📄 কর্মীর নিকট থাকা ঋণ দিয়ে মুদারাবা
হানাফী, মালেকী ও শাফেয়ী আলেমদের সম্মিলিত মত, যা হাম্বলী আলেমদের একটি মত, কর্মীর কাছে পুঁজিদাতার বকেয়া ঋণকে পুঁজি ধরে মুদারাবা ব্যবসা করা যথাযথ ও সঠিক নয়। হাম্বলী কতক আলেম এটি সহীহ বলে মত প্রদান করেছেন। বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে বিধৃত হচ্ছে :
মুদারাবার পুঁজি সম্পর্কে হানাফী মাযহাবের আলেমদের সুস্পষ্ট অভিমত হচ্ছে, এটি হতে হবে নগদ মুদ্রা, তাহলেই মুদারাবা সহীহ হবে। যদি তা না হয়ে ঋণকে পুঁজি ধরা হয় তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। তাই কারো যদি অপর কারো কাছে ঋণ হিসাবে টাকা পাওনা থাকে, সে যদি ঋণীব্যক্তিকে বলে, তোমার কাছে আমার যা ঋণ রয়েছে তা পুঁজি হিসাবে খাটিয়ে ব্যবসা করো, এ মুদারাবা ব্যবসাতে অর্ধেক করে লাভ বণ্টন করা হবে; তাহলে তা সহীহ হবে না। হানাফী সকল আলেমের মতে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। যদি ঋণদাতার কথা শুনে কর্মী কোনো কিছু কেনে এবং তা বিক্রি করে, তবে লাভ হলেও তা তার একার, ক্ষতি হলেও তার একার হবে এবং ঋণ যথাপূর্বই তার দায়িত্বে বহাল থাকবে। এটি ইমাম আবু হানিফার মত। তিনি এই ফয়সালা প্রদান করেন এ জন্যে যে, কেউ যদি তার পাওনাদারকে প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব দেয়, তার কাছে যা পাওনা রয়েছে তা দ্বারা সে ঋণদাতার পক্ষ থেকে কোনো কিছু কিনবে, তাহলে তা সহীহ হবে না। এটি ইমাম আবু হানিফার মত। অতএব, সে ঋণী ব্যক্তি যদি তার কথা অনুসারে সে বস্তু কেনে তাহলে সে ব্যক্তি ঋণের দায় থেকে মুক্তও হবে না। দায়িত্বে থাকা ঋণ-এর বিপরীতে কোনো কিছু কেনার নির্দেশই যখন যথার্থ নয়, তখন দায়ে থাকা ঋণের দ্বারা মুদারাবা ব্যবসা করা তো বৈধ ও সঠিক হবেই না।
এক্ষেত্রে কারণ বর্ণনা করে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ বলেন, উপরিউক্ত অবস্থায়- যখন পুঁজিদাতা তার ঋণকে পুঁজি সাব্যস্ত করে কর্মীকে ব্যবসা করতে বলবে, তার কথা অনুযায়ী যদি কর্মী কোনো কিছু কেনে বিক্রি করে, তবে লাভ হলে তা পুঁজিদাতার একার হবে, ক্ষতি হলেও তার একার ওপর বর্তাবে। মাসআলার রূপ এমন হওয়ার কারণ, তাদের দৃষ্টিতে ঋণে বা পাওনায় প্রতিনিধিত্ব সহীহ ও যথাযথ, কিন্তু তাকে পুঁজি সাব্যস্ত করে মুদারাবা সহীহ নয়। যেহেতু প্রতিনিধিত্ব সহীহ, তাই ধরা হবে, কর্মী পুঁজিদাতার প্রতিনিধি হয়ে সে জিনিসটি কিনেছে। এরপর পুঁজিদাতা তাকে সে পণ্যটি পুঁজি হিসাবে প্রদান করেছে। যেহেতু সাহেবাইনেরও মত হচ্ছে, মুদারাবাতে পুঁজি হতে হবে নগদ অর্থ; কোনো পণ্য নয়, তাই পণ্যটি পুঁজি হিসাবে ধরা হলেও মুদারাবা সহীহ হবে না। তাই মুদারাবা বাতিল হয়ে কেবল প্রতিনিধিত্ব ধর্তব্য হবে। এভাবে সে পণ্যটি কেবল পুঁজিদাতার একার মালিকানায় থাকায় তা বিক্রিতে যা লাভ বা ক্ষতি তা হবে তার একার; তাতে কর্মীর কোনো অংশ থাকবে না। ৫৬
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, কর্মীর কাছে থাকা পাওনাকে পুঁজি সাব্যস্ত করণ সহীহ নয়। তাই পুঁজি সরবরাহকারী তার দেনাদারকে এ ধরনের কথা বলা সঙ্গত নয়, তোমার কাছে থাকা আমার পাওনাকে পুঁজি ধরে অর্ধেক অর্ধেক লাভের ভিত্তিতে মুদারাবা ব্যবসা করো। যেহেতু এভাবে বলা হলে তা হবে এমন সরফ বিক্রি, যেখানে পণ্য কজা করার পূর্বেই তাতে লাভে বিক্রি করা হচ্ছে, যা জায়েয নয়। তাই এটি কার্যকর হবে না, আর তাই পাওনাদারের পাওনা যথাপূর্ব বহাল থাকবে। যেহেতু এভাবে মুদারাবা সহীহ হবে না এবং পাওনাদারের পাওনাও বহাল থাকবে, তাই কর্মী যা কিনবে বেচবে তাতে লাভ হলে তার হবে, ক্ষতি হলেও হবে তার একার। তবে যদি ইতোমধ্যে পুঁজিদাতা তার কর্মীর নিকট থাকা তার পাওনা নিয়ে নেয় এবং তা পুনরায় কর্মীর হাতে তুলে দেয় মুদারাবার পুঁজি হিসাবে তাহলে তা সহীহ হবে। এর পরবর্তী লেনদেন মুদারাবা হিসাবে গণ্য ও সহীহ হবে। এর পূর্ববর্তী কোনো লেনদেন মুদারাবা বলে গণ্যও হবে না, সে হিসাবের আওতায় আসবেও না। ৫৭
শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি কোনো পুঁজিদাতা তার দেনাদারকে বলে, তোমার কাছে আমার যা পাওনা রয়েছে তা পুঁজি ধরে আমি তোমার সাথে মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা করব, তাহলে তা সহীহ হবে না। পুঁজিদাতা যদি বলে, তোমার সম্পদ থেকে আমার প্রাপ্য সম্পদ পৃথক করো। দেনাদার তা পৃথক করার পর পাওনাদার কব্জা না করেই যদি তা পুঁজি ধার্য করে তাহলেও মুদারাবা সহীহ হবে না। যেহেতু দেনাদার যা তার সম্পদ থেকে দেনা হিসাবে পৃথক করেছে তা পাওনাদার কব্জা না করা পর্যন্ত সেটি তার মালিকানায় আসেনি। তাই তাতে পুঁজিদাতার কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণও আসেনি, তাই তা পুঁজি ধার্য করে কর্মীকে তা প্রদানও সহীহ হবে না।
যদি কর্মী দেনাদার তার পাওনাদারের কথা অনুযায়ী তার প্রাপ্য পৃথক করে তা দিয়ে মুদারাবা হিসাবে পণ্য কেনাবেচা করে তবে তাতে দুটি অবস্থা হতে পারে : এক. হয়তো সে নগদ অর্থব্যয়ে পণ্যটি কিনেছে। তাহলে সে এই পণ্য ক্রয়ে নিজের অর্থব্যয় করা ফুযুলীতুল্য হয়েছে। ফুযুলী হচ্ছে যে ব্যক্তি মূল নয়, তার প্রতিনিধিও নয়, তার অসী বা অভিভাবকও নয়। এমন ব্যক্তির কেনাকাটা মূল ব্যক্তির অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকে। দুই. অথবা সে পণ্যটির মূল্য প্রদান বকেয়া রেখেছে। সেক্ষেত্রে শাফেয়ী আলেমগণ দুটো মত ব্যক্ত করেছেন। এক মতে, পণ্যটি হবে পাওনাদারের, যেহেতু তার অনুমতি বা নির্দেশেই সে এটি কিনেছে। বাগাভী এ মতটি সঠিকতর ও বিশুদ্ধতর বলে দাবি করেছেন। তাদের এক্ষেত্রে অপর মত হচ্ছে, পণ্যটি কর্মীর মালিকানায় থাকবে, আবু হামেদ এটিই অধিক বিশুদ্ধ বলে মত প্রদান করেছেন।
যেহেতু পৃথক করা সম্পদ মালিক কব্জা না করেই তা দিয়ে ব্যবসা করতে দিয়েছে, তাই প্রথম অবস্থায় এবং দ্বিতীয় অবস্থার প্রথম মতে পণ্যের মালিক হবে পুঁজিদাতা একাই, তাই তার লাভ লোকসানও সে একাই ভোগ করবে। যেহেতু এক্ষেত্রে মুদারাবা সহীহ হয়নি, তাই কর্মী লাভে অংশীদার হবে না। তবে মালিকের অনুমতি থাকায় কর্মী হবে তার প্রতিনিধি, সে হিসাবে মালিকের কর্তব্য হবে তাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান করা। ৫৮
হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, পুঁজিদাতা যদি তার দেনাদারকে বলে, তোমার কাছে যা ঋণ ও পাওনা রয়েছে তা দিয়ে আমার সাথে তোমার মুদারাবা চুক্তি, তবে তা সহীহ হবে না। এটিই তাদের গৃহীত মত। অবশ্য ইমাম আহমদ রহ.-এর পক্ষ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তা সহীহ হবে। কাজী ইয়ায তার এ কথার ব্যাখ্যা করেছেন, এ কেনাবেচা কর্মীর পক্ষ থেকে ধর্তব্য হবে। নিহায়া গ্রন্থকার বলেন, ধরা হবে কর্মী এক্ষেত্রে প্রতিনিধি, সে তার পাওনাদার-এর পক্ষ থেকে সে পণ্য কজা করেছে এবং তাতে লেনদেন করেছে। এভাবে এখানে দুটি ব্যাখ্যা এবং দুধরনের বিবরণই আলোচিত হয়েছে। ৫৯
টিকাঃ
৫৬. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৩; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৪৮৪
৫৭. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৭১; আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়াতুসসাভী, খ. ৩, পৃ. ৬৮৩
৫৮. রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১১৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০
৫৯. আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪৩১
📄 কর্মী-ভিন্ন অন্য কারো কাছে থাকা ঋণ দিয়ে মুদারাবা
(الْمُضَارَبَةُ بَدَيْنِ عَلَى غَيْرِ الْعَامِلِ)
অধিকাংশ ফকীহ-শাফেয়ী ও হাম্বলী সকল ফকীহ এবং মালেকী মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহ-এর অভিমত হচ্ছে, কর্মী-ভিন্ন অন্য কারো কাছে থাকা ঋণ দিয়ে মুদারাবা করা সহীহ নয়। এর উদাহরণ : কেউ তার কর্মীকে বলল, অমুকের কাছে আমার যা পাওনা রয়েছে তা দ্বারা তোমার সাথে মুদারাবা করছি। তুমি তার কাছ থেকে টাকাটা কব্জা করে এর দ্বারা ব্যবসা করো। ৬০
হানাফী আলেমগণ বলেন, এ অবস্থাতে মুদারাবা সহীহ হবে। মালেকী আলেম লাখামী এবং হাম্বলী মাযহাবের 'রিআয়া' গ্রন্থকারও এই মত ব্যক্ত করেছেন। আল্লামা কাসানী বলেন : কেউ যদি কাউকে বলে, অমুকের কাছে থাকা আমার ঋণের টাকাটা তুমি কব্জা করে তা দিয়ে মুদারাবার ভিত্তিতে ব্যবসা করো, তাহলে এটি জায়েয হবে। যেহেতু এভাবে বলার দ্বারা যা কব্জায় আসছে তার সাথে মুদারাবার সম্পর্ক করা হচ্ছে, তাই মুদারাবার পুঁজি হচ্ছে নগদ অর্থ, কোনো ঋণ নয়। ৬১
টিকাঃ
৬০. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৭১; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১১৭-১১৮; আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪৩১
৬১. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৩; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৭১; আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪৩১
📄 চার. পুঁজি কর্মীর হাতে সোপর্দ করা
(كَوْنُ رَأْسٍ مَالِ الْمُضَارَبَةِ مُسَلَّمًا إِلَى الْعَامِل)
হানাফী, মালেকী ও শাফেয়ী আলেমগণ এবং হাম্বলী মাযহাবের কাজী ইয়ায ও আবু হামেদ বলেন, মুদারাবা যথাযথ ও সহীহ হওয়ার জন্যে শর্ত হচ্ছে, পুঁজিতে কর্মীর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সে-ই শুধু তার একক ইচ্ছানুসারে তা ব্যবহার করবে। এটিকে কেউ কেউ এভাবে প্রকাশ করেছেন, 'কর্মী ও পুঁজির মাঝে প্রতিবন্ধকতাহীন নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনের সুযোগদান।' কেউ এ অবস্থা ব্যক্ত করেছেন, 'কর্মীর হাতে পুঁজি সমর্পণ ও হস্তান্তর' বলে। ফকীহগণ তাদের প্রকাশ বর্ণনায় পার্থক্য করার সাথে সাথে তাতে কারণ বর্ণনা ও বিস্তারিত আলোচনাতেও বেশ পার্থক্য প্রকাশ করেছেন।
আল্লামা কাসানী বলেছেন, কর্মীর হাতে পুঁজি সোপর্দ করা শর্ত সাব্যস্ত হয়েছে, যেহেতু তা তার হাতে আমানত। তাই তার হাতে তা সমর্পণ করার মাধ্যমে তাকে তা প্রতিবন্ধকতাহীন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ও সুযোগ দিতে হবে, যেমন অন্য যে কোনো আমানতে সুযোগ দেওয়া হয়। নতুবা পুঁজি কর্মীর হাতে সমর্পণ যথাযথ ও সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে না। যদি কর্মীর হাতে দেওয়ার পরও তাতে পুঁজিদাতার নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকে তাহলে তার নিয়ন্ত্রণ থাকার দরুন কর্মীর হাতে সমর্পণ যথাযথ হবে না, ফলে মুদারাবাও যথাযথ ও সহীহ হবে না। তাই পুঁজিদাতা যদি শর্ত করে, কর্মীর হাতে সমর্পণ করার পরও সে অর্থ-সম্পদে পুঁজিদাতার কর্তৃত্ব থাকবে তাহলে মুদারাবা-ই বাতিল হয়ে যাবে।
যদি মুদারাবা চুক্তিতে শর্ত হিসাবে একথা উল্লেখ করা হয় যে, পুঁজিদাতাও ব্যবসাকাজে অংশগ্রহণ করবে, তাহলে পুঁজিদাতা কর্মীর সাথে কাজে অংশ নিক বা না নিক, সক্রিয়ভাবে কোনো লেনদেন করুক বা না করুক, মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। এর কারণ হচ্ছে, পুঁজিদাতা কাজে শামিল থাকার শর্ত প্রকারান্তরে তার প্রদত্ত পুঁজিতে তার নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকার শর্ত। যেহেতু এটি ফাসেদ শর্ত, তাই তার দরুন মুদারাবাই বাতিল হয়ে যাবে।
এ আলোচনায় এ কথাই সাব্যস্ত হলো, প্রদত্ত পুঁজিতে পুঁজিদাতার আর কোনো কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ অবশিষ্ট থাকবে না, মুদারাবা বিশুদ্ধ নিয়মে করতে হলে এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ রাখা জরুরি। বিষয়টি এতোটাই পালনীয় যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলের সম্পদ তার পিতা বা পিতার অবর্তমানে অসী কাউকে মুদারাবা হিসাবে প্রদান করে, তাতে সে অপ্রাপ্তবয়স্কের কাজে অংশী হওয়ার শর্ত করে, তাহলেও মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে সে কমবয়সী হোক, সে হলো পুঁজিদাতা, তাই তার কর্তৃত্ব থাকায় এখানে পুঁজি হস্তান্তর ও সমর্পণ বাস্তবায়িত হবে না। ৬২
মালেকী আলেমগণ বলেন, মুদারাবার পুঁজিতে শর্ত হচ্ছে, পুঁজিদাতা তার কর্মীর হাতে পুঁজি পুরোপুরি তুলে দেবে। পুঁজিদাতা কর্মীকে এই অর্থসম্পদের হস্তান্তরে তাকে আমানতদার বানাবে না, তার নিকট থাকা ঋণ বা তার নিকট থাকা বন্ধক হিসাবে রাখা বস্তুকে পুঁজি বানাবে না অথবা এটি তার কাছে থাকা কোনো আমানতের বস্তুও হবে না। নয়তো পুঁজিটা কর্মীর হাতে তুলে দেওয়া হবে বস্তুত না দেওয়ার সমতুল্য। ৬৩
শাফেয়ী আলেমগণ বলেন, মুদারাবা চুক্তি যথাযথ হওয়ার জন্যে শর্ত হচ্ছে, পুঁজিটা কর্মীর হাতে তুলে দিতে হবে। এ সম্পর্কে খতীব শারবীনী বলেন, কর্মীর হাতে টাকা তুলে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সময় বা চুক্তির মজলিসে পুঁজি তার নিকট হস্তান্তর করা। বরং এ কথার মর্ম হচ্ছে, কর্মীকে কর্মী বানানোর পর তার হাতে সম্পূর্ণ পুঁজিটা দিয়ে দেওয়া, তাকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের অবাধ সুযোগ দেওয়া, যে কোনো লেনদেন তার ইচ্ছামাফিক করতে দেওয়া। তাই এর বিপরীত যে কোনো কিছু করা সহীহ ও জায়েয হবে না। যেমন পুঁজিটা পুঁজিদাতার অথবা তৃতীয় কারো হাতে থাকার শর্ত করা, কর্মী যখন কোনো কিছু কিনবে সে লোক তার হাতে থাকা পুঁজি থেকে তা প্রদান করবে। এমনিভাবে কর্মী যা কিছু করছে তা পুঁজিদাতাকে বা তার পক্ষ থেকে নিয়োজিত কাউকে পুরোপুরি অবহিত করার শর্ত করা। পুঁজিদাতা বা তার পক্ষ থেকে নিয়োজিত তৃতীয় ব্যক্তিকে অবহিত করার ক্ষেত্রে হয়তো কর্মী তার স্বাধীন ইচ্ছানুসারে ব্যবসা করতে পারবে না, পুঁজি তাদের হাতে থাকলে হয়তো সময়মত তাদের পাওয়া যাবে না, ইত্যাকার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনিভাবে পুঁজিদাতাও কর্মীর সাথে সাথে কাজে অংশগ্রহণ করার শর্ত মুদারাবার পরিপন্থী। কেননা, তাতে কাজ বণ্টনের মাধ্যমে পুঁজি ব্যবহারও বণ্টিত হবে, ফলে পুঁজিতে কর্মীর একক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, নিয়ন্ত্রণও উভয়ের মাঝে বণ্টিত হবে। এ সকল শর্তই কর্মীর নিজ একক ইচ্ছামাফিক কাজ করার পরিপন্থী, অথচ মুদারাবা সহীহ হতে হলে কর্মীকে একক ইচ্ছানুযায়ী কাজ করতে দেওয়া জরুরি। তার বিপরীত হওয়ায় উপরিউক্ত শর্তগুলো মুদারাবা বাতিল করে দেবে। ৬৪
হাম্বলী আলেমগণ তাদের গৃহীত মত হিসাবে বলেন, কেউ যদি এই লক্ষ্য নিয়ে পুঁজি সরবরাহ করে যে, সে এবং অপর কেউ একত্রে তা দিয়ে ব্যবসা করবে, লাভ তাদের দুজনের মাঝে বণ্টিত হবে, তবে তা সহীহ হবে এবং তা মুদারাবা বলেই গণ্য হবে। ৬৫
টিকাঃ
৬২. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৪-৮৫
৬৩. আশ-শারহুল কাবীর ও হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৫১৭; শারহু্য যুরকানী, খ. ৬, পৃ. ২১৪
৬৪. রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১১৮-১১৯; নিহায়াতুল মুহতাজ ও হাশিয়া আশ শাবরামাল্লিসী, খ. ৫, পৃ. ২২১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০-৩১১
৬৫. আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪৩২
📄 আমানতের অর্থ দিয়ে মুদারাবা
(الْمُضَارَبَةُ بِالْوَدِيعَةِ)
হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের অভিমত হচ্ছে, কর্মী বা আর কারো কাছে রাখা আমানতের টাকা দিয়ে মুদারাবা করা সহীহ। এর নমুনা হচ্ছে, যার নিকট আমানত রাখা হচ্ছে তাকে টাকা প্রদানকারী বলবে, তোমার কাছে আমার আমানতের যে টাকা রয়েছে তা দিয়ে তুমি মুদারাবা ভিত্তিতে ব্যবসা করো, অর্ধেক করে আমাদের দুজনের মাঝে লাভ বণ্টিত হবে। অথবা বলল, অমুকের কাছে আমার যে টাকা আমানত হিসাবে রাখা আছে তা দিয়ে তুমি মুদারাবার নিয়মে ব্যবসা করো। এক্ষেত্রে যদি টাকার পরিমাণ কর্মীর জানা থাকে এবং উভয় প্রস্তাবে যদি দ্বিতীয় ব্যক্তি সম্মত হয়, তাহলে মুদারাবা সহীহ ও সঠিক হবে। এটি সঠিক হয়, যেহেতু পুঁজির দখল ও নিয়ন্ত্রণের মূল অবস্থাতে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। মুদারাবা চুক্তি সংঘটনের পূর্বেও তা যেমন আমানত ছিল, চুক্তি সংঘটনের পরেও তা তেমনি আমানতই থাকছে, তাই মুদারাবা সংঘটনে তা কোনো বাধা হয় না। তা ছাড়া, আমানত হিসাবে যা রাখা হয়েছে তা পুঁজিদাতারই সম্পদ, তাই তা দিয়ে সে মুদারাবা করতে পারবে, যেমন ঘরের কোনায় রাখা সম্পদ হলে তা সে পুঁজি হিসাবে দিতে পারবে। কিন্তু যদি এমন ঘটে, যার কাছে আমানত রাখা হয়েছে তার কাছে সে সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যায় এমন কোনো পন্থায় যার দরুন এখন তার ক্ষতিপূরণ আদায় করার কথা উঠে, তাহলে সে সম্পদকে পুঁজি ধরে মুদারাবা করা সহীহ হবে না, যেহেতু সে টাকাটা এখন আর আমানত হিসাবে বহাল নেই, তা ঋণে পরিণত হয়ে গেছে। ৬৬
মালেকী মাযহাবের আলেমদের মতে, কর্মীর কাছে রাখা আমানতকে বর্তমানে পুঁজি বানিয়ে মুদারাবা করা সহীহ নয়। এর কারণ হিসাবে তারা বলেন, হতে পারে সে লোক আমানতের এ সম্পদ খরচ করে ফেলেছে, তাহলে তা আর এখন আমানত হিসাবে নেই, তা হয়ে গেছে ঋণ ও দেনা। ঋণ যেহেতু পুঁজি হতে পারে না, তাই তা দ্বারা মুদারাবা সহীহ হবে না। তবে যদি এমন হয়, আমানতদার তার কাছে যা আমানত রাখা হয়েছে তা মজলিসে উপস্থিত করে, যে আমানত রেখেছিল সে তা কব্জা করার পর পুঁজি হিসাবে প্রদান করে, তাহলে তা সহীহ ও সঠিক হবে। অথবা আমানতদার আমানত রাখা টাকা মজলিসে হাজির করে এবং এমর্মে সাক্ষ্যপ্রদান করে, এ টাকা যা আমি এখানে উপস্থিত করেছি তা আমার কাছে রাখা অমুকের আমানত। এরপর যে আমানত রেখেছিল সে মুদারাবার পুঁজি হিসাবে তা প্রদান করে তবে তা সহীহ হবে।
যদি উপরিউক্ত এ দুটি পদ্ধতি ভিন্ন অন্য পন্থা অবলম্বন করা হয়; যেমন যে আমানত রেখেছে সে যদি আমানতদারকে বলে, তোমার কাছে আমার যে টাকা আমানত হিসাবে রয়েছে তা দিয়ে তুমি মুদারাবা হিসাবে ব্যবসা করো, লাভ আমাদের মাঝে অর্ধেক করে বণ্টিত হবে। তার কথামত আমানতদার তা দিয়ে ব্যবসা করলে লাভক্ষতি যা-ই হবে তা হবে এককভাবে পুঁজিদাতার। যেহেতু মুদারাবা সহীহ হয়নি, তাই কর্মী পাবে তার পরিশ্রমের পারিশ্রমিক; লাভের অংশ নয়।
তারা বলেন, আমানতদারের কাছে থাকা আমানত দ্বারা মুদারাবা সহীহ নয়। তাই পুঁজিদাতা যদি কর্মীকে প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব দেয়, আমানতের সে টাকা উঠিয়ে তা দিয়ে মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা করবে, অথবা যদি আমানত হিসাবে কোনো বস্তু রাখা হয় তাহলে তা বিক্রি করে তার মূল্য দিয়ে মুদারাবা করবে, তবে মুদারাবা সহীহ হবে না। কর্মীকে প্রতিনিধি হিসাবে যে কাজগুলো করতে বলা হয়েছে সে যদি সে কাজগুলো করে, আমানতদারের কাছ থেকে আমানত রাখা টাকা উঠায়, তা দিয়ে কোনো বস্তু কেনা হলে তা বিক্রি করে, এ সবের উপযুক্ত পারিশ্রমিক কর্মীকে পুঁজিদাতা যথাযথ হিসাব করে প্রদান করবে, ব্যবসা করে কর্মী লাভ করুক বা না করুক সে লাভের অংশ পাবে না, লাভ না করলেও যথাযথ পারিশ্রমিক সে পাবে। কর্মীরও তেমনি কর্তব্য হবে তার পারিশ্রমিক পরিমাণ লাভ হতে যে পরিমাণ মুদারাবা করা প্রয়োজন তা করে যাওয়া। যদি তাতে আরো লাভ হয়, তাহলে মুদারাবাতে যেমন দেওয়ার শর্ত ছিল তেমন লাভ থেকে এক অংশ কর্মীকে দেওয়া হবে। যদি লাভ না হয় তাহলে কর্মীকে কিছু দেওয়া হবে না, সম্পদ থেকেও নয়, পুঁজিদাতার দায়িত্বেও তা থাকবে না। ৬৭
টিকাঃ
৬৬. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৩; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১১৮; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫২২-৫২৩
৬৭. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৭১; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৮৫-৬৮৬; শারহুয যুরকানী, খ. ৬, পৃ. ২১৫