📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 হস্তান্তরের ক্ষমতা

📄 হস্তান্তরের ক্ষমতা


চুক্তির ক্ষেত্র সম্পর্কিত আরো একটি শর্ত হলো তা হস্তান্তর করা সম্ভব হতে হবে। আর্থিক বিনিময়যুক্ত লেনদেনের চুক্তিতে সবাই মোটামুটি এ শর্তের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। সুতরাং হারানো বা পালিয়ে থাকা জন্তু বা এ ধরনের কোনো বস্তু কেনাবেচা, ইজারা, সন্ধি বা এ ধরনের কোনো চুক্তির ক্ষেত্র হতে পারবে না। তদ্রূপ ছিনতাইকারী ব্যতীত অন্যের কাছে ছিনতাইকৃত বাড়ি কিংবা জমিন বা অন্য কোনো জিনিস শত্রুর হাতে রেখে বিক্রি করা জায়েয হবে না।

আল্লামা কাসানী বলেছেন: পণ্যের সাথে সম্পর্কিত শর্তসমূহের একটি হলো, চুক্তির সময় পণ্য হস্তান্তর করা সম্ভব হওয়া। তাই চুক্তিকালে পণ্য হস্তান্তর করা সম্ভব না হলে চুক্তিই সংঘটিত হবে না—যদিও পণ্যটি বিক্রেতার মালিকানার থাকে। যেমন পলাতক গোলাম। এমনকি পণ্যটি চুক্তির পরে হস্তান্তরযোগ্য হলে নতুনভাবে ঈজাব ও কবুলের প্রয়োজন পড়বে। তবে উভয় পক্ষ যদি সম্মত থাকে তাহলে পরস্পরে নিছক আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিক্রি সম্পন্ন হবে—তখন আর নতুন ঈজাব-কবুলের দরকার পড়বে না।

ভাড়ায় প্রদানকৃত বস্তুর শর্ত প্রসঙ্গে ইমাম কাসানী বলেন, ইজারার বস্তুটি বাস্তবে ও শরীয়তসম্মতভাবে হস্তান্তরযোগ্য হতে হবে। কারণ, চুক্তিকৃত বস্তুর অনুপস্থিতিতে চুক্তি সংঘটিত হতে পারে না। সুতরাং পলাতক গোলামকে ভাড়া দেওয়া জায়েয হবে না। তদ্রূপ ছিনতাইকারী ব্যতীত অন্যের কাছে ছিনতাইকৃত জন্তু ভাড়া দেওয়া হবে অবৈধ।

আল্লামা যারকাশী রহ. তাঁর আল-মানছুর কিতাবে লিখেছেন: আবশ্যকীয় চুক্তির বিধান হচ্ছে, চুক্তিবদ্ধ বিষয় পরিজ্ঞাত এবং তাৎক্ষণিক হস্তান্তরযোগ্য হতে হবে। তবে যে চুক্তি আবশ্যকীয় নয় তাতে কখনো এমন শর্তের দরকার পড়ে না। যেমন পলাতক গোলাম ফিরিয়ে আনার পুরস্কার চুক্তি।

পণ্যের শর্তাবলি আলোচনায় ইমাম নববী রহ. বলেন: তৃতীয়ত পণ্য হস্তান্তরযোগ্য হওয়া। সুতরাং হারানো, পলাতক এবং ছিনতাইকৃত বস্তু/জন্তু বিক্রি করা জায়েয হবে না। শারবীনী আল-খতীব এর কারণ বর্ণনা করে বলেন, তাৎক্ষণিক ওই বস্তুসমূহ হস্তান্তর করা সম্ভব না হওয়ার কারণে নাজায়েয হয়েছে। অন্যান্য মাযহাবের কিতাবসমূহতেও অনুরূপ বিধান রয়েছে।

তবে স্বেচ্ছাসেবা ও অনুদানমূলক চুক্তিসমূহের ক্ষেত্রে মালেকীগণ পলাতক গোলাম এবং হারানো জন্তু হেবা করাকে জায়েয বলেন। অথচ চুক্তির সময় তা হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। জায়েযের কারণ, তা নিছক অনুদান ও অনুগ্রহ; প্রচলিত অর্থে কোনো চুক্তি নয়। সুতরাং ওই ব্যক্তি যখন তা পেয়ে হস্তগত করতে পারবে তখন এর দ্বারা উপকৃত হবে। আর না পেলেও তো সে কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হবে না—যেমনটি ইমাম কারাফী বলেছেন। হস্তান্তর করা সম্ভব নয় এমন বস্তুতে শাফেয়ীগণ অসীয়ত জায়েয বলেছেন। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ. স্বেচ্ছাসেবামূলক লেনদেনের ক্ষেত্রে বলেছেন: উপস্থিত, অনুপস্থিত বস্তু এবং হস্তান্তর করা সম্ভব কিংবা সম্ভব নয় যে কোনো বস্তু হলেও এ ক্ষেত্রে ধোঁকা ও প্রতারণার কোনো আশস্কা নেই।

টিকাঃ
১৪৩. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৪৭
144. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৮৭
১৪৫. আয যারকাশী, আদ দুররুল মানছুর, খ. ২, পৃ. ৪০০
১৪৬. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২
১৪৭. আল-হাত্তাব এবং হাশিয়া মাওওয়াক, খ. ৪, পৃ. ২৬৮; কাশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ১৬২
১৪৮. আল-ফুরূক, খ. ১, পৃ. ১৫০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২ পৃ. ৪৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 চুক্তির প্রকারভেদ

📄 চুক্তির প্রকারভেদ


ফকীহগণ বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে চুক্তি ভাগ করেছেন এবং তারা চুক্তির নানা বৈশিষ্ট্য ও ফিকহী বিধান বর্ণনা করেছেন। যেগুরো এক ধরনের চুক্তিসমূহে পাওয়া যায়, সেগুলোর দ্বারা অপর ধরনের চুক্তিসমূহ পৃথক হয়ে যায়। ওই প্রকারসমূহের মধ্য হতে কিছু নিম্নরূপ:

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 প্রথম : আর্থিক ও অ-আর্থিক চুক্তি

📄 প্রথম : আর্থিক ও অ-আর্থিক চুক্তি


কোনো সম্পদ বা টাকা পয়সার বিষয়ে চুক্তি সংঘটিত হলে সকল ফকীহের মতে ওই চুক্তিটি আর্থিক চুক্তি। ওই বস্তুর মালিকানা স্থানান্তর বিনিময়ের মাধ্যমে হতে পারে—যেমন বেচাকেনার সকল প্রকার; যথা—সরফ, সালাম, মুকায়াযা (পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বিক্রি); কিংবা বিনিময় ছাড়া হতে পারে—যেমন হেবা, ঋণপ্রদান, কোনো বস্তু সম্পর্কে অসীয়ত করা ইত্যাদি। অথবা তা কোনো কাজের বিনিময়েও হতে পারে; যেমন মুযারাআ, মুসাকাত, মুদারাবা ইত্যাদি।

তবে চুক্তিটি যখন নির্দিষ্ট কোনো কাজের বিপরীতে হবে; যেমন ওকালত, কাফালত, অসী হওয়া অথবা নির্দিষ্ট কোনো কাজ হতে বিরত থাকা; যেমন মুসলমানদের ও কাফেরদের মাঝে যুদ্ধবিরতির চুক্তি, তাহলে তা উভয় পক্ষ থেকেই একটি অ-আর্থিক চুক্তি বলে গণ্য হবে।

আরো কিছু চুক্তি রয়েছে যা একদিক বিচারে আর্থিক চুক্তি হয়, আবার অন্য বিচারে আর্থিক চুক্তি হয় না। যেমন বিয়ে, খুলা, হত্যার বদলে অর্থদন্ডে সন্ধি, জিযিয়া-চুক্তি ইত্যাদি।

ফকীহবৃন্দ মুনাফা ও উপকারিতার চুক্তি—যেমন ইজারা, ধারপ্রদান ইত্যাদি বিষয়ে মতভেদ করেছেন। অধিকাংশ ফকীহ বলেন, এগুলো আর্থিক চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। কারণ তাদের মতে বস্তুর উপকারিতাও সম্পদ কিংবা সম্পদের হুকুমে গণ্য। হানাফীগণ-এর বিরোধিতা করেন। কারণ, তাদের মতে উপকারিতা সম্পদ নয়।

আল্লামা যারকাশী বলেন: চুক্তি হয়তো উভয় পক্ষ থেকে প্রকৃতই আর্থিক হবে; যেমন বেচাকেনা ও সালাম। অথবা বিধানগত আর্থিক হবে; যেমন ইজারা। কারণ, বস্তুর উপকারিতা সম্পদের স্থলাভিষিক্ত। অনুরূপ হচ্ছে মুদারাবা ও মুসাকাত। অথবা চুক্তিটি দুদিকের কোনো দিক থেকে আর্থিক হবে না; যেমন যুদ্ধবিরতির চুক্তি। কারণ, এখানে চুক্তিবদ্ধ জিনিস কোনো সম্পদ নয়; বরং মুসলমান ও কাফের উভয় পক্ষ অপর পক্ষের ওপর আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকা হচ্ছে চুক্তির মূল বিষয়। এমনিভাবে বিচারের চুক্তি। কিংবা চুক্তিটি একপক্ষ থেকে আর্থিক হবে; যেমন বিয়ে, খুলা, হত্যার বদলে আর্থিক সমঝোতা চুক্তি কিংবা জিযিয়ার চুক্তি।

উভয়পক্ষ থেকে অ-আর্থিক চুক্তিটি উভয়পক্ষে আর্থিক চুক্তির তুলনায় বেশি আবশ্যকীয়। এটি এভাবে প্রকাশিত হয়, আর্থিক লেনদেনে বিনিময়দ্রব্যে (পণ্য বা মুদ্রা) কোনো দোষ প্রকাশিত হলে চুক্তিটি রহিত করা জায়েয। যেমন খিয়ারুল আইবে হয়ে থাকে। কিন্তু অ-আর্থিক চুক্তিটি কোনোভাবেই রহিত করা যায় না; তবে কোনো প্রতিবন্ধকতা যদি চুক্তির ধারাবাহিকতার প্রতিবন্ধক হয় তাহলে ভিন্ন কথা।

আর্থিক চুক্তি দুই প্রকার: ১. শুধুই আর্থিক (مُعَاوَضَةٌ مَحْضَةً); ২. নিছক আর্থিক নয় (غَيْرُ مَحْضَة)। শুধু আর্থিক চুক্তি হলো, যেখানে উভয় পক্ষ থেকে অর্থ বা সম্পদই মূল উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। যেমন বেচাকেনা। আর যে চুক্তি শুধু আর্থিক নয় তা শর্তযুক্ত হয় না, অর্থাৎ তাকে কোনো জিনিসের সাথে ঝুলিয়ে রাখা যায় না; তবে মহিলার পক্ষ থেকে খুলা-চুক্তি হলে ভিন্ন কথা। যেমন মহিলা স্বামীর অর্থপ্রাপ্তিকে শর্তযুক্ত করে বলল, 'তুমি আমাকে তালাক দিলে এক হাজার টাকা পাবে।

টিকাঃ
১৫০. মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ২৬৩
১৫১. আয যারকাশী, আল মানছুর, খ. ২, পৃ. ৪০২
১৫২. আয যারকাশী, আল মানছুর, খ. ২, পৃ. ৪০৩

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দ্বিতীয় : আবশ্যকীয় ও অনাবশ্যকীয় চুক্তি

📄 দ্বিতীয় : আবশ্যকীয় ও অনাবশ্যকীয় চুক্তি


আবশ্যকীয় চুক্তি (الْعُقُودُ اللأزمة) হলো এমন চুক্তি যা দুপক্ষের একপক্ষ অন্যের সন্তুষ্টি ব্যতীত রহিত করতে পারে না। আর এর বিপরীত হচ্ছে অনাবশ্যকীয় বা সাধারণ বৈধ চুক্তি (الْعَقْدُ الْجَائِزُ অর্থাৎ الْعُقُودُ غَيْرُ اللأزمة)। এর সংজ্ঞা: তা এমন চুক্তি যা একপক্ষ অন্যপক্ষের সন্তুষ্টি ব্যতীত রহিত বা ভঙ্গ করতে পারে।

চুক্তি আবশ্যক হওয়া বা না হওয়ার দিক বিবেচনা করে ফকীহ সমাজ যাবতীয় চুক্তি কয়েক ভাগে বিভক্ত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লামা সুযুতী রহ. বলেন, দুজন বা দুপক্ষের মাঝে সংঘটিত চুক্তি কয়েক প্রকার:

প্রথমত: যা উভয় পক্ষ থেকে আবশ্যক। যেমন—বেচাকেনা, সরফ, সালাম, তাওলিয়া, তাশরীক, বিনিময়ের সন্ধি, হাওয়ালা, ইজারা, মুসাকাত, হেবার জিনিস গ্রহণের পর অপরিচিত কাউকে হেবা করে দেওয়া, মহর ও খুলার বিনিময়।

দ্বিতীয়ত: উভয় পক্ষ থেকে নিশ্চিত অনাবশ্যকীয়। যেমন—অংশীদারী ব্যবসা, ওকালত বা প্রতিনিধি নিযুক্তকরণ, মুদারাবা, অসীয়ত, আরিয়ত, ওদীয়ত, ঋণ দেওয়া, মজুরি-চুক্তি, বিচারকার্য, প্রশাসনিক সকল দায়িত্ব—শাসনক্ষমতা ব্যতীত।

তৃতীয়ত: মতানৈক্যপূর্ণ চুক্তি। তবে সঠিক কথা হচ্ছে তা আবশ্যকীয়। যেমন দৌড় প্রতিযোগিতা ও তীর প্রতিযোগিতা, এ হিসেবে যে এগুলো ইজারার মতো। এই মতের বিরুদ্ধচারীগণ বলেন, উভয়টাতে পুরস্কার রয়েছে। আর বিয়ে মহিলার পক্ষ থেকে নিশ্চিত আবশ্যকীয়; সঠিক মতানুসারে পুরুষের পক্ষ থেকেও।

চতুর্থত: অনাবশ্যকীয় চুক্তি, যা পরবর্তী সময়ে আবশ্যক হয়ে যায়। যেমন, গ্রহণ করার পূর্বে হেবা ও বন্ধক। মৃত্যুর পূর্বে অসীয়ত।

পঞ্চমত: একপক্ষ থেকে আবশ্যক হলেও অন্যপক্ষ হতে অনাবশ্যক। গ্রহণের পর বন্ধক, ক্ষতিপূরণ, কাফালত, নিরাপত্তার চুক্তি ও শাসনব্যবস্থা।

আল্লামা যারকাশী রহ. বলেন: মূলত চুক্তির প্রকার হচ্ছে তিনটি: ১. উভয় পক্ষ হতে আবশ্যক। ২. উভয় পক্ষ থেকে অনাবশ্যক। ৩. একপক্ষ থেকে আবশ্যক, অন্যপক্ষ হতে অনাবশ্যক। তিনি আরো বলেন, আবশ্যকীয় চুক্তির বিধান হলো চুক্তিবদ্ধ বিষয় নির্দিষ্ট, পরিজ্ঞাত ও তাৎক্ষণিক হস্তান্তরযোগ্য হতে হবে। কিন্তু অনাবশ্যকীয় চুক্তি এমন নাও হতে পারে।

উভয়পক্ষ হতে আবশ্যক—এমন চুক্তির আরো বিধান হচ্ছে, তাতে স্থায়ী খিয়ার থাকবে না। এবং চুক্তি সম্পাদনকারী একজন কিংবা উভয়ে মৃত্যুবরণ করলেও এই চুক্তি রহিত হবে না। তদ্রূপ পাগলামি ও বেহুঁশ হওয়ার কারণে রহিত হবে না। কিন্তু জায়েয চুক্তি, যা আবশ্যক নয় এর বিপরীত।

এই নীতিমালা হানাফীদের মত অনুসারে কার্যকর নয়। তারা তাদের মতের সপক্ষে বলেন, ইজারা-চুক্তি এমন একটি চুক্তি যা উভয় পক্ষ থেকেই আবশ্যক। তবে ইজারা বাতিল হয়ে যায় মৃত্যু দ্বারা। কারণ, ইজারা লাভের ওপর হয়ে থাকে। আর লাভ ও উপকার তো একটু একটু করে উৎপাদন হতে থাকে। সুতরাং উভয়পক্ষের যে কারোর ইন্তেকালের পর সৃষ্ট উপকারিতা চুক্তির সময় ছিল না।

টিকাঃ
১৫৩. আয যারকাশী, আল মানছুর, খ. ২, পৃ. ৪০০
১৫৪. সুয়ূতী, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ২৭৫; ইবনে নুজাইম, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৩৬
১৫৫. আয যারকাশী, আদ দুররুল মানছুর, খ. ২, পৃ. ৩৯৮ ও ৪০০
১৫৬. আয যারকাশী, আদ দুররুল মানছুর, খ. ২, পৃ. ৪০১
১৫৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ২২২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00