📄 ইজারার মূল বিষয়
ইজারাচুক্তির রুকন বা মূল ভিত্তি কয়টি, এ ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশের মতে, ইজারার ভিত্তি হলো, ইজারার শব্দ অর্থাৎ প্রস্তাব ও গ্রহণ, ইজারাচুক্তির দুপক্ষ, এক পক্ষের উপকার লাভ এবং অন্য পক্ষের মূল্য বা পারিশ্রমিক প্রাপ্তি। হানাফীদের মতে, ইজারার মূল ভিত্তি শুধুই প্রস্তাব ও গ্রহণ। ইজারাচুক্তির দুটি পক্ষ এবং উপকারভোগ ও পারিশ্রমিক হলো ইজারাচুক্তির উপাদানমাত্র। আবশ্যিক এই উপাদানগুলো একত্র না হলে ইজারা চুক্তি অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না। হানাফী ও অধিকাংশ ফকীহের মধ্যকার এই মতপার্থক্য মূলত শাব্দিক, বিধানের ক্ষেত্রে এই মতপার্থক্যের কোনো প্রভাব নেই।
📄 ইজারাচুক্তির শব্দ
ইজারাচুক্তির শব্দ হলো, এমন শব্দ/বাক্য যা উভয়পক্ষের আকাঙ্খাকে প্রতিফলিত করে কিংবা এমন অর্থের প্রতিনিধিত্বকারী শব্দ। সাধারণত উভয়পক্ষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঈজাব ও কবুল দ্বারাই পূর্ণতা লাভ করে। ঈজাব হলো সেই ব্যক্তির অভিব্যক্তি যে প্রতিপক্ষকে উপকারের মালিক বানাবে, আর কবুল সেই ব্যক্তির অভিব্যক্তি যে উপকার লাভ করবে। এ অভিমত অধিকাংশ ফকীহের। হানাফীগণ বলেন, দুপক্ষের যে কোনো একজনের প্রথমে বলা শব্দ/বাক্যকে ঈজাব আর দ্বিতীয় পক্ষের অভিব্যক্তিকে বলা হয় কবুল।
জমহুর বলেন, ইজারার উদ্দেশ্য ও অর্থ ধারণ করে এমন যে-কোনো শব্দ/বাক্য দ্বারাই ইজারাচুক্তি সম্পাদিত হতে পারে। যেমন ভাড়া রাখা, ভাড়া নেওয়া কিংবা ভাড়া দেয়া। অথবা কেউ যদি বলে, আমি এত টাকার বিনিময়ে এই ঘরটি তোমাকে একমাসের জন্য হাওলাত দিলাম, এক্ষেত্রেও তার কথা ভাড়া বুঝাবে। কেননা, বিনিময় নিয়ে কোনো জিনিস হাওলাত দেওয়াটা মূলত ইজারা বা ভাড়ারই নামান্তর। অনুরূপ কেউ যদি বলে, "আমি অমুক জিনিসটির লাভ বা উপকারিতা একমাসের জন্য এত টাকার বিনিময়ে তোমাকে দান করলাম তাতেও ইজারা বুঝাবে। অথবা কেউ যদি কাউকে বলে, আমি তোমার সাথে এ ব্যাপারে আপস করেছি যে, তুমি এত টাকা ভাড়ার বিনিময়ে একমাস এই ঘরে থাকবে।
হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ এক্ষেত্রে আরো উদার। তারা বলেন, কেউ যদি বলে, আমি ইজারা দিলাম কিংবা বলে, আমি তোমার কাছে ভাড়া দিলাম, তাহলেই ইজারাচুক্তি সম্পন্ন হয়ে যাবে। ইজারার বস্তুটির প্রতি ইঙ্গিত করুক বা তার মুনাফার প্রতি ইঙ্গিত করুক, ইজারাচুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না। বিক্রয় শব্দ দ্বারাও ইজারা সম্পন্ন হয়। যেমন কেউ বলে, আমি তোমার কাছে এই ঘরের উপকারিতা বিক্রি করলাম, কিংবা এই ঘরের আবাসন তোমার কাছে বিক্রি করলাম।
হানাফীদের একটি অভিমত এবং শাফেয়ীদের বিশুদ্ধ মতে, 'আমি তোমার কাছে এই ঘরের উপকারিতা বিক্রি করেছি' এমন বলার দ্বারা ইজারা সম্পন্ন হবে না। কেননা, ইজারা দ্বারা কোনো জিনিসের উপকারিতায় মালিকানা সাব্যস্ত হয়, আর বিক্রি শব্দটি মূল বস্তুতে মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করে। ফলে কোনো উপকারিতা লেনদেনে বিক্রয় শব্দ ব্যবহার করা বিক্রয়চুক্তি ভন্ডুল হওয়ার নামান্তর।
📄 কথাবার্তা ছাড়া আদান-প্রদান দ্বারা ইজারাচুক্তি
হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী ফকীহগণ অতিসাধারণ ও অতিমূল্যবান সবধরনের জিনিসের ক্ষেত্রেই আদান-প্রদানের মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন হওয়া বৈধ মনে করেন। তবে শর্ত হলো, তাতে উভয়পক্ষের সম্মতি এবং মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার থাকা। শাফেয়ী মতাবলম্বীদেরও এমন একটি অভিমত রয়েছে। এ মতকে ইমাম নববী এবং একটি দল গ্রহণ করেছেন।
বিখ্যাত হানাফী ফকীহ আল-কুদূরী বলেন, অতিসাধারণ জিনিসের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বৈধ হবে, কিন্তু অতিমূল্যবান জিনিসের ক্ষেত্রে তা বৈধ হবে না। শাফেয়ীদেরও একটি অভিমত এমন। তবে তাদের মূল অবস্থান হলো, এমন লেনদেন নিষিদ্ধ। অবস্থা ও পারিপার্শ্বিকতার চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জিনিসটি যদি ভাড়ার জন্যে তৈরি করা হয়ে থাকে; যেমন কেউ কোনো হোটেলে রাতযাপন করল; তখন রাতযাপনের বিপরীতে প্রদেয় টাকা ভাড়া হিসেবেই গণ্য হবে।
শাফেয়ীদের এ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে কেউ যদি কোনো দর্জিকে কাপড় সেলাই করতে দেয়, আর দর্জি সেলাই করে; কিন্তু কেউই মজুরির কথা উচ্চারণ করেনি, তাহলে মজুরি পরিশোধ অপরিহার্য হবে না। কোনো কোনো ফকীহ বলেন, এ অবস্থায় দর্জি বাজারদর অনুযায়ী উপযুক্ত মজুরি পাবে। কেউ কেউ বলেন, দর্জি যদি মজুরির বিনিময়ে সেলাই কাজে অভ্যস্ত ও পরিচিতি পেয়ে থাকে, তবে মজুরি প্রাপ্য হবে, নয়তো মজুরির অধিকারী হবে না।
📄 ইজারাচুক্তির তাৎক্ষণিক কার্যকারিতা, এর সম্পর্ক ও শর্তের বিধান
ইজারাচুক্তিতে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে যদি কোনো পরিষ্কার বক্তব্য না থাকে এবং এই চুক্তি কখন থেকে কার্যকর হবে, তাও যদি না থাকে তাহলে এ অবস্থায় তা তাৎক্ষণিক কার্যকর হওয়াকেই বুঝাবে। তবে ভবিষ্যতে কার্যকর হওয়ার শর্তে যদি ইজারাচুক্তি করা হয়, তবে সেটির দুটি অবস্থা হতে পারে। যেমন কোনো নির্দিষ্ট জিনিসের ইজারা কিংবা কারো জিম্মায় থাকাবস্থায় ইজারা।
অধিকাংশ ফকীহ মূল জিনিস ও উপকারিতার ইজারা প্রশ্নে ভবিষ্যতের লেনদেনকে সঠিক মনে করেন এবং এ দুটোতে পার্থক্য করেন না।
শাফেয়ীদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতে, যদি মূল বস্তুতে না হয়ে ইজারাদাতার জিম্মায় উপকার নিশ্চিত করার শর্তে ইজারাচুক্তি হয় তবে তা জায়েয। অবশ্য মূল জিনিসের ইজারাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে তাদের মতে জায়েয, যদি চুক্তি এবং তার মেয়াদে, যার সাথে ইজারার সম্পর্ক করা হচ্ছে অল্প সময়ের ব্যবধান থাকে। যেমন, হজের সফর শুরু হওয়ার আগেই যানবাহন ইজারা করা।
ইজারা যেহেতু একটি কার্যকর চুক্তি, ফলে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর দুপক্ষের কেউ ইচ্ছা করলেই তা বাতিল করতে পারবে না। ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর একটি মতে, যদি ভবিষ্যতে উপকার লাভের ভিত্তিতে ইজারাচুক্তি করা হয় তবে নির্দিষ্ট সময় আসার আগেই দুপক্ষের কেউ যদি চুক্তি বাতিল করতে চায় তবে তা বাতিল করতে পারবে।
ফকীহগণ এ ব্যাপারে একমত যে, ক্রয়বিক্রয়ের মতো ইজারাচুক্তিও শর্তাধীন করা জায়েয নয়। হানাফী ফকীহ কাযীযাদা এটি এ কথায় সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন : ইজারা কোনো শর্ত কবুল করে না। অনেক ক্ষেত্রে ইজারা দৃশ্যত শর্তযুক্ত মনে হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা শর্তযুক্ত নয়, ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন কেউ যদি দর্জিকে বলে, তুমি যদি আজ এ কাপড় সেলাই করে দাও তাহলে এক টাকা মজুরি দেব, আর আগামীকাল সেলাই করলে অর্ধেক টাকা দেব।
ইজারাচুক্তি শুদ্ধ হওয়ার জন্য ইজারার শব্দাবলিতে ইজারাচুক্তির পরিপন্থী কোনো শর্ত থাকতে পারবে না। অথবা ইজারাচুক্তির ক্ষেত্রে যদি এমন কথা বলা হয় যা ইজারাদাতা বা ইজারাগ্রহীতা অথবা তারা ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষা করে— যা ইজারাচুক্তিতে প্রত্যাশিত নয়; যেমন ইজারাদাতা শর্ত করল, আমি এই ঘরটি ইজারা দেব বটে, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত আমি তাতে বসবাস করব কিংবা তার উপকার হাসিল করব; এমন শর্ত করার ক্ষেত্রে ইজারাচুক্তি শুদ্ধ হবে কি-না, এ ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে মতপার্থক্য ও বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
ইজারাচুক্তি বিশুদ্ধ ও সম্পাদিত হওয়ার শর্তাদি ছাড়াও ইজারাচুক্তি কার্যকর হওয়ার জন্যে শর্ত হলো, উভয়পক্ষের চুক্তি সম্পাদন করার যোগ্যতা থাকতে হবে। (সেই সাথে শর্ত হলো) কোনো পক্ষের খিয়ারুশ শারত করার অধিকার থাকবে না। এর কারণ, গ্রহণ-বর্জনের অধিকারের শর্তারোপ যে-কোনো লেনদেনের কার্যকারিতাকে শুরুতেই বাধাগ্রস্ত করে।
হানাফী, মালেকী এবং হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের মতে ইজারাচুক্তিতে ইচ্ছাধিকারের শর্তারোপ জায়েয। ইজারাচুক্তি যদি কোনো নির্দিষ্ট জিনিসের ক্ষেত্রে হয় তবে সেক্ষেত্রে শাফেয়ী মতাবলম্বীদের এক বক্তব্য মতেও ইচ্ছাধিকারের শর্তারোপ জায়েয। জিম্মার ইজারার ক্ষেত্রে শাফেয়ীগণ ইচ্ছাধিকারের শর্তারোপ নিষিদ্ধ মনে করেন।