📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 প্রথম উদ্দেশ্য : ইজারায় প্রদত্ত পণ্যের মুনাফা ও উপকার

📄 প্রথম উদ্দেশ্য : ইজারায় প্রদত্ত পণ্যের মুনাফা ও উপকার


সব ধরনের ইজারার মধ্যেই হানাফীদের নিকট ইজারার পণ্য হলো মুনাফা ও উপকার। ক্ষেত্রভেদে উপকারিতা ভিন্ন হয়ে থাকে। মালেকী ও শাফেয়ীদের মতে, ইজারার পণ্য হয়তো মূল জিনিসের উপকারিতা কিংবা দায়িত্বে আবশ্যক উপকারিতা। তারা শর্ত করেন, দায়িত্বে আবশ্যক ইজারাচুক্তির মধ্যে মুনাফার মূল্য আগেই আদায় করা জরুরি- ঋণের বিনিময়ে ঋণের চুক্তি হতে বের হওয়ার জন্য।

হাম্বলীদের নিকট ইজারার ক্ষেত্র তিনটি জিনিসের যে কোনো একটি: ১. নির্দিষ্ট জায়গায় কিংবা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের কোনো জায়গায় কাজ করে দেওয়ার দায়িত্বে চুক্তিবদ্ধ হওয়া। তারা এটিকে দুভাবে ভাগ করেছেন: প্রথমত: কোনো শ্রমিকের সাথে নির্দিষ্ট কাজে নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্যে চুক্তি করা। দ্বিতীয়ত: কোনো শ্রমিকের সাথে নির্দিষ্ট পরিশ্রমিকের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে দেওয়ার চুক্তি করা। যেমন কোনো জামা সেলাই করে দেওয়ার জন্যে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের চুক্তি করা, কিংবা গরু, ছাগল ইত্যাদি চড়ানোর জন্যে কারো সাথে চুক্তি করা। ২. নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের বস্তু দায়িত্বে আবশ্যক করে দেওয়ার চুক্তি করা। ৩. নির্দিষ্ট জিনিসকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ইজারা দেওয়া।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুনাফা ও উপকার লাভের ইজারাচুক্তি সম্পন্ন হতে কয়েকটি শর্ত রয়েছে

📄 মুনাফা ও উপকার লাভের ইজারাচুক্তি সম্পন্ন হতে কয়েকটি শর্ত রয়েছে


এক. উপকার ভোগের জন্য ইজারা হতে হবে; মূল জিনিসটি নিঃশেষ করা যাবে না। এ কথায় ফকীহগণের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। তবে ইবনে রুশদ বলেন, কতিপয় ফকীহ ভোগের জিনিসটিও নিঃশেষ করে দেওয়ার ইজারাচুক্তি জায়েয বলেছেন। তাদের মতে, উভয় বৈধ উপকার ভোগের অন্তর্ভুক্ত। শাফেয়ীগণ উপকার ভোগের বিষয়টি ব্যাপকার্থে ব্যবহার করেন এবং বহু ধরনকে এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

এই নীতির আওতায় বহু শাখারূপ রয়েছে, যেগুলোতে মূল জিনিস ব্যবহার করে নিঃশেষ করা হয়, কিন্তু সেটি হয়ে থাকে পরোক্ষে; যেমন দুধ দানকারিণী মহিলার সাথে সন্তানের অভিভাবকদের ইজারাচুক্তি, ষাঁড় গরু দ্বারা গাভীর গর্ভসঞ্চারের ইজারা, গাছের ফল থেকে উপকার লাভের জন্য গাছ ইজারা নেওয়া। এসব অবস্থায় মূল জিনিস নিঃশেষ হয়ে যায়।

হানাফীগণ বলেন, কোনো মূল জিনিসকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্যে ইজারা সংঘটিত হতে পারে না। মালেকীগণ বলেন, ইজারাচুক্তিতে ইচ্ছা করে এমন জিনিস কব্জায় নেওয়া জায়েয হবে না। হাম্বলীগণ বলেন, ইজারাচুক্তি এমন জিনিসের মধ্যে হতে পারে যেক্ষেত্রে মূল জিনিস অক্ষুণ্ণ থাকে। তবে জিনিসটি যদি এমন হয় যে, মূল জিনিস অক্ষুণ্ণ রেখে উপকার লাভ সম্ভব নয় তবে ভিন্ন কথা। যেমন আলো লাভের জন্যে মোমবাতি।

দুই. উপকার ও মুনাফা মূল্যবান হতে হবে এবং লেনদেনের মাধ্যমে তা অর্জন করার উদ্দেশ্য থাকতে হবে। এই শর্তের ফলে মূল্য ছাড়াই যে উপকার ভোগ করা যায় তাতে ফকীহগণের মতে ইজারাচুক্তি সাব্যস্ত হয় না। কারণ এক্ষেত্রে টাকা-পয়সা ব্যয় করা অর্থহীন।

তিন. উপকার এমন হতে হবে যা অর্জন বা ভোগ করা বৈধ। ইজারার বিষয়টি এমন হতে পারবে না, শরীয়তে যা ইবাদত হিসাবে পালন করার নির্দেশ রয়েছে কিংবা এমন নিষিদ্ধ উপকার লাভ করা যাবে না যা শরীয়তের দৃষ্টিতে গোনাহ ও অন্যায়।

চার. ইজারাচুক্তি বৈধ হওয়ার জন্যে উপকার লাভের ব্যাপারটি শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ এবং বাস্তবতার নিরিখে অর্জনযোগ্য হতে হবে। যেমন পালিয়ে যাওয়া কোনো জন্তু ভাড়া দেওয়া কিংবা লুণ্ঠনকারী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে লুণ্ঠিত বস্তুর ইজারাচুক্তি বৈধ হবে না। কারণ, ইজারাদাতা ইজারার বস্তু হস্তান্তরে সক্ষম হবে না।

পাঁচ. উপকার লাভের বিষয়টি পরিষ্কার হতে হবে, যেন অজ্ঞতার কারণে উভয় পক্ষের মধ্যে বিবাদের কোনো আশঙ্কা না থাকে। অনুরূপ ইজারার মূল্যের বিষয়টিতেও কোনো প্রকার অস্পষ্টতা না থাকা এই শর্তের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, অজ্ঞতা-অস্পষ্টতা ও অনির্ধারিত হওয়ার বিষয়টি উপকার লাভের ব্যাপারে যেমন বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে; তদ্রূপ ইজারার মূল্যের ক্ষেত্রেও অস্পষ্টতা বিরোধের কারণ হতে পারে, এ বিষয়ে সকল ফকীহই ঐকমত্য পোষণ করেন।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 উপকার সুনির্দিষ্ট হওয়া

📄 উপকার সুনির্দিষ্ট হওয়া


উপকার লাভের বিষয়টি কোনো কোনো সময় স্থান ও ক্ষেত্র নির্দিষ্টকরণের দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে যায়; আবার কখনো উপকারিতার বিষয়টি উল্লেখ করার দ্বারাই নির্দিষ্ট হয়। যেমন কোনো ব্যক্তি কারো সাথে কাপড় সেলাই করার চুক্তি করল, এবং সে সেলাইয়ের ডিজাইনও বলে দিল। কোনো সময় ইশারা করার দ্বারাও উপকার লাভের বিষয়টি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। যেমন কেউ কাউকে মজদুর হিসাবে নিল, সে উৎপাদিত ফসল অমুক জায়গা থেকে অমুক জায়গায় নিয়ে পৌঁছাবে।

উপকার লাভের স্থান ও ক্ষেত্র নির্দিষ্টকরণের শর্ত ইজারাচুক্তিকে দু'ভাগে বিভক্ত করে: এক. মূল জিনিসের ইজারা, যেক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট জিনিসের উপকার লাভের জন্য চুক্তি করা হয়, কোনো কারণে যদি সেই জিনিসটি নষ্ট হয়ে যায় তবে গোটা লেনদেনের সমাপ্তি ঘটে। যেমন বসবাসের জন্যে কোনো ঘর ইজারা দেওয়া। দুই. এমন জিনিসের ইজারা যে জিনিসটির বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি বর্ণনা করা হয় এবং জিনিসটি চুক্তিকারী অপরপক্ষের দায়িত্বে থাকে। এই উপকারিতা এমন গুণাবলিশিষ্ট সকল জিনিসের দ্বারাই লাভ করা সম্ভব। তাই উল্লিখিত গুণাবলিসম্পন্ন জিনিসটি বিনষ্ট হয়ে গেলেও এর বিকল্প পাওয়া যায়।

হাম্বলী ফকীহদের মত এবং শাফেয়ীদের একটি মতানুসারে ইজারাচুক্তি সম্পাদনের আগে ইজারার দ্রব্য দেখে নেওয়া শর্ত। যদি চুক্তি সম্পাদনের আগে দ্রব্যটি না দেখে থাকে, তবে ইজারাচুক্তি সম্পাদনের পর ইজারাগ্রহীতার দ্রব্য দেখে নেওয়ার অধিকার থাকবে। শাফেয়ীগণ সব ধরনের ইজারার ক্ষেত্রে এই দেখার অধিকারের শর্তটিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন। কিন্তু হাম্বলীগণ শুধু নির্দিষ্ট কিছু ইজারার ক্ষেত্রে এই শর্তারোপ করেন। যেমন দুগ্ধদানকারিণী মহিলার জন্যে দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দেখা এবং কোনো ফসলী জমিন ইজারাগ্রহীতার ইজারাকৃত জমিন দেখা।

ইজারাচুক্তির উপকারিতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ফকীহ সমাজের প্রচলিত রীতি ও প্রচলনকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন; ফলে ইজারাকৃত বস্তুর ব্যবহার এর উপর নির্ভর করবে। এক্ষেত্রে পার্থক্যের বিষয়টি যেহেতু খুব সাধারণ ও গৌণ, তাই এটিকে কেন্দ্র করে তেমন বিবাদ দেখা দেবে না।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 কর্ম ও মেয়াদ উভয়টি নির্দিষ্টকরণ

📄 কর্ম ও মেয়াদ উভয়টি নির্দিষ্টকরণ


কখনো ইজারার ক্ষেত্রে উপকার ভোগের বিষয়টি কাজ ও মেয়াদ- উভয়টির বর্ণনা দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে যায়। যেমন একব্যক্তি দর্জিকে বলল, আমি তোমাকে ইজারা নিলাম, আজকের মধ্যে তুমি আমার এই কাপড়টি সেলাই করে দেবে। এখানে সেলাইয়ের উল্লেখ করার দ্বারা তার উপকার লাভের বিষয়টি যেমন নির্দিষ্ট করে নিল তেমনি সে মেয়াদ আজকের মধ্যে বলেও মুনাফা নির্দিষ্ট করেছে।

ফকীহগণের এক্ষেত্রে দু'টি অভিমত রয়েছে। একটি অভিমত হলো : এভাবে লেনদেন জায়েয নেই। এর দ্বারা চুক্তি ফাসিদ হয়ে যাবে। কেননা মেয়াদ নির্দিষ্টকরণ এমনটি দাবি করে যে, কাজ সম্পাদন করা ছাড়াও সে বিনিময়ের অধিকারী হবে। কেননা মেয়াদ নির্দিষ্টকরণের দ্বারা শ্রমদাতা ব্যক্তিগত কর্মচারীর পর্যায়ভুক্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে কাজের উল্লেখ করার দ্বারা সে সাধারণ শ্রমিকের পর্যায়ভুক্ত হয়ে পড়ে এবং তার পারিশ্রমিক কাজের বিনিময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়। এটি ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ী রহ.-এর অভিমত। হাম্বলীদেরও এরূপ একটি অভিমত রয়েছে।

দ্বিতীয় অভিমত হচ্ছে : এ অবস্থায়ও চুক্তি জায়েয হবে। কেননা, এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে কাজের জন্য চুক্তি করা। এখানে মেয়াদের বিষয়টি শুধু কাজটি তরান্বিত করার জন্যে। সাহেবাইন ও ইমাম মালিক রহ. এ অভিমত ব্যক্ত করেন। হাম্বলীদেরও একটি অভিমত এমন রয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00