📄 এক. মেয়াদপূর্তি : انْقِضَاءُ الْمُدَّةِ
ইজারা যদি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য হয় আর মেয়াদ পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে সকল ফকীহের মতেই ইজারাচুক্তির সমাপ্তি ঘটে। তবে যদি এমন কোনো অসুবিধার উদ্ভব ঘটে, যে অসুবিধা নির্দিষ্ট মেয়াদে বৃদ্ধি হওয়া দাবি করে, তাহলে প্রয়োজন পরিমাণ সময় বৃদ্ধি করা হবে। যেমন চাষাবাদের জমি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মেয়াদ শেষ হলেও জমিতে উৎপাদিত ফসল কাটার উপযোগী হয়নি, কিংবা জাহাজ বা বিমান নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ভাড়া নেওয়া হয়েছে, কিন্তু মেয়াদপূর্তি ঘটলেও জাহাজ কূলে পৌঁছাতে পারেনি।
📄 দুই. চুক্তি বাতিলকরণের দ্বারা ইজারার সমাপ্তি
ক্রয়বিক্রয়ের ক্ষেত্রে যেমন ইকালা (বাতিলকরণ) কিংবা অব্যাহতি প্রদান বৈধ, ইজারার ক্ষেত্রেও অনুরূপ অব্যাহতিপ্রদান কিংবা বাতিলকরণ বৈধ। কেননা রাসূলুল্লাহ সা. বলেন : 'কেউ যদি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এমন কোনো ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেয়, যে চুক্তি সম্পাদনের জন্যে লজ্জিত; তবে লজ্জিত ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেওয়ার দরুন আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন অব্যাহতি দানকারীর অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন।' বস্তুত ইজারা যেহেতু মুনাফা ও উপকার কেনাবেচার মতোই, তাই এক্ষেত্রেও অব্যাহতি দান জায়েয।
📄 তিন. পণ্য ধ্বংসের কারণে ইজারার সমাপ্তি
ইজারাচুক্তির সুবাদে যে পণ্য অর্জিত হয় সেই পণ্য যদি ধ্বংস হয়ে যায়, কিংবা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে ইজারাচুক্তির সমাপ্তি ঘটে। কেননা, এ অবস্থায় ইজারা দ্বারা উপকার লাভের উদ্দেশ্যই সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়ে যায়। যেমন— ভাড়াকৃত জাহাজ ভেঙ্গে টুকরো হয়ে গেছে কিংবা ভাড়াকৃত বাড়ি ভেঙ্গে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। উল্লিখিত অবস্থায় সকল ফকীহের মতেই ইজারাচুক্তির সমাপ্তি ঘটবে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত ইজারাচুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার বর্ণনায় করা হবে।
📄 চার. অসুবিধার কারণে ইজারা রহিত হওয়া
হানাফী ফকীহগণের অভিমত হলো, ইজারাচুক্তি সম্পাদনকারী দু পক্ষের কেউ কিংবা যে পণ্যদ্রব্যটি ইজারা দেওয়ার কথা সেটি কোনো বিপত্তির সম্মুখীন হয়, যার দরুন পণ্য থেকে উপকার লাভ করা সম্ভব না হয়, তবে ইজারাচুক্তি কার্যকর করা আবশ্যিক থাকে না। তখন ইজারাচুক্তি রহিত করা যায়। কেননা যখন সত্যিকার অর্থেই কোনো বিপত্তির উদ্ভব হয় তখন পরিস্থিতি চুক্তি রহিতকরণের দাবি করে। কেননা, কোনো বিপত্তির উদ্ভব হওয়ার পরও যদি ইজারাচুক্তি বজায় রাখা হয়, তবে যে পক্ষ বিপত্তির কবলে পড়েছে, তাকে এমন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, এই চুক্তি তাকে যে ক্ষতির দায়বহন করতে বাধ্য করে না। ফলে এই চুক্তি রহিতকরণের দ্বারা সে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করা থেকে রক্ষা করতে পারে। এ ধরনের ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করার অধিকার তার আছে। তারা একথাও বলেছেন, কোনো বিপত্তি ও অসুবিধার সম্মুখীন হওয়ার পরও এই চুক্তি রহিত করার অধিকার না দেওয়া যুক্তি ও শরীয়তের পরিপন্থী। বিষয়টি অনেকটা এমন হয়ে যাবে যে, কেউ কোনো ডাক্তারের সাথে ব্যথাজনিত কারণে আক্রান্ত দাঁত ফেলার চুক্তি করল। কিন্তু তার দাঁতের ব্যথা ইতোমধ্যে কমে গেল, আর দাঁত তুলে ফেলার প্রয়োজনের পরিসমাপ্তি ঘটল। কিন্তু ডাক্তার তাকে দাঁত ফেলতে বাধ্য করল। এটিও তেমনি যুক্তি ও শরীয়তের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।
মালেকীগণ বিপত্তির জন্যে ইজারা রহিত করার মাসআলায় হানাফী ফকীহগণের কাছাকাছি অভিমত ব্যক্ত করেন। অবশ্য হানাফীদের মতে যতটা ব্যাপকতা রয়েছে, মালেকীগণের মতে তা নেই। মালেকীগণ বলেন, ভাড়ার পণ্য বা তার মুনাফা যদি ছিনতাই হয়ে যায় কিংবা কোনো জালেমের কজায় চলে যায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সেই জালেমকে পাকড়াও করতে না পারে; অবস্থা যদি এমন হয় যে, ভাড়াকৃত দোকান কোনো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বন্ধ করে দেয় কিংবা দুগ্ধদানকারিণী মহিলা পুনর্বার গর্ভধারণ করে, কারণ গর্ভবতীর দুধ দুগ্ধপায়ী শিশুর জন্যে ক্ষতির কারণ হয় কিংবা দুগ্ধদানকারিণী মহিলা কোনো গুরুতর অসুখে আক্রান্ত হয়ে দুধপান করাতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তাহলে ইজারাগ্রহীতা ইচ্ছা করলে এই চুক্তি রহিত করতে পারবে, বহালও রাখতে পারবে।
অন্য ফকীহগণ বিপত্তির কারণে ইজারাচুক্তি রহিত করার বিপক্ষে। তারা বলেন, ইজারাও ক্রয়বিক্রয়ের একটি শাখা, কাজেই এই লেনদেনও বহাল থাকবে। যেহেতু চুক্তি দুপক্ষের সম্মতিতে সম্পাদিত হয়েছে তাই এক পক্ষের অসুবিধার কারণে তা রহিত হবে না, রহিত হতে উভয়পক্ষের সম্মতি জরুরি। শাফেয়ীগণের পরিষ্কার অভিমত হলো, বিপত্তি কিংবা একপক্ষের অসুবিধার কারণে ইজারাচুক্তি রহিত করা যাবে না।
হানাফীদের এক্ষেত্রে যুক্তি হলো, এমন অসুবিধা ইজারাগ্রহীতার পক্ষে হতেই পারে, যেমন ভাড়াটে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কারণে ভাড়া নেওয়া দোকানে ব্যবসা বন্ধ করে দিল, কিংবা সে বিদেশে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কিংবা ব্যবসা ত্যাগ করে সে কৃষিকাজে জড়িয়ে পড়ল, কিংবা ফসলী জমির ভাড়াগ্রহীতা কৃষিকাজ ছেড়ে ব্যবসায়ে লেগে গেল, কেউ পূর্বের পেশা ত্যাগ করে নিজেকে অন্য পেশায় নিয়োজিত করল। যে নিঃস্ব হয়ে গেছে, তার পক্ষে ভাড়াকৃত দোকান থেকে কোনো লাভ অর্জন সম্ভব নয়, তখনও যদি তার উপর ইজারা যথাপূর্ব বহাল রাখা হয় তবে সে আরো বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তেমনি কারো যদি দেশের বাইরে কিংবা অন্য জায়গায় চলে যাওয়াটা অপরিহার্য হয়ে পড়ে তাকে আটকে রাখাটাও হবে ক্ষতিকর।
কখনো ইজারাদাতার পক্ষ থেকেও বিপত্তির উদ্ভব ঘটতে পারে : যেমন ভাড়াদাতা এমন ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে যে, ভাড়ায় প্রদত্ত পণ্যটি বিক্রি ছাড়া তার গত্যন্তর নেই, এ অবস্থায় সে চুক্তি রহিত করার অধিকার পাবে। হানাফী ফকীহদের মতে, কোনো মহিলা যদি কারো শিশুকে দুধ পান করানোর চুক্তি করে, আর এ চুক্তির কারণে লোকজন তার বদনাম করে, তবে তার পরিবার এ চুক্তি রহিত করার অধিকার পাবে।
টিকাঃ
৮৮. আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৭৬; আল-ইনসাফ, খ. ৬, পৃ. ৬১-৬২; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৯৬; আশ শারহুস সাগীর ওয়া হাশিয়া আস-সাভী, খ. ৪, পৃ. ৪৯
৮৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৯৭; আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২৫০; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৪৫৮; আল-মাবসূত, খ. ১৬, পৃ. ২
৯০. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৪, পৃ. ৫১; প্রকাশ দারুল মাআরিফ।
৯১. মিনহাজুত তালিবীন, ওয়া হাশিয়াতু কালয়ূবী, খ. ৩, পৃ. ৮১; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৪০৫
৯২. আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ২১
৯৩. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৪৫৮-৪৬০; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৯৮
৯৪. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৯৮
৮৫. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ১৯৯