📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 লুণ্ঠিত সম্পদ দ্বারা মুদারাবা

📄 লুণ্ঠিত সম্পদ দ্বারা মুদারাবা


(الْمُضَارَبَةُ بِالْمَعْصُوبِ)
শাফেয়ীদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত, হানাফীদের মাঝে ইমাম আবু ইউসুফ ও হাসান ইবনে যিয়াদের মত এবং হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের মত হচ্ছে, লুটে নেওয়া সম্পদ দিয়ে মুদারাবা করা হলে তা সহীহ হবে।

এ সম্পর্কে কাসানী বলেন, কোনো পুঁজিদাতা যদি কর্মীর হাতে দায়বদ্ধ যা রয়েছে তার সাথে মুদারাবার সম্পর্ক করে, যেমন লুটে আনা দিরহাম ও দীনারকে পুঁজি সাব্যস্ত করে লুণ্ঠনকারীকে বলে, তোমার হাতে যা রয়েছে তা দিয়ে অর্ধেক লাভ বণ্টনের হারে মুদারাবা করো, তাহলে ইমাম আবু ইউসুফ ও হাসান ইবনে যিয়াদের মতে তা সহীহ হবে। তারা এর কারণ বর্ণনা করে বলেন, এখন লুণ্ঠনকারীর হাতে যা রয়েছে সে তা কাজে (ব্যবসায়) খাটানো পর্যন্ত তা তার হাতেই দায়বদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু সে যখনই তা কাজে লাগাবে, তা দিয়ে কিছু কিনবে, তা তার হাতে আমানত হয়ে যাবে। ফলে তাতে মুদারাবার শর্ত বাস্তবায়িত হওয়ায় তা সহীহ হবে।

শাফেয়ী মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহ বলেন, লুণ্ঠনকারী তার লুটে আনা সম্পদ দিয়ে মুদারাবা করা যথাযথ ও সহীহ হবে। যেহেতু লুণ্ঠনকারী কর্মীর হাতে লুণ্ঠনকৃত সম্পদ নির্দিষ্টভাবে রক্ষিত রয়েছে, (তাই তা ব্যবহারে কোনো ঝামেলা নেই।) এর বিপরীতে পুঁজি সরবরাহ করা যদি পুঁজিদাতার দায়িত্বে থেকে যায় তাহলে তা কজা করার পর নির্দিষ্ট হয়। যে ব্যক্তি লুণ্ঠনকারী নয় সে লুণ্ঠিত সম্পদ দিয়ে মুদারাবা করা সহীহ হবে। তাতে শর্ত হচ্ছে, পুঁজিদাতা বা কর্মী সে সম্পদটা হস্তগত করতে সক্ষম হতে হবে। এভাবে লুণ্ঠিত সম্পদ কর্মীর হাতে চলে গেলে লুণ্ঠনকারী তার অপরাধ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে, যেহেতু সে সম্পদ মূল মালিকের কথা মতোই কর্মীর হাতে সে বুঝিয়ে দিয়েছে। ফলে সে সম্পদে লুণ্ঠনকারীর আর কোনো দখল বাকী থাকেনি। এভাবে মূল মালিকের অধিকারে দেওয়ার ফলে লুণ্ঠনকারী রেহাই পাবে, শুধু মুদারাবা হওয়ার দ্বারাই এ ফয়সালা চূড়ান্ত হবে না। ৬৮

শাফেয়ী আলেমগণ তাদের উপরিউক্ত সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতের বিপরীত অপর এক মতে বলেন, যা হানাফী মাযহাবের যুফারেরও মত, লুণ্ঠন করা সম্পদ দ্বারা মুদারাবা করা যথাযথ নয়। তারা এর কারণ হিসাবে বলেন, মুদারাবার চাহিদা হচ্ছে কর্মীর হাতে থাকা সম্পদ হবে আমানত, লুণ্ঠিত মাল তো লুণ্ঠিত-ই, সেটিতো আর আমানত নয়। তাই তা দ্বারা মুদারাবার লেনদেন করা যথাযথ হবে না তাই মুদারাবা-ই সহীহ হবে না। ৬৯

টিকাঃ
৬৮. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮০; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়‍্যা, খ. ৪, পৃ. ২৮৬; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১১৮; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৮৫; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৩৮১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫২৩
৬৯. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮০; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১১৮; আল-মুহায্যাব, খ. ১, পৃ. ৩৮৫; আসনাল মাতালিব ও হাশিয়া আর-রামালী, খ. ২, পৃ. ৩৮১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 কোনো বস্তুর বিস্তৃত অংশ দিয়ে মুদারাবা

📄 কোনো বস্তুর বিস্তৃত অংশ দিয়ে মুদারাবা


(الْمُضَارَبَةُ بِالْمَالِ الْمَشَاعِ)
হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের সম্মিলিত মত হচ্ছে, কোনো বস্তুর বিস্তৃত এক অংশ দিয়ে মুদারাবা ব্যবসা করা জায়েয। তাই কেউ যদি অপরকে কোনো সম্পদ প্রদান করে, তার এক অংশ (যেমন দুই তৃতীয়াংশ) মুদারাবার পুঁজি হিসাবে, অপর অংশ (যেমন অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ) মুদারাবা ভিন্ন অন্য কোনো হিসাবে, যদি এ অংশ সম্পূর্ণ সম্পদে বিস্তৃত হয় (যেমন দুই তৃতীয়াংশ পুরো সম্পদে বিস্তৃত অংশ) তাহলে তা দ্বারা মুদারাবা সহীহ ও জায়েয হবে। কেননা এভাবে কোনো অংশ সম্পূর্ণ সম্পদে বিস্তৃত হওয়া তা কজা করা, নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিজ ইচ্ছা মাফিক তা দিয়ে লেনদেন করা ইত্যাদি কোনো কিছুতে বাধা সৃষ্টি করে না। তাই কর্মী মুদারাবা চুক্তি অনুসারে সম্পদের সে অংশ পুঁজি হিসাবে গ্রহণ করে তাতে তার ইচ্ছামাফিক কর্তৃত্ব প্রকাশ করতে এবং যাবতীয় লেনদেনে তা ব্যবহার করতে পারে। তবে সম্পদে অংশ বিস্তৃত হওয়া মুদারাবা সংঘটনে বাধা ও প্রতিবন্ধক হয় যদি তা নিয়ন্ত্রণ ও যথেচ্ছা ব্যবহারে বাধার সৃষ্টি হয়। যেমন সম্পদের এক অংশ কর্মীকে দেওয়া হলেও অন্য অংশ থাকে কর্মী ভিন্ন অন্য কারো হাতে। ফলে কর্মী তার ইচছামাফিক তা ব্যবহার করতে পারে না। কিন্তু যদি পুঁজির মালিক এক অংশ নিজের আওতায় রেখে অপর অংশ কর্মীকে প্রদান করে, তবে যেহেতু কর্মী তা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারে বাধার সম্মুখীন হয় না, তাই তা মুদারাবার পুঁজি হতে পারে। ৭০

টিকাঃ
৭০. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৩; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১১৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ২৩-২৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদারাবায় অর্জিত লাভের সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি

📄 মুদারাবায় অর্জিত লাভের সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি


(مَا يَتَعَلَّقُ بِالرِّبِّحِ مِنَ الشروط)
এক. লভ্যাংশ নির্দিষ্ট থাকা জ্ঞাত ও সুবিদিত হওয়া (كَوْنُ الرِّبِّحِ مَعْلُومًا) :
সকল ফকীহ এ কথায় একমত, মুদারাবা যথাযথ ও সঠিক হওয়ার জন্যে শর্ত হলো, অর্জিত লাভে কার কত অংশ তা উভয়ের জানা থাকতে হবে। কেননা, এ চুক্তির মূল কাম্য বিষয় হচ্ছে ব্যবসায়ে লাভ অর্জন। তাই তা অজানা থাকলে মুদারাবাই বাতিল হয়ে যাবে। ৭১

শাফেয়ী আলেমদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতে এবং হানাফী ও হাম্বলী আলেমদের মতে, কেউ যদি অপর কাউকে এ কথায় এক হাজার দিরহাম প্রদান করে যে তারা উভয়ে প্রাপ্ত লাভে অংশীদার হবে, কিন্তু কে কত অংশ তা আলোচনা না করে, তবুও মুদারাবা সহীহ হবে। এ ক্ষেত্রে লাভ তাদের দুজনের মাঝে অর্ধেক হারে বণ্টিত হবে। ৭২ এর কারণ, অংশীদার হওয়ার স্বাভাবিক দাবি হচ্ছে, সকল অংশীদার সমভাগের অধিকারী হবে। যেমন মৃতের সম্পত্তি বণ্টনের বিধানে আল্লাহ তাআলা বলেন : فَهُمْ شُرَكَاءُ فِي الثُّلُتْ “তারা (মৃতের বৈপিত্রেয় ভাইবোনেরা) মৃতের এক তৃতীয়াংশ সম্পত্তিতে (সম) অংশীদার।”৭৩

দারদীর বলেন, যদি টাকা দেওয়ার সময় পুঁজিদাতা কেবল এটুকু বলে, অর্জিত লাভ আমাদের দুজনের মধ্যে বণ্টিত হবে (কার কত অংশ তা না বলে); তাহলে এটিই স্বাভাবিক ও প্রকাশ্য যে, উভয়ে অর্ধেক করে নেবে। এর কারণ, শুধু এতটুকু কথা সাধারণ্যে এটিই বোঝায় যে, উভয়ে সমহারে পাবে। কিন্তু পুঁজিদাতা যদি এভাবে বলে, তুমি আমার টাকা নিয়ে ব্যবসা করো, লাভে তোমার অংশ থাকবে, তাহলে তার এ কথা যদি সুস্পষ্টভাবে কিছু বোঝায়, সে এলাকায় এভাবে বললে যদি অর্ধেক বা অন্য কোনো অংশ বোঝানোর প্রচলন থাকে তাহলে মুদারাবা সহীহ হবে। নতুবা শুধু এতটুকু বলা, 'লাভে তোমার অংশ রয়েছে', অথচ সে অংশটা কত তা নির্ধারিত না হয়, তাহলে মুদারাবা সহীহ হবে না, বাতিল হয়ে যাবে। ৭৪

দুই. প্রাপ্ত লাভ বিস্তৃত অংশ হতে হবে (كَوْنُ الرِّبْحِ جُزْءًا شَائعًا) :
সকল ফকীহ এ কথায় একমত, পুঁজিদাতা ও কর্মী উভয়ের লাভ হবে বিস্তৃত অংশ : অর্ধেক অর্ধেক, একজনের এক তৃতীয়াংশ, অপর জনের দুই তৃতীয়াংশ ইত্যাদি। যদি তারা দুজনে মিলে কোনো একজনের জন্যে নির্ধারিত পরিমাণ শর্ত করে; যেমন কর্মীর জন্যে একশ দিরহাম বা অন্য এমন কোনো সংখ্যা, অবশিষ্ট লাভ পুঁজিদাতার, তাহলে এ বণ্টন জায়েয হবে না। তাই মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। যেহেতু মুদারাবা হচ্ছে এক প্রকার অংশীদারি। এই চুক্তিতে অংশীদারি হবে প্রাপ্ত লাভে। কিন্তু এখানে যে শর্ত আলোচিত হলো তা অংশীদারি বাতিল করে দিতে পারে, যেহেতু এমন হতে পারে, কর্মী ব্যবসা করে এই পরিমাণ লাভই অর্জন করেছে। যদি একজনকে একশ দিরহাম দেওয়ার শর্ত থাকে এবং তাকে তা দেওয়া হয়, তাহলে অপরজন লাভপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। যেহেতু এভাবে অংশীদারি বহাল থাকে না, তাই এমন শর্ত করা হলে মুদারাবাই সহীহ হবে না। ৭৫

কাসানী বলেন, এমনিভাবে যদি তারা শর্ত করে, পুঁজিদাতা ও কর্মী এ দুজনের কোনো একজনের প্রাপ্ত অংশ হবে মোট লাভের অর্ধেক এবং একশ দিরহাম, তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। কেননা হতে পারে মোট লাভ হয়েছে দুশ দিরহাম। সেক্ষেত্রে তার অর্ধেক একশ দিরহাম এবং সেই সাথে উল্লেখকৃত একশ দিরহাম দিলে পুরো লাভ একজনকেই দেওয়া হবে, অপরজন কিছুই পাবে না। এভাবে প্রমাণিত হলো, অর্ধেক ও একশ দিরহাম এমন শর্ত যা অংশীদারির পরিপন্থী; এটা অংশীদারিকে বিঘ্নিত করে। তেমনিভাবে যদি বলা হয়, একজনের লাভ অর্ধেক থেকে একশ দিরহাম কম, তাহলে হতে পারে মোট লাভ হয়েছে দুশ দিরহাম। তা থেকে অর্ধেক হিসাবে একশ দিরহাম নেওয়ার পর আবার একশ দিরহাম ফেরত দিলে তার লাভ নেওয়া পড়ে না মোটেই, এটিও অংশীদারিকে বিনষ্ট ও বাতিল করে। তাই এ ধরনের শর্ত করা হলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে।

যদি পুঁজিদাতা ও কর্মী শর্ত করে, ব্যবসায়ে লোকসান হলে তা দুজনের মাঝে বণ্টিত হবে, তাহলে তাদের এ শর্ত বাতিল হবে; তা কার্যকর হবে না। তবে মুদারাবা বাতিল হবে না, তা বহাল থাকবে। শর্ত বাতিল হওয়ার কারণ, লোকসান যা হয় তা পুঁজির এক অংশ, যা বিনষ্ট বা বিলীন হয়ে যায়। সুতরাং এটি কেবল পুঁজিদাতার একার কাঁধে পড়বে। তা ছাড়া মুদারাবা হচ্ছে প্রতিনিধিত্ব, কর্মী পুঁজিদাতার প্রতিনিধি হয়ে যাবতীয় কাজ সম্পাদন করে। নিয়ম হচ্ছে, কোনো ফাসেদ শর্ত করা হলে তা প্রতিনিধিত্বে কার্যকর হয় না। তাই শর্তটি বাতিল হবে, তবে মুদারাবা বাতিল হবে না। তাই ক্ষতি উভয়ের কাঁধে না এসে তা কেবল পুঁজিদাতার কাঁধে আসবে।

হানাফী আলেমগণ বলেন, যদি পুঁজি সরবরাহকারী শর্ত করে : লাভের এক অংশ গরীবদের মাঝে বণ্টন করা হবে, হজযাত্রীদের দেওয়া হবে ইত্যাদি, তাহলে চুক্তিটি বহাল থাকলেও শর্ত বাতিল বলে প্রত্যাখ্যাত হবে। ফলে এ সকল খাতে বরাদ্দ সবটুকু লাভ পুঁজিদাতার নামে বরাদ্দ হবে।

যদি শর্ত করা হয় কর্মী যাকে খুশি লাভের এক অংশ প্রদান করবে, এক্ষেত্রে কর্মী যদি তা নিজের বা পুঁজিদাতার নামে বরাদ্দ করে তা সহীহ হবে। কিন্তু এ দুজন ব্যতীত আর কারো জন্যে ধার্য করলে সে শর্ত বাতিল হয়ে যাবে। তৃতীয় কারো নামে লাভের অংশ বরাদ্দ করার সময় সে যদি তার কাজে অংশগ্রহণ করার শর্ত করে তবে এ বরাদ্দ কার্যকর হবে। নতুবা তা কার্যকর হবে না। অবশ্য কাহাস্তানী বলেন, তৃতীয় ব্যক্তি কোনো কাজে অংশী হোক বা না হোক তার জন্যে বরাদ্দ করা সহীহ হবে।

তৃতীয় ব্যক্তির জন্যে যা শর্ত করা হবে তা সে পাবে যদি তার কাজ করার শর্ত করা হয়, নতুবা তার জন্যে বরাদ্দ অংশ পুঁজির মালিক পাবে। ৭৬

যদি শর্ত করা হয়, আংশিক লাভ ব্যয় করা হবে কর্মীর কোনো ঋণ পরিশোধে বা পুঁজিদাতার কোনো ঋণ পরিশোধে, তাহলে তা জায়েয হবে এবং শুধু এই ঋণ পরিশোধেই তা ব্যয়িত হবে, সকল পাওনাদারের দাবিপূরণে তা ব্যয় করা হবে না। ৭৭

শাফেয়ী আলেমগণ বলেন, লাভের সাথে সংশ্লিষ্ট শর্ত রয়েছে চারটি :
এক. পুঁজিদাতা ও কর্মী এ দুজনের মাঝেই লাভ বণ্টন নির্ধারিত থাকবে, তাতে তৃতীয় কেউ অংশী হবে না। তাই যদি তৃতীয় কাউকে আংশিক লাভ প্রদানের শর্ত করা হয় তবে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। তবে যদি সে তৃতীয় ব্যক্তির অংশীদার হয়ে কাজ করার শর্ত উল্লেখ করা হয়, সেও এ মুদারাবায় কর্মী হিসাবে কাজ করে, তবে লাভেও অংশীদার হবে।

দুই. লাভটা তাদের দুজনের মাঝে বণ্টিত হবে, একজন পুঁজির মালিক হিসাবে অপরজন কর্মী হিসাবে। এ দুজনের কোনো একজনকে লাভ প্রদানে নির্ধারিত এবং তাতেই সীমিত করা চলবে না। যদি কোনো একজনকে শুধু লাভ প্রদানের শর্ত করা হয় তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে।

তিন. লাভে কার কত অংশ তা উভয়ের জানা থাকতে হবে। যদি পুঁজিদাতা বলে, আমি তোমার সাথে মুদারাবা করছি এ শর্তে যে, প্রাপ্ত লাভে তোমারও অংশ থাকবে। কিন্তু সে অংশ কতটুকু তা যদি না বলে, তাহলে মুদারাবা সহীহ হবে না; বাতিল হয়ে যাবে।

চার. লাভ বণ্টিত হতে হবে অংশ হিসাবে, তাতে নির্ধারিত পরিমাণ উল্লেখ করা যথাযথ হবে না। তাই যদি কেউ বলে, প্রাপ্ত লাভ থেকে তোমার বা আমার একশ দিরহাম নেওয়ার পর অবশিষ্টটুকু সমানভাগে বণ্টিত হবে, তাহলে মুদারাবা সহীহ হবে না, যেহেতু এখানে শুধু অংশ না বলে পরিমাণসহ অংশ উল্লেখ করা হয়েছে। ৭৮

হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি শর্ত করা হয় ব্যবসায়ে অর্জিত পুরো লাভ পাবে কর্মী, তাহলে এটি আর মুদারাবা বলে অভিহিত হবে না, এটি হয়ে যাবে ঋণপ্রদান। যেহেতু লাভ একজনে সীমাবদ্ধ করায় তাতে মুদারাবা সহীহ হয় না, তাই তা বাদ দিয়ে এর নাম হবে ঋণপ্রদান। এখানে পুঁজিদাতা কর্মীকে পুরো পুঁজিটাই ঋণপ্রদান করেছে, তাই এটি পরিচিত হবে কর্জ বলে। মুদারাবাকেও কিরায বলা হয়, যা কর্জ শব্দ হতেই নির্গত। যে কোনো চুক্তিতে তার অন্তর্নিহিত অর্থেরই মূল্যায়ন হয়ে থাকে, এখানেও তাই কর্জের দিকটি গুরুত্ব পাবে। ৭৯

এমনিভাবে যদি শর্ত করা হয় পুরো লাভ পাবে পুঁজিদাতা একাই, তাহলে এটা হবে ইবযা, তাতে ইবযা-এর বৈশিষ্ট্য থাকার দরুন, তা মুদারাবা হবে না। ইবযা হচ্ছে কর্মী স্বেচ্ছাসেবা হিসাবে ব্যবসা করে পুঁজিদাতাকে সে লাভ পাইয়ে দেওয়া।

মালেকী ফকীহদের মাযহাব উপরিউক্ত কথাগুলোর খুবই কাছাকাছি। তারা বলেন, ব্যবসায়ে অর্জিত পুরো লাভ পুঁজিদাতা অথবা কর্মী অথবা অন্য কারো জন্যে সাব্যস্ত করা জয়েয হবে। তখন তা আর মুদারাবা থাকবে না, হয়ে যাবে ইবযা। তথাপি যদি তাকে মুদারাবা বলা হয় তবে তা হবে রূপক, সাদৃশ্য থাকার দরুন তা কথিত হবে। এটি হবে তখন সম্পূর্ণ সেবামূলক কার্য, বাণিজ্যভিত্তিক কাজ নয়। ৮০

হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি পুঁজি সরবরাহকারী তার কর্মীকে বলে, তুমি পুঁজি হিসাবে এ সম্পদ হস্তগত করে তা দিয়ে ব্যবসা করো, তাতে যা লাভ হবে তার সবটা তোমার একার, তাহলে এটি হবে কর্জ, কর্মীকে ঋণ প্রদান; কিরায (মুদারাবা) নয়। সে যখন বলেছে তুমি পুঁজি হিসাবে এ সম্পদ হস্তগত করে তা দিয়ে ব্যবসা করো, তার এ কথায় কর্জ ও কিরায (মুদারাবা) দুটিরই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু পরে যখন সে বলেছে তাতে যা লাভ হবে তার সবটা তোমার একার, তাতে কর্জের দিকটিই প্রবল হয়ে উঠেছে, তাই তা আর কিরায থাকেনি। যদি পুঁজিদাতা সে কথাগুলোর সাথে একথাও বলে, তাতে তোমার কোনো দায়দায়িত্ব নেই, তাহলে তার এ কথা বলার দরুন সে দায়মুক্ত হয়ে যাবে না। বরং দায়মুক্তির এ শর্তই বাতিল হয়ে যাবে। যেমন কেউ অপর কাউকে বলল, কর্জ হিসাবে তুমি এ টাকা নাও, তাতে তোমার কোনো দায় নেই, এর সদৃশ, তাতে সে দায়মুক্ত হয়ে যায় না।

যদি কেউ কাউকে বলে, তুমি পুঁজি হিসাবে এ সম্পদ গ্রহণ করো, তা দিয়ে ব্যবসা করো। তাতে যা লাভ হবে তার সবটুকু আমার, তাহলে এটি মুদারাবা না হয়ে হবে ইবযা (إبْضاع)। ইবযা হচ্ছে কারো পুঁজি দিয়ে ব্যবসা করে তাকে লাভের মালিক বানানো, যা স্বেচ্ছাসেবার অন্তর্ভুক্ত। যদি কেউ বলে, মুদারাবা হিসাবে তুমি এ পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করো, তাতে যা লাভ হবে তার সবটা আমার অথবা তোমার, তাহলে এটি মুদারাবা হবে না, হবে ইবযা অথবা কর্জপ্রদান। শাফেয়ী আলেমগণ তাদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতে এ কথাটিই গ্রহণ করেছেন।

তাদের এই মতের বিপরীত যে মত আলোচিত হয়েছে তা হলো, যদি কেউ কাউকে বলে, আমি তোমার সাথে মুদারাবা চুক্তি করছি, তাতে পুরো লাভটা তোমারই থাকবে, তাহলে তা যথাযথ মুদারাবা বলেই গণ্য হবে। কিন্তু যদি বলে, পুরো লাভটা থাকবে আমার, তাহলে তা আর মুদারাবা থাকবে না, ইবযা হয়ে যাবে। ৮১

টিকাঃ
৭১. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৫; আশ শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৮২ ও ৬৮৭; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৩; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৬, পৃ. ১২২-১২৪; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫১৪
৭২. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৬৫; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১২৩; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৩২৮; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩৩
৭৩. সূরা নিসা, আয়াত ১২
৭৪. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৮৭
৭৫. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৫-৮৬; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৮২-৬৮৭; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১২২-১২৪; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ২৯-৩২
৭৬. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৫-৮৬
৭৭. আদ-দুররুল মুখতার, খ. ৪, পৃ. ৪৮৫, ৪৮৮-৪৮৯
৭৮. রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১২২-১২৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১২-৩১৩
৭৯. হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৮৫
৮০. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, প. ৬৯২; আল খিরাশী, খ. ৬, পৃ. ২০৯
৮১. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 কর্মীর কাজকর্ম ও ক্ষমতা

📄 কর্মীর কাজকর্ম ও ক্ষমতা


(تَصَرُّفَاتُ الْمُضَارِبِ)
কর্মীর সকল কাজ এবং তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নিম্ন আলোচিত চার প্রকারের অন্তর্ভুক্ত :
এক. কোনো কিছু বলে না দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মীর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বিস্তৃত ও ব্যাপক : পুঁজির মালিক যদি কর্মীর কাজ নির্ধারণ করে না দেয়, বরং তার কাজের স্থান সময় বা কাজের ধরন ও বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি কিছুই না বলে, কর্মীর সাথে আরো কেউ সহায়তা করবে কিনা তাও যদি না বলে, এভাবে কোনো কিছুই না বলে কেবল এটুকু বলে, তুমি মুদারাবার পুঁজি হিসাবে এ সম্পদ গ্রহণ করো, তাতে এভাবে লাভ বণ্টিত হবে, তাহলে কর্মী সব কিছুই করতে পারবে। সে-ই কিনবে, সে-ই ভাড়া দেবে, সেই বিক্রি করবে, সেই ভাড়া নেবে, সে-ই ঋণ দেবে, সে-ই ঋণ নেবে, সে-ই বন্ধক রাখবে, সে-ই কাউকে প্রতিনিধি নির্ধারণ করবে। সে-ই ইবযা করতে চাইলে করবে, সে-ই একালা করতে চাইলে করবে ইত্যাদি, সব কিছুই তার এখতিয়ারে থাকবে। কেননা, এ সবই ব্যবসার কাজ, আর কর্মী তো ব্যবসাই করছে।

হানাফী মাযহাবের আলেমগণ এ কথাই বলেন। ৮২ অধিকাংশ ফকীহ এর কাছাকাছি বক্তব্যই প্রদান করেছেন। শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, কর্মী ব্যবসাপণ্য কেনা ও বেচা করে যেতে পারবে, পুঁজির মালিক তাকে এ কাজগুলো করার অনুমতি না দিলেও। কারণ তার উদ্দেশ্য ব্যবসায়ে লাভ করা এবং পণ্য কেনাবেচার মাধ্যমেই লাভ অর্জিত হয়। ৮৩

হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, মুদারাবাতে অংশীদারি কারবারের সে সকল বিধান কার্যকর হবে যেগুলো কর্মীর সাথে সম্পর্কিত। সে হিসাবে কর্মী পণ্য কেনা, বেচা, কব্জা করা, কজা করানো ইত্যাদি সব কিছুই করতে পারবে। ৮৪

যদি পুঁজিদাতা শর্তহীনভাবে পণ্য বিক্রির অনুমতি প্রদান করে তবে কর্মী তা নগদ বিক্রি করতে পারবে, তা নিয়ে হাম্বলী আলেমদের কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু বাকীতে বিক্রি করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে পরস্পর বিপরীত দুটো মতের উল্লেখ পাওয়া যায়। এক. কর্মী বাকীতে কোনো কিছু বিক্রি করতে পারবে না। যেহেতু সে বেচাকেনায় পুঁজির মালিকের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি এবং তার স্থলবর্তী, তাই পুঁজিদাতার এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট অনুমতি ছাড়া কর্মীর এ ভাবে বিক্রি করা জায়েয হবে না; যেমন বিক্রির প্রতিনিধির জন্যে তা জায়েয নয়। এমনটা এজন্যে, যেহেতু স্থলবর্তী ব্যক্তির যে কোনো ক্ষেত্রে সতর্কতার ভিত্তিতে কাজ করে যাওয়া বাঞ্ছনীয়, সতর্কতার পরিপন্থী কোনো কাজ করা তার জন্যে জায়েয নয়। মূল্য বাকী রাখা হলে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাই তা জায়েয হবে না। মালিক কোনো শর্ত ছাড়া বললেও এ অবস্থা তার কথাটিকে শর্তযুক্ত করে দিয়েছে। তাই মালিক যদিও বলেছে, তুমি বিক্রি করো, কিন্তু অবস্থার আলোকে তা ধরা হবে, তুমি নগদ বিক্রি করো।

দুই. তাদের দ্বিতীয় মতটি হচ্ছে, কর্মী বাকীতে বিক্রি করতে পারবে, তা তার জন্যে জায়েয। ইবনে আকীল এটি পছন্দ করেছেন। এ মতের যুক্তি হচ্ছে, পুঁজির মালিক কর্মীকে ব্যবসা করার অনুমতি দিয়েছে। তার সাথে সে মুদারাবা চুক্তি করেছে। এর দ্বারা স্বাভাবিকভাবে প্রচলিত ব্যবসা করাই বোঝায়। প্রচলিত ব্যবসাতে যেমন নগদ বিক্রি রয়েছে, বাকীতে বেচাকেনারও প্রচলন রয়েছে। সেই সাথে ব্যবসাতে যেহেতু উদ্দেশ্য হচ্ছে লাভ করা, তাই বাকীতেও সে ব্যবসা করতে পারবে, যেহেতু বাকীতে লাভের পরিমাণ থাকে বেশি। নিছক প্রতিনিধি হয়ে কোনো পণ্য কেনা বা বেচার সাথে এটিকে মিলানো যথার্থ নয়। যেহেতু প্রতিনিধিত্বে লাভের কোনো বিষয় থাকে না, সেখানে শুধু থাকে উপযুক্ত দামে বিক্রি করা। তাই নগদ বিক্রি করলে যেহেতু ঝুঁকিহীনভাবে মূল্য হস্তগত হয়ে যায় তাই সেক্ষেত্রে নগদ বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়। বাকীতে বিক্রি হলে ধোঁকার সম্ভাবনা থাকার প্রেক্ষিতে তার অনুমতি দেওয়া হয় না। ৮৫

শাফেয়ী ও হাম্বলী আলেমদের মতে কর্মী ত্রুটিপূর্ণ বস্তু কেনার অধিকার রাখে, যদি সে তা কেনা লাভজনক বিবেচনা করে। যেহেতু কর্মী লাভ করতে এসেছে, আর ত্রুটিপূর্ণ বস্তুতে সে হয় তো লাভ অধিক দেখছে, তাহলে সে তা কেনে বেচতে পারবে। ৮৬

শাফেয়ীগণ তাদের অপর মতে বলেন, যদি পণ্যে ত্রুটি থাকার প্রেক্ষিতে তা ফিরিয়ে দেওয়াই লাভজনক বিবেচনা করা হয়, তাহলে তা বিক্রি না করে বরং মূল মালিকের নিকট ফিরিয়ে দেবে। যদি ত্রুটি থাকলেও তা রেখে দেওয়া লাভজনক বিবেচিত হয় তাহলে তা রেখে দেবে, এটিই সর্বাধিক সঠিক মত। এ উভয় অবস্থায় ত্রুটি থাকা ব্যবসায়ে লাভ বা ক্ষতি টেনে আনবে কি না, তা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ৮৭

টিকাঃ
৮২. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৭-৯০; আল-ইখতিয়ার, খ. ৩, পৃ. ২০
৮৩. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২২৯-২৩১; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৮৭
৮৪. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫১১
৮৫. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩৯-৪০
৮৬. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২২৯-২৩১; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৮৭; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪৪
৮৭. পূর্ববর্তী সূত্র।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00