📄 এক. ব্যবসা কাজে মালিকের অংশগ্রহণের শর্ত করা
(شَرْطُ اشْتَرَاكَ الْمَالِكَ فِي الْعَمَلِ)
হানাফী, মালেকী ও শাফেয়ী আলেমদের এবং হাম্বলী আলেমদের মাঝে ইবনে হামেদ ও কাজী ইয়ায-এর মত হচ্ছে, যদি ব্যবসাকাজে মালিকের অংশগ্রহণের শর্ত করা হয় তাহলে তা মুদারাবা বাতিল করে দেবে। এর কারণ, মুদারাবাতে প্রদত্ত পুঁজি হচ্ছে আমানত। তাই অন্য আমানতের ন্যায় পুঁজি কর্মীর হাতে তুলে না দেওয়া পর্যন্ত আমানত রাখা সম্পন্ন হবে না। এ অবস্থায় যদি পুঁজিদাতার ব্যবসায়িক কাজে অংশগ্রহণের শর্ত করা হয় তাহলে পুঁজি কর্মীর হাতে হস্তান্তর এবং তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে দেওয়া বাস্তবায়িত হবে না। যেহেতু কাজ করার প্রেক্ষিতে পুঁজিতে তারও নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে, যা পূর্ণ হস্তান্তরে বাধার সৃষ্টি করবে। ১০৯
তবে হাম্বলী ফকীহদের গৃহীত মত ও মাযহাব হচ্ছে, যে পুঁজি সরবরাহ করবে এ উদ্দেশ্যে যে, তা নিয়ে সে এবং অপর ব্যক্তি ব্যবসা করবে, তাতে যা লাভ হবে তা তাদের দুজনের মাঝে বণ্টিত হবে, সে চুক্তি সহীহ হবে। ১১০
টিকাঃ
১০৯. হাশিয়া শালাবী বিহামিশ তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৫৬; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬০৯; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১১৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩০৯-৩১০
১১০. আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪৩২
📄 দুই. নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ প্রদানের শর্ত করা
(شَرْطُ قَدْرٍ مُعَيْنِ مِنَ الرِّبِّحِ)
সকল ফকীহ এ কথায় একমত, উভয়ের জন্যে অথবা দুজনের কোনো একজনের জন্যে লাভের নির্দিষ্ট পরিমাণ শর্ত করা হলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। যেমন তারা শর্ত করল, তাদের দুজনের কোনো একজনকে, পুঁজিদাতাকে বা কর্মীকে, লাভ হিসাবে একশ দিরহাম দেওয়ার পর অবশিষ্ট লাভ অপরজনকে দেওয়া হবে, তাহলে তা জায়েয হবে না; তাই মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। কেননা মুদারাবা হচ্ছে এক প্রকার অংশীদারি। এ অংশীদারি হচ্ছে অর্জিত লাভে। কিন্তু এখানে যে শর্ত আলোচিত হলো তা দ্বারা অংশীদারির অবলুপ্তি ঘটতে পারে। কেননা, এমন হতে পারে উল্লিখিত পরিমাণ লাভই অর্জিত হয়েছে, তাহলে সবটুকু লাভ একজনের হাতে চলে যাবে, তখন অপরজন কিছুই পাবে না। তখন অংশীদারিও বাস্তবায়িত হবে না। ফলে মুদারাবাও বাস্তবায়ন করা যাবে না। ১১১
টিকাঃ
১১১. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৫-৮৬; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৮২; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১২৩, মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৩; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩৮
📄 তিন. পুঁজি ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর্মী দায়ী থাকার শর্ত
(اشْتَرَاطُ ضَمَانِ الْمُضَارِبِ عندَ اللف)
হানাফী ও মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেছেন, যদি কোনোভাবে পুঁজি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়, তাতে কর্মীর পক্ষ থেকে কোনো ত্রুটি বা অবহেলা প্রদর্শিত না হলেও কর্মীকে এ জন্যে দায়ী থাকতে হবে- এরূপ শর্ত করা হলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। ১১২
শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের লিখিত গ্রন্থাদি অধ্যয়নেও এ কথাই সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। তারা সে সব গ্রন্থে বলেন, কর্মীর হাতে যে পুঁজি তুলে দেওয়া হয় তা আমানত। আমানতদারের কোনো শৈথিল্য বা অবহেলা প্রদর্শন ব্যতীত যদি আমানত বিনষ্ট বা বিলীন হয়, তাহলে তাকে সে জন্যে দায়ী করা হয় না। তাই পুঁজি বিনষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর্মীকে সেজন্যে দায়ী করা যেমন আমানতের হিসাবের বিপরীত, তেমনি মুদারাবার চাহিদারও পরিপন্থী। ১১৩
টিকাঃ
১১২. আল-ফাতাওয়া আল-আনকারাভিয়্যা, খ. ২, পৃ. ২৩২; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৮৭; ইবনে আব্দিল বার প্রণীত আল-কাফী, খ. ২, পৃ. ১১২; মুদ্রণ : মাতবাআ হাসসান।
১১৩. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৯৫; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫২২
📄 মুদারাবার সময় বেধে দেওয়া বা শর্ত দ্বারা শর্তায়িত করা
(توتيت الضاربه او تعليقها)
মুদারাবা সময় দ্বারা সীমিত করা বা কোনো শর্ত দ্বারা শর্তায়িত করা জায়েয কি-না, তা নিয়ে ফকীহগণ মতপার্থক্য করেছেন। নিম্নে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ এবং গৃহীত মত ব্যক্তকালে হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মুদারাবা সীমিত রাখা সহীহ ও যথাযথ। যেমন, পুঁজির মালিক কর্মীকে বলল, এই পুঁজি দিয়ে আমি তোমার সাথে মুদারাবা করছি এক বছরের জন্যে। এভাবে সীমিত করা জায়েয। কারণ, মুদারাবায় এক প্রকার সম্পদ (নগদ অর্থ) নিয়ে নানা লেনদেন সম্পাদন করা হয়। অন্য সকল সম্পদ হস্তান্তর ও নিয়ন্ত্রণে মেয়াদ নির্ধারিত থাকে, তাই অর্থ সম্পদেও তেমন মেয়াদ নির্দিষ্ট হওয়া হবে যথাযথ ও স্বাভাবিক। তা ছাড়া মুদারাবা চুক্তিতে পুঁজির মালিক কর্মীকে তার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি নির্ধারণ করে। প্রতিনিধিত্ব সময়ে সীমিত হতে পারে, তেমনি মুদারাবা সময়ে সীমিত হবে।
হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ আরো বলেন, পুঁজিদাতা যদি কর্মীকে বলে, তুমি মুদারাবা হিসাবে এই টাকা দিয়ে ব্যবসা করবে এক মাস, এর পরে তা হয়ে যাবে কর্জ, তাহলে তা সহীহ হবে। অতএব, নির্ধারিত সময়ের পর পুঁজির অর্থ বহাল থাকলে তা কর্জ বলে গণ্য হবে। যদি নির্ধারিত মেয়াদ (যেমন আলোচিত উদাহরণে তা এক মাস) অতিক্রান্ত হলে দেখা যায়, নগদ অর্থ হাতে নেই, বরং তার পরিবর্তে রয়েছে দ্রব্যসামগ্রী, তাহলে কর্মীর সে দ্রব্য নগদ অর্থে রূপান্তরিত করা কর্তব্য। তাই সে সেই দ্রব্য বিক্রি করবে। এভাবে যখন তার হাতে অর্থকড়ি আসবে তা কর্জ হয়ে যাবে। এটি এজন্যে, এভাবে সম্পদ বিক্রি করে তা কর্জে রূপান্তর করাতে কখনো পুঁজিদাতার কোনো উদ্দেশ্য থাকে। তাই তার উদ্দেশ্য যেন ব্যাহত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা হবে।
ফকীহগণ আরো বলেন, মুদারাবা চুক্তি কোনো শর্ত দ্বারা ঝুলন্ত করাও সহীহ, তা ভবিষ্যৎ কোনো বিষয়ও হতে পারে। যেমন বলা হলো, যখন মাসের সূচনা হবে এই সম্পদ দিয়ে মুদারাবা কারবার করবে। এভাবে কর্মীকে মুদারাবা পদ্ধতিতে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, তাই তাকে এভাবে ঝুলিয়ে দেওয়া সহীহ হবে, যেমন প্রতিনিধি নিয়োগে এ ধরনের শর্ত উল্লেখ করা সহীহ হয়। ১১৪
মালেকী ও শাফেয়ী আলেমদের মত হাম্বলীদের এক মত। তা হচ্ছে, মুদারাবা সময় দ্বারা সীমিত করাও জায়েয নয়, কোনো শর্ত দ্বারা ঝুলিয়ে দেওয়াও জায়েয নয়। যদি শুরু ও শেষ সময় বলে কাজের মোট সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয় অথবা শুধু শুরু সময় বা শেষ সময় বলা হয় তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। যেমন বলা হলো, এখন থেকে এক বছর মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা করো, যখন অমুক সময় আসবে তখন তুমি মুদারাবা শুরু করবে ইত্যাদি। এভাবে বলা হলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে, তাতে কর্মীকে বাধা প্রদান করা হয় যা মুদারাবা পদ্ধতিতে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করে যাওয়ার পরিপন্থী। তা ছাড়া মুদারাবা চুক্তিতে কোনো বিষয় অজানা থাকলে তা বাতিল হয়ে যায়। তাই ভবিষ্যতের কোনো কিছুর সাথে মুদারাবাকে ঝুলিয়ে দেওয়া জায়েয হবে না। যেহেতু তা ভবিষ্যতে ঘটবে কিনা জানা নেই, ফলে মুদারাবা হবে কিনা তাও অজানা রইল। সেই সাথে আরো লক্ষণীয়, সময় নির্ধারণ করার দরুন মুদারাবার মূল উদ্দেশ্য লাভ করায় বাধার সৃষ্টি হতে পারে। হতে পারে, এ সীমিত সময়ে লাভ হাতে আসবে না, তাহলে মুদারাবা করা হবে নিরর্থক। ১১৫
টিকাঃ
১১৪. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৯৯; আল-ইখতিয়ার, খ. ৩, পৃ. ২১; কাশশাফুল-কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫১২; আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪৩০
১১৫. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৮৭; আল-মুহায্যাব, খ. ১, পৃ. ৩৯৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১২