📄 الْجَعَالَةُ (আল জিআলা) : নির্দিষ্ট কাজের বিনিময়ে কমিশন বা পুরস্কার
ইজারা আর জিআলা'র মধ্যে পার্থক্য হলো, জিআলা এমন উপকার লাভের জন্য শ্রমিকের সাথে চুক্তি করা যা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইজারাগ্রহীতা শ্রমিকের শ্রমঅংশের দ্বারা উপকার লাভ করতে পারে না, বরং কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর লাভবান হতে পারে। জিআলা এমন একটি চুক্তি যা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চুক্তি পালনকে অপরিহার্য করে না।
বিনিময় জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “مَنِ اسْتَأْجَرَ أَجيرًا فَلْيُعْلِمْهُ أَجْرَهُ কেউ যদি কাউকে কোনো কাজের জন্যে শ্রমদাতা হিসাবে গ্রহণ করে তাহলে তার মজুরি তাকে পরিজ্ঞাত করা আবশ্যক।”
এমন কোনো জিনিস যদি ইজারার বিনিময় নির্ধারণ করা হয়, যা ঋণ গণ্য হতে পারে, যেমন রৌপ্যমুদ্রা, স্বর্ণমুদ্রা, অথবা পরিমাপযোগ্য কিংবা ওজনযোগ্য কোনো জিনিস, কাছাকাছি গড়নের বস্তু তাহলে এগুলোর পরিমাণ, গুণাবলি, প্রকৃতি ও প্রকার উল্লেখ করা আবশ্যক। এসব ক্ষেত্রে যদি কোনো প্রকার অস্পষ্টতা থাকে, যাকে কেন্দ্র করে বিরোধ দেখা দিতে পারে, তাহলে ইজারাচুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। এ অবস্থায় যদি ইজারাগ্রহীতা তার উপকার ভোগ করে ফেলে তবে সমাজে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তথা বাজারমূল্যে প্রতিদান পরিশোধ করা আবশ্যক হবে। বস্তুত সংশ্লিষ্ট কাজের মজুরি সম্পর্কে যারা পূর্ণ অবগত তাদের মতের ভিত্তিতে তখন মজুরি নির্ধারিত হবে।
📄 الاسْتِصْنَاعُ (আল ইসতিসনা’) : কোনো কিছু বানানোর চুক্তি, অর্ডার
ইজারা ও ইসতিসনা'র মধ্যে পার্থক্য হলো, ইজারার ক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগ করে ভাড়াগ্রহণকারী আর ইসতিসনা এমন বিক্রয়চুক্তি যেখানে ক্রেতা একটি জিনিস ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতাকে জিনিসটি কাঁচামালসহ বানিয়ে দেওয়ার শর্ত করে।
📄 ইজারা বৈধ হওয়ার প্রমাণ
ইসলামী শরীয়তে ইজারা বৈধ। কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা এর বৈধতা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন : فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ “যদি তারা তোমাদের (শিশুদের) দুধপান করায় তবে তোমরা তাদের পারিশ্রমিক দিয়ে দিও।”
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : مَنِ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَلْيُعْلِمْهُ أَجْرَهُ “কেউ যদি কাউকে শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত করে তবে সে যেন কাজে লাগানোর আগেই তার পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে নেয়।”
অন্য এক জায়গায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: أَعْطُوا الأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجفُ عَرَقُهُ “শ্রমিকের ঘাম শোকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।”
রাসূলুল্লাহ আরো বলেন: ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَدَّ مِنْهُمْ رَجُلًا اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِهِ أَجْرَهُ . “আমি কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেবো। তিনজনের একজন হচ্ছে ওই ব্যক্তি, যে একজন শ্রমিক ভাড়ায় নিয়ে পূর্ণ শ্রম আদায় করেছে কিন্তু তার পারিশ্রমিক দেয়নি।” এ ছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্ম এবং এ সম্পর্কে তার নীরবতাও ইজারা বৈধ হওয়ার প্রমাণ।
তা ছাড়া সাহাবায়ে কিরামের সময় থেকে এ পর্যন্ত ইজারা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা— ঐকমত্য রয়েছে। এ সম্পর্কে বিবেক ও বুদ্ধিজাত দলিল হলো, যে জিনিসে মানুষের কোনো কর্তৃত্ব বা মালিকানা থাকে না, মানুষ এমন জিনিস দ্বারাও উপকৃত হতে চায়, ইজারার দ্বারা মানুষ সেই উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে এবং এটি মানুষের কাজকেও সহজ করে দেয়। মানুষ বিভিন্ন বস্তুর প্রয়োজন যেমন অনুভব করে, তদ্রূপ বিভিন্ন জিনিস থেকে উপকার লাভের প্রয়োজনও অনুভব করে। যেমন একজন গরীব মানুষের দরকার টাকা, আর একজন বিত্তশালী মানুষের প্রয়োজন হয় শ্রমিকের। আর শরীয়ত মানুষের প্রয়োজনকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। এক্ষেত্রে ইজারার বৈধতা শ্রমগ্রহীতা ও শ্রমদাতা উভয়ের প্রয়োজন পূরণ করে এবং এটি শরীয়তের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বস্তুত এটিই ইজারা বৈধ হওয়ার মূল কারণ।
📄 ইজারার মূল বিষয়
ইজারাচুক্তির রুকন বা মূল ভিত্তি কয়টি, এ ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশের মতে, ইজারার ভিত্তি হলো, ইজারার শব্দ অর্থাৎ প্রস্তাব ও গ্রহণ, ইজারাচুক্তির দুপক্ষ, এক পক্ষের উপকার লাভ এবং অন্য পক্ষের মূল্য বা পারিশ্রমিক প্রাপ্তি। হানাফীদের মতে, ইজারার মূল ভিত্তি শুধুই প্রস্তাব ও গ্রহণ। ইজারাচুক্তির দুটি পক্ষ এবং উপকারভোগ ও পারিশ্রমিক হলো ইজারাচুক্তির উপাদানমাত্র। আবশ্যিক এই উপাদানগুলো একত্র না হলে ইজারা চুক্তি অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না। হানাফী ও অধিকাংশ ফকীহের মধ্যকার এই মতপার্থক্য মূলত শাব্দিক, বিধানের ক্ষেত্রে এই মতপার্থক্যের কোনো প্রভাব নেই।