📄 উপকার সুনির্দিষ্ট হওয়া
উপকার লাভের বিষয়টি কোনো কোনো সময় স্থান ও ক্ষেত্র নির্দিষ্টকরণের দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে যায়; আবার কখনো উপকারিতার বিষয়টি উল্লেখ করার দ্বারাই নির্দিষ্ট হয়। যেমন কোনো ব্যক্তি কারো সাথে কাপড় সেলাই করার চুক্তি করল, এবং সে সেলাইয়ের ডিজাইনও বলে দিল। কোনো সময় ইশারা করার দ্বারাও উপকার লাভের বিষয়টি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। যেমন কেউ কাউকে মজদুর হিসাবে নিল, সে উৎপাদিত ফসল অমুক জায়গা থেকে অমুক জায়গায় নিয়ে পৌঁছাবে।
উপকার লাভের স্থান ও ক্ষেত্র নির্দিষ্টকরণের শর্ত ইজারাচুক্তিকে দু'ভাগে বিভক্ত করে: এক. মূল জিনিসের ইজারা, যেক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট জিনিসের উপকার লাভের জন্য চুক্তি করা হয়, কোনো কারণে যদি সেই জিনিসটি নষ্ট হয়ে যায় তবে গোটা লেনদেনের সমাপ্তি ঘটে। যেমন বসবাসের জন্যে কোনো ঘর ইজারা দেওয়া। দুই. এমন জিনিসের ইজারা যে জিনিসটির বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি বর্ণনা করা হয় এবং জিনিসটি চুক্তিকারী অপরপক্ষের দায়িত্বে থাকে। এই উপকারিতা এমন গুণাবলিশিষ্ট সকল জিনিসের দ্বারাই লাভ করা সম্ভব। তাই উল্লিখিত গুণাবলিসম্পন্ন জিনিসটি বিনষ্ট হয়ে গেলেও এর বিকল্প পাওয়া যায়।
হাম্বলী ফকীহদের মত এবং শাফেয়ীদের একটি মতানুসারে ইজারাচুক্তি সম্পাদনের আগে ইজারার দ্রব্য দেখে নেওয়া শর্ত। যদি চুক্তি সম্পাদনের আগে দ্রব্যটি না দেখে থাকে, তবে ইজারাচুক্তি সম্পাদনের পর ইজারাগ্রহীতার দ্রব্য দেখে নেওয়ার অধিকার থাকবে। শাফেয়ীগণ সব ধরনের ইজারার ক্ষেত্রে এই দেখার অধিকারের শর্তটিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন। কিন্তু হাম্বলীগণ শুধু নির্দিষ্ট কিছু ইজারার ক্ষেত্রে এই শর্তারোপ করেন। যেমন দুগ্ধদানকারিণী মহিলার জন্যে দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দেখা এবং কোনো ফসলী জমিন ইজারাগ্রহীতার ইজারাকৃত জমিন দেখা।
ইজারাচুক্তির উপকারিতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ফকীহ সমাজের প্রচলিত রীতি ও প্রচলনকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন; ফলে ইজারাকৃত বস্তুর ব্যবহার এর উপর নির্ভর করবে। এক্ষেত্রে পার্থক্যের বিষয়টি যেহেতু খুব সাধারণ ও গৌণ, তাই এটিকে কেন্দ্র করে তেমন বিবাদ দেখা দেবে না।
📄 কর্ম ও মেয়াদ উভয়টি নির্দিষ্টকরণ
কখনো ইজারার ক্ষেত্রে উপকার ভোগের বিষয়টি কাজ ও মেয়াদ- উভয়টির বর্ণনা দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে যায়। যেমন একব্যক্তি দর্জিকে বলল, আমি তোমাকে ইজারা নিলাম, আজকের মধ্যে তুমি আমার এই কাপড়টি সেলাই করে দেবে। এখানে সেলাইয়ের উল্লেখ করার দ্বারা তার উপকার লাভের বিষয়টি যেমন নির্দিষ্ট করে নিল তেমনি সে মেয়াদ আজকের মধ্যে বলেও মুনাফা নির্দিষ্ট করেছে।
ফকীহগণের এক্ষেত্রে দু'টি অভিমত রয়েছে। একটি অভিমত হলো : এভাবে লেনদেন জায়েয নেই। এর দ্বারা চুক্তি ফাসিদ হয়ে যাবে। কেননা মেয়াদ নির্দিষ্টকরণ এমনটি দাবি করে যে, কাজ সম্পাদন করা ছাড়াও সে বিনিময়ের অধিকারী হবে। কেননা মেয়াদ নির্দিষ্টকরণের দ্বারা শ্রমদাতা ব্যক্তিগত কর্মচারীর পর্যায়ভুক্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে কাজের উল্লেখ করার দ্বারা সে সাধারণ শ্রমিকের পর্যায়ভুক্ত হয়ে পড়ে এবং তার পারিশ্রমিক কাজের বিনিময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়। এটি ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ী রহ.-এর অভিমত। হাম্বলীদেরও এরূপ একটি অভিমত রয়েছে।
দ্বিতীয় অভিমত হচ্ছে : এ অবস্থায়ও চুক্তি জায়েয হবে। কেননা, এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে কাজের জন্য চুক্তি করা। এখানে মেয়াদের বিষয়টি শুধু কাজটি তরান্বিত করার জন্যে। সাহেবাইন ও ইমাম মালিক রহ. এ অভিমত ব্যক্ত করেন। হাম্বলীদেরও একটি অভিমত এমন রয়েছে।
📄 যৌথ মালিকানাধীন অবণ্টিত জিনিসের ইজারা
ইজারার চুক্তিবদ্ধ জিনিসটি যদি অবণ্টিত এবং যৌথ মালিকানাধীন হয় আর একজন অংশীদার তার নিজের অংশটি ইজারা দিতে চায়, তবে সে তার শরীকদের মধ্যেই অন্য কাউকে ইজারা দিতে পারবে- এ ব্যাপারে সকল ফকীহ একমত। কিন্তু শরীকদের বাইরে অন্য কাউকে ইজারা দেওয়ার প্রশ্নে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হানাফীদের মধ্যে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. এবং শাফেয়ী ও মালেকী ফকীহদের মতে এবং হাম্বলীদের একটি উক্তি মতে, উল্লিখিত পদ্ধতি বৈধ। কেননা, তাদের মতে ইজারা ক্রয়বিক্রয়েরই একটি অংশ। যৌথ মালিকানাধীন জিনিসের অংশ বিক্রি করা যেমন জায়েয তদ্রূপ ইজারা দেয়াও জায়েয।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম যুফার রহ.-এর মত এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের এক উক্তি মতে, যৌথমালিকানাধীন কোনো জিনিসের অংশবিশেষের মালিকের নিজ অংশ বিক্রি বা ইজারা দেওয়া জায়েয নেই। কেননা, অংশীদারের মালিকানা গোটা জিনিসের মধ্যে বিস্তৃত। ফলে ইজারাগ্রহীতাকে অংশবিশেষ থেকে উপকার লাভ করতে দিতে হলে পুরো জিনিসটিই তার হাতে তুলে দিতে হবে। অথচ গোটা জিনিসটা দেওয়ার ব্যাপারে ইজারাগ্রহীতার সাথে চুক্তি হয়নি। ফলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তাকে বস্তুটি দেওয়াও হবে না, এবং এই চুক্তি গ্রহণযোগ্যও নয়।
📄 দ্বিতীয় উদ্দেশ্য : ভাড়া, বিনিময়, পারিশ্রমিক
ইজারাগ্রহীতা উপকার লাভের বিপরীতে ইজারাদাতাকে যে বিনিময় দেওয়ার অঙ্গীকার করে তা-ই হচ্ছে উজরত। বিনিময়, পারিশ্রমিক বা ভাড়া। ক্রয়বিক্রয়ে যেটি মূল্য হতে পারে, ইজারার ক্ষেত্রে সেটিই উজরত হতে পারে। অধিকাংশ ফকীহের মতে মূল্যের ক্ষেত্রে যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা শর্ত, ইজারার বিনিময়ের ক্ষেত্রেও সেগুলো থাকা শর্ত।
বিনিময় জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “মিনিস্তা'জারা আজীরান ফালইউ'লিমহু আজরাহু - কেউ যদি কাউকে কোনো কাজের জন্যে শ্রমদাতা হিসাবে গ্রহণ করে তাহলে তার মজুরি তাকে পরিজ্ঞাত করা আবশ্যক।”
যে উপকার লাভের উপর ইজারাচুক্তি সাব্যস্ত হয় অধিকাংশ ফকীহের দৃষ্টিতে সে ধরনের উপকারই ইজারাগ্রহীতা বিনিময় হিসাবে দিতে পারে। শিরাজী বলেন, উপকারের বিনিময় অন্য ধরনের বস্তু হতে পারে, উপকার শ্রেণীও হতে পারে। কেননা, ইজারার ক্ষেত্রে উপকার ভোগের বিষয়টি ক্রয়বিক্রয়ের পণ্যের সমতুল্য। আর একই প্রকার জিনিসের বিনিময়ে একই প্রকার জিনিস ক্রয়বিক্রয় করা যায়।
ফকীহদের একটি দল এ মত পোষণ করেন, কোনো কাজের ইজারার ক্ষেত্রে সেই কাজের অংশবিশেষ কিংবা কাজের দ্বারা উৎপাদিত পণ্যের অংশ ইজারার বিনিময় নির্ধারণ করা বৈধ নয়। কারণ, এর মধ্যে প্রতারণার অবকাশ আছে। কেননা যদি কোনো শ্রমিককে কোনো কাজের জন্যে ইজারাবদ্ধ করা হয়, আর কোনো কারণে শ্রমিক সে কাজটি করে কোনো ফল লাভ করতে না পারে, তাহলে সেই শ্রমিক পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে নিষেধ করেছেন।