📄 তিন. পণ্য ধ্বংসের কারণে ইজারার সমাপ্তি
ইজারাচুক্তির সুবাদে যে পণ্য অর্জিত হয় সেই পণ্য যদি ধ্বংস হয়ে যায়, কিংবা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে ইজারাচুক্তির সমাপ্তি ঘটে। কেননা, এ অবস্থায় ইজারা দ্বারা উপকার লাভের উদ্দেশ্যই সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়ে যায়। যেমন— ভাড়াকৃত জাহাজ ভেঙ্গে টুকরো হয়ে গেছে কিংবা ভাড়াকৃত বাড়ি ভেঙ্গে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। উল্লিখিত অবস্থায় সকল ফকীহের মতেই ইজারাচুক্তির সমাপ্তি ঘটবে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত ইজারাচুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার বর্ণনায় করা হবে।
📄 চার. অসুবিধার কারণে ইজারা রহিত হওয়া
হানাফী ফকীহগণের অভিমত হলো, ইজারাচুক্তি সম্পাদনকারী দু পক্ষের কেউ কিংবা যে পণ্যদ্রব্যটি ইজারা দেওয়ার কথা সেটি কোনো বিপত্তির সম্মুখীন হয়, যার দরুন পণ্য থেকে উপকার লাভ করা সম্ভব না হয়, তবে ইজারাচুক্তি কার্যকর করা আবশ্যিক থাকে না। তখন ইজারাচুক্তি রহিত করা যায়। কেননা যখন সত্যিকার অর্থেই কোনো বিপত্তির উদ্ভব হয় তখন পরিস্থিতি চুক্তি রহিতকরণের দাবি করে। কেননা, কোনো বিপত্তির উদ্ভব হওয়ার পরও যদি ইজারাচুক্তি বজায় রাখা হয়, তবে যে পক্ষ বিপত্তির কবলে পড়েছে, তাকে এমন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, এই চুক্তি তাকে যে ক্ষতির দায়বহন করতে বাধ্য করে না। ফলে এই চুক্তি রহিতকরণের দ্বারা সে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করা থেকে রক্ষা করতে পারে। এ ধরনের ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করার অধিকার তার আছে। তারা একথাও বলেছেন, কোনো বিপত্তি ও অসুবিধার সম্মুখীন হওয়ার পরও এই চুক্তি রহিত করার অধিকার না দেওয়া যুক্তি ও শরীয়তের পরিপন্থী। বিষয়টি অনেকটা এমন হয়ে যাবে যে, কেউ কোনো ডাক্তারের সাথে ব্যথাজনিত কারণে আক্রান্ত দাঁত ফেলার চুক্তি করল। কিন্তু তার দাঁতের ব্যথা ইতোমধ্যে কমে গেল, আর দাঁত তুলে ফেলার প্রয়োজনের পরিসমাপ্তি ঘটল। কিন্তু ডাক্তার তাকে দাঁত ফেলতে বাধ্য করল। এটিও তেমনি যুক্তি ও শরীয়তের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।
মালেকীগণ বিপত্তির জন্যে ইজারা রহিত করার মাসআলায় হানাফী ফকীহগণের কাছাকাছি অভিমত ব্যক্ত করেন। অবশ্য হানাফীদের মতে যতটা ব্যাপকতা রয়েছে, মালেকীগণের মতে তা নেই। মালেকীগণ বলেন, ভাড়ার পণ্য বা তার মুনাফা যদি ছিনতাই হয়ে যায় কিংবা কোনো জালেমের কজায় চলে যায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সেই জালেমকে পাকড়াও করতে না পারে; অবস্থা যদি এমন হয় যে, ভাড়াকৃত দোকান কোনো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বন্ধ করে দেয় কিংবা দুগ্ধদানকারিণী মহিলা পুনর্বার গর্ভধারণ করে, কারণ গর্ভবতীর দুধ দুগ্ধপায়ী শিশুর জন্যে ক্ষতির কারণ হয় কিংবা দুগ্ধদানকারিণী মহিলা কোনো গুরুতর অসুখে আক্রান্ত হয়ে দুধপান করাতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তাহলে ইজারাগ্রহীতা ইচ্ছা করলে এই চুক্তি রহিত করতে পারবে, বহালও রাখতে পারবে।
অন্য ফকীহগণ বিপত্তির কারণে ইজারাচুক্তি রহিত করার বিপক্ষে। তারা বলেন, ইজারাও ক্রয়বিক্রয়ের একটি শাখা, কাজেই এই লেনদেনও বহাল থাকবে। যেহেতু চুক্তি দুপক্ষের সম্মতিতে সম্পাদিত হয়েছে তাই এক পক্ষের অসুবিধার কারণে তা রহিত হবে না, রহিত হতে উভয়পক্ষের সম্মতি জরুরি। শাফেয়ীগণের পরিষ্কার অভিমত হলো, বিপত্তি কিংবা একপক্ষের অসুবিধার কারণে ইজারাচুক্তি রহিত করা যাবে না।
হানাফীদের এক্ষেত্রে যুক্তি হলো, এমন অসুবিধা ইজারাগ্রহীতার পক্ষে হতেই পারে, যেমন ভাড়াটে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কারণে ভাড়া নেওয়া দোকানে ব্যবসা বন্ধ করে দিল, কিংবা সে বিদেশে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কিংবা ব্যবসা ত্যাগ করে সে কৃষিকাজে জড়িয়ে পড়ল, কিংবা ফসলী জমির ভাড়াগ্রহীতা কৃষিকাজ ছেড়ে ব্যবসায়ে লেগে গেল, কেউ পূর্বের পেশা ত্যাগ করে নিজেকে অন্য পেশায় নিয়োজিত করল। যে নিঃস্ব হয়ে গেছে, তার পক্ষে ভাড়াকৃত দোকান থেকে কোনো লাভ অর্জন সম্ভব নয়, তখনও যদি তার উপর ইজারা যথাপূর্ব বহাল রাখা হয় তবে সে আরো বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তেমনি কারো যদি দেশের বাইরে কিংবা অন্য জায়গায় চলে যাওয়াটা অপরিহার্য হয়ে পড়ে তাকে আটকে রাখাটাও হবে ক্ষতিকর।
কখনো ইজারাদাতার পক্ষ থেকেও বিপত্তির উদ্ভব ঘটতে পারে : যেমন ভাড়াদাতা এমন ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে যে, ভাড়ায় প্রদত্ত পণ্যটি বিক্রি ছাড়া তার গত্যন্তর নেই, এ অবস্থায় সে চুক্তি রহিত করার অধিকার পাবে। হানাফী ফকীহদের মতে, কোনো মহিলা যদি কারো শিশুকে দুধ পান করানোর চুক্তি করে, আর এ চুক্তির কারণে লোকজন তার বদনাম করে, তবে তার পরিবার এ চুক্তি রহিত করার অধিকার পাবে।
টিকাঃ
৮৮. আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৭৬; আল-ইনসাফ, খ. ৬, পৃ. ৬১-৬২; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৯৬; আশ শারহুস সাগীর ওয়া হাশিয়া আস-সাভী, খ. ৪, পৃ. ৪৯
৮৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৯৭; আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২৫০; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৪৫৮; আল-মাবসূত, খ. ১৬, পৃ. ২
৯০. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৪, পৃ. ৫১; প্রকাশ দারুল মাআরিফ।
৯১. মিনহাজুত তালিবীন, ওয়া হাশিয়াতু কালয়ূবী, খ. ৩, পৃ. ৮১; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৪০৫
৯২. আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ২১
৯৩. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৪৫৮-৪৬০; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৯৮
৯৪. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৯৮
৮৫. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৯৯
📄 পঞ্চম. মৃত্যুজনিত কারণে ইজারাচুক্তি রহিত হওয়া
ইজারাচুক্তির দুপক্ষের একপক্ষ মৃত্যুবরণ করলে হানাফী ফকীহগণের মতে ইজারাচুক্তি রহিত হয়ে যাবে। তদ্রূপ কোনো ইজারায় যদি একাধিক গ্রহীতা থাকে কিংবা একাধিক ইজারাদাতা থাকে আর তাদের মধ্যে কোনো একজনের মৃত্যু ঘটে তবে মৃতব্যক্তির অংশের ইজারা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ইমাম যাইলায়ী রহ. বলেন, ইজারাদাতার মৃত্যুজনিত কারণে ইজারাচুক্তি রহিত হওয়ার ব্যাখ্যায় বলেন, ইজারাকৃত পণ্য দ্বারা ধীরে ধীরে উপকার লাভের বিনিময়ে ইজারাচুক্তি বাস্তবায়িত হয়। ফলে ইজারাদাতার মৃত্যুর কারণে এখন যা সৃষ্টি হচ্ছে তার মালিক হচ্ছে অন্য লোকজন, যারা চুক্তি সম্পাদনকারীও নয় চুক্তিতে সম্মতও নয়। ফলে ইজারা বাতিল হওয়াটাই যৌক্তিক।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইজারাচুক্তির পরিসমাপ্তি তখন ঘটবে যখন ইজারাদাতা সমাপ্তির দাবি করবে। ইজারাদাতার মৃত্যুর পরও যদি ইজারাগ্রহীতা তথা ভাড়াটে সেই বাড়িতে বসবাস করতে থাকে, তাহলে সে ভাড়া পরিশোধের দায় বহন করবে। কেননা ভাড়াচুক্তি এখনও বহাল আছে। মৃতের কোনো উত্তরাধিকারী যদি ভাড়াটেকে বাড়ি ছাড়তে বলে তাহলে চুক্তি বাতিল হওয়া প্রকাশিত হবে। অনুরূপভাবে যদি কোনো ভাড়া দেওয়া জন্তুর মালিকের মৃত্যু হয়, আর ভাড়া দেওয়া জন্তুটি তখনো পথিমধ্যে ভাড়াটিয়াকে বহনে লিপ্ত, এ অবস্থায় চুক্তি বহাল থাকবে ভাড়াটিয়া তার গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত।
অন্য সকল ফকীহের মতে, একপক্ষের মৃত্যুতে ইজারাচুক্তি বাতিল হয় না। কেননা ইজারা একটি আবশ্যিক চুক্তি; যতক্ষণ পর্যন্ত উপকার অর্জন সম্ভব হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দুপক্ষের কোনো একজনের মৃত্যুতে তা বাতিল হবে না। সাহাবা ও তাবেঈগণেরও একই অভিমত ছিল যে, মৃত্যুজনিত কারণে ইজারাচুক্তি বাতিল হয় না।
টিকাঃ
৯৬. রদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ৩০২
৯৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ২০০-২০১; আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২৫১; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৪৫৯; রদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ২৯৯
৯৮. তাবঈনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ১৪৪
৯৯. রদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ৩০২; ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৫২
📄 ষষ্ঠ. ভাড়ার পণ্য বিক্রয়ের পরিণতি
হানাফী ও হাম্বলী ফকীহদের মত এবং শাফেয়ীদের জাহেরী বর্ণনামতে, ইজারা দেওয়া পণ্য যদি বিক্রি করে দেওয়া হয় তাহলে ইজারাচুক্তি রহিত হয়ে যায় না। মালেকীদের মতে, বিক্রিতে যদি সন্দেহের অবকাশ থাকে তবে ইজারা রহিত হবে না, আর যদি সন্দেহের অবকাশ না থাকে তবে ইজারা রহিত হয়ে যাবে।
প্রথমোক্ত ফকীহদের দলিল হলো, ক্রয়বিক্রয়ের মধ্যে মূল জিনিস হলো পণ্য, আর ইজারার মূল জিনিস হলো উপকার। ফলে ভাড়া দেওয়া জিনিস বিক্রি করে দিলেও ইজারাচুক্তি বহাল থাকায় কোনো বৈপরীত্য নেই। এক্ষেত্রে একটি বিষয় বিবেচ্য যে, হানাফীগণ ইজারার পণ্য বিক্রিকে বিক্রীত জিনিসের ত্রুটি হিসেবে গণ্য করে, ফলে তাদের দৃষ্টিতে ইজারার পণ্য বিক্রি হলে ক্রেতা ত্রুটিজনিত প্রত্যাখ্যানের অধিকার পাবে। ইজারার পণ্য যদি ভাড়াটের কাছ থেকে ক্রয় করা হয় তবে শাফেয়ী ও হাম্বলীদের বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে এবং অন্যদের মতেও ইজারাচুক্তি রহিত হবে না।
টিকাঃ
১০১. হাদীসটি 'রাসূলুল্লাহ (সা.) খায়বরের জমি তার অধিবাসীদের দিয়েছিলেন...' ইমাম বুখারী ও মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেন। নাসবুর রায়া, খ. ৪, পৃ. ১৭৯।