📄 বন্ধকীবস্তু দ্বারা উপকার গ্রহণ করা
বন্ধকীবস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া বৈধ হওয়ার বিষয়ে এবং এটি কার জন্য বৈধ হবে তা নিয়ে ফকীহ সমাজ মতবিরোধ করেছেন। হানাফী ফকীহদের অভিমত হলো, বন্ধকদাতা ও বন্ধকগ্রহীতা কারো জন্যই কোনো ভাবে অপরের অনুমতি ব্যতীত বন্ধকীবস্তু যথা: ঘর-বাড়ি, বাহন বা অন্যকিছু দ্বারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ নেই।
মালেকীগণ বলেন: বন্ধকী জিনিসের শস্য বন্ধকদাতার, তা উপার্জনে বন্ধকগ্রহীতা তার স্থলাভিষিক্ত হবে। আর কয়েকটি শর্তে বন্ধকগ্রহীতার বন্ধকীবস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া জায়েয আছে। ক. মূল চুক্তিতেই উপকার ভোগ করার শর্তারোপ করতে হবে। খ. সময় বা মেয়াদ নির্দিষ্ট থাকতে হবে। গ. যার বিপরীতে বন্ধক রাখা হবে তা কোনো ঋণ হবে না।
হাম্বলীগণ বলেন: বন্ধকীবস্তু যদি বাহন বা দুগ্ধদানকারী প্রাণী ব্যতীত অন্য কিছু হয় তাহলে বন্ধকদাতা বা বন্ধকগ্রহীতা কারো জন্য একে অপরের অনুমতি ব্যতীত তা দ্বারা উপকৃত হওয়া জায়েয নেই। বন্ধক রাখা প্রাণী বাহন বা দুগ্ধদানকারী হলে বন্ধকগ্রহীতা সেগুলোতে বন্ধকদাতার কাছে খরচ করার বা উপকার ভোগ করার অনুমতি চাওয়া ব্যতীতই নিজের টাকা ব্যয় করে সে খরচ অনুপাতে ইনসাফের ভিত্তিতে সেগুলোতে আরোহণ করতে এবং দুধ দোহন করতে পারবে। শাফেয়ীগণ বলেন: বন্ধকী জিনিসে গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা ছাড়া বন্ধকগ্রহীতার কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ বা উপকৃত হওয়ার অধিকার নেই।
টিকাঃ
৪০. হাশিয়াতুত-তাহতাভী, খ. ৪, পৃ. ২৩৬; ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩১০
৪১. বুলগাতুস সালিক আলাশ-শারহিস সাগীর, খ. ২, পৃ. ১১২; হাশিয়াতু দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৪৬; আল-ক্বাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ৩১৯
৪২. ইমাম বুখারী রহ হযরত আবু হুরায়রা রা. এর বর্ণনায় বুখারী শরীফে এটি উদ্ধৃত করেছেন। [ফাতহুল বারী, খ. ৫, পৃ. ১৪৩ আস-সালফিয়্যা প্রকাশনী)।
৪৩. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৪২৬-৪৩২
৪৪. ইমাম বায়হাকী হযরত আবু হুরায়রা রা.-এর বর্ণনায় সুনানে বায়হাকীতে এই হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন।
৪৫. রওজাতুত তালিবীন, খ. ৪, পৃ. ৭৯-৯৯; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৬১
📄 বন্ধকী জিনিসে বন্ধকদাতার হস্তক্ষেপ
ফকীহদের এ কথায় কোনো মতবিরোধ নেই, বন্ধক আবশ্যক হওয়ার পর বন্ধকগ্রহীতার অনুমতি ব্যতীত বন্ধকদাতা বন্ধকীবস্তুতে এমন কোনো কাজ বা হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই যা তার মালিকানা দূর করে দেয়। যেমন বিক্রি করে দেওয়া, দান করে দেওয়া, ওয়াকফ করে দেওয়া, কিংবা অন্যের কাছে বন্ধক রাখা। তবে বন্ধকগ্রহীতার অনুমতি থাকলে এসবই করা যাবে।
সে যদি উপরিউক্ত কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করে তাহলে তার হস্তক্ষেপের বিষয়টি বন্ধকগ্রহীতার অনুমতির ওপর স্থগিত থাকবে। যদি সে অনুমতি দেয় তাহলে তার হস্তক্ষেপ সহীহ হবে এবং বন্ধক বাতিল হয়ে যাবে, যদি হস্তক্ষেপটা এই ধরনের হয় যে, সেখানে বন্ধকের কোনো বদল বা বিনিময় বাকী থাকে না; যেমন: ওয়াকফ, হিবা বা দান।
যদি বন্ধকের কোনো বদল বা বিনিময় বাকী থাকে তাহলে তাতে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে: যদি অনুমতিটা শর্তহীন অনুমতি হয় আর ঋণটা দীর্ঘমেয়াদী হয়, তাহলে বিক্রয় সহীহ হবে এবং বন্ধকদাতার মালিকানা থেকে বন্ধকীজিনিস বের হয়ে যাওয়ার কারণে বন্ধক বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি সে অনুমতি দেওয়ার সময় এই শর্তারোপ করে যে, বন্ধকীজিনিসের মূল্য দিয়ে তার ঋণ আদায় করতে হবে, তাহলে অনুমতি দেওয়ার কারণে বিক্রয় সহীহ হবে।
হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন: যখন বন্ধকদাতা বিক্রয় করে দেবে আর বন্ধকগ্রহীতা বিক্রয়ের অনুমতি দেবে তখন বিক্রয় জায়েয হয়ে যাবে। যদি বন্ধকগ্রহীতা বিক্রয়ের অনুমতি না দেয় তাহলে মাযহাবের দুটি বর্ণনার মাঝে যেটি অধিক বিশুদ্ধ তা হচ্ছে, তা স্থগিত থাকবে। মালেকীগণ বলেন: যদি বন্ধকগ্রহীতা বন্ধকদাতাকে বিক্রির অনুমতি প্রদান করে তাহলে নির্দিষ্ট বন্ধকীজিনিস থেকে বন্ধক বাতিল হয়ে যাবে।
টিকাঃ
৪৬. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৪০১; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৫৮; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৩৩৪; আল-কাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ৩১৯; হাশিয়াতুত-তাহতাভী, খ. ৪, পৃ. ২৪৭
৪৭. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩৩৪-৩৩৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৫৯-২৬৮
৪৮. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩৩৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৬৯; আল-মাজমুউ, খ. ৩, পৃ. ২৪০
৪৯. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩৩৮
৫০. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৬৩; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৬৯
৫১. তাকমিলাতু ফাতহিল কাদীর- ও হাশিয়াতু সাদী চালপী, খ. ৯, পৃ. ১১১; ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩২৭
৫২. হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৪৩; শারহুম যুরক্বানী, খ. ৫, পৃ. ২৪৩
📄 বন্ধকীবস্তুর উপর কর্তৃত্ব
চুক্তি আবশ্যক হওয়ার পর বন্ধকীজিনিসের ওপর কর্তৃত্ব হবে বন্ধকগ্রহীতার। কেননা বন্ধকী বস্তু হলো নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টির জন্য একটি মজবুত স্তম্ভ। বন্ধকগ্রহীতার সন্তুষ্টি ব্যতীত কিংবা ঋণ পরিশোধ করা ব্যতীত বন্ধকদাতা তার কাছ থেকে তা সরিয়ে নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। যদি তারা এ ব্যাপারে একমত হয় যে, তারা উভয়ে এর কর্তৃত্ব তৃতীয় কারো হাতে রাখবে তাহলে তা জায়েয আছে।
শাফেয়ী ও হাম্বলীগণ এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, বন্ধকীজিনিসের উপর বন্ধকগ্রহীতার কব্জা বা কর্তৃত্ব হলো আমানতের। সুতরাং তার কোনো ত্রুটি ব্যতীত তা বিনষ্ট হলে তাকে জামানত বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। হানাফীগণ বলেন: এটি হলো জামানতের কর্তৃত্ব। সুতরাং যদি তা গ্রহীতার হাতে বিনষ্ট হয় তাহলে ঋণ এবং বন্ধকী জিনিসের মাঝে যেটার মূল্য কম তা দিয়ে সে ক্ষতিপূরণ দেবে।
মালেকীগণ গোপন রাখা যায় এবং যা গোপন রাখা যায় না এমন জিনিসের মাঝে পার্থক্য করেছেন। যদি বন্ধকীজিনিস কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে না থাকে কিংবা তার সীমালঙ্ঘন ব্যতীত ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে কোনো প্রমাণ পেশ করতে না পারে তবে প্রথম ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
টিকাঃ
৫৩. আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২৭২; আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ১৪৯; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৬২-১৬৫; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৫১; আল-হিদায়া, খ. ৪, পৃ. ১৪১; হাশিয়াতুত-তাহতাভী, খ. ৪, পৃ. ২৪৫
৫৪. ইমাম বায়হাকী রহ. হাদীসটি হযরত আবু হুরায়রা রা.-এর হাদীস থেকে উদ্ধৃত করেছেন।
৫৫. আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২৭৫; কাশশাফুল ক্বিনা', খ. ৩, পৃ. ৩৪১; আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ১৫৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ১৮১
৫৬. ইমাম আবু দাউদ রহ. হাদীসটি তার মারাসিলে আতা ইবনে আবী রাবাহ র.-এর হাদীস থেকে মুরসালরূপে উদ্ধৃত করেছেন।
৫৭. হাশিয়াতুত-তাহতাভী, খ. ৪, পৃ. ২৩৫; ফাতহুল কাদীর, খ. ৯, পৃ. ৭০
৫৮. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২৪৭; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৫৩
📄 বন্ধকী জিনিসের খরচ
অধিকাংশ ফকীহের অভিমত, বন্ধকীজিনিসের খরচ বন্ধকদাতার উপর বর্তায়। যেমন: প্রাণীর ঘাস-খাদ্য ব্যবস্থা করা, গাছে পানি দেওয়া, ফল-ফসল নিড়ানো ও শুকানো, পাহারাদারী, রাখালের পারিশ্রমিক ইত্যাদি। কেননা এটি তার মালিকানাধীন জিনিস, সুতরাং বন্ধক টিকিয়ে রাখার জন্য যা প্রয়োজন তা সরবরাহ করা তার উপর ওয়াজিব।
হানাফীগণ বলেন: কেবল বন্ধকের প্রয়োজনে যা প্রয়োজন; যেমন প্রাণীর ঘাস-খাদ্য, বাগানে পানি দেওয়া ইত্যাদি এসব বন্ধকদাতার উপর আরোপিত হবে। আর বন্ধকীজিনিস সংরক্ষণের জন্য যা প্রয়োজন যেমন: চতুষ্পদ জন্তু রাখার স্থান, সংরক্ষণের ভাড়া ইত্যাদি এসব আরোপিত হবে ঋণদাতার উপর।
টিকাঃ
৫৯. লা ইয়াল্লাকুর রহনু মিন রাহিনিহি... (হাদীস)।
৬০. কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৩৩৩; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৭৯; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২৭৫; হাশিয়া দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ২৫১; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১২০
৬১. হাশিয়াতুত তাহতাভী, খ. ৪, পৃ. ২৩৮; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩১৬