📄 শিশুদের ইজারাচুক্তি : إِجَارَةُ الصَّبِيِّ
পূর্ণ বোধজ্ঞানসম্পন্ন শিশু যদি নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিজের শ্রম বিক্রির চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, তাহলে সে অভিভাবকের অনুমতি পেলে এ চুক্তি বিশুদ্ধ হবে, নতুবা নয়। কিন্তু শাফেয়ীগণ এর বিপরীতে সাধারণভাবে নিষেধ করেন। তবে চুক্তি হয়ে থাকলে শিশু পারিশ্রমিকের অধিকারী হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে যে, শিশু তার নির্ধারণকৃত পারিশ্রমিক পাবে, না বাজারে প্রচলিত পারিশ্রমিকের অধিকারী হবে?
চুক্তি সম্পাদনকারী যদি মাহজুর বা লেনদেনে বারণকৃত হয় তবে হানাফী এবং মালেকীদের প্রসিদ্ধ মত এবং ইমাম আহমদ রহ.-এর এক বর্ণনামতে, এই স্থগিত চুক্তি অভিভাবকের অনুমতির উপর নির্ভরশীল হবে। কেননা চুক্তি কার্যকরী করার জন্য কার্যকরী ক্ষমতা থাকার শর্তারোপ করা হয়েছে, চুক্তি বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য কার্যকরী ক্ষমতা থাকা শর্তযুক্ত নয়। পক্ষান্তরে শাফেয়ীগণের মতে এবং মালেকীদের একটি অভিমত ও ইমাম আহমদ রহ.-এর অপর এক বর্ণনামতে এমন চুক্তি বিশুদ্ধ হবে না। কারণ তাদের মতে, চুক্তি কার্যকরী করার ক্ষমতাবান হওয়া কোনো লেনদেন বিশুদ্ধ হওয়া এবং সম্পাদিত হওয়ার জন্যেও শর্ত; কার্যকরী হওয়ার জন্যেই নয়।
কোনো ব্যক্তি যদি কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব লাভ করে, অতঃপর সে ওই শিশুকে কোনো কাজে নিয়োগের চুক্তি করে কিংবা সেই শিশুর সম্পত্তির কোনো অংশ ইজারা দেয়, তবে ওই চুক্তি শুদ্ধ হবে। কেননা, ইসলামী শরীয়তে অভিভাবক আপন সত্তার মতোই শিশুর কর্তৃত্বের অধিকারী। তবে অভিভাবকের সম্পাদিত চুক্তির মেয়াদের মধ্যেই যদি শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যায়, তাহলে শিশুর জন্য সম্পাদিত চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করা অপরিহার্য কি-না, এ ব্যাপারে দুটি অভিমত রয়েছে। কেউ বলেছেন, শিশুর এ চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করা আবশ্যক। কেননা, অভিভাবকত্বের অধিকার বলেই তো অভিভাবক চুক্তি সম্পাদনা করেছিল; ফলে বালেগ হওয়ার কারণে চুক্তি শেষ হয়ে যাবে না। যেমন শিশুর নাবালেগ অবস্থায় তার অভিভাবক যদি তার কোনো বাড়ি বিক্রি করে দেয় কিংবা শিশুকে বিবাহ দিয়ে দেয় তা যেমন অক্ষুণ্ণ থাকে, এই ইজারাচুক্তিও তেমন বহাল থাকবে। এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন ইমাম শাফেয়ী রহ, আর ইমাম শিরাজী এটিকে বিশুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন।
হাম্বলীদেরও এই মতের পক্ষে একটি অভিমত রয়েছে। ইবনে কুদামা হাম্বলী ফিকহের মধ্যে এটিকে বিশুদ্ধ মত বলে অভিহিত করেছেন। নাবালেগ শিশুর কোনো সম্পত্তি ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে হানাফীগণও এই একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
দ্বিতীয় অভিমতটি হলো, এই চুক্তির আবশ্যকতা আর বহাল থাকবে না। শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর চুক্তি অক্ষুণ্ণ রাখা, না রাখার ব্যাপারে স্বাধীন হবে। সে চুক্তি বহাল রাখতে পারে, আবার চুক্তি ভঙ্গও করতে পারে। কারণ, বালেগ হওয়ার সাথে সাথে তার সম্পদ ও সত্তার ব্যাপারে সে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে, অভিভাবকের অভিভাবকত্ব শেষ হয়ে যায়। উল্লিখিত মতটি মালেকীদের এবং শাফেয়ী ও হাম্বলীদেরও একটি অভিমত এমন রয়েছে। নাবালেগ শিশুকে ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে হানাফীদেরও একই অভিমত। এক্ষেত্রে হানাফীদের বক্তব্য হলো, শিশুর শৈশব অবস্থায় তার শ্রমবিনিয়োগের জন্যে তার অভিভাবক কর্তৃক সম্পাদিত কোনো চুক্তি বালেগ হওয়ার পরও বহাল রাখা তার জন্যে মর্যাদা হানিকর। কেননা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সে অন্যের সেবা করাকে নিজের জন্যে অসম্মানজনক মনে করতেই পারে। তা ছাড়া ইজারার উপকারিতা একটু একটু করে অস্তিত্বে আসে। তাই ইজারাচুক্তিও ধাপে ধাপে সংঘটিত হয়। তাই শিশুর জন্যে অভিভাবকের চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার অধিকার থাকবে। যেমন শিশু বালেগ হওয়ার পর যদি সে নতুন করে কোনো চুক্তি সম্পাদন করে তবে তা ভেঙ্গে ফেলার অধিকার থাকে।
হাম্বলীদের আরেকটি অভিমত এমনও রয়েছে যে, শিশুর অভিভাবক যদি এমন সময়সীমার কোনো চুক্তি করে যে সময়ের মধ্যে শিশু বালেগ হয়ে যেতে পারে তবে বালেগ হয়ে যাওয়ার পর শিশুর সে চুক্তি অক্ষুণ্ণ রাখা অপরিহার্য হবে না। কারণ, যদি অভিভাবকের সম্পাদিত চুক্তি অক্ষুণ্ণ থাকে তবে এমনটি হওয়ার অবকাশ তৈরি হয় যে, অভিভাবক তার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে সারাজীবনের জন্যে চুক্তিবদ্ধ করে শিশুর স্বার্থহানি করেছে। সেই সাথে অভিভাবকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তার হস্তক্ষেপ বহাল রয়েছে। হ্যাঁ, অবস্থা যদি এমন হয় যে, চুক্তির সময়সীমার মধ্যে স্বাভাবিকভাবে শিশুর বালেগ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না; কিন্তু ঘটনাক্রমে তাই ঘটে গেছে। এমতাবস্থায় অভিভাবকের সম্পাদিত চুক্তি বহাল থাকবে।
📄 ইজারার ক্ষেত্র : مَحَلُّ الإِجَارَةِ
এক্ষেত্রে দু'টি বিষয়ে আলোচনা করা হবে, ইজারা দেওয়া পণ্যের উপকারিতা এবং ইজারার মূল্য তথা ভাড়া।
📄 প্রথম উদ্দেশ্য : ইজারায় প্রদত্ত পণ্যের মুনাফা ও উপকার
সব ধরনের ইজারার মধ্যেই হানাফীদের নিকট ইজারার পণ্য হলো মুনাফা ও উপকার। ক্ষেত্রভেদে উপকারিতা ভিন্ন হয়ে থাকে। মালেকী ও শাফেয়ীদের মতে, ইজারার পণ্য হয়তো মূল জিনিসের উপকারিতা কিংবা দায়িত্বে আবশ্যক উপকারিতা। তারা শর্ত করেন, দায়িত্বে আবশ্যক ইজারাচুক্তির মধ্যে মুনাফার মূল্য আগেই আদায় করা জরুরি- ঋণের বিনিময়ে ঋণের চুক্তি হতে বের হওয়ার জন্য।
হাম্বলীদের নিকট ইজারার ক্ষেত্র তিনটি জিনিসের যে কোনো একটি: ১. নির্দিষ্ট জায়গায় কিংবা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের কোনো জায়গায় কাজ করে দেওয়ার দায়িত্বে চুক্তিবদ্ধ হওয়া। তারা এটিকে দুভাবে ভাগ করেছেন: প্রথমত: কোনো শ্রমিকের সাথে নির্দিষ্ট কাজে নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্যে চুক্তি করা। দ্বিতীয়ত: কোনো শ্রমিকের সাথে নির্দিষ্ট পরিশ্রমিকের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে দেওয়ার চুক্তি করা। যেমন কোনো জামা সেলাই করে দেওয়ার জন্যে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের চুক্তি করা, কিংবা গরু, ছাগল ইত্যাদি চড়ানোর জন্যে কারো সাথে চুক্তি করা। ২. নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের বস্তু দায়িত্বে আবশ্যক করে দেওয়ার চুক্তি করা। ৩. নির্দিষ্ট জিনিসকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ইজারা দেওয়া।
📄 মুনাফা ও উপকার লাভের ইজারাচুক্তি সম্পন্ন হতে কয়েকটি শর্ত রয়েছে
এক. উপকার ভোগের জন্য ইজারা হতে হবে; মূল জিনিসটি নিঃশেষ করা যাবে না। এ কথায় ফকীহগণের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। তবে ইবনে রুশদ বলেন, কতিপয় ফকীহ ভোগের জিনিসটিও নিঃশেষ করে দেওয়ার ইজারাচুক্তি জায়েয বলেছেন। তাদের মতে, উভয় বৈধ উপকার ভোগের অন্তর্ভুক্ত। শাফেয়ীগণ উপকার ভোগের বিষয়টি ব্যাপকার্থে ব্যবহার করেন এবং বহু ধরনকে এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
এই নীতির আওতায় বহু শাখারূপ রয়েছে, যেগুলোতে মূল জিনিস ব্যবহার করে নিঃশেষ করা হয়, কিন্তু সেটি হয়ে থাকে পরোক্ষে; যেমন দুধ দানকারিণী মহিলার সাথে সন্তানের অভিভাবকদের ইজারাচুক্তি, ষাঁড় গরু দ্বারা গাভীর গর্ভসঞ্চারের ইজারা, গাছের ফল থেকে উপকার লাভের জন্য গাছ ইজারা নেওয়া। এসব অবস্থায় মূল জিনিস নিঃশেষ হয়ে যায়।
হানাফীগণ বলেন, কোনো মূল জিনিসকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্যে ইজারা সংঘটিত হতে পারে না। মালেকীগণ বলেন, ইজারাচুক্তিতে ইচ্ছা করে এমন জিনিস কব্জায় নেওয়া জায়েয হবে না। হাম্বলীগণ বলেন, ইজারাচুক্তি এমন জিনিসের মধ্যে হতে পারে যেক্ষেত্রে মূল জিনিস অক্ষুণ্ণ থাকে। তবে জিনিসটি যদি এমন হয় যে, মূল জিনিস অক্ষুণ্ণ রেখে উপকার লাভ সম্ভব নয় তবে ভিন্ন কথা। যেমন আলো লাভের জন্যে মোমবাতি।
দুই. উপকার ও মুনাফা মূল্যবান হতে হবে এবং লেনদেনের মাধ্যমে তা অর্জন করার উদ্দেশ্য থাকতে হবে। এই শর্তের ফলে মূল্য ছাড়াই যে উপকার ভোগ করা যায় তাতে ফকীহগণের মতে ইজারাচুক্তি সাব্যস্ত হয় না। কারণ এক্ষেত্রে টাকা-পয়সা ব্যয় করা অর্থহীন।
তিন. উপকার এমন হতে হবে যা অর্জন বা ভোগ করা বৈধ। ইজারার বিষয়টি এমন হতে পারবে না, শরীয়তে যা ইবাদত হিসাবে পালন করার নির্দেশ রয়েছে কিংবা এমন নিষিদ্ধ উপকার লাভ করা যাবে না যা শরীয়তের দৃষ্টিতে গোনাহ ও অন্যায়।
চার. ইজারাচুক্তি বৈধ হওয়ার জন্যে উপকার লাভের ব্যাপারটি শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ এবং বাস্তবতার নিরিখে অর্জনযোগ্য হতে হবে। যেমন পালিয়ে যাওয়া কোনো জন্তু ভাড়া দেওয়া কিংবা লুণ্ঠনকারী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে লুণ্ঠিত বস্তুর ইজারাচুক্তি বৈধ হবে না। কারণ, ইজারাদাতা ইজারার বস্তু হস্তান্তরে সক্ষম হবে না।
পাঁচ. উপকার লাভের বিষয়টি পরিষ্কার হতে হবে, যেন অজ্ঞতার কারণে উভয় পক্ষের মধ্যে বিবাদের কোনো আশঙ্কা না থাকে। অনুরূপ ইজারার মূল্যের বিষয়টিতেও কোনো প্রকার অস্পষ্টতা না থাকা এই শর্তের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, অজ্ঞতা-অস্পষ্টতা ও অনির্ধারিত হওয়ার বিষয়টি উপকার লাভের ব্যাপারে যেমন বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে; তদ্রূপ ইজারার মূল্যের ক্ষেত্রেও অস্পষ্টতা বিরোধের কারণ হতে পারে, এ বিষয়ে সকল ফকীহই ঐকমত্য পোষণ করেন।