📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ইজারা বৈধ হওয়ার প্রমাণ

📄 ইজারা বৈধ হওয়ার প্রমাণ


ইসলামী শরীয়তে ইজারা বৈধ। কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা এর বৈধতা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন : فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ “যদি তারা তোমাদের (শিশুদের) দুধপান করায় তবে তোমরা তাদের পারিশ্রমিক দিয়ে দিও।”

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : مَنِ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَلْيُعْلِمْهُ أَجْرَهُ “কেউ যদি কাউকে শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত করে তবে সে যেন কাজে লাগানোর আগেই তার পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে নেয়।”

অন্য এক জায়গায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: أَعْطُوا الأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجفُ عَرَقُهُ “শ্রমিকের ঘাম শোকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।”

রাসূলুল্লাহ আরো বলেন: ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَدَّ مِنْهُمْ رَجُلًا اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِهِ أَجْرَهُ . “আমি কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেবো। তিনজনের একজন হচ্ছে ওই ব্যক্তি, যে একজন শ্রমিক ভাড়ায় নিয়ে পূর্ণ শ্রম আদায় করেছে কিন্তু তার পারিশ্রমিক দেয়নি।” এ ছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্ম এবং এ সম্পর্কে তার নীরবতাও ইজারা বৈধ হওয়ার প্রমাণ।

তা ছাড়া সাহাবায়ে কিরামের সময় থেকে এ পর্যন্ত ইজারা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা— ঐকমত্য রয়েছে। এ সম্পর্কে বিবেক ও বুদ্ধিজাত দলিল হলো, যে জিনিসে মানুষের কোনো কর্তৃত্ব বা মালিকানা থাকে না, মানুষ এমন জিনিস দ্বারাও উপকৃত হতে চায়, ইজারার দ্বারা মানুষ সেই উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে এবং এটি মানুষের কাজকেও সহজ করে দেয়। মানুষ বিভিন্ন বস্তুর প্রয়োজন যেমন অনুভব করে, তদ্রূপ বিভিন্ন জিনিস থেকে উপকার লাভের প্রয়োজনও অনুভব করে। যেমন একজন গরীব মানুষের দরকার টাকা, আর একজন বিত্তশালী মানুষের প্রয়োজন হয় শ্রমিকের। আর শরীয়ত মানুষের প্রয়োজনকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। এক্ষেত্রে ইজারার বৈধতা শ্রমগ্রহীতা ও শ্রমদাতা উভয়ের প্রয়োজন পূরণ করে এবং এটি শরীয়তের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বস্তুত এটিই ইজারা বৈধ হওয়ার মূল কারণ।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ইজারার মূল বিষয়

📄 ইজারার মূল বিষয়


ইজারাচুক্তির রুকন বা মূল ভিত্তি কয়টি, এ ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশের মতে, ইজারার ভিত্তি হলো, ইজারার শব্দ অর্থাৎ প্রস্তাব ও গ্রহণ, ইজারাচুক্তির দুপক্ষ, এক পক্ষের উপকার লাভ এবং অন্য পক্ষের মূল্য বা পারিশ্রমিক প্রাপ্তি। হানাফীদের মতে, ইজারার মূল ভিত্তি শুধুই প্রস্তাব ও গ্রহণ। ইজারাচুক্তির দুটি পক্ষ এবং উপকারভোগ ও পারিশ্রমিক হলো ইজারাচুক্তির উপাদানমাত্র। আবশ্যিক এই উপাদানগুলো একত্র না হলে ইজারা চুক্তি অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না। হানাফী ও অধিকাংশ ফকীহের মধ্যকার এই মতপার্থক্য মূলত শাব্দিক, বিধানের ক্ষেত্রে এই মতপার্থক্যের কোনো প্রভাব নেই।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ইজারাচুক্তির শব্দ

📄 ইজারাচুক্তির শব্দ


ইজারাচুক্তির শব্দ হলো, এমন শব্দ/বাক্য যা উভয়পক্ষের আকাঙ্খাকে প্রতিফলিত করে কিংবা এমন অর্থের প্রতিনিধিত্বকারী শব্দ। সাধারণত উভয়পক্ষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঈজাব ও কবুল দ্বারাই পূর্ণতা লাভ করে। ঈজাব হলো সেই ব্যক্তির অভিব্যক্তি যে প্রতিপক্ষকে উপকারের মালিক বানাবে, আর কবুল সেই ব্যক্তির অভিব্যক্তি যে উপকার লাভ করবে। এ অভিমত অধিকাংশ ফকীহের। হানাফীগণ বলেন, দুপক্ষের যে কোনো একজনের প্রথমে বলা শব্দ/বাক্যকে ঈজাব আর দ্বিতীয় পক্ষের অভিব্যক্তিকে বলা হয় কবুল।

জমহুর বলেন, ইজারার উদ্দেশ্য ও অর্থ ধারণ করে এমন যে-কোনো শব্দ/বাক্য দ্বারাই ইজারাচুক্তি সম্পাদিত হতে পারে। যেমন ভাড়া রাখা, ভাড়া নেওয়া কিংবা ভাড়া দেয়া। অথবা কেউ যদি বলে, আমি এত টাকার বিনিময়ে এই ঘরটি তোমাকে একমাসের জন্য হাওলাত দিলাম, এক্ষেত্রেও তার কথা ভাড়া বুঝাবে। কেননা, বিনিময় নিয়ে কোনো জিনিস হাওলাত দেওয়াটা মূলত ইজারা বা ভাড়ারই নামান্তর। অনুরূপ কেউ যদি বলে, "আমি অমুক জিনিসটির লাভ বা উপকারিতা একমাসের জন্য এত টাকার বিনিময়ে তোমাকে দান করলাম তাতেও ইজারা বুঝাবে। অথবা কেউ যদি কাউকে বলে, আমি তোমার সাথে এ ব্যাপারে আপস করেছি যে, তুমি এত টাকা ভাড়ার বিনিময়ে একমাস এই ঘরে থাকবে।

হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ এক্ষেত্রে আরো উদার। তারা বলেন, কেউ যদি বলে, আমি ইজারা দিলাম কিংবা বলে, আমি তোমার কাছে ভাড়া দিলাম, তাহলেই ইজারাচুক্তি সম্পন্ন হয়ে যাবে। ইজারার বস্তুটির প্রতি ইঙ্গিত করুক বা তার মুনাফার প্রতি ইঙ্গিত করুক, ইজারাচুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না। বিক্রয় শব্দ দ্বারাও ইজারা সম্পন্ন হয়। যেমন কেউ বলে, আমি তোমার কাছে এই ঘরের উপকারিতা বিক্রি করলাম, কিংবা এই ঘরের আবাসন তোমার কাছে বিক্রি করলাম।

হানাফীদের একটি অভিমত এবং শাফেয়ীদের বিশুদ্ধ মতে, 'আমি তোমার কাছে এই ঘরের উপকারিতা বিক্রি করেছি' এমন বলার দ্বারা ইজারা সম্পন্ন হবে না। কেননা, ইজারা দ্বারা কোনো জিনিসের উপকারিতায় মালিকানা সাব্যস্ত হয়, আর বিক্রি শব্দটি মূল বস্তুতে মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করে। ফলে কোনো উপকারিতা লেনদেনে বিক্রয় শব্দ ব্যবহার করা বিক্রয়চুক্তি ভন্ডুল হওয়ার নামান্তর।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 কথাবার্তা ছাড়া আদান-প্রদান দ্বারা ইজারাচুক্তি

📄 কথাবার্তা ছাড়া আদান-প্রদান দ্বারা ইজারাচুক্তি


হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী ফকীহগণ অতিসাধারণ ও অতিমূল্যবান সবধরনের জিনিসের ক্ষেত্রেই আদান-প্রদানের মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন হওয়া বৈধ মনে করেন। তবে শর্ত হলো, তাতে উভয়পক্ষের সম্মতি এবং মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার থাকা। শাফেয়ী মতাবলম্বীদেরও এমন একটি অভিমত রয়েছে। এ মতকে ইমাম নববী এবং একটি দল গ্রহণ করেছেন।

বিখ্যাত হানাফী ফকীহ আল-কুদূরী বলেন, অতিসাধারণ জিনিসের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বৈধ হবে, কিন্তু অতিমূল্যবান জিনিসের ক্ষেত্রে তা বৈধ হবে না। শাফেয়ীদেরও একটি অভিমত এমন। তবে তাদের মূল অবস্থান হলো, এমন লেনদেন নিষিদ্ধ। অবস্থা ও পারিপার্শ্বিকতার চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জিনিসটি যদি ভাড়ার জন্যে তৈরি করা হয়ে থাকে; যেমন কেউ কোনো হোটেলে রাতযাপন করল; তখন রাতযাপনের বিপরীতে প্রদেয় টাকা ভাড়া হিসেবেই গণ্য হবে।

শাফেয়ীদের এ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে কেউ যদি কোনো দর্জিকে কাপড় সেলাই করতে দেয়, আর দর্জি সেলাই করে; কিন্তু কেউই মজুরির কথা উচ্চারণ করেনি, তাহলে মজুরি পরিশোধ অপরিহার্য হবে না। কোনো কোনো ফকীহ বলেন, এ অবস্থায় দর্জি বাজারদর অনুযায়ী উপযুক্ত মজুরি পাবে। কেউ কেউ বলেন, দর্জি যদি মজুরির বিনিময়ে সেলাই কাজে অভ্যস্ত ও পরিচিতি পেয়ে থাকে, তবে মজুরি প্রাপ্য হবে, নয়তো মজুরির অধিকারী হবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00