📄 কর্ম ও মেয়াদ উভয়টি নির্দিষ্টকরণ
কখনো ইজারার ক্ষেত্রে উপকার ভোগের বিষয়টি কাজ ও মেয়াদ- উভয়টির বর্ণনা দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে যায়। যেমন একব্যক্তি দর্জিকে বলল, আমি তোমাকে ইজারা নিলাম, আজকের মধ্যে তুমি আমার এই কাপড়টি সেলাই করে দেবে। এখানে সেলাইয়ের উল্লেখ করার দ্বারা তার উপকার লাভের বিষয়টি যেমন নির্দিষ্ট করে নিল তেমনি সে মেয়াদ আজকের মধ্যে বলেও মুনাফা নির্দিষ্ট করেছে।
ফকীহগণের এক্ষেত্রে দু'টি অভিমত রয়েছে। একটি অভিমত হলো : এভাবে লেনদেন জায়েয নেই। এর দ্বারা চুক্তি ফাসিদ হয়ে যাবে। কেননা মেয়াদ নির্দিষ্টকরণ এমনটি দাবি করে যে, কাজ সম্পাদন করা ছাড়াও সে বিনিময়ের অধিকারী হবে। কেননা মেয়াদ নির্দিষ্টকরণের দ্বারা শ্রমদাতা ব্যক্তিগত কর্মচারীর পর্যায়ভুক্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে কাজের উল্লেখ করার দ্বারা সে সাধারণ শ্রমিকের পর্যায়ভুক্ত হয়ে পড়ে এবং তার পারিশ্রমিক কাজের বিনিময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়। এটি ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ী রহ.-এর অভিমত। হাম্বলীদেরও এরূপ একটি অভিমত রয়েছে।
দ্বিতীয় অভিমত হচ্ছে : এ অবস্থায়ও চুক্তি জায়েয হবে। কেননা, এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে কাজের জন্য চুক্তি করা। এখানে মেয়াদের বিষয়টি শুধু কাজটি তরান্বিত করার জন্যে। সাহেবাইন ও ইমাম মালিক রহ. এ অভিমত ব্যক্ত করেন। হাম্বলীদেরও একটি অভিমত এমন রয়েছে।
📄 যৌথ মালিকানাধীন অবণ্টিত জিনিসের ইজারা
ইজারার চুক্তিবদ্ধ জিনিসটি যদি অবণ্টিত এবং যৌথ মালিকানাধীন হয় আর একজন অংশীদার তার নিজের অংশটি ইজারা দিতে চায়, তবে সে তার শরীকদের মধ্যেই অন্য কাউকে ইজারা দিতে পারবে- এ ব্যাপারে সকল ফকীহ একমত। কিন্তু শরীকদের বাইরে অন্য কাউকে ইজারা দেওয়ার প্রশ্নে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হানাফীদের মধ্যে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. এবং শাফেয়ী ও মালেকী ফকীহদের মতে এবং হাম্বলীদের একটি উক্তি মতে, উল্লিখিত পদ্ধতি বৈধ। কেননা, তাদের মতে ইজারা ক্রয়বিক্রয়েরই একটি অংশ। যৌথ মালিকানাধীন জিনিসের অংশ বিক্রি করা যেমন জায়েয তদ্রূপ ইজারা দেয়াও জায়েয।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম যুফার রহ.-এর মত এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের এক উক্তি মতে, যৌথমালিকানাধীন কোনো জিনিসের অংশবিশেষের মালিকের নিজ অংশ বিক্রি বা ইজারা দেওয়া জায়েয নেই। কেননা, অংশীদারের মালিকানা গোটা জিনিসের মধ্যে বিস্তৃত। ফলে ইজারাগ্রহীতাকে অংশবিশেষ থেকে উপকার লাভ করতে দিতে হলে পুরো জিনিসটিই তার হাতে তুলে দিতে হবে। অথচ গোটা জিনিসটা দেওয়ার ব্যাপারে ইজারাগ্রহীতার সাথে চুক্তি হয়নি। ফলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তাকে বস্তুটি দেওয়াও হবে না, এবং এই চুক্তি গ্রহণযোগ্যও নয়।
📄 দ্বিতীয় উদ্দেশ্য : ভাড়া, বিনিময়, পারিশ্রমিক
ইজারাগ্রহীতা উপকার লাভের বিপরীতে ইজারাদাতাকে যে বিনিময় দেওয়ার অঙ্গীকার করে তা-ই হচ্ছে উজরত। বিনিময়, পারিশ্রমিক বা ভাড়া। ক্রয়বিক্রয়ে যেটি মূল্য হতে পারে, ইজারার ক্ষেত্রে সেটিই উজরত হতে পারে। অধিকাংশ ফকীহের মতে মূল্যের ক্ষেত্রে যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা শর্ত, ইজারার বিনিময়ের ক্ষেত্রেও সেগুলো থাকা শর্ত।
বিনিময় জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “মিনিস্তা'জারা আজীরান ফালইউ'লিমহু আজরাহু - কেউ যদি কাউকে কোনো কাজের জন্যে শ্রমদাতা হিসাবে গ্রহণ করে তাহলে তার মজুরি তাকে পরিজ্ঞাত করা আবশ্যক।”
যে উপকার লাভের উপর ইজারাচুক্তি সাব্যস্ত হয় অধিকাংশ ফকীহের দৃষ্টিতে সে ধরনের উপকারই ইজারাগ্রহীতা বিনিময় হিসাবে দিতে পারে। শিরাজী বলেন, উপকারের বিনিময় অন্য ধরনের বস্তু হতে পারে, উপকার শ্রেণীও হতে পারে। কেননা, ইজারার ক্ষেত্রে উপকার ভোগের বিষয়টি ক্রয়বিক্রয়ের পণ্যের সমতুল্য। আর একই প্রকার জিনিসের বিনিময়ে একই প্রকার জিনিস ক্রয়বিক্রয় করা যায়।
ফকীহদের একটি দল এ মত পোষণ করেন, কোনো কাজের ইজারার ক্ষেত্রে সেই কাজের অংশবিশেষ কিংবা কাজের দ্বারা উৎপাদিত পণ্যের অংশ ইজারার বিনিময় নির্ধারণ করা বৈধ নয়। কারণ, এর মধ্যে প্রতারণার অবকাশ আছে। কেননা যদি কোনো শ্রমিককে কোনো কাজের জন্যে ইজারাবদ্ধ করা হয়, আর কোনো কারণে শ্রমিক সে কাজটি করে কোনো ফল লাভ করতে না পারে, তাহলে সেই শ্রমিক পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে নিষেধ করেছেন।
📄 শরীয়ত নির্ধারিত শর্তগুলোর কোনোটিতে ত্রুটি থাকার প্রভাব
ইজারাচুক্তি সাব্যস্ত হওয়ার জন্য শরীয়তের পক্ষ থেকে যেসব শর্ত আরোপ করা হয়েছে এগুলোর কোনোটি যদি পরিপূর্ণভাবে না থাকে, তবে বাহ্যিকভাবে লেনদেন সম্পন্ন হলেও তা বাতিল বলে গণ্য হবে। কারণ, কোনো লেনদেন যদি সম্পন্নই না হয়- তাহলে প্রভাব প্রতিক্রিয়া হিসাবে তার অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব এক বরাবর। হানাফীগণ এ অবস্থায় নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক প্রাপ্তি যেমন আবশ্যিক মনে করে না, প্রচলিত রীতি অনুযায়ী পারিশ্রমিক পরিশোধও জরুরি মনে করে না, যেমনটি কোনো চুক্তি ফাসিদ হলে ধর্তব্য হয় এবং এমন কোনো শর্তের বর্তমানে ধর্তব্য হয় যা মূল লেনদেনে বিশুদ্ধতায় কোনো প্রভাব ফেলে না। কারণ হানাফীগণ ফাসিদ ও বাতিল লেনদেনের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেন।
হানাফীদের মতে, মজুরির পরিমাণ, কাজের বৈশিষ্ট্য ও সময়সীমা এবং যে কাজের জন্যে লেনদেন হয়েছে তা যদি অনির্দিষ্ট হয় কিংবা এমন কোনো শর্ত যদি লাগানো হয়, যে শর্ত ইজারাচুক্তির সাথে মোটেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এ অবস্থায় যদি ইজারাগ্রহীতা উপকার ভোগ করে ফেলে তবে আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মতে সমকালীন রীতি অনুযায়ী মজুরি পরিশোধ করতে হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই তা নির্ধারিত মজুরির বেশি হতে পারবে না। আর যদি ইজারাগ্রহীতা কোনো উপকার ভোগ না করে থাকে, তবে হানাফী ও হাম্বলীদের একটি মতে, কোনো মজুরি পরিশোধই আবশ্যিক হবে না।
অন্য ফকীহগণ বাতিল ও ফাসিদ লেনদেনের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না। তাদের মতে শরীয়ত যেসব শর্ত আরোপ করেছে, এর কোনোটি যদি না থাকে তবে সেই চুক্তি শুদ্ধ হবে না। কেননা শরীয়তের দৃষ্টিতে এই লেনদেন নিষিদ্ধ। আর নিষিদ্ধতার দাবি হলো, এমন লেনদেনের অস্তিত্ব অস্বীকার করা। ইজারাগ্রহীতার পক্ষে এমন চুক্তির বলে উপকার ভোগ জায়েয হবে না এবং তার উপর নির্ধারিত মূল্য পরিশোধও আবশ্যিক হবে না। তবে ইজারাকৃত বস্তু যদি ইজারাগ্রহীতা নিজের আয়ত্তে নিয়ে থাকে, কিংবা উপকার ভোগ করে ফেলে, কিংবা সে করায়ত্ত করার পর এতটুকু সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায় যে সময়ের মধ্যে অনায়াসেই সে উপকার ভোগ করতে পারত, তবে ইজারাগ্রহীতার উপর প্রচলিত রীতি অনুযায়ী মূল্য পরিশোধ আবশ্যিক হবে; তা যতই হোক।