📄 মুদারাবার সম্পদ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ
হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী আলেমগণ বলেন, কর্মী পুঁজি নিয়ে কোনো কাজ করতে গিয়ে, তা দিয়ে নানা পণ্য কেনাকাটা করতে গিয়ে যদি সে লোকসানের শিকার হয় বা আংশিক পুঁজি বিনষ্ট হয়, তাহলে ইতোমধ্যে লাভ হলে তা দিয়ে ক্ষতিপূরণ করা হবে। ব্যবসায়ে লোকসান হওয়ায় বা বিনষ্ট হওয়ায় যে পরিমাণ পুঁজি হাতছাড়া হয়ে গেছে লাভ দ্বারা তা পূরণ করা হবে। যদি এখনো লাভ না হয়ে থাকে বা ক্ষতি লাভের চেয়ে অধিক হয়ে থাকে তবে তা পুঁজি থেকে কর্তন করা হবে। প্রতি মাযহাবের আলেমগণই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
মাওসিলী বলেন, মুদারাবার সম্পদে যা বিনষ্ট হবে তা অর্জিত লাভ দিয়ে পূরণ করা হবে, যেহেতু এটি হচ্ছে মূল পুঁজির অনুবর্তী; যেমন যাকাতের নেসাবে অতিরিক্ত সম্পদ। যদি ক্ষতির পরিমাণ লাভ থেকে অধিক হয়, তাহলে সে অধিক অংশটুকু পুঁজি থেকে বিয়োগ হবে। এর কারণ, কর্মী এ মূলধনের আমানতদার। তাই তার ত্রুটি ব্যতীত ক্ষতি হয়ে গেলে তাকে তার জরিমানা আদায় করতে হবে না। যদি মালিক ও কর্মী উভয়ে লাভ ভাগ করে নেয়, মুদারাবা বহাল থাকে, এরপর মূলধনের পুরোটা বা তার এক অংশ যদি ধ্বংস হয় তাহলে লাভ ফিরিয়ে নিয়ে মূলধন পূর্ণ করতে হবে। কেননা লাভ হচ্ছে পুঁজি থেকে অতিরিক্ত অংশ। তাই সম্পূর্ণ পুঁজি যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকার পর অতিরিক্ত অংশের খোঁজ নেওয়া হবে। তাই সে বণ্টনই সহীহ ও যথাযথ হবে না যার পর পুঁজি ধ্বংস হলে লাভ ফিরিয়ে নেওয়া হয়। যদি মুদারাবা বাতিল হয়ে যায়, এ অবস্থায় মালিক ও কর্মী লাভ বণ্টন করে নেয়, এরপর তারা আবার মুদারাবার চুক্তি করে- এ সময় যদি তাদের পুঁজি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে হাতে আসা লাভ ফিরিয়ে দিতে হবে না। যেহেতু এটি নতুন মুদারাবা চুক্তি, আগের চুক্তি শেষ হয়ে গেছে, তার ফলাফলও শেষ হয়ে গেছে। কর্মী ব্যবসায়ে ক্ষতি হলে তার ভাগীদার হওয়ার শর্ত করাও বাতিল।
ইমাম নববী বলেন, মুদারাবার পণ্যে মূল্যহ্রাস করার দরুন পুঁজিতে যে ক্ষতি সাধিত হবে, তা হবে লোকসান। পরবর্তী সময়ে লাভ অর্জন করে সে ক্ষতি পূরণ করতে হবে। তেমনিভাবে পণ্যে কোনো ত্রুটি সৃষ্টি হওয়া অথবা পণ্য প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়া, এগুলোর কারণেও পুঁজিতে হ্রাস ও খেসারতের ঘটনা ঘটতে পারে। যদি পণ্যের এক অংশ (যেমন পশুপাল থেকে কতক পশু বা ব্যবসার বস্তু থেকে এক অংশ) ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে তা হবে বস্তুগত ক্ষতি। এটি বেচাকেনার মাধ্যমে পণ্যে কর্মী তার নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনের পর হতে পারে। অধিকাংশ আলেম অকাট্যভাবে যা বলেন তা হচ্ছে, যদি আগুনে পুড়ে যাওয়া বা ডুবে যাওয়া ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিসাধিত হয় তবে তা হবে ব্যবসায়ে লোকসান; লাভ দ্বারা তার ক্ষতিপূরণ করতে হবে। যদি চুরি ডাকাতি বা লুণ্ঠনের দরুন ক্ষতি হয়, ক্ষতিসাধনকারীর নিকট থেকে এর ক্ষতিপূরণ আদায় করা অসাধ্য ও অসম্ভব হয় তাহলে সেখানে দুটো মত রয়েছে। একদল অবশ্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে উভয় মত বর্জন করেন। তবে সর্বাধিক সঠিক ও সহীহ ফয়সালা হচ্ছে, উপরিউক্ত সকল ক্ষেত্রেই লাভ দ্বারা ক্ষতিপূরণ করা হবে।
যদি কর্মী পুঁজি কজা করার আগেই পুঁজিতে ক্ষতি সাধিত হয়, তাহলে সেখানে দুটো মত রয়েছে। এক. এটি লোকসান ও খেসারত বলে গণ্য হবে। পরবর্তী সময়ে লাভ করে তা পূরণ করতে হবে। যেহেতু কর্মী তা তার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর তা মুদারাবার সম্পদ হয়ে গেছে। তবে দ্বিতীয় মত যেটি অধিক সহীহ ও যথার্থ তা হচ্ছে, লাভ থেকে তার ক্ষতিপূরণ করা হবে না, পুঁজি থেকে কিছু বিনষ্ট হয়ে কমে যাওয়াই ধর্তব্য হবে। কেননা কর্মী তার কাজ করে চুক্তিটিকে এখনো কার্যকর ও শক্তিশালী করেনি। উপরিউক্ত আলোচনা, যদি আংশিক সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। কিন্তু যদি পুরো মূলধন বা পণ্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়ে যায়, তা কর্মী কজা করার আগে হোক বা পরে, তাহলে মুদারাবা-ই বাতিল হয়ে যাবে।
বাহুতী বলেন, যদি কর্মী তার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর মূলধন সবটুকু বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় অথবা পণ্যে খুঁত সৃষ্টি হয় অথবা অসুস্থ হয়ে (দাসদাসী বা পশু পাখি ইত্যাদির) দাম পড়ে যায় অথবা পণ্যের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এসে যায় অথবা বাজারে স্বাভাবিক ভাবেই পণ্যের দাম কমে যায়, এসবই হয় কর্মীর নিয়ন্ত্রণে ও পরিচালনায় ব্যবসা শুরু হওয়ার পর, তাহলে অবশিষ্ট সম্পদে লাভ হলে তা বণ্টন করার পূর্বে তা দ্বারা সে ক্ষতি পূরণ করতে হবে। আলেমগণ এ পর্যায়ে বলেন, যে পর্যন্ত পুঁজির ওপর ভিত্তি করে মুদারাবা বহাল থাকবে, অর্জিত লাভ দ্বারা তার ক্ষতিপূরণের ধারাও অব্যাহত থাকবে।
টিকাঃ
১৪৪. আল-ইখতিয়ার, খ. ৩, পৃ. ২০, ২৪-২৫
১৪৫. রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১৩৮-১৩৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৮-৩১৯
১৪৬. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫১৭-৫২০
📄 শরীয়তসম্মত মুদারাবা হলে মালিক যা কিছুর অধিকারী হয়
মুদারাবা শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায় যথাযথ নিয়মে করা হলে মালিক শর্ত মোতাবেক লাভের অধিকারী হয়- যদি ব্যবসায়ে লাভ হয়। আর যদি লাভ না হয় তাহলে কর্মীর নিকট তার কোনো কিছু পাওনা থাকে না।
টিকাঃ
১৪৯. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১০৮
📄 মুদারাবার সম্পদে যাকাত
সকল ফকীহ এ কথায় একমত, মুদারাবা ব্যবসাতে যে পুঁজি বিনিয়োগ করা হয় তার মালিক তার যাকাত প্রদান করবে। ব্যবসায়ে যা লাভ হবে তার যাকাত নিয়ে ফকীহদের নানা মত হয়েছে, যা বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে যাকাত অধ্যায়ে।
টিকাঃ
১৫০. সারাখসী প্রণীত আল-মাবসূত, খ. ২, পৃ. ২০৪; আল-কাওয়ানীন আল-ফিকহিয়্যা, পৃ. ১০৮; আল-মুদাওয়ানা, খ. ৫, পৃ. ৯৮; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ৩১; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৩৮
📄 বাতিল মুদারাবার প্রতিক্রিয়া
হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, মুদারাবা বাতিল বা বিনষ্ট হলে যে সকল বিষয় ধারাবাহিকভাবে সাব্যস্ত হয় সে সব হচ্ছে: এক. যদি লাভ হয় তবে সবটুকু পাবে পুঁজির মালিক। কেননা লাভ হচ্ছে তার সম্পদে সংঘটিত বৃদ্ধি। কর্মী সে লাভের এক অংশের অধিকারী হয় শর্ত করার প্রেক্ষিতে। সে শর্ত এখন আর কার্যকর থাকবে না, যেহেতু মুদারাবা যখন বাতিল হয়ে যায় তার শর্তগুলোও বাতিল হয়ে যায়। তাই কর্মী এখন আর লাভের অংশ পাবে না, ফলে সবটুকু লাভ চলে যাবে মালিকের হাতে। দুই. ব্যবসায়ে লাভ হোক বা লোকসান, কর্মী তার কাজের উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাবে। এর কারণ, সে যে পরিশ্রম করে তার বিনিময়ে লাভের নির্দিষ্ট অংশের কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু যেহেতু সে শর্ত বাতিল হয়েছে তাই তার সে নির্দিষ্ট অংশও বাতিল হয়েছে। লাভের আলোচনা বাতিল হওয়ার প্রেক্ষিতে এখন তার পরিশ্রম তাকে ফিরিয়ে দেওয়া কর্তব্য। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়, তাই যথাযথ পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে। বাতিল মুদারাবা হচ্ছে বাতিল ইজারাতুল্য। ইজারা বাতিল হওয়ার দরুন মজুর পূর্বনির্ধারিত পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকারী থাকে না। সে যথাযথ পরিশ্রম বিবেচনায় পারিশ্রমিক পায়।
হানাফী আলেমদের মতে, কর্মী যথাযথ পারিশ্রমিক পাবে শর্তহীনভাবে অর্থাৎ ব্যবসায়ে লাভ হোক বা না হোক। এটিই তাদের গৃহীত মত। শর্তমত দেওয়া হলে লাভের যে অংশ দেওয়া হতো পারিশ্রমিক তা থেকে বেশি হবে না। মুহাম্মদ রহ. বলেন, পারিশ্রমিক যা-ই হবে তা দেওয়া হবে। তা নির্ধারিত লাভের তুলনায় বেশি বা কম, তা দেখা হবে না। আবু ইউসুফ রহ. বলেন, সম্পদে যদি কোনো লাভ না আসে তাহলে কর্মীকেও কোনো বেতন ভাড়া দেওয়া হবে না। ইবনে আবিদীন বলেন, এভাবে কর্মীকে পারিশ্রমিক প্রদানের বিধান যথাযথ ও সঠিক।
মালেকী আলেমদের মুদারাবা সম্পর্কে মূলনীতি হচ্ছে, যে ব্যবসাকর্ম মুদারাবার মূল বৈশিষ্ট্য থেকে বের হয়ে গেছে তাতে কর্মী পাবে যথাযথ পারিশ্রমিক। যেটি মুদারাবার বৈশিষ্ট্য ধারণ করে রাখবে- তবে তাতে কোনো শর্ত যোগ করা হয়েছে যা মুদারাবার চাহিদার বিপরীত, সেক্ষেত্রে এটি মুদারাবাতুল্য বলে বিবেচিত হবে এবং শর্ত অনুযায়ী লাভ বণ্টিত হবে। তারা বলেন, যখন মুদারাবা বাতিল বা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায় তখন কর্মীর প্রাপ্য বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন হয়ে থাকে।
টিকাঃ
১৫১. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১০৮; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১২৫; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫১১-৫১২
১৫২. হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৮৪
১৫৩. আল-শারহুস সাগীর ও বুলগাতুস সালিক, খ. ৩, পৃ. ৬৮৬-৬৯০; হাশিয়া দুসূকী ও আশ-শারহুস কাবীর, খ. ৩, পৃ. ৫১৯