📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 বন্ধকের আবশ্যকতা

📄 বন্ধকের আবশ্যকতা


বন্ধক আবশ্যক হওয়া নিয়ে ফকীহগণ মতানৈক্য করেছেন: হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের অভিমত হলো, হস্তগত করা বা করানো ব্যতীত বন্ধকচুক্তি আবশ্যক হয় না। বস্তুত বন্ধক হলো একটি জায়েয বিষয়, (অপরিহার্য কোনো বিষয় নয়।) তাই বন্ধকদাতা হস্তগতকরণের পূর্বে বন্ধকচুক্তি থেকে সরে আসা জায়েয। কজা ব্যতীত আবশ্যক না হওয়ার দলিল হচ্ছে আল্লাহ তাআলার ইরশাদ: 'হস্তান্তরকৃত বন্ধক।' সুতরাং যদি কজা বা হস্তগতকরণ ব্যতীত বন্ধক আবশ্যক হয়ে যায় তাহলে আয়াতে 'মাকবুদাহ' বলে শর্তযুক্ত করার কোনো অর্থ থাকে না।

মালেকী ফকীহগণ বলেন: কেবলমাত্র আকদ বা চুক্তির দ্বারাই এটি আবশ্যক হয়ে যায়। এরপর বন্ধকদাতাকে বন্ধকগ্রহীতার নিকট বন্ধকী-জিনিস অর্পণ করতে বাধ্য করা হবে। কেননা এটা এমন চুক্তি যা কজা করা ছাড়াই আবশ্যক হয়ে যায়। সুতরাং বেচাকেনার মতো হস্তগত করার পূর্বেই বন্ধকী চুক্তি আবশ্যক হয়ে যাবে।

টিকাঃ
৩১. সূরা বাকারা, আয়াত- ২৮৩
৩২. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৫৫ নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৫৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৬৪; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩০৮
৩৩. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৬৪
৩৪. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২৪৫; হাশিয়াতুল বুনানী আলা শারহিয যুরক্বানী, খ. ৫, পৃ. ২৩৩

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 সম্পদটি যার কজায় তার কাছেই বন্ধক দেওয়া

📄 সম্পদটি যার কজায় তার কাছেই বন্ধক দেওয়া


যদি বন্ধকী জিনিস বন্ধকগ্রহীতার হাতে ধার বা আমানত অথবা ছিনতাইকৃতরূপে থাকে এবং বন্ধকদাতা সেটাকে তার কাছেই বন্ধক রাখে, তাহলে ফকীহ সমাজের সর্বসম্মতিক্রমে ঐ বন্ধক রাখা সহীহ হবে। যেহেতু সেটি বন্ধকদাতার সম্পদ তাই সেটি সে যেমন নিতে পারে, বন্ধকও রাখতে পারবে, যার কাছেই হোক। এসকল ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কোনো বিষয় ব্যতীত কেবল চুক্তির দ্বারাই বন্ধক আবশ্যক হয়ে যাবে। হানাফী ও হাম্বলী ফকীহগণ এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

শাফেয়ীগণ বলেন: এখানে হস্তগত করিয়ে দেওয়া বা হস্তগত করার অনুমতি দেওয়া শর্ত—যদি বন্ধকী জিনিস উপস্থিত থাকে। আর যদি বন্ধকী-জিনিস চুক্তির মজলিসে উপস্থিত না থাকে তাহলে হস্তগত করার অনুমতি প্রদানের সাথে সাথে এতটুকু পরিমাণ সময় অতিবাহিত হওয়াও শর্ত—যেসময়ে তা হস্তগত করা সম্ভব।

সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের অভিমত অনুসারে নতুন করে কব্জা বা হস্তগত করার প্রয়োজন না থাকায় যদি তা কোনো কারণে নষ্ট হয়ে যায় তাহলে বন্ধক রাখার কারণে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি রহিত হয়ে যাবে। শাফেয়ীগণ বলেন: ছিনতাইকারী বন্ধকগ্রহীতা বা ধারগ্রহণকারী যেই হোক, সে ক্ষতিপূরণ দেওয়া থেকে মুক্ত হবে না। যদিও বন্ধকচুক্তি আবশ্যক হয়ে যায়।

টিকাঃ
৩৫. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৭০; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৩৬; হাশিয়াতুত তাহতাভী, খ. ৪, পৃ. ২৩৫; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৫৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৫০
৩৬. প্রাগুক্ত।
৩৭. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৫৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৫৫
৩৮. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৭১; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৩৬; হাশিয়াতুত তাহতাভী, খ. ৪, পৃ. ২৩৫
৩৯. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৫৫; রওযাতুত তালিবীন, খ. ৪, পৃ. ৬৮; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৫৬

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 বন্ধকীবস্তুতে আধিক্য ও তার বৃদ্ধি

📄 বন্ধকীবস্তুতে আধিক্য ও তার বৃদ্ধি


এ কথায় ফকীহ সমাজে কোনো মতবিরোধ নেই যে, বন্ধকীবস্তুর সত্তাগত বৃদ্ধি—যেমন গাছ মোটা হওয়া বা বড় হওয়া ইত্যাদি—তার মূলের অনুগামী হবে। তবে বন্ধকীবস্তুর বৃদ্ধি অসত্তাগত হলে তার বিধানে ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন:

শাফেয়ীদের অভিমত হলো: যে বৃদ্ধি বা আধিক্য তার সকল প্রকার সহ আলাদাভাবে হয় তাতে বন্ধক চলবে না। হানাফীগণ বলেন: বন্ধকীবস্তুর বৃদ্ধি যেমন—সন্তান, ফল, দুধ, পশম ইত্যাদি তার মূল বস্তুর সাথে বন্ধক থাকবে। তবে যা উপকারের বিনিময় হয় তা ব্যতীত, যেমন—ভাড়া, পারিশ্রমিক, সাদাকা, হিবা। মালেকীগণ বলেন: যে বন্ধকী জিনিস থেকে বংশবৃদ্ধি হয় কিংবা তার ফল বের হয়, যেমন সন্তান—তাতে বন্ধক চলবে। আর এর বাইরে যা অতিরিক্ত, তাতে বন্ধক চলবে না। হাম্বলীগণের অভিমত হলো, নির্দিষ্ট বন্ধকী জিনিসে পৃথকভাবে যা অতিরিক্ত হবে তা মূল জিনিসের মতোই বন্ধক বলে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে বংশ বিস্তার ও প্রজনন যেমন সন্তান ও শাবক এবং অন্য জিনিসের মাঝে যেমন: পারিশ্রমিক, ফলফলাদি, দুধ, পশম ইত্যাদিতে কোনো পার্থক্য নেই।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 বন্ধকীবস্তু দ্বারা উপকার গ্রহণ করা

📄 বন্ধকীবস্তু দ্বারা উপকার গ্রহণ করা


বন্ধকীবস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া বৈধ হওয়ার বিষয়ে এবং এটি কার জন্য বৈধ হবে তা নিয়ে ফকীহ সমাজ মতবিরোধ করেছেন। হানাফী ফকীহদের অভিমত হলো, বন্ধকদাতা ও বন্ধকগ্রহীতা কারো জন্যই কোনো ভাবে অপরের অনুমতি ব্যতীত বন্ধকীবস্তু যথা: ঘর-বাড়ি, বাহন বা অন্যকিছু দ্বারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ নেই।

মালেকীগণ বলেন: বন্ধকী জিনিসের শস্য বন্ধকদাতার, তা উপার্জনে বন্ধকগ্রহীতা তার স্থলাভিষিক্ত হবে। আর কয়েকটি শর্তে বন্ধকগ্রহীতার বন্ধকীবস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া জায়েয আছে। ক. মূল চুক্তিতেই উপকার ভোগ করার শর্তারোপ করতে হবে। খ. সময় বা মেয়াদ নির্দিষ্ট থাকতে হবে। গ. যার বিপরীতে বন্ধক রাখা হবে তা কোনো ঋণ হবে না।

হাম্বলীগণ বলেন: বন্ধকীবস্তু যদি বাহন বা দুগ্ধদানকারী প্রাণী ব্যতীত অন্য কিছু হয় তাহলে বন্ধকদাতা বা বন্ধকগ্রহীতা কারো জন্য একে অপরের অনুমতি ব্যতীত তা দ্বারা উপকৃত হওয়া জায়েয নেই। বন্ধক রাখা প্রাণী বাহন বা দুগ্ধদানকারী হলে বন্ধকগ্রহীতা সেগুলোতে বন্ধকদাতার কাছে খরচ করার বা উপকার ভোগ করার অনুমতি চাওয়া ব্যতীতই নিজের টাকা ব্যয় করে সে খরচ অনুপাতে ইনসাফের ভিত্তিতে সেগুলোতে আরোহণ করতে এবং দুধ দোহন করতে পারবে। শাফেয়ীগণ বলেন: বন্ধকী জিনিসে গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা ছাড়া বন্ধকগ্রহীতার কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ বা উপকৃত হওয়ার অধিকার নেই।

টিকাঃ
৪০. হাশিয়াতুত-তাহতাভী, খ. ৪, পৃ. ২৩৬; ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩১০
৪১. বুলগাতুস সালিক আলাশ-শারহিস সাগীর, খ. ২, পৃ. ১১২; হাশিয়াতু দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৪৬; আল-ক্বাওয়ানীনুল ফিকহিয়‍্যা, পৃ. ৩১৯
৪২. ইমাম বুখারী রহ হযরত আবু হুরায়রা রা. এর বর্ণনায় বুখারী শরীফে এটি উদ্ধৃত করেছেন। [ফাতহুল বারী, খ. ৫, পৃ. ১৪৩ আস-সালফিয়‍্যা প্রকাশনী)।
৪৩. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৪২৬-৪৩২
৪৪. ইমাম বায়হাকী হযরত আবু হুরায়রা রা.-এর বর্ণনায় সুনানে বায়হাকীতে এই হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন।
৪৫. রওজাতুত তালিবীন, খ. ৪, পৃ. ৭৯-৯৯; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৬১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00