📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 তৃতীয় : খিয়ারের সুযোগ থাকা বা না থাকা হিসাবে বিভক্তি

📄 তৃতীয় : খিয়ারের সুযোগ থাকা বা না থাকা হিসাবে বিভক্তি


আল্লামা ইবনে কুদামা চুক্তিতে খিয়ারের (গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের স্বাধীনতা) সুযোগ থাকা বা না থাকা হিসাবে চুক্তিকে ছয়ভাগে ভাগ করেছেন। তা নিম্নরূপ:

ক. এমন আবশ্যকীয় চুক্তি যার উদ্দেশ্য কেবল বিনিময়। যেমন বেচাকেনা ও বেচাকেনার সদৃশ অন্যান্য চুক্তি। আর তা দু প্রকার:
প্রথম প্রকার: সেখানে দু ধরনের খিয়ার সাব্যস্ত হয়। খিয়ারুল মজলিস ও খিয়ারুশ শারত। যেমন এমন বেচাকেনা যেটিতে মজলিসে কব্জা করা শর্ত নয়। এমন সন্ধি করা যার মধ্যে বেচাকেনার অর্থ রয়েছে।
দ্বিতীয় প্রকার: যে চুক্তির মধ্যে মজলিসেই কব্জা করা শর্ত। যেমন সরফ, সালাম, সুদী পণ্যকে একই প্রকারের পণ্যের বিনিময়ে বিক্রি করা। এসব চুক্তিতে খিয়ারুশ শারত সাব্যস্ত হবে না।

খ. আবশ্যকীয় চুক্তি, তাতে বিনিময় গ্রহণ করা হলেও তা মূল উদ্দেশ্য থাকে না। যেমন বিবাহ ও খুলা। এ দুটোতে খিয়ার হবে না। কারণ, খিয়ার সাব্যস্ত হয় ব্যয়কৃত অর্থের বিনিময়ে নিজের প্রাপ্য অংশের যথাযথ পরিচয় লাভ করার জন্যে। তদ্রূপ ওয়াকফ, হেবা।

গ. একপক্ষ হতে আবশ্যকীয় চুক্তি, অন্য পক্ষ থেকে নয়। যেমন বন্ধক; তা বন্ধকদাতার পক্ষ হতে আবশ্যক, কিন্তু বন্ধকগ্রহীতার পক্ষ হতে অবশ্যক নয়। সুতরাং তাতে খিয়ার সাব্যস্ত হবে না।

ঘ. উভয় পক্ষ হতে অনাবশ্যক চুক্তি। যেমন: অংশীদারী কারবার, মুদারাবা, মজুরি-চুক্তি, ওকালাত, ওদীয়ত, অসীয়ত ইত্যাদি। এ সকল চুক্তিতে খিয়ার সাব্যস্ত হবে না। কারণ, এ চুক্তিগুলো সংঘটিত হতে খিয়ারের প্রয়োজন হয় না।

ঙ. আবশ্যক ও অনাবশ্যক দুটোর মাঝামাঝি চুক্তি। যেমন: মুসাকাত ও মুযারাআ। বাহ্যত এ দুটি চুক্তি বৈধ, আবশ্যক নয়। তাই এ দুটোতে খিয়ারের কোনো প্রয়োজন না থাকায় খিয়ার হবে না।

চ. এমন আবশ্যক চুক্তি যার মধ্যে সম্পাদনকারী উভয়ের একজনের স্বাধীনতা থাকে। যেমন হাওয়ালা এবং শুফআ। এগুলোতে খিয়ার হবে না। যেহেতু চুক্তিতে একজনের সন্তুষ্টি বিবেচনা করা হয় না, তাই তার কোনো খিয়ার থাকবে না।

টিকাঃ
১৫৮. ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৯৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 চতুর্থ : যেসব চুক্তিতে দখল বা কজা করা শর্ত আর যেগুলোতে শর্ত নয়

📄 চতুর্থ : যেসব চুক্তিতে দখল বা কজা করা শর্ত আর যেগুলোতে শর্ত নয়


দখল বা কব্জা করা শর্ত কিংবা শর্ত নয়—এ হিসেবে ফকীহগণ সকল চুক্তি দুই ভাগে ভাগ করেছেন:

প্রথম প্রকার: এমন সব চুক্তি যেগুলোতে মোটামুটিভাবে চুক্তির সময় চুক্তিবদ্ধ বস্তু কজা করা শর্ত নয়। এ প্রকারের উদাহরণ হচ্ছে সাধারণ বেচাকেনা, ইজারা, বিয়ে, অসীয়ত, ওকালাত, হাওয়ালা ইত্যাদি। বেচাকেনা তো ঈজাব ও কবুল দ্বারা সংঘটিত হয়ে যায়। এরপর এই চুক্তির ফলাফল ও প্রভাব প্রকাশিত হয়। পণ্যের মালিকানা বিক্রেতার নিকট হতে ক্রেতার কাছে চলে যায়, মূল্যের মালিকানা ক্রেতার নিকট থেকে সরে এসে বিক্রেতার হয়ে যায়। এই বিধান ফকীহদের ঐকমত্য অনুযায়ী। তবে হানাফী ও শাফেয়ী ফকীহগণ স্পষ্ট বলেছেন, বেচাকেনার ক্ষেত্রে যদিও শুধু চুক্তির দ্বারাই মালিকানা স্থানান্তর হয়ে যায়, কিন্তু পণ্য ও মূল্য কজা করা ব্যতীত তা স্থায়িত্ব লাভ করে না।

ইজারা শুধু ঈজাব ও কবুল দ্বারাই সংঘটিত হয়। আর ইজারার ফলাফল বা প্রভাব প্রকাশিত হয় চুক্তি সংঘটিত হওয়ার দ্বারাই; তা উসুল করার চাহিদা প্রকাশ করা ছাড়াই। এটি অধিকাংশ আলেমের অভিমত। তবে হানাফীগণ এর বিপরীত মত ব্যক্ত করেন। তাঁরা বলেন: ভাড়াদাতা কেবল চুক্তির দ্বারাই ভাড়ার টাকার মালিক হয়ে যাবে না; বরং সে ভাড়ার টাকার উসুল করা কিংবা ভাড়ার টাকা উসুল করার সুযোগ লাভ করার দ্বারা হতে পারে। তেমনিভাবে বিয়েতে কেবল চুক্তির মাধ্যমেই এর ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়। মহর গ্রহণ করা ছাড়াই। তদ্রূপ অসীয়ত, ওকালাত, হাওয়ালা।

টিকাঃ
১৫৯. ইবনে নুজাইম, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৪৭; সুয়ূতী, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ২৮২; ইবনে রাজাব, আল-কাওয়ায়িদ, পৃ. ৭৪-৭৬
১৬০. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২১৮; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১৬৪; ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪৪৩
১৬১. ইবনে নুজাইম, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৪৮

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দ্বিতীয় প্রকার : যেসব চুক্তিতে চুক্তির সময় চুক্তিবদ্ধ জিনিস কজা করা শর্ত

📄 দ্বিতীয় প্রকার : যেসব চুক্তিতে চুক্তির সময় চুক্তিবদ্ধ জিনিস কজা করা শর্ত


এমন কিছু চুক্তি রয়েছে যেগুলোতে চুক্তির সময়ই চুক্তিবদ্ধ জিনিস দখলে নেওয়া অর্থাৎ কব্জা করা শর্ত। তা কয়েক প্রকার:

ক. এমন যাবতীয় চুক্তি যেগুলোতে মালিকানা স্থানান্তরের জন্যে কব্জা করা শর্ত। যেমন—হেবা, কর্জ বা ঋণ ও আরিয়াত বা ধারপ্রদান।
হেবা বলা হয় : هِيَ تَمْلِيكٌ فِي الْحَيَاة بغير عوض অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার জীবদ্দশায় নিজের কোনো জিনিস বিনিময় ব্যতীত অপরকে দিয়ে দেওয়া। এ প্রসঙ্গে হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, কেবল ঈজাব ও কবুল দ্বারা হেবাতে মালিকানা স্থানান্তর হয় না। বরং হেবাকারীর অনুমতিক্রমে তা কজা করা জরুরি। মালেকীগণ বলেন, মালিকানা স্থানান্তরের জন্যে হেবায় কব্জা করা শর্ত নয়।
এমনিভাবে কর্জ বা ঋণ সম্পর্কে হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন: ঋণগ্রহীতার কাছে মালিকানা স্থানান্তরের জন্যে কব্জা করা শর্ত। এক্ষেত্রে মালেকীগণ বলেন, শুধু চুক্তির মাধ্যমেই তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।

খ. কিছু চুক্তি এমন রয়েছে যেগুলো বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে কজা করা শর্ত। যেমন: সরফ, সুদী বস্তুসমূহ বিক্রি করা, সালাম, মুদারাবা, মুসাকাত, মুযারাআ।
সরফ-চুক্তি বলা হয় : هُوَ بَيْعُ النَّقْدِ بِالنَّقْد অর্থাৎ মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রার লেনদেন। সকল ফকীহ সরফের বিষয়ে একমত, তা বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে চুক্তির মজলিস থেকে উভয়ে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে উভয় বিনিময়বস্তু কব্জা করা শর্ত। তদ্রূপ সুদী জিনিসের বেচাকেনা। যেমন গম, যব ইত্যাদি। এসব বস্তু অনুরূপ বস্তুর বিনিময়ে বিক্রি করতে হলে পরস্পরে কজা করা শর্ত।
সালাম বলা হয় : بيع الأجل بالعاجল “নগদ মূল্যের বিনিময়ে বাকিতে পণ্য বিক্রি করা।” এ ব্যাপারে হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী—এ তিন মাযহাবের ফকীহদের মত হলো, সালাম বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে উভয়ে মজলিস থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্বে বিক্রেতার মূলধন কব্জা করা শর্ত। মালেকীদের প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে, সালামের ক্ষেত্রে চুক্তির মজলিসে মূলধন কজা করা শর্ত নয়।
মুদারাবা হচ্ছে : লাভ নির্দিষ্ট অংশের বিনিময়ে কাউকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সম্পদ দেওয়া। অধিকাংশ ফকীহ বলেন, মুদারাবা-চুক্তি বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে শ্রমিকের কাছে মূলধন হস্তান্তর করা শর্ত।
মুসাকাত-চুক্তি হচ্ছে : ফলের নির্দিষ্ট অংশের বিনিময়ে বাগান চাষ করতে দেওয়া। হানাফী ও শাফেয়ীগণ চুক্তির বৈধতার জন্যে বাগানের মালিকের ওপর শর্তারোপ করেছেন; শ্রমিকের কাছে বাগান হস্তান্তর করা। জমি যদি কৃষকের কাছে হস্তান্তর না করা হয় তবে মুযারাআ বিশুদ্ধ হবে না।

টিকাঃ
১৬২. ইবনে নুজাইম, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ২৭৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৪০০; সুয়ূতী, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩১৯; ইবনে রাজাব, আল কাওয়ায়িদ, পৃ. ৭১
১৬৩. হাশিয়া দুসূকী মা'আশ শারহিল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১০১
১৬৪. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ১৩৯৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২০; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৭৫
১৬৫. দারদীর প্রণীত আশ শারহুল কাবীর, দুসূকীর হাশিয়াসহ, খ. ৩, পৃ. ২২৬
১৬৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ২১৪
১৬৮. বুখারী, ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৩৮০; মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২০৮
১৬৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২১৫; আল-কাওয়ানীন আল-ফিকহিয়‍্যা, পৃ. ২৭৫; রওযাতুত তালিবীন, খ. ৩, পৃ. ৩৭৯; কাশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২১৭
১৭১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২০২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১০২; কাশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৩৯১
১৭৩. মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৫১৪
১৭৪. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৮৪; আশ শারহুল কাবীর মা'আ হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৫১৭; ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ২৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০
১৭৫. ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ২৫
১৭৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ১৪৪৫; মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়‍্যা; রওজাতুত তালিবীন, খ. ৫, পৃ. ১৫৫
১৭৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১৭৮

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 যে সকল চুক্তি আবশ্যক হওয়ার জন্যে কজা করা শর্ত

📄 যে সকল চুক্তি আবশ্যক হওয়ার জন্যে কজা করা শর্ত


কিছু চুক্তি এমন রয়েছে যেগুলো আবশ্যক হওয়ার জন্যে কব্জা করা শর্ত। যেমন হেবা ও বন্ধক। হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের অভিমত হলো, কব্জা করার পূর্বে কেবল ঈজাব ও কবুল দ্বারা হেবা-চুক্তি আবশ্যক হয়ে যায় না। সুতরাং হেবাকৃত বস্তু হেবাগ্রহণকারী কব্জা না করা পর্যন্ত হেবাকারী তার হেবা প্রত্যাহার করার সুযোগ পাবে। মালেকীগণ বলেন, কয়েকটি বিশেষ অবস্থা ব্যতীত সর্বাবস্থায় কব্জা করার দ্বারা হেবা আবশ্যক হয়ে যায়।

বন্ধকের ক্ষেত্রে দখল বা কজা করাকে সকল ফকীহ শর্ত বলে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং বন্ধকদাতার প্রত্যাহারমূলক কথায় বন্ধকচুক্তি রহিত হয়ে যায়; তদ্রূপ এমন কাজ দ্বারাও রহিত হয়ে যায় যা বন্ধকদাতার মালিকানা দূর করে দেয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন পরিভাষা : رَهْن

টিকাঃ
১৭৮. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৪০১; কাশাফুল কিনা, খ. ৪, পৃ. ২৫৩; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ১২৩-১২৭
১৭৯. আদ দুসুকী, মা'আশ শারহিল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১০১
১৮০. ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩০৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২৮; ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৬৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00