে দেওয়া। এ প্রসঙ্গে হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, কেবল ঈজাব ও কবুল দ্বারা হেবাতে মালিকানা স্থানান্তর হয় না। বরং হেবাকারীর অনুমতিক্রমে তা কজা করা জরুরি। মালেকীগণ বলেন, মালিকানা স্থানান্তরের জন্যে হেবায় কব্জা করা শর্ত নয়।
এমনিভাবে কর্জ বা ঋণ সম্পর্কে হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন: ঋণগ্রহীতার কাছে মালিকানা স্থানান্তরের জন্যে কব্জা করা শর্ত। এক্ষেত্রে মালেকীগণ বলেন, শুধু চুক্তির মাধ্যমেই তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।
খ. কিছু চুক্তি এমন রয়েছে যেগুলো বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে কজা করা শর্ত। যেমন: সরফ, সুদী বস্তুসমূহ বিক্রি করা, সালাম, মুদারাবা, মুসাকাত, মুযারাআ।
সরফ-চুক্তি বলা হয় : هُوَ بَيْعُ النَّقْدِ بِالنَّقْد অর্থাৎ মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রার লেনদেন। সকল ফকীহ সরফের বিষয়ে একমত, তা বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে চুক্তির মজলিস থেকে উভয়ে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে উভয় বিনিময়বস্তু কব্জা করা শর্ত। তদ্রূপ সুদী জিনিসের বেচাকেনা। যেমন গম, যব ইত্যাদি। এসব বস্তু অনুরূপ বস্তুর বিনিময়ে বিক্রি করতে হলে পরস্পরে কজা করা শর্ত।
সালাম বলা হয় : بيع الأجل بالعاجল “নগদ মূল্যের বিনিময়ে বাকিতে পণ্য বিক্রি করা।” এ ব্যাপারে হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী—এ তিন মাযহাবের ফকীহদের মত হলো, সালাম বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে উভয়ে মজলিস থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্বে বিক্রেতার মূলধন কব্জা করা শর্ত। মালেকীদের প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে, সালামের ক্ষেত্রে চুক্তির মজলিসে মূলধন কজা করা শর্ত নয়।
মুদারাবা হচ্ছে : লাভ নির্দিষ্ট অংশের বিনিময়ে কাউকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সম্পদ দেওয়া। অধিকাংশ ফকীহ বলেন, মুদারাবা-চুক্তি বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে শ্রমিকের কাছে মূলধন হস্তান্তর করা শর্ত।
মুসাকাত-চুক্তি হচ্ছে : ফলের নির্দিষ্ট অংশের বিনিময়ে বাগান চাষ করতে দেওয়া। হানাফী ও শাফেয়ীগণ চুক্তির বৈধতার জন্যে বাগানের মালিকের ওপর শর্তারোপ করেছেন; শ্রমিকের কাছে বাগান হস্তান্তর করা। জমি যদি কৃষকের কাছে হস্তান্তর না করা হয় তবে মুযারাআ বিশুদ্ধ হবে না।
টিকাঃ
১৬২. ইবনে নুজাইম, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ২৭৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৪০০; সুয়ূতী, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩১৯; ইবনে রাজাব, আল কাওয়ায়িদ, পৃ. ৭১
১৬৩. হাশিয়া দুসূকী মা'আশ শারহিল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১০১
১৬৪. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ১৩৯৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২০; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৭৫
১৬৫. দারদীর প্রণীত আশ শারহুল কাবীর, দুসূকীর হাশিয়াসহ, খ. ৩, পৃ. ২২৬
১৬৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ২১৪
১৬৮. বুখারী, ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৩৮০; মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২০৮
১৬৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২১৫; আল-কাওয়ানীন আল-ফিকহিয়্যা, পৃ. ২৭৫; রওযাতুত তালিবীন, খ. ৩, পৃ. ৩৭৯; কাশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২১৭
১৭১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২০২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১০২; কাশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৩৯১
১৭৩. মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৫১৪
১৭৪. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৮৪; আশ শারহুল কাবীর মা'আ হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৫১৭; ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ২৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০
১৭৫. ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ২৫
১৭৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ১৪৪৫; মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা; রওজাতুত তালিবীন, খ. ৫, পৃ. ১৫৫
১৭৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১৭৮
📄 যে সকল চুক্তি আবশ্যক হওয়ার জন্যে কজা করা শর্ত
কিছু চুক্তি এমন রয়েছে যেগুলো আবশ্যক হওয়ার জন্যে কব্জা করা শর্ত। যেমন হেবা ও বন্ধক। হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের অভিমত হলো, কব্জা করার পূর্বে কেবল ঈজাব ও কবুল দ্বারা হেবা-চুক্তি আবশ্যক হয়ে যায় না। সুতরাং হেবাকৃত বস্তু হেবাগ্রহণকারী কব্জা না করা পর্যন্ত হেবাকারী তার হেবা প্রত্যাহার করার সুযোগ পাবে। মালেকীগণ বলেন, কয়েকটি বিশেষ অবস্থা ব্যতীত সর্বাবস্থায় কব্জা করার দ্বারা হেবা আবশ্যক হয়ে যায়।
বন্ধকের ক্ষেত্রে দখল বা কজা করাকে সকল ফকীহ শর্ত বলে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং বন্ধকদাতার প্রত্যাহারমূলক কথায় বন্ধকচুক্তি রহিত হয়ে যায়; তদ্রূপ এমন কাজ দ্বারাও রহিত হয়ে যায় যা বন্ধকদাতার মালিকানা দূর করে দেয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন পরিভাষা : رَهْن
টিকাঃ
১৭৮. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৪০১; কাশাফুল কিনা, খ. ৪, পৃ. ২৫৩; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ১২৩-১২৭
১৭৯. আদ দুসুকী, মা'আশ শারহিল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১০১
১৮০. ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩০৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২৮; ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৬৬
📄 পঞ্চম. বিনিময়পূর্ণ ও অনুদানমূলক চুক্তিসমূহ
কিছুসংখ্যক ফকীহ চুক্তিতে বিনিময় বিদ্যমান ও অবিদ্যমান—এ দৃষ্টিকোণ থেকে সমুদয় চুক্তি দুভাগে ভাগ করেছেন: ১. বিনিময়পূর্ণ চুক্তি (عُقُودُ الْمُعَاوَضَةِ); এবং ২. অনুদানমূলক চুক্তি (عُقُودُ التبرع)।
প্রথম প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, বেচাকেনার সকল প্রকার, যেমন পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বিক্রি, সালাম, সরফ, ইজারা, অর্ডার, সন্ধি, বিয়ে, খুলা, মুদারাবা, মুযারাআ, মুসাকাত, অংশীদারী চুক্তি ইত্যাদি এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয় প্রকারের উদাহরণ হচ্ছে : হেবা, আরিয়াত বা ধার, ওদীয়ত, ওকালাত, ঋণগ্রহীতার অনুমতি ব্যতীত কাফালত গ্রহণ, বন্ধক, অসীয়ত ইত্যাদি।
বিনিময়পূর্ণ চুক্তি এবং অনুদানমূলক চুক্তির বিধানে পার্থক্য রয়েছে, চুক্তি সম্পাদনকারী উভয় পক্ষের দায়িত্ব কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে। বিনিময়মূলক চুক্তি যেমন বেচাকেনা ও ইজারা ইত্যাদিতে চুক্তি সম্পাদনকারী উভয়ের কৃত অঙ্গীকার পূরণ করা ওয়াজিব—যদি তা শর্তসহকারে সঠিকভাবে সংঘটিত হয়ে থাকে। কিন্তু অনুদানমূলক চুক্তি, যেমন, হেবা, আরিয়াত, কর্জ, অসীয়ত ইত্যাদি এর বিপরীত। এসব চুক্তিতে অনুদান প্রদানকারীর অঙ্গীকার পূরণ করা ওয়াজিব বা আবশ্যক নয়। কারণ, সে অনুগ্রহকারী ও স্বেচ্ছাদানকারী।
মালেকীগণের মতে অনুদানমূলক হলেও কিছু চুক্তিতে চুক্তি পূরণ করা আবশ্যক। যেমন নির্দিষ্ট মেয়াদের আরিয়াত সময় অতিবাহিত হতেই ফেরত দেওয়া তাদের মতে ওয়াজিব। যেমনিভাবে তাদের মতে হেবা কবুল করা আবশ্যক। সুতরাং যদি হেবাকারী তা অর্পণ করতে অসম্মত হয় তাহলে তাকে বাধ্য করা যাবে।
টিকাঃ
১৮১. আয যারকাশী, আদ দুররুল মানছুর, খ. ২, পৃ. ৪০৩; ইবনে রাজাব, আল-কাওয়ায়িদ, পৃ. ৭৪
১৮২. আল-কারাফী, আল ফুরূক, খ. ১, পৃ. ১৫১
১৮৩. সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ১
১৮৪. সূরা আল-মায়িদা, আয়াত-২
১৮৫. হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৪০৯-৪৪২
১৮৬. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২৬২
📄 ষষ্ঠ : শুদ্ধ, বাতিল ও ফাসিদ চুক্তি
শরীয়ত কোনো চুক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং এর ফলাফল প্রকাশিত হওয়া কিংবা কোনোটাই না হওয়ার বিচারে ফকীহগণ চুক্তিকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: ১. বিশুদ্ধ চুক্তি (الْعَقْدُ الصَّحِيحُ), ২. অবিশুদ্ধ চুক্তি (الْعَقْدُ غَيْرُ الصَّحِيحُ)।