📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 খ. বেহুঁশ হওয়া (الْإِغْمَاءُ)

📄 খ. বেহুঁশ হওয়া (الْإِغْمَاءُ)


শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, মুদারাবা বাতিল হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে দুপক্ষের কোনো একজন বেহুঁশ হয়ে যাওয়া। তারা বলেন, যেমন পাগল ও অপ্রকৃতিস্থ হলে দুপক্ষের যে-ই হোক, মুদারাবা বাতিল হয় এবং দুপক্ষের কোনো একজন মারা গেলে তা বাতিল হয়, তেমনি কেউ বেহুঁশ হলেও মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে।

টিকাঃ
১৮৫. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 গ. কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া (الْحَجْرُ)

📄 গ. কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া (الْحَجْرُ)


হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, পুঁজিদাতা ও কর্মী এ দুজনের কোনো একজনের কার্যক্রমে বিচারক কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা জারি হলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। হাম্বলী আলেমগণ এক্ষেত্রে আরো বলেন, দুজনের কোনো একজনের যদি মনে সন্দেহ জাগে, মুদারাবাতে লেনদেন সুন্দর পরিপাটিভাবে হচ্ছে না, তাহলেও মুদারাবা বাতিল ও রহিত হয়ে যাবে।

টিকাঃ
১৮৬. আদ দুররুল মুখতার, খ. ৪, পৃ. ৪৮৯; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫২২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 তিন. মুদারাবা চুক্তি রহিত করা (فَسْخُ الْمُضَارَبَةِ)

📄 তিন. মুদারাবা চুক্তি রহিত করা (فَسْخُ الْمُضَارَبَةِ)


মালিক ও কর্মী উভয়ের ইচ্ছায় অথবা দুজনের কোনো একজনের একক ইচ্ছায় মুদারাবা বাতিল হতে পারে। বাতিল করার জন্যে আগ্রহী দুজন বা একজন বলবে, فَسَحْتُ الْمُضَارَبَةَ أَوْ رَفَعْتُهَا أَوْ أَبْطَلْتُهَا অর্থাৎ আমি মুদারাবা রহিত করলাম, উঠিয়ে দিলাম। অথবা মালিক আগ্রহী হলে কর্মীকে বলবে, لَا تَتَصَرَّفْ بَعْدَ هَذَا অর্থাৎ এরপর পুঁজি দিয়ে আর বেচাকেনা করো না বা এ জাতীয় বাক্য যা বাতিল করা বুঝাবে। কখনো কাজের মাধ্যমেও তা সাব্যস্ত হতে পারে। যেমন, পুঁজির মালিক প্রদত্ত পুঁজির সবটুকু ফেরত নিয়ে নেওয়া।

মুদারাবা চুক্তি হচ্ছে সে সব চুক্তি ও লেনদেনের অন্তর্ভুক্ত যেগুলো স্বেচ্ছাকৃত; আবশ্যিক নয়। তাই পুঁজিদাতা ও কর্মী এ দুজনের যে কেউ একক ইচ্ছাতে যখন ইচ্ছা তা বাতিল করে দিতে পারে। এটুকু কথাতে সকল ফকীহ একমত, তাদের মতপার্থক্য যা হয়েছে তা হলো:

শাফেয়ী ও হাম্বলী আলেমগণ বলেন, দুপক্ষের যে কেউ মুদারাবা বাতিল করতে পারে যখন ইচ্ছা; অন্যের তা অবগত হওয়া বা পুঁজি সে সময় নগদ অর্থ আকারে থাকা শর্ত নয়। হানাফী আলেমগণ বলেন, দুপক্ষের যে কেউ যখন ইচ্ছা মুদারাবা বাতিল করতে পারবে। তবে তাতে শর্ত হলো, অপর পক্ষের সে সম্পর্কে জানা থাকতে হবে এবং পুঁজি নগদ অর্থ আকারে থাকতে হবে। মালেকী আলেমগণ বলেন, পুঁজি দিয়ে পণ্য কেনার পূর্বপর্যন্ত তাদের দুজনের তা বাতিল করার সুযোগ রয়েছে, এরপর নয়। প্রতিটি মাযহাবে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

মালেকীগণ বলেন, কর্মী কাজ শুরু করার পূর্বে যদি পুঁজিদাতা তার পুঁজি দিয়ে কিছু করতে কর্মীকে নিষেধ করে মুদারাবা চুক্তি তাহলে বাতিল হয়ে যাবে এবং প্রদত্ত পুঁজি নিছক আমানততুল্য হয়ে যাবে। কর্মী যদি তারপরও সে অর্থ দিয়ে ব্যবসা করে তাহলে লাভও তার একার হবে, লোকসান হলেও তা তার। এ অবস্থায় পুঁজির মালিক কেবল পুঁজিটুকু ফেরত পাবে।

হানাফী আলেমগণ বলেন, পুঁজির মালিক যদি তার কর্মীকে যাবতীয় লেনদেন করা থেকে বিরত থাকতে বলে তখন, যখন তার পুঁজি দিয়ে পণ্য কেনা হয়ে গেছে, তাহলে তার এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না; তাই তার নিষেধাজ্ঞার দরুন কর্মী অপসারিতও হবে না। বরং কর্মী যথারীতি সে পণ্য কেনাবেচা করতে পারবে। লাভ অর্জনের উদ্দেশ্যে সে সব পণ্য দিরহাম দীনারে/নগদ অর্থে বিক্রি করা তার জন্যে আবশ্যক। এ পরিস্থিতিতে তাকে নিষেধ করা এবং মুদারাবা বাতিল করে দেওয়া হলে কর্মীর পুঁজি নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করে তার অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা হবে। তবে যদি লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা এবং মুদারাবা চুক্তি বাতিল করার সময় পুঁজি দিরহাম দীনারের আকারেই থাকে, তাহলে এ নিষেধাজ্ঞা ও রহিতকরণ যথাযথ ও সহীহ হবে। তবে ইসতিহসান বা সূক্ষ্ম যুক্তি হচ্ছে, সকল মুদ্রা এক ধরনের হওয়া। তাই সবগুলো দিরহাম দীনারে বা সবগুলো দীনার দিরহামে বদলানো হবে। উভয়টি মুদ্রার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ বদলানো বিক্রি বলে অভিহিত হবে না।

শাফেয়ী আলেমগণ বলেন, মুদারাবা বাতিল করার পরও কর্মী তার হাতে থাকা পণ্য বিক্রি করতে পারবে যদি সে তাতে লাভের আশা করতে পারে, যেমন সে কোনো বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পেল অথবা কোনো আগ্রহী ক্রেতা পেল। তবে মুদারাবা রহিত করার পর কর্মী নতুনভাবে কিছু কিনবে না। যেহেতু চুক্তিও বহাল নেই, তাই নতুন যা কেনা হবে তাতে তার লাভের অংশও থাকবে না।

পুঁজিদাতা ও কর্মী উভয়ে মুদারাবা বাতিল করুক বা দুজনের কোনো একজন অথবা চুক্তি কোনো কারণে বাতিল হয়ে যাক, বাতিল হওয়ার সময় মুদারাবার পণ্যে ক্রেতাদের নিকট যে ঋণ থাকবে তা আদায় করতে হবে, এটি কর্মীর দায়িত্ব। যেহেতু ঋণ হচ্ছে পুঁজির এক অংশ, অপরদিকে মালিকের নিকট থেকে কর্মী পূর্ণ পুঁজিটিই তার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। তাই কর্মীর জন্যে দায়িত্ব হচ্ছে সে যেভাবে পুঁজি গ্রহণ করেছিল সেভাবেই তা পুঁজিদাতার নিকট ফিরিয়ে দেওয়া। পণ্যে লাভ হওয়া বা না হওয়া এক্ষেত্রে লক্ষ করা হবে না। যদি কর্মী অপর কাউকে জিম্মাদার বানানোতে মালিক সম্মত থাকে তবে তা জায়েয হবে।

যদি মুদারাবা বাতিল করার সময় পুঁজির পুরোটা বা এক অংশ পণ্য আকারে থাকে, মালিক পুঁজি ফেরত নিতে চায় নগদ অর্থ আকারে, তাহলে কর্মী সে পণ্যগুলো বিক্রি করে পুঁজি প্রদান করবে, পণ্য বিক্রয়ে লাভ হবে কিনা, তা আর তখন সে লক্ষ করবে না।

হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যখন মুদারাবা বাতিল হয় তখন পুঁজি যদি নগদ মুদ্রা আকারে থাকে, তাতে তখনো কোনো লাভ হয়নি, তবু সে অবস্থাতেই পুঁজিদাতাকে তা ফিরিয়ে দেওয়া হবে, মালিক তা লাভবিহীন ভাবেই গ্রহণ করবে। যদি ইতোমধ্যে কিছু লাভ হয়ে থাকে তাহলে তারা লাভ বণ্টনের যে শর্ত করেছিল সে শর্ত অনুযায়ীই ভাগ করে নেবে। যদি মুদারাবা বাতিল হওয়ার সময় পুঁজি পণ্য আকারে থাকে তাহলে তারা দুজন যে কথায় একমত হবে তা-ই করা হবে। হয়তো বিক্রি করে তা থেকে পুঁজি ফেরত দেওয়া হবে অথবা মূল্য হিসাব করে পণ্য দিয়ে পুঁজি ফেরত দেওয়া হবে। এ উভয় ক্ষেত্রে লাভ হলে তা শর্ত মতো বণ্টিত হবে। যেহেতু এ সম্পদে কেবল তাদের দুজনের অধিকার, তাই তারাই ফয়সালা করবে পুঁজি ফেরতে কোন পন্থা তারা গ্রহণ করবে।

যদি কর্মী পণ্য বিক্রি করতে চায়, মালিক তাতে অমত করে তাহলে তাতে লাভ হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্য হলে পুঁজির মালিককে পণ্য বিক্রয়ের মত ব্যক্ত করতে বাধ্য করা হবে। কেননা, অর্জিত লাভে কর্মীর অধিকার থাকে, পুঁজিতে তার কোনো অধিকার থাকে না। পণ্য বিক্রি না করা পর্যন্ত কর্মীর হাতে লাভ আসে না, তার অধিকারও প্রকাশিত হয় না। যদি লাভ হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্য না হয়, তাহলে পুঁজির মালিক বিক্রিতে আপত্তি করলে তাকে বাধ্য করা হবে না।

যদি মুদারাবা বাতিল হওয়ার সময় পণ্য থাকে পাওনা, তাহলে তা তাগাদা দিয়ে হস্তগত করা কর্মীর দায়িত্ব। এক্ষেত্রে এ পণ্যে লাভ হচ্ছে কিনা তা লক্ষ করা হবে না।

টিকাঃ
১৮৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১০৯; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৭০৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৫৮
১৮৮. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৭৯৭
১৮৯. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১০৯-১১২; হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৮৯
১৯০. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯-৩২০
১৯১. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৬৮-৬৫

মালিক ও কর্মী উভয়ের ইচ্ছায় অথবা দুজনের কোনো একজনের একক ইচ্ছায় মুদারাবা বাতিল হতে পারে। বাতিল করার জন্যে আগ্রহী দুজন বা একজন বলবে, فَسَحْتُ الْمُضَارَبَةَ أَوْ رَفَعْتُهَا أَوْ أَبْطَلْتُهَا অর্থাৎ আমি মুদারাবা রহিত করলাম, উঠিয়ে দিলাম। অথবা মালিক আগ্রহী হলে কর্মীকে বলবে, لَا تَتَصَرَّفْ بَعْدَ هَذَا অর্থাৎ এরপর পুঁজি দিয়ে আর বেচাকেনা করো না বা এ জাতীয় বাক্য যা বাতিল করা বুঝাবে। কখনো কাজের মাধ্যমেও তা সাব্যস্ত হতে পারে। যেমন, পুঁজির মালিক প্রদত্ত পুঁজির সবটুকু ফেরত নিয়ে নেওয়া।

মুদারাবা চুক্তি হচ্ছে সে সব চুক্তি ও লেনদেনের অন্তর্ভুক্ত যেগুলো স্বেচ্ছাকৃত; আবশ্যিক নয়। তাই পুঁজিদাতা ও কর্মী এ দুজনের যে কেউ একক ইচ্ছাতে যখন ইচ্ছা তা বাতিল করে দিতে পারে। এটুকু কথাতে সকল ফকীহ একমত, তাদের মতপার্থক্য যা হয়েছে তা হলো:

শাফেয়ী ও হাম্বলী আলেমগণ বলেন, দুপক্ষের যে কেউ মুদারাবা বাতিল করতে পারে যখন ইচ্ছা; অন্যের তা অবগত হওয়া বা পুঁজি সে সময় নগদ অর্থ আকারে থাকা শর্ত নয়। হানাফী আলেমগণ বলেন, দুপক্ষের যে কেউ যখন ইচ্ছা মুদারাবা বাতিল করতে পারবে। তবে তাতে শর্ত হলো, অপর পক্ষের সে সম্পর্কে জানা থাকতে হবে এবং পুঁজি নগদ অর্থ আকারে থাকতে হবে। মালেকী আলেমগণ বলেন, পুঁজি দিয়ে পণ্য কেনার পূর্বপর্যন্ত তাদের দুজনের তা বাতিল করার সুযোগ রয়েছে, এরপর নয়। প্রতিটি মাযহাবে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

মালেকীগণ বলেন, কর্মী কাজ শুরু করার পূর্বে যদি পুঁজিদাতা তার পুঁজি দিয়ে কিছু করতে কর্মীকে নিষেধ করে মুদারাবা চুক্তি তাহলে বাতিল হয়ে যাবে এবং প্রদত্ত পুঁজি নিছক আমানততুল্য হয়ে যাবে। কর্মী যদি তারপরও সে অর্থ দিয়ে ব্যবসা করে তাহলে লাভও তার একার হবে, লোকসান হলেও তা তার। এ অবস্থায় পুঁজির মালিক কেবল পুঁজিটুকু ফেরত পাবে।

হানাফী আলেমগণ বলেন, পুঁজির মালিক যদি তার কর্মীকে যাবতীয় লেনদেন করা থেকে বিরত থাকতে বলে তখন, যখন তার পুঁজি দিয়ে পণ্য কেনা হয়ে গেছে, তাহলে তার এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না; তাই তার নিষেধাজ্ঞার দরুন কর্মী অপসারিতও হবে না। বরং কর্মী যথারীতি সে পণ্য কেনাবেচা করতে পারবে। লাভ অর্জনের উদ্দেশ্যে সে সব পণ্য দিরহাম দীনারে/নগদ অর্থে বিক্রি করা তার জন্যে আবশ্যক। এ পরিস্থিতিতে তাকে নিষেধ করা এবং মুদারাবা বাতিল করে দেওয়া হলে কর্মীর পুঁজি নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করে তার অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা হবে। তবে যদি লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা এবং মুদারাবা চুক্তি বাতিল করার সময় পুঁজি দিরহাম দীনারের আকারেই থাকে, তাহলে এ নিষেধাজ্ঞা ও রহিতকরণ যথাযথ ও সহীহ হবে। তবে ইসতিহসান বা সূক্ষ্ম যুক্তি হচ্ছে, সকল মুদ্রা এক ধরনের হওয়া। তাই সবগুলো দিরহাম দীনারে বা সবগুলো দীনার দিরহামে বদলানো হবে। উভয়টি মুদ্রার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ বদলানো বিক্রি বলে অভিহিত হবে না।

শাফেয়ী আলেমগণ বলেন, মুদারাবা বাতিল করার পরও কর্মী তার হাতে থাকা পণ্য বিক্রি করতে পারবে যদি সে তাতে লাভের আশা করতে পারে, যেমন সে কোনো বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পেল অথবা কোনো আগ্রহী ক্রেতা পেল। তবে মুদারাবা রহিত করার পর কর্মী নতুনভাবে কিছু কিনবে না। যেহেতু চুক্তিও বহাল নেই, তাই নতুন যা কেনা হবে তাতে তার লাভের অংশও থাকবে না।

পুঁজিদাতা ও কর্মী উভয়ে মুদারাবা বাতিল করুক বা দুজনের কোনো একজন অথবা চুক্তি কোনো কারণে বাতিল হয়ে যাক, বাতিল হওয়ার সময় মুদারাবার পণ্যে ক্রেতাদের নিকট যে ঋণ থাকবে তা আদায় করতে হবে, এটি কর্মীর দায়িত্ব। যেহেতু ঋণ হচ্ছে পুঁজির এক অংশ, অপরদিকে মালিকের নিকট থেকে কর্মী পূর্ণ পুঁজিটিই তার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। তাই কর্মীর জন্যে দায়িত্ব হচ্ছে সে যেভাবে পুঁজি গ্রহণ করেছিল সেভাবেই তা পুঁজিদাতার নিকট ফিরিয়ে দেওয়া। পণ্যে লাভ হওয়া বা না হওয়া এক্ষেত্রে লক্ষ করা হবে না। যদি কর্মী অপর কাউকে জিম্মাদার বানানোতে মালিক সম্মত থাকে তবে তা জায়েয হবে।

যদি মুদারাবা বাতিল করার সময় পুঁজির পুরোটা বা এক অংশ পণ্য আকারে থাকে, মালিক পুঁজি ফেরত নিতে চায় নগদ অর্থ আকারে, তাহলে কর্মী সে পণ্যগুলো বিক্রি করে পুঁজি প্রদান করবে, পণ্য বিক্রয়ে লাভ হবে কিনা, তা আর তখন সে লক্ষ করবে না।

হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যখন মুদারাবা বাতিল হয় তখন পুঁজি যদি নগদ মুদ্রা আকারে থাকে, তাতে তখনো কোনো লাভ হয়নি, তবু সে অবস্থাতেই পুঁজিদাতাকে তা ফিরিয়ে দেওয়া হবে, মালিক তা লাভবিহীন ভাবেই গ্রহণ করবে। যদি ইতোমধ্যে কিছু লাভ হয়ে থাকে তাহলে তারা লাভ বণ্টনের যে শর্ত করেছিল সে শর্ত অনুযায়ীই ভাগ করে নেবে। যদি মুদারাবা বাতিল হওয়ার সময় পুঁজি পণ্য আকারে থাকে তাহলে তারা দুজন যে কথায় একমত হবে তা-ই করা হবে। হয়তো বিক্রি করে তা থেকে পুঁজি ফেরত দেওয়া হবে অথবা মূল্য হিসাব করে পণ্য দিয়ে পুঁজি ফেরত দেওয়া হবে। এ উভয় ক্ষেত্রে লাভ হলে তা শর্ত মতো বণ্টিত হবে। যেহেতু এ সম্পদে কেবল তাদের দুজনের অধিকার, তাই তারাই ফয়সালা করবে পুঁজি ফেরতে কোন পন্থা তারা গ্রহণ করবে।

যদি কর্মী পণ্য বিক্রি করতে চায়, মালিক তাতে অমত করে তাহলে তাতে লাভ হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্য হলে পুঁজির মালিককে পণ্য বিক্রয়ের মত ব্যক্ত করতে বাধ্য করা হবে। কেননা, অর্জিত লাভে কর্মীর অধিকার থাকে, পুঁজিতে তার কোনো অধিকার থাকে না। পণ্য বিক্রি না করা পর্যন্ত কর্মীর হাতে লাভ আসে না, তার অধিকারও প্রকাশিত হয় না। যদি লাভ হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্য না হয়, তাহলে পুঁজির মালিক বিক্রিতে আপত্তি করলে তাকে বাধ্য করা হবে না।

যদি মুদারাবা বাতিল হওয়ার সময় পণ্য থাকে পাওনা, তাহলে তা তাগাদা দিয়ে হস্তগত করা কর্মীর দায়িত্ব। এক্ষেত্রে এ পণ্যে লাভ হচ্ছে কিনা তা লক্ষ করা হবে না।

টিকাঃ
১৮৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১০৯; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৭০৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৫৮
১৮৮. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৭৯৭
১৮৯. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১০৯-১১২; হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৮৯
১৯০. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯-৩২০
১৯১. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৬৮-৬৫

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 চার. মুদারাবার পুঁজি ধ্বংস হওয়া (تَلَفُ رَأْسِ مَالِ الْمُضَارَبَةِ)

📄 চার. মুদারাবার পুঁজি ধ্বংস হওয়া (تَلَفُ رَأْسِ مَالِ الْمُضَارَبَةِ)


ফকীহদের সম্মিলিত মত হচ্ছে, মুদারাবার পুঁজি কর্মী বুঝে পাওয়ার পর কোনো কিছু কেনাকাটার মাধ্যমে তাতে কিছু নাড়া দেওয়ার পূর্বেই যদি সে পুঁজি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। কেননা যে অর্থকড়ি মুদারাবার জন্যে নির্ধারিত ছিল, যে অর্থের সাথে এ চুক্তি সম্পর্কিত ছিল তা ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা বলেন, যদি পুঁজি সবটা ধ্বংস হয়ে যায়, মুদারাবা বাতিল হয়। কিন্তু যদি এক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে অবশিষ্ট পুঁজিতে মুদারাবা বহাল থাকে, যেটুকু বিলুপ্ত হয়েছে সেটুকু মুদারাবার হিসাব থেকে বাদ পড়ে যায়।

তারা বলেন, মুদারাবার উদ্দেশ্যে কেনাবেচার কাজে পুরোপুরি মগ্ন হওয়ার পর পুঁজি বিনাশ হলে সে মুদারাবা বাতিল ও রহিত হয়ে যায়। এটুকু কথায় সকল ফকীহ একমত। এক্ষেত্রেও যদি বেচাকেনা শুরু করার পর পুঁজির এক অংশ বিনাশ হয়ে যায় তবে সে অংশে মুদারাবা বাতিল হয়ে যায়। অবশিষ্ট অংশই তখন পুঁজি হিসাবে ধার্য থাকে। এটি ফকীহদের একাংশের অভিমত। তারা বিভিন্ন অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

আল্লামা কাসানী বলেছেন, কর্মীর হাতে পুঁজি আসার পর সে তা দিয়ে কিছু পণ্য কেনার পূর্বেই যদি পুঁজিটা ধ্বংস হয়ে যায়, আমাদের মাযহাবের ইমামদের মতে, তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যায়। এর কারণ হচ্ছে, কর্মী সে অর্থ কজা করার মাধ্যমে তা মুদারাবার জন্যে নির্ধারিত হয়েছে। এখন তা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এ চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। এ মাসআলা আমানত রাখা সদৃশ। আমানতদারের হাতে থাকা অবস্থায় তা ধ্বংস হয়ে গেলে আমানত বাতিল হয়ে যায়। এমনিভাবে যদি কর্মী পুঁজি বিনাশ করে ফেলে বা তা খরচ করে অথবা কাউকে দেওয়ার পর সে তা ধ্বংস করে ফেলে, যদি যে বিনাশ করেছে তার নিকট থেকে সে পরিমাণ অর্থ সম্পদ আদায় করা হয় তবে কর্মী সে গৃহীত অর্থ দ্বারা পণ্য ক্রয় করতে এবং মুদারাবা হিসাবে ব্যবসা করতে পারবে। ইমাম আবু হানিফার পক্ষ থেকে তাঁর ছাত্র হাসান এ মতটি উদ্ধৃত করেছেন। আবু হানিফা রহ. এ সম্পর্কে বলছেন, এখানে পুঁজির পরিবর্তে পুঁজি পরিমাণ সম্পদ গ্রহণ করা হয়েছে। তাই এটিই এখন পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তাই তা দ্বারা মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা করা যাবে।

ইমাম মুহাম্মদের পক্ষ থেকে ইবনে রুস্তম বর্ণনা করেন, কর্মী যদি পুঁজির টাকা কাউকে কর্জ হিসাবে প্রদান করে, সে যদি হুবহু সে মুদ্রাগুলোই ফেরত দেয় তাহলে মুদারাবা হিসাবে তা ফেরত আসবে। এর কারণ, যদি সে সীমালঙ্ঘন করত তাহলে তার সে মুদ্রাগুলোর সমপরিমাণ জরিমানা দিতে হতো। কিন্তু ঋণগ্রহীতা সীমালঙ্ঘন করেনি, তাই তার জরিমানাও দিতে হবে না। কিন্তু যদি হুবহু সে মুদ্রাগুলো নয়, বরং তার সমপরিমাণ অর্থ সীমালঙ্ঘনকারীর নিকট থেকে আদায় করা হয় তাহলে তা মুদারাবা হিসাবে ফেরত আসবে না। যেহেতু মূল পুঁজি বিলুপ্ত করে দেওয়ায় তার পক্ষ থেকে জরিমানাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জরিমানা ও মুদারাবা উভয়ের বিধান কখনো একত্র হয় না, তাই এ সময় মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে।

উপরিউক্ত আলোচনা যখন কর্মী পুঁজি খরচ করে কিছু কেনার পূর্বেই পুঁজি বিনষ্ট ও ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু যদি কিছু কেনার পর সে পুঁজি ধ্বংস হয়, যা এভাবে হবে, কর্মীকে পুঁজি হিসাবে দেওয়া হয়েছে এক হাজার টাকা। কর্মী সে টাকার পরিমাণ পণ্য খরিদ করলেও তখনই মূল্য পরিশোধ করেনি। ইতোমধ্যে সে এক হাজার টাকা ধ্বংস হয়ে গেছে। অবস্থা এমন হলে আমাদের ইমামগণ (হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ) বলেন, পণ্যটা মুদারাবার পণ্য হিসাবেই গণ্য হবে এবং তার মূল্য পরিশোধের জন্যে কর্মী পুঁজিদাতার দ্বারস্থ হবে। তার কাছ থেকে এক হাজার টাকা নিয়ে সে পণ্য বিক্রেতাকে প্রদান করবে। যদি দ্বিতীয় এক হাজার টাকা কর্মী কজা করার পর এটিও ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে এমন আরো এক হাজার আনার জন্যে কর্মী আবারো পুঁজিমালিকের দ্বারস্থ হবে। এমনকি এমন ঘটনা তৃতীয় চতুর্থবার ঘটলেও একইভাবে মালিকের দ্বারস্থ হয়ে অর্থের ব্যবস্থা করবে। মালিক প্রথমবার যা দিয়েছে, পরে জরিমানা হিসাবে আরো যত দিয়েছে সবটাই পুঁজি বলে ধর্তব্য হবে। যেহেতু পুঁজিদাতার পুঁজিতে কর্মীর নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান। তাই তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় যা জরিমানা হবে কর্মী সেজন্যে পুঁজিদাতার দ্বারস্থই হবে, বিষয়টি প্রতিনিধির বিষয়ের ন্যায়। প্রতিনিধির হাতে টাকা ধ্বংস হয়ে গেলে প্রতিনিধি মূল ব্যক্তির দ্বারস্থ হবে এবং তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে খরচ করবে। তবে মুদারাবার কর্মী ও প্রতিনিধিতে এক স্থানে পার্থক্য রয়েছে। তা হচ্ছে, প্রতিনিধির হাতে প্রথমবার পণ্যের মূল্য ধ্বংস হয়ে গেলে সে মূল ব্যক্তির দ্বারস্থ হয়ে দ্বিতীয় হাজার টাকা পায়। কিন্তু দ্বিতীয় এক হাজারও ধ্বংস হয়ে গেলে সে আর মূল ব্যক্তির দ্বারস্থ হবে না, যেহেতু মূল ব্যক্তি তার প্রতিনিধিকে দু হাজারের অধিক দেবে না। কিন্তু মুদারাবার কর্মীর বিষয় ভিন্ন, তার নিকট তৃতীয় চতুর্থবার বরং যত বার পুঁজি ধ্বংস হোক, কর্মী মালিকের দ্বারস্থ হবে এবং প্রতিবারই মালিক তাকে সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করবে।

মালেকী আলেমগণ বলেন, যদি কর্মীর হাতে থাকা অবস্থায় মালিকের সমুদয় পুঁজি ধ্বংস ও বিনাশ হয়ে যায় তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। যদি আংশিক পুঁজি বিনষ্ট হয় তবে সে পরিমাণ সম্পদে বাতিল হবে, অবশিষ্ট সম্পদ যেটুকু হাতে আছে সেটুকুতে মুদারাবা বহাল থাকবে। তারা বলেন, যদি সম্পূর্ণ পুঁজি বা তার এক অংশ ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে পুঁজিদাতার করণীয় হচ্ছে, যে পরিমাণ ধ্বংস হয়েছে তার পরিবর্তে সে পরিমাণ আরো অর্থ সে কর্মীকে ব্যবসা করার জন্যে দেবে; যদি পুঁজিদাতা ব্যবসা করার ইচ্ছাই করে। কর্মী কাজ শুরু করার আগে দিক বা পরে, এক্ষেত্রে পুঁজিদাতার ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। কর্মীর জন্যে আবশ্যক, যদি পুঁজি ধ্বংস হওয়া কাজ শুরু করার পূর্বে না হয়ে পরে হয়, তাহলে আংশিক পুঁজি বিনাশ হলে তার সমপরিমাণ অর্থ পুঁজিদাতার নিকট থেকে সে নিয়ে নেবে। কাজ শুরু হওয়ার পূর্বে ধ্বংস হলে সমপরিমাণ অর্থ নেওয়া আবশ্যক নয়, যেহেতু এ সময় পুঁজিদাতা ও কর্মী উভয়ের মুদারাবা ভেঙ্গে দেওয়ার অধিকার রয়েছে।

যদি কর্মীর হাতে সম্পূর্ণ পুঁজি বিনাশ হয়, তার পরিবর্তে পুরো টাকাই মালিক দিতে আগ্রহী ও সম্মত থাকে এ সময় কর্মী টাকাটা নেওয়া আবশ্যিক নয়। যেহেতু পুরো পুঁজিটাই না থাকার কারণে মুদারাবা বাতিল হয়ে গেছে তাই কর্মী দ্বিতীয় বার মালিকের পক্ষ থেকে টাকা গ্রহণে বাধ্য থাকবে না। অথচ পুঁজি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রদত্ত জরিমানা যখন দেওয়া হয় কর্মীকে তা অবশ্যই গ্রহণ করতে হয়। যেহেতু পুরো টাকাটা ধ্বংস হলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যায়, তাই পুঁজিদাতারও এখতিয়ার থাকে সে তার পরিবর্তে আবারো পুঁজি সরবরাহ করতে পারে, না-ও পারে। এ পরিস্থিতিতে কর্মী যদি মুদারাবার জন্যে কোনো পণ্য কেনে, মূল্য পরিশোধ করে বিক্রেতার নিকট থেকে পণ্য আনতে গিয়ে সে যদি দেখতে পায়, পণ্য ধ্বংস হয়ে গেছে, আর পুঁজিদাতা যদি পুনরায় পুঁজি সরবরাহ করতে আপত্তি ও অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে কর্মীর সে পণ্য গ্রহণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক হবে। যদি কর্মীর হাতে টাকা না থাকে তাহলে তার সেই পণ্য বিক্রি করে মূল্য পরিশোধ করতে হবে। এ পণ্য বিক্রয়ে লাভ হলে তা কর্মীর একার, লোকসান হলেও তা তার হবে।

মালেকী আলেমদের নিকট যা প্রসিদ্ধ তা হচ্ছে, পুঁজিদাতা পুনরায় পুঁজির যোগান দিলে তার লাভ দ্বারা প্রথম পুঁজিতে যা ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ করা হবে না। সবটা পুঁজি ধ্বংস হোক বা আংশিক, বিধান একইরূপ থাকবে। তারা বলেন, পুঁজির মালিক বা কর্মী যদি মুদারাবার আংশিক পুঁজিতে ক্ষতিসাধন করে অথবা পুঁজির একাংশ তাদের দুজনের কোনো একজন ঋণ হিসাবে নেয়, তবে তার সাথে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির ন্যায় আচরণ করা হবে। ক্ষতিসাধনকারীর নিকট থেকে ক্ষতি পরিমাণ এবং ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে গৃহীত ঋণের পরিমাণ উসুল করা হবে। অর্জিত লাভ দ্বারা তা পূরণ করা হবে না। ব্যবসায়ে লোকসান হলে বা পুঁজি বিনষ্ট হলে লাভ দিয়ে তা পূরণ করা হয়, কিন্তু কেউ ক্ষতি করলে বা কর্জ নিলে তা লাভ দ্বারা পূরণ করা হবে না।

শাফেয়ী আলেমগণ তাদের সর্বাধিক সঠিক মতে বলেন, যদি মূলধনের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে, যেমন আগুন লেগে পুড়ে যাওয়া, পানিতে ডুবে যাওয়া, লুণ্ঠিত হওয়া বা চুরি হওয়া, তাহলে কর্মী বেচাকেনা করে সে পুঁজিতে তার মর্জিমাফিক কাজ করার পরও সে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বা তার বদল হাতে পাওয়া যদি বেশ কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে এ অংশটুকুকে লাভের আওতায় হিসাব করা হবে, অর্থাৎ লাভ থেকে এই পরিমাণ কর্তন করা হবে। যেহেতু এ ক্ষতিটা কারো হাতে ইচ্ছাকৃতভাবে হয়নি, তাই এ ক্ষতিটাকে মেনে নিতে হবে।

যদি উপরিউক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুঁজি ধ্বংস হয় বেচাকেনা করে তাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পূর্বে, তাহলে মূলধন থেকেই তা হিসাব করে বাদ দেওয়া হবে; লাভ থেকে কর্তন করা হবে না। এটিই তাদের সর্বাধিক সহীহ মত। যেহেতু কাজ করার মাধ্যমে মুদারাবা চুক্তি মোটে দৃঢ়তাই অর্জন করতে পারেনি, তাই তা লাভের আওতায় আসবে না।

যদি মুদারাবার পুরো মূলধনই ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে মুদারাবা রহিত হয়ে যাবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগেই বিনাশ হোক অথবা মালিক বা কর্মী বা তৃতীয় কোনো ব্যক্তি ধ্বংস করুক। তবে মালিক ধ্বংস করলে তাতে কর্মীর লাভের অংশ বহাল থাকবে। যদি তৃতীয় কোনো ব্যক্তি ধ্বংস করার পর তার কাছ থেকে বদল গ্রহণ করা হয় তাহলে মুদারাবা বহাল থাকবে।

হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ এ সম্পর্কে বলেন, যদি মুদারাবার আংশিক মূলধন ধ্বংস হয় কর্মী তা দিয়ে বেচাকেনা শুরু করার পূর্বে, তাহলে ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশে মুদারাবা রহিত হয়ে যাবে। ধ্বংসের পর যা অবশিষ্ট থাকবে পুঁজি হিসাবে সেটুকুই ধর্তব্য হবে। তারা বলেন, কর্মী কিছু কেনাকাটার পূর্বেই যে পুঁজিটুকু ধ্বংস হয়ে গেছে তা যেন কর্মী হাতে পাওয়ার আগেই ধ্বংস হয়েছে, তাই তা হিসাবে আসবে না। কিন্তু যা কেনাকাটা ইত্যাদির পরে ধ্বংস হয়েছে তার বিধান ভিন্ন, যেহেতু তা ব্যবসায়ে আবর্তিত হয়েছে।

যদি কর্মী কেনাকাটা করার আগেই পুঁজি ধ্বংস হয়, এরপর কর্মী মুদারাবা ব্যবসা উপলক্ষে নিজ দায়িত্বে মূল্য বাকী রেখে কোনো পণ্য কেনে, তাহলে এটি কর্মীর মালিকানাধীন বস্তু হবে, তার মূল্য পরিশোধ তার দায়িত্বেই থাকবে। এ অবস্থায় পণ্যটি মুদারাবার পণ্য বিবেচনা করা হয়, তাহলে অন্যের কাছ থেকে তার ঋণ নেওয়া হবে। অন্যের কাছ থেকে তার অনুমতি ছাড়া ঋণ নেওয়া জায়েয নয়। তবে যদি মালিক পুনরায় পুঁজি দিয়ে তার ঋণ পরিশোধ করে তবে পণ্যটি মালিকের হয়ে যাবে।

কর্মী পণ্য কেনার পর মূল্য পরিশোধ করার পূর্বে যদি মূলধন ধ্বংস হয়; তা এ ভাবে যে, সে মুদারাবা ব্যবসার জন্যে নিজ দায়িত্বে কোনো পণ্য কিনেছে। এরপর তার মূল্য পরিশোধ করার পূর্বেই যদি মূলধন ধ্বংস হয় অথবা মূলধন ও মুদারাবার পণ্যও ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে মুদারাবা যথারীতি বহাল থাকবে। এ জাতীয় মাসআলায় মুদারাবা বাতিলের কারণ হয় মূলধন ধ্বংস হওয়া। তা পণ্য কেনার সময় বা তার পূর্বে সংঘটিত হয়নি, তাই মুদারাবা বাতিল হবে না। এ অবস্থায় পুঁজির মালিক পণ্যের মূল্য পরিশোধ করবে, যেহেতু ব্যবসার মূল অধিকার তার হাতে।

টিকাঃ
১৯২. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১১৩
১৯৩. আশ-শারহুল কাবীর ও হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৫২৮-৫২৯; শারহু্য যুরক্বানী ও হাশিয়া আল-বুনানী, খ. ৬, পৃ. ২২৫-২২৬; বুলগাতুস সালিক ও আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৯৭; শারহুল খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ৪৩১
১৯৪. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২৩৬
১৯৫. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫১৮

ফকীহদের সম্মিলিত মত হচ্ছে, মুদারাবার পুঁজি কর্মী বুঝে পাওয়ার পর কোনো কিছু কেনাকাটার মাধ্যমে তাতে কিছু নাড়া দেওয়ার পূর্বেই যদি সে পুঁজি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। কেননা যে অর্থকড়ি মুদারাবার জন্যে নির্ধারিত ছিল, যে অর্থের সাথে এ চুক্তি সম্পর্কিত ছিল তা ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা বলেন, যদি পুঁজি সবটা ধ্বংস হয়ে যায়, মুদারাবা বাতিল হয়। কিন্তু যদি এক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে অবশিষ্ট পুঁজিতে মুদারাবা বহাল থাকে, যেটুকু বিলুপ্ত হয়েছে সেটুকু মুদারাবার হিসাব থেকে বাদ পড়ে যায়।

তারা বলেন, মুদারাবার উদ্দেশ্যে কেনাবেচার কাজে পুরোপুরি মগ্ন হওয়ার পর পুঁজি বিনাশ হলে সে মুদারাবা বাতিল ও রহিত হয়ে যায়। এটুকু কথায় সকল ফকীহ একমত। এক্ষেত্রেও যদি বেচাকেনা শুরু করার পর পুঁজির এক অংশ বিনাশ হয়ে যায় তবে সে অংশে মুদারাবা বাতিল হয়ে যায়। অবশিষ্ট অংশই তখন পুঁজি হিসাবে ধার্য থাকে। এটি ফকীহদের একাংশের অভিমত। তারা বিভিন্ন অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

আল্লামা কাসানী বলেছেন, কর্মীর হাতে পুঁজি আসার পর সে তা দিয়ে কিছু পণ্য কেনার পূর্বেই যদি পুঁজিটা ধ্বংস হয়ে যায়, আমাদের মাযহাবের ইমামদের মতে, তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যায়। এর কারণ হচ্ছে, কর্মী সে অর্থ কজা করার মাধ্যমে তা মুদারাবার জন্যে নির্ধারিত হয়েছে। এখন তা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এ চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। এ মাসআলা আমানত রাখা সদৃশ। আমানতদারের হাতে থাকা অবস্থায় তা ধ্বংস হয়ে গেলে আমানত বাতিল হয়ে যায়। এমনিভাবে যদি কর্মী পুঁজি বিনাশ করে ফেলে বা তা খরচ করে অথবা কাউকে দেওয়ার পর সে তা ধ্বংস করে ফেলে, যদি যে বিনাশ করেছে তার নিকট থেকে সে পরিমাণ অর্থ সম্পদ আদায় করা হয় তবে কর্মী সে গৃহীত অর্থ দ্বারা পণ্য ক্রয় করতে এবং মুদারাবা হিসাবে ব্যবসা করতে পারবে। ইমাম আবু হানিফার পক্ষ থেকে তাঁর ছাত্র হাসান এ মতটি উদ্ধৃত করেছেন। আবু হানিফা রহ. এ সম্পর্কে বলছেন, এখানে পুঁজির পরিবর্তে পুঁজি পরিমাণ সম্পদ গ্রহণ করা হয়েছে। তাই এটিই এখন পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তাই তা দ্বারা মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা করা যাবে।

ইমাম মুহাম্মদের পক্ষ থেকে ইবনে রুস্তম বর্ণনা করেন, কর্মী যদি পুঁজির টাকা কাউকে কর্জ হিসাবে প্রদান করে, সে যদি হুবহু সে মুদ্রাগুলোই ফেরত দেয় তাহলে মুদারাবা হিসাবে তা ফেরত আসবে। এর কারণ, যদি সে সীমালঙ্ঘন করত তাহলে তার সে মুদ্রাগুলোর সমপরিমাণ জরিমানা দিতে হতো। কিন্তু ঋণগ্রহীতা সীমালঙ্ঘন করেনি, তাই তার জরিমানাও দিতে হবে না। কিন্তু যদি হুবহু সে মুদ্রাগুলো নয়, বরং তার সমপরিমাণ অর্থ সীমালঙ্ঘনকারীর নিকট থেকে আদায় করা হয় তাহলে তা মুদারাবা হিসাবে ফেরত আসবে না। যেহেতু মূল পুঁজি বিলুপ্ত করে দেওয়ায় তার পক্ষ থেকে জরিমানাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জরিমানা ও মুদারাবা উভয়ের বিধান কখনো একত্র হয় না, তাই এ সময় মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে।

উপরিউক্ত আলোচনা যখন কর্মী পুঁজি খরচ করে কিছু কেনার পূর্বেই পুঁজি বিনষ্ট ও ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু যদি কিছু কেনার পর সে পুঁজি ধ্বংস হয়, যা এভাবে হবে, কর্মীকে পুঁজি হিসাবে দেওয়া হয়েছে এক হাজার টাকা। কর্মী সে টাকার পরিমাণ পণ্য খরিদ করলেও তখনই মূল্য পরিশোধ করেনি। ইতোমধ্যে সে এক হাজার টাকা ধ্বংস হয়ে গেছে। অবস্থা এমন হলে আমাদের ইমামগণ (হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ) বলেন, পণ্যটা মুদারাবার পণ্য হিসাবেই গণ্য হবে এবং তার মূল্য পরিশোধের জন্যে কর্মী পুঁজিদাতার দ্বারস্থ হবে। তার কাছ থেকে এক হাজার টাকা নিয়ে সে পণ্য বিক্রেতাকে প্রদান করবে। যদি দ্বিতীয় এক হাজার টাকা কর্মী কজা করার পর এটিও ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে এমন আরো এক হাজার আনার জন্যে কর্মী আবারো পুঁজিমালিকের দ্বারস্থ হবে। এমনকি এমন ঘটনা তৃতীয় চতুর্থবার ঘটলেও একইভাবে মালিকের দ্বারস্থ হয়ে অর্থের ব্যবস্থা করবে। মালিক প্রথমবার যা দিয়েছে, পরে জরিমানা হিসাবে আরো যত দিয়েছে সবটাই পুঁজি বলে ধর্তব্য হবে। যেহেতু পুঁজিদাতার পুঁজিতে কর্মীর নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান। তাই তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় যা জরিমানা হবে কর্মী সেজন্যে পুঁজিদাতার দ্বারস্থই হবে, বিষয়টি প্রতিনিধির বিষয়ের ন্যায়। প্রতিনিধির হাতে টাকা ধ্বংস হয়ে গেলে প্রতিনিধি মূল ব্যক্তির দ্বারস্থ হবে এবং তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে খরচ করবে। তবে মুদারাবার কর্মী ও প্রতিনিধিতে এক স্থানে পার্থক্য রয়েছে। তা হচ্ছে, প্রতিনিধির হাতে প্রথমবার পণ্যের মূল্য ধ্বংস হয়ে গেলে সে মূল ব্যক্তির দ্বারস্থ হয়ে দ্বিতীয় হাজার টাকা পায়। কিন্তু দ্বিতীয় এক হাজারও ধ্বংস হয়ে গেলে সে আর মূল ব্যক্তির দ্বারস্থ হবে না, যেহেতু মূল ব্যক্তি তার প্রতিনিধিকে দু হাজারের অধিক দেবে না। কিন্তু মুদারাবার কর্মীর বিষয় ভিন্ন, তার নিকট তৃতীয় চতুর্থবার বরং যত বার পুঁজি ধ্বংস হোক, কর্মী মালিকের দ্বারস্থ হবে এবং প্রতিবারই মালিক তাকে সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করবে।

মালেকী আলেমগণ বলেন, যদি কর্মীর হাতে থাকা অবস্থায় মালিকের সমুদয় পুঁজি ধ্বংস ও বিনাশ হয়ে যায় তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। যদি আংশিক পুঁজি বিনষ্ট হয় তবে সে পরিমাণ সম্পদে বাতিল হবে, অবশিষ্ট সম্পদ যেটুকু হাতে আছে সেটুকুতে মুদারাবা বহাল থাকবে। তারা বলেন, যদি সম্পূর্ণ পুঁজি বা তার এক অংশ ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে পুঁজিদাতার করণীয় হচ্ছে, যে পরিমাণ ধ্বংস হয়েছে তার পরিবর্তে সে পরিমাণ আরো অর্থ সে কর্মীকে ব্যবসা করার জন্যে দেবে; যদি পুঁজিদাতা ব্যবসা করার ইচ্ছাই করে। কর্মী কাজ শুরু করার আগে দিক বা পরে, এক্ষেত্রে পুঁজিদাতার ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। কর্মীর জন্যে আবশ্যক, যদি পুঁজি ধ্বংস হওয়া কাজ শুরু করার পূর্বে না হয়ে পরে হয়, তাহলে আংশিক পুঁজি বিনাশ হলে তার সমপরিমাণ অর্থ পুঁজিদাতার নিকট থেকে সে নিয়ে নেবে। কাজ শুরু হওয়ার পূর্বে ধ্বংস হলে সমপরিমাণ অর্থ নেওয়া আবশ্যক নয়, যেহেতু এ সময় পুঁজিদাতা ও কর্মী উভয়ের মুদারাবা ভেঙ্গে দেওয়ার অধিকার রয়েছে।

যদি কর্মীর হাতে সম্পূর্ণ পুঁজি বিনাশ হয়, তার পরিবর্তে পুরো টাকাই মালিক দিতে আগ্রহী ও সম্মত থাকে এ সময় কর্মী টাকাটা নেওয়া আবশ্যিক নয়। যেহেতু পুরো পুঁজিটাই না থাকার কারণে মুদারাবা বাতিল হয়ে গেছে তাই কর্মী দ্বিতীয় বার মালিকের পক্ষ থেকে টাকা গ্রহণে বাধ্য থাকবে না। অথচ পুঁজি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রদত্ত জরিমানা যখন দেওয়া হয় কর্মীকে তা অবশ্যই গ্রহণ করতে হয়। যেহেতু পুরো টাকাটা ধ্বংস হলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যায়, তাই পুঁজিদাতারও এখতিয়ার থাকে সে তার পরিবর্তে আবারো পুঁজি সরবরাহ করতে পারে, না-ও পারে। এ পরিস্থিতিতে কর্মী যদি মুদারাবার জন্যে কোনো পণ্য কেনে, মূল্য পরিশোধ করে বিক্রেতার নিকট থেকে পণ্য আনতে গিয়ে সে যদি দেখতে পায়, পণ্য ধ্বংস হয়ে গেছে, আর পুঁজিদাতা যদি পুনরায় পুঁজি সরবরাহ করতে আপত্তি ও অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে কর্মীর সে পণ্য গ্রহণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক হবে। যদি কর্মীর হাতে টাকা না থাকে তাহলে তার সেই পণ্য বিক্রি করে মূল্য পরিশোধ করতে হবে। এ পণ্য বিক্রয়ে লাভ হলে তা কর্মীর একার, লোকসান হলেও তা তার হবে।

মালেকী আলেমদের নিকট যা প্রসিদ্ধ তা হচ্ছে, পুঁজিদাতা পুনরায় পুঁজির যোগান দিলে তার লাভ দ্বারা প্রথম পুঁজিতে যা ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ করা হবে না। সবটা পুঁজি ধ্বংস হোক বা আংশিক, বিধান একইরূপ থাকবে। তারা বলেন, পুঁজির মালিক বা কর্মী যদি মুদারাবার আংশিক পুঁজিতে ক্ষতিসাধন করে অথবা পুঁজির একাংশ তাদের দুজনের কোনো একজন ঋণ হিসাবে নেয়, তবে তার সাথে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির ন্যায় আচরণ করা হবে। ক্ষতিসাধনকারীর নিকট থেকে ক্ষতি পরিমাণ এবং ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে গৃহীত ঋণের পরিমাণ উসুল করা হবে। অর্জিত লাভ দ্বারা তা পূরণ করা হবে না। ব্যবসায়ে লোকসান হলে বা পুঁজি বিনষ্ট হলে লাভ দিয়ে তা পূরণ করা হয়, কিন্তু কেউ ক্ষতি করলে বা কর্জ নিলে তা লাভ দ্বারা পূরণ করা হবে না।

শাফেয়ী আলেমগণ তাদের সর্বাধিক সঠিক মতে বলেন, যদি মূলধনের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে, যেমন আগুন লেগে পুড়ে যাওয়া, পানিতে ডুবে যাওয়া, লুণ্ঠিত হওয়া বা চুরি হওয়া, তাহলে কর্মী বেচাকেনা করে সে পুঁজিতে তার মর্জিমাফিক কাজ করার পরও সে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বা তার বদল হাতে পাওয়া যদি বেশ কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে এ অংশটুকুকে লাভের আওতায় হিসাব করা হবে, অর্থাৎ লাভ থেকে এই পরিমাণ কর্তন করা হবে। যেহেতু এ ক্ষতিটা কারো হাতে ইচ্ছাকৃতভাবে হয়নি, তাই এ ক্ষতিটাকে মেনে নিতে হবে।

যদি উপরিউক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুঁজি ধ্বংস হয় বেচাকেনা করে তাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পূর্বে, তাহলে মূলধন থেকেই তা হিসাব করে বাদ দেওয়া হবে; লাভ থেকে কর্তন করা হবে না। এটিই তাদের সর্বাধিক সহীহ মত। যেহেতু কাজ করার মাধ্যমে মুদারাবা চুক্তি মোটে দৃঢ়তাই অর্জন করতে পারেনি, তাই তা লাভের আওতায় আসবে না।

যদি মুদারাবার পুরো মূলধনই ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে মুদারাবা রহিত হয়ে যাবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগেই বিনাশ হোক অথবা মালিক বা কর্মী বা তৃতীয় কোনো ব্যক্তি ধ্বংস করুক। তবে মালিক ধ্বংস করলে তাতে কর্মীর লাভের অংশ বহাল থাকবে। যদি তৃতীয় কোনো ব্যক্তি ধ্বংস করার পর তার কাছ থেকে বদল গ্রহণ করা হয় তাহলে মুদারাবা বহাল থাকবে।

হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ এ সম্পর্কে বলেন, যদি মুদারাবার আংশিক মূলধন ধ্বংস হয় কর্মী তা দিয়ে বেচাকেনা শুরু করার পূর্বে, তাহলে ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশে মুদারাবা রহিত হয়ে যাবে। ধ্বংসের পর যা অবশিষ্ট থাকবে পুঁজি হিসাবে সেটুকুই ধর্তব্য হবে। তারা বলেন, কর্মী কিছু কেনাকাটার পূর্বেই যে পুঁজিটুকু ধ্বংস হয়ে গেছে তা যেন কর্মী হাতে পাওয়ার আগেই ধ্বংস হয়েছে, তাই তা হিসাবে আসবে না। কিন্তু যা কেনাকাটা ইত্যাদির পরে ধ্বংস হয়েছে তার বিধান ভিন্ন, যেহেতু তা ব্যবসায়ে আবর্তিত হয়েছে।

যদি কর্মী কেনাকাটা করার আগেই পুঁজি ধ্বংস হয়, এরপর কর্মী মুদারাবা ব্যবসা উপলক্ষে নিজ দায়িত্বে মূল্য বাকী রেখে কোনো পণ্য কেনে, তাহলে এটি কর্মীর মালিকানাধীন বস্তু হবে, তার মূল্য পরিশোধ তার দায়িত্বেই থাকবে। এ অবস্থায় পণ্যটি মুদারাবার পণ্য বিবেচনা করা হয়, তাহলে অন্যের কাছ থেকে তার ঋণ নেওয়া হবে। অন্যের কাছ থেকে তার অনুমতি ছাড়া ঋণ নেওয়া জায়েয নয়। তবে যদি মালিক পুনরায় পুঁজি দিয়ে তার ঋণ পরিশোধ করে তবে পণ্যটি মালিকের হয়ে যাবে।

কর্মী পণ্য কেনার পর মূল্য পরিশোধ করার পূর্বে যদি মূলধন ধ্বংস হয়; তা এ ভাবে যে, সে মুদারাবা ব্যবসার জন্যে নিজ দায়িত্বে কোনো পণ্য কিনেছে। এরপর তার মূল্য পরিশোধ করার পূর্বেই যদি মূলধন ধ্বংস হয় অথবা মূলধন ও মুদারাবার পণ্যও ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে মুদারাবা যথারীতি বহাল থাকবে। এ জাতীয় মাসআলায় মুদারাবা বাতিলের কারণ হয় মূলধন ধ্বংস হওয়া। তা পণ্য কেনার সময় বা তার পূর্বে সংঘটিত হয়নি, তাই মুদারাবা বাতিল হবে না। এ অবস্থায় পুঁজির মালিক পণ্যের মূল্য পরিশোধ করবে, যেহেতু ব্যবসার মূল অধিকার তার হাতে।

টিকাঃ
১৯২. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১১৩
১৯৩. আশ-শারহুল কাবীর ও হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৫২৮-৫২৯; শারহু্য যুরক্বানী ও হাশিয়া আল-বুনানী, খ. ৬, পৃ. ২২৫-২২৬; বুলগাতুস সালিক ও আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৯৭; শারহুল খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ৪৩১
১৯৪. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২৩৬
১৯৫. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫১৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00