📄 বন্ধকের জন্য ধারকৃত বস্তু বন্ধক রাখা সহীহ হওয়ার শর্তাবলি
বন্ধক রাখার জন্য ধারের চুক্তিতে ঋণের পরিমাণ, তার প্রকার, তার গুণাগুণ, তা পরিশোধের সময়, যার কাছে বন্ধক রাখা হবে সেই ব্যক্তি এবং বন্ধকের সময়ের কথা উল্লেখ করতে হবে। কেননা এসব অজ্ঞাত থাকলে বিভিন্ন বিপদ ও ঝুঁকি দেখা দিতে পারে; তাই এগুলো উল্লেখ করা প্রয়োজন। এটি শাফেয়ীদের অভিমত এবং হাম্বলীদের একটি মত।
হানাফী ও হাম্বলীগণ বলেন—যা মালেকীদের বক্তব্যের চাহিদা—পূর্বোক্ত বিষয়ের কোনোটিই চুক্তিতে উল্লেখ করা আবশ্যক নয়। যদি সে সাধারণভাবে চুক্তি করে এবং কোনো শর্ত না করে তাহলেও চুক্তি সহীহ হবে। বন্ধকদাতার জন্য সুযোগ আছে, সে যা ইচ্ছা তাই বন্ধক রাখতে পারবে। কেননা শর্তমুক্ত হওয়ার বিষয়টি এখানে অবশ্যই ধর্তব্য হবে, বিশেষ করে ধারের ক্ষেত্রে। কেননা এ ব্যাপারে অজ্ঞতা ঝগড়া-বিবাদের দিকে ঠেলে দেয় না। যেহেতু এর ভিত্তি হলো উদারতার ওপর। আর মালিক কখনো কখনো ধারগ্রহণকারীর ঋণের বিষয়টি মালিকের নিজের সম্পদের সাথে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে রাজি থাকে।
এখানে যেগুলো উল্লেখ করা হলো এগুলোর কোনোটি যদি ধারপ্রদানকারী শর্ত হিসাবে উল্লেখ করে, ধারগ্রহণকারী তার বিরোধিতা করে, তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে বন্ধক সহীহ হবে না। এর কারণ তাকে এই বন্ধকের অনুমতি প্রদান করা হয়নি। কিন্তু যদি এর চেয়ে ভালো কোনো বিষয়ে ধারগ্রহণকারী বিরোধিতা করে তাহলে তা বন্ধক রাখা বৈধ হবে। যেমন তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণের অনুমতি দেওয়ার পর সে এর চেয়ে কম পরিমাণ বন্ধক রাখল, তাহলে তা সহীহ হবে।
টিকাঃ
২৬. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৪৫; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২৬৫
২৭. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৮০; ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩৩০; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১১১
২৮. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৮০; ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩৩০; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১১১
📄 ধারকৃত বস্তুর জামানত
বন্ধকের জন্য ধারকৃত বস্তুর জামানত এবং কে এর জামানত দেবে, সে বিষয়ে ফকীহবৃন্দ মতবিরোধ করেছেন। শাফেয়ী ও হাম্বলীগণের অভিমত হলো, যা মালেকীদের কথারও সারমর্ম: বন্ধকের জন্য ধারকৃত বস্তুর ক্ষেত্রে আসল হলো জামানত (যা আমানতের বিপরীত)। এরপর শাফেয়ীগণ বলেছেন, যদি বন্ধক হিসাবে দেওয়ার পূর্বেই ধারগ্রহণকারী ব্যক্তির হাতে তা বিনষ্ট হয়ে যায় তবে সে-ই এর ক্ষতিপূরণ দেবে। কেননা সে হলো ধারগ্রহণকারী। আর ধার হলো ক্ষতিপূরণযোগ্য বিষয়। আর যদি তা বন্ধকগ্রহীতা হস্তগত করার পর কোনোরূপ স্বেচ্ছাচারিতা বা বাড়াবাড়ি ছাড়াই বিনষ্ট হয়ে যায় তাহলে তাদের কাউকেই জামানত দিতে হবে না।
হানাফীগণ বলেন: বন্ধক রাখার জন্য ধারগ্রহণকারীর কব্জা ও নিয়ন্ত্রণ হলো আমানতের কব্জা ও নিয়ন্ত্রণ। সুতরাং বন্ধকের জন্য ধারকৃত বস্তুটি যদি বন্ধক দেওয়ার পর বা বন্ধক ছুটানোর পর বিনষ্ট হয়ে যায় তাহলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। যদিও সে এটা পূর্ব থেকেই ব্যবহার করে এবং বন্ধকী জন্তুতে আরোহণ করে থাকে। কেননা সে হলো এমন আমানতদার যে আমানতের বিপরীত করেছে, এরপর আবার পথে ফিরে এসেছে। আর বন্ধকগ্রহীতার কব্জা ও কর্তৃত্ব হলো জামানতের কর্তৃত্ব। সুতরাং যখন তার হাতে বন্ধক হিসাবে গৃহীত বস্তুটি বিনষ্ট হয়ে যাবে তখন তার পাওনা পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। আর ধারগ্রহণকারীর উপর ধারদাতার জন্য ঋণের অনুরূপ দেওয়া আবশ্যক হয়ে যাবে।
টিকাঃ
২৯. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৪৫; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ২৪৯; হাশিয়া দুসুক্বী, খ. ৩, পৃ. ২৩৯ ও জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭৯
৩০. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩৩১; হাশিয়া তাহতাভী, খ. ৪, পৃ. ২৫০
📄 বন্ধকের আবশ্যকতা
বন্ধক আবশ্যক হওয়া নিয়ে ফকীহগণ মতানৈক্য করেছেন: হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের অভিমত হলো, হস্তগত করা বা করানো ব্যতীত বন্ধকচুক্তি আবশ্যক হয় না। বস্তুত বন্ধক হলো একটি জায়েয বিষয়, (অপরিহার্য কোনো বিষয় নয়।) তাই বন্ধকদাতা হস্তগতকরণের পূর্বে বন্ধকচুক্তি থেকে সরে আসা জায়েয। কজা ব্যতীত আবশ্যক না হওয়ার দলিল হচ্ছে আল্লাহ তাআলার ইরশাদ: 'হস্তান্তরকৃত বন্ধক।' সুতরাং যদি কজা বা হস্তগতকরণ ব্যতীত বন্ধক আবশ্যক হয়ে যায় তাহলে আয়াতে 'মাকবুদাহ' বলে শর্তযুক্ত করার কোনো অর্থ থাকে না।
মালেকী ফকীহগণ বলেন: কেবলমাত্র আকদ বা চুক্তির দ্বারাই এটি আবশ্যক হয়ে যায়। এরপর বন্ধকদাতাকে বন্ধকগ্রহীতার নিকট বন্ধকী-জিনিস অর্পণ করতে বাধ্য করা হবে। কেননা এটা এমন চুক্তি যা কজা করা ছাড়াই আবশ্যক হয়ে যায়। সুতরাং বেচাকেনার মতো হস্তগত করার পূর্বেই বন্ধকী চুক্তি আবশ্যক হয়ে যাবে।
টিকাঃ
৩১. সূরা বাকারা, আয়াত- ২৮৩
৩২. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৫৫ নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৫৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৬৪; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩০৮
৩৩. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৬৪
৩৪. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২৪৫; হাশিয়াতুল বুনানী আলা শারহিয যুরক্বানী, খ. ৫, পৃ. ২৩৩
📄 সম্পদটি যার কজায় তার কাছেই বন্ধক দেওয়া
যদি বন্ধকী জিনিস বন্ধকগ্রহীতার হাতে ধার বা আমানত অথবা ছিনতাইকৃতরূপে থাকে এবং বন্ধকদাতা সেটাকে তার কাছেই বন্ধক রাখে, তাহলে ফকীহ সমাজের সর্বসম্মতিক্রমে ঐ বন্ধক রাখা সহীহ হবে। যেহেতু সেটি বন্ধকদাতার সম্পদ তাই সেটি সে যেমন নিতে পারে, বন্ধকও রাখতে পারবে, যার কাছেই হোক। এসকল ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কোনো বিষয় ব্যতীত কেবল চুক্তির দ্বারাই বন্ধক আবশ্যক হয়ে যাবে। হানাফী ও হাম্বলী ফকীহগণ এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
শাফেয়ীগণ বলেন: এখানে হস্তগত করিয়ে দেওয়া বা হস্তগত করার অনুমতি দেওয়া শর্ত—যদি বন্ধকী জিনিস উপস্থিত থাকে। আর যদি বন্ধকী-জিনিস চুক্তির মজলিসে উপস্থিত না থাকে তাহলে হস্তগত করার অনুমতি প্রদানের সাথে সাথে এতটুকু পরিমাণ সময় অতিবাহিত হওয়াও শর্ত—যেসময়ে তা হস্তগত করা সম্ভব।
সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের অভিমত অনুসারে নতুন করে কব্জা বা হস্তগত করার প্রয়োজন না থাকায় যদি তা কোনো কারণে নষ্ট হয়ে যায় তাহলে বন্ধক রাখার কারণে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি রহিত হয়ে যাবে। শাফেয়ীগণ বলেন: ছিনতাইকারী বন্ধকগ্রহীতা বা ধারগ্রহণকারী যেই হোক, সে ক্ষতিপূরণ দেওয়া থেকে মুক্ত হবে না। যদিও বন্ধকচুক্তি আবশ্যক হয়ে যায়।
টিকাঃ
৩৫. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৭০; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৩৬; হাশিয়াতুত তাহতাভী, খ. ৪, পৃ. ২৩৫; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৫৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৫০
৩৬. প্রাগুক্ত।
৩৭. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৫৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৫৫
৩৮. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৭১; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৩৬; হাশিয়াতুত তাহতাভী, খ. ৪, পৃ. ২৩৫
৩৯. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৫৫; রওযাতুত তালিবীন, খ. ৪, পৃ. ৬৮; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৫৬