📄 ইজারা শব্দের সাথে বিভিন্ন শর্তারোপ
সর্বসম্মতভাবেই ইজারাচুক্তিতে বিভিন্ন ধরনের শর্তারোপ করা যায়; তবে শর্ত যদি এমন হয় যে ইজারার মেয়াদ শেষ হলেও তার প্রভাব থেকে যায়, এমন শর্তারোপের ক্ষেত্রে ফকীহগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। যেমন কেউ যদি শর্তারোপ করে, আমি তোমার কাছে ফসলী জমি ইজারা দিতে পারি তবে শর্ত হলো, অসমতল জমিটাকে সমান করে নিতে হবে কিংবা জমিতে সেচ দেওয়ার শর্তারোপ করে তবে তা জায়েয হবে।
কিন্তু শর্ত যদি এমন হয় যে, ফসল উৎপাদনের পর পুনরায় সে তাতে চাষ করবে কিংবা জমিতে থাকা ড্রেন খনন করে দিতে হবে, যার উপকারিতা ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বজায় থাকে, হানাফীদের মতে এমন শর্তারোপ অগ্রহণযোগ্য। মালেকীগণ এমন শর্তারোপ জায়েয মনে করেন। জমির ইজারাদাতা যদি এমন শর্তারোপ করে যে, ইজারাগ্রহীতা নিজেই চাষাবাদ করবে, কিংবা জমিতে শুধু গমচাষ করতে হবে, তবে এসব শর্ত ইজারাচুক্তির উদ্দেশ্যের পরিপন্থী বলে বিবেচিত হবে, তাই এ সকল শর্ত মানা ইজারাগ্রহীতার জন্যে বাধ্যতামূলক হবে না।
অধিকাংশ ফকীহ তথা শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী ফকীহগণের বিশুদ্ধ মতে, জমি ইজারার উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। চাষাবাদ বা শস্য উৎপাদন করা হবে, না বৃক্ষরোপণ, তা উল্লেখ করাই যথেষ্ট হবে। যদি বৃক্ষরোপণ কিংবা ফসল উৎপাদনের বিষয়টি উল্লেখ করা না হয় এবং এ ব্যাপারে সেখানে কোনো প্রচলিত রীতিও না থাকে, তাহলে অস্পষ্টতার কারণে ইজারাচুক্তি জায়েয হবে না। হানাফীদের মতে, কী ফসলের চাষ করবে তা নির্দিষ্ট করাও তাদের দৃষ্টিতে ইজারা সহীহ হওয়ার জন্য শর্ত।
টিকাঃ
১১৮. আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২৩৫; আদ দুসূকী, খ. ৪, পৃ. ৬; মাওয়াহিবুস সামাদ, পৃ. ১০২; গায়াতুল বায়ান লিরামলী, খ. ১, পৃ. ২২৭; আত তাওযিহু লিশশাওকী, পৃ. ২০৭
১১৯. আল-ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৪৬১-৪৬২; হাশিয়া আদ দুসুকী, খ. ৪, পৃ. ৪৫-৪৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৩০২-৩০৩; কাশশাফুল কিনা, খ. ৪, পৃ. ১৬
১২০. আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২৪৩; হাশিয়া আদ দুসূকী, খ. ৪, পৃ. ৪৬; আশ শারহুস সাগীর, খ. ৪, পৃ. ৬২
১২১. কাশফুল হাকায়েক, খ. ৬, পৃ. ১৬০; আশ শারহুস সাগীর, খ. ৪, পৃ. ১৪, ৬৩; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৪০৩-৪০৪; কাশশাফুল কিনা, খ. ৪, পৃ. ১৩; আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৬০
📄 ফসলী জমি ইজারার বিধান
ফসলী জমি ইজারার ক্ষেত্রে মালিকের দায়িত্ব হলো জমি খালি করে হস্তান্তর করা এবং ইজারাগ্রহীতার দায়িত্ব হলো ভাড়া পরিশোধ করা ও জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
📄 জমির মালিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য
ইজারাগ্রহীতার কাছে জমি খালি অবস্থায় হস্তান্তর করা ভূমি মালিকের কর্তব্য। অন্যের আবাদ করা ফসল জমিতে থাকাবস্থায় যদি জমি ইজারা নেয় বা জমিতে যদি এমন কিছু থাকে যার ফলে জমিতে চাষাবাদ সম্ভব না হয়, তবে ইজারা সহীহ হবে না। হাম্বলীগণ বলেন, ইজারার মেয়াদের মধ্যে যদি জমি অন্য কিছু দ্বারা আবদ্ধ থাকে আর ইজারার মেয়াদের মধ্যেই খালি হয়ে যায় তবে যতটুকু সময় খালি থাকবে মেয়াদের সেই অংশের হিসাব মতে মূল্য দেয়ার মাধ্যমে ইজারা জায়েয হবে।
টিকাঃ
১২২. আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৪৬৮; হাশিয়া দুসুকী, খ. ৪, পৃ. ৪৭; আল মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৪০৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৪৭২
📄 ইজারাগ্রহীতার দায়িত্ব ও কর্তব্য
ইজারাগ্রহীতার দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো, চুক্তিবদ্ধ হিসেব অনুযায়ী ইজারার মূল্য পরিশোধ করা। হানাফীগণ বলেন, যে জমিতে নদীর পানি কিংবা বৃষ্টির পানি দ্বারা সেচ দেওয়া হতো তাতে যদি কোন কারণে পানি আসা বন্ধ হয়ে যায়, তবে তা ভাড়া পরিশোধকে রহিত করে দেবে। মালেকীদের মতে, ইজারার জমিতে যদি সেচ দেওয়ার পানি না পাওয়া যায় কিংবা আবাদ করার আগেই পানিতে তলিয়ে যায় এবং ইজারার মেয়াদ পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে থাকে, তাহলে ভাড়া আবশ্যিক হবে না। শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণ বলেন, কেউ যদি চাষাবাদ করার জন্য জমি ইজারা নেয় আর আবাদ করার জন্য সেচ দেয়ার পানি নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে ইজারাগ্রহীতা ইজারা রহিত করার অধিকার পাবে।
ইজারাগ্রহীতার কর্তব্য হলো, চুক্তির শর্তাদি মেনে প্রচলিত রীতিনীতির মধ্যে থেকে জমি ব্যবহার করে উপকৃত হওয়া। ইজারাগ্রহীতা এমন পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারবে না যার দ্বারা জমির বেশি ক্ষতি হয়। অধিকাংশ ফকীহ বলেন, জমির মালিক ও ইজারাগ্রহীতা উভয়ে সমঝোতা করে যে কোনো ফসল আবাদ করতে পারবে। হানাফীগণ বলেন, গম চাষ করার কথা বলে কেউ যদি ইজারাকৃত জমিতে তুলা চাষ করে তবে তা জায়েয হবে না।
টিকাঃ
১২৩. আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২৪২-২৪৩; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৮৩; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৪৪০
১২৪. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৪৬৮; হাশিয়া আদ দুসূকী, খ. ৪, পৃ. ৪৭; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৪০৬-৪০৭; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৪৭২
১২৫. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৪৬১
১২৬. হাশিয়া আদ দুসূকী, খ. ৪, পৃ. ৫০
১২৭. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৯৫-৪০৫; আশ শারহুস কবীর, খ. ৬, পৃ. ৮০-৮১; কাশশাফুল কিনা, খ. ৪, পৃ. ২২