📄 ইজারার মৌলিক ও প্রাসঙ্গিক বিধান
ইজারাচুক্তি যখন শুদ্ধ হবে, তাতে ইজারার মূল বিধান কার্যকর হবে। আর মূল বিধান হলো, ইজারা দ্বারা ইজারাগ্রহীতা উপকার লাভের অধিকারী হবে এবং ইজারাদাতা বিনিময়ের অধিকারী হবে। তা ছাড়া ইজারার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রাসঙ্গিক বিধানও রয়েছে। সে সব: পণ্যের মালিক ইজারাদাতা ইজারাগ্রহীতাকে তার পণ্য হস্তান্তর করবে এবং সে যেন উপকার ভোগ করতে পারে সে সুযোগ করে দেবে এবং ইজারাগ্রহীতা ইজারাকৃত পণ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেবে।
📄 উপকার ভোগ ও মজুরির মালিকানা এবং এর সময়
হানাফী ও মালেকী ফকীহগণের মতে শুধু লেনদেন সম্পন্ন হলেই ইজারার মূল্য/মজুরি আবশ্যিক হয় না। ইজারার বিনিময় আবশ্যিক হওয়ার জন্যে অন্তত দুটি অবস্থার যে কোনো একটি হতে হবে। লেনদেনের আগেই অগ্রিম বিনিময় প্রদানের ফয়সালা করে নেওয়া কিংবা যে কাজের বিনিময় নির্ধারণ করা হয়েছে তা ইজারাগ্রহীতা পুরোপুরি অর্জন করা। হানাফী ফকীহগণের দৃষ্টিতে তিন অবস্থার যে-কোনো এক অবস্থায় ইজারাচুক্তির বিনিময় পরিশোধ করা ওয়াজিব। এক. চুক্তি সাব্যস্ত করার সময়ই যদি দ্রুত বিনিময় পরিশোধের শর্তারোপ করা হয়। দুই. শর্ত করা হয়নি, কিন্তু ইজারাকৃত পণ্যের উপকার ভোগের আগেই মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে। তিন. যে কাজ বা পণ্যের উপর ইজারাচুক্তি করা হয়েছে, সেই পণ্য বা কাজ বুঝে নেওয়া হয়েছে; এ অবস্থায় মূল্য পরিশোধ ওয়াজিব হবে।
মালেকী ফকীহগণের মতে, ইজারাচুক্তির মূলনীতি হলো, ইজারাচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিনিময় ও ভাড়া পরিশোধ আবশ্যিক হবে। এটি ক্রয়বিক্রয়ের বিপরীত। অবশ্য চারটি অবস্থা উল্লিখিত মাসআলা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে অবস্থাগুলোতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিনিময় পরিশোধ করা ওয়াজিব। ১. যদি অগ্রিম পরিশোধের শর্তারোপ করা হয়। ২. প্রচলিত রীতি অনুযায়ী। ৩. কোনো নির্দিষ্ট দ্রব্যকে বিনিময় হিসাবে নির্ধারণ করা হয়। ৪. অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করা তখনও আবশ্যক হবে যখন বিনিময় নির্ধারিত না হয়, আর ইজারাগ্রহীতার উপকার ভোগের বিষয়টি ইজারাদাতার দায়িত্বে থাকে।
শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণের অভিমত হলো, চুক্তি যদি শর্তহীন হয় (এবং বিনিময় পরিশোধের কোনো সময় নির্ধারণ করা না হয়), তবে শুধু চুক্তি করার দ্বারাই মূল্য পরিশোধ আবশ্যিক হবে। তবে মূল্য তখন আদায় করতে হবে যখন ইজারার পণ্য ইজারাগ্রহীতার নিকট হস্তান্তর করা হবে এবং পণ্য থেকে উপকার লাভের সুযোগ দেওয়া হবে।
📄 ইজারাগ্রহীতা ইজারাকৃত পণ্য অপরজনের কাছে ইজারা দেওয়া
জমহুর তথা হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী এবং বিশুদ্ধ বর্ণনামতে হাম্বলী ফকীহগণ এ কথায় একমত যে, কোনো পণ্য দ্রব্য ইজারা নিয়ে কজা করার পর ইজারাগ্রহীতা ওই পণ্য ইজারাদাতা মালিক ব্যতীত অন্য জনের কাছে ইজারা দিতে পারবে। শর্ত হলো, পণ্যটি ব্যবহারকারী পরিবর্তিত হওয়ার দরুন তা নষ্ট কিংবা ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কামুক্ত হতে হবে। ইজারাকৃত পণ্য কজা করা মূলত উপকার লাভের উপর কব্জা করার সমতুল্য।
📄 ইজারাগ্রহীতা অন্যকে বেশি ভাড়ায় ইজারা দেওয়া
শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ প্রথম ইজারাগ্রহীতা দ্বিতীয়বার অন্যজনের কাছে কম ভাড়ায় ইজারা দিক বা বেশি ভাড়ায় বা পূর্বের ভাড়ায়, শর্তহীনভাবে এটিকে জায়েয মনে করেন। কারণ তাদের মতে ইজারা ক্রয়বিক্রয়ের মতো, তাতে প্রথম ক্রেতা ইচ্ছা করলে অপরজনের কাছে কম মূল্যে বা বেশি মূল্যে বিক্রি করতে পারে; ইজারায়ও তা-ই পারবে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলও বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে তাদের মতকেই সমর্থন করেছেন।
হানাফীগণ বলেন, দ্বিতীয় ইজারার যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে তা যদি প্রথম ইজারায় প্রদত্ত মুদ্রা ব্যতীত ভিন্ন মুদ্রা দ্বারা পরিশোধ করা হয় তবে শর্তহীনভাবেই তা জায়েয। কিন্তু উভয় চুক্তির মূল্য পরিশোধের মাধ্যম তথা মুদ্রা বা বিনিময় যদি এক জাতীয় বস্তু হয়, সেক্ষেত্রে প্রথম মূল্যের চেয়ে দ্বিতীয়বারে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া বৈধ হবে না। তবে ইজারা সহীহ হবে বটে, কিন্তু দ্বিতীয় ইজারাদাতা অতিরিক্ত যে মূল্য নেবে তা সাদকা করে দেওয়া উচিত হবে। কারণ, যে মূল্য সে অতিরিক্ত নিয়েছে এর মধ্যে সুদের সংশয় রয়েছে। হ্যাঁ, প্রথম ইজারাগ্রহীতা যদি দ্বিতীয় ইজারাগ্রহীতাকে দেওয়ার সময় পণ্যে কোনো জিনিস যোগ করে তবে তার জন্যে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া জায়েয হবে। তখন তার যোগ করা জিনিসের বিপরীতে অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়টি বিবেচিত হবে।
হাম্বলীদের দ্বিতীয় অভিমত হলো, প্রথম ইজারাগ্রহীতা যদি ইজারার পণ্যে কোনো জিনিস যোগ করে তবে তার জন্যে দ্বিতীয় ইজারাগ্রহীতার কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য আদায় শর্তহীনভাবেই জায়েয হবে। তাতে মূল্য একই জিনিস হোক কিংবা ভিন্ন হোক, প্রথম ইজারাদাতা প্রকৃত মালিক-এর অনুমতি নিক বা না নিক।
ইমাম আহমদ রহ.-এর তৃতীয় একটি মত রয়েছে, পণ্যের প্রকৃত মালিক যদি প্রথম ইজারাগ্রহীতাকে পণ্যের মধ্যে কিছু যোগ করার অনুমতি দিয়ে থাকে, তাহলেই কেবল অতিরিক্ত মূল্য আদায় জায়েয হবে, অন্যথায় নয়। মোদ্দাকথা, উপরিউক্ত মাসআলার ক্ষেত্রে ফকীহগণ ইজারাগ্রহণের মাধ্যমে প্রাপ্ত জিনিস দখলে নেয়ার পর সেটিকে পুনর্বার অপরজনের কাছে ইজারা দেয়ার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন।