📄 দুই. মুদারাবাতে পুঁজির পরিমাণ জ্ঞাত হওয়া
(كَوْنُ رَأْسٍ مَالِ الْمُضَارَبَةِ مَعْلُومًا)
সকল ফকীহ এ কথায় একমত, মুদারাবা চুক্তি সম্পাদনকালে পুঁজি কত তা উভয়পক্ষের অবগতিতে থাকা শর্ত। কোন্ ধরনের মুদ্রা, তার বৈশিষ্ট্য কী, তার সংখ্যা বা পরিমাণ কত- এসব কথাই চুক্তির উভয়পক্ষের পুরোপুরি জানা থাকতে হবে, যেন কারো কোনো বিষয় অজানা না থাকে এবং ফলে কোনো ঝগড়ার আশঙ্কাও না থাকে। যদি এমন স্পষ্টভাবে উভয়পক্ষের বিষয়টি জানা না থাকে তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে।
আলেমসমাজ এর কারণ বর্ণনা করে বলেন, যদি মুদারাবা চুক্তিতে পুঁজির পরিমাণ এমন বিশদভাবে উভয়পক্ষের জানা না থাকে, তাহলে তাতে লাভের পরিমাণও উভয়ের সুস্পষ্ট জানা হবে না। অথচ লাভের পরিমাণ জানা থাকা মুদারাবা যথাযথ হওয়ার জন্যে শর্ত, তাই পুঁজির পরিমাণ সুস্পষ্ট হওয়া আবশ্যক। ৫৪
টিকাঃ
৫৪. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮২; হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৮৪; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৭২; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৫১৮; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৮৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২১৯-২২০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৯
📄 দু’ থলের এক থলে মুদ্রা দিয়ে মুদারাবা
(الْمُضَارَبَةُ بِأَحَدِ الْكَيسَيْنِ أو الصُّرْتين)
হাম্বলী আলেমগণ বলেন, শাফেয়ী আলেমগণ তাদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত হিসাবে বলেন এবং কতক হানাফী আলেম বলেন, যদি পুঁজি সরবরাহকারী স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রায় পূর্ণ দুটো থলে বা ব্যাগ এনে কর্মীর হাতে দেয়, যদি কোনটিতে কতটি মুদ্রা বা কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা দুজনের জানা থাকে। এ অবস্থায় সে তার কর্মীকে যদি বলে, এ দুটো থলে বা ব্যাগে রাখা সম্পদের কোনো একটি তোমাকে মুদারাবার পুঁজি হিসাবে দিলাম, তাহলে পুঁজির পরিমাণ নির্দিষ্ট করে উল্লেখ না করার দরুন মুদারাবা সংঘটিত হবে না, তা বাতিল বলে গণ্য হবে। এমনকি যদি উভয় থলে বা ব্যাগে সমান পরিমাণ সম্পদ থাকে তবুও মুদারাবা সংঘটিত হবে না, তাতে অস্পষ্টতা থাকার দরুন। অস্পষ্টতার দরুন এ চুক্তিতে প্রতারণার আশঙ্কা বিদ্যমান। এ অবস্থায় এ চুক্তি বহাল রাখার কোনোই আবশ্যকতা নেই।
শাফেয়ী আলেমদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতের বিপরীত, এটি হানাফী আলেমদের অপর কতক আলেমের মত, যদি উভয় থলেতে রাখা মুদ্রা একজাতীয়, একই বৈশিষ্ট্যের সমসংখ্যক বা সমপরিমাণের হয় তাহলে দু থলের যে কোনো একটি কর্মী তার পুঁজি হিসাবে গ্রহণ করতে পারবে, তা দ্বারা মুদারাবা সহীহ ও সঠিক হবে। সে যেটি গ্রহণ করবে পুঁজি হিসাবে সেটিই নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে যা জরুরি তা হচ্ছে, থলেগুলোতে মোট কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা উভয়ের জানা থাকতে হবে।
শাফেয়ী আলেমগণ বলেন, তাদের প্রথম মতটি যা তাদের দৃষ্টিতে বিশুদ্ধতম তার আলোকে এ মাসআলা নির্গত হয় যদি পুঁজি বিনিয়োগকারী কর্মীকে দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) বা দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) প্রদান করে মুদারাবা চুক্তির ভিত্তিতে, কিন্তু তা নির্দিষ্ট না করেই দিয়েছিল। এরপর সে মজলিসেই হিসাব করে তা নির্ধারণ করে নিলে চুক্তি বহাল ও সঠিক থাকবে। অপর এক বর্ণনায় মজলিসে হিসাব করলেও সহীহ না হওয়ার মত ব্যক্ত হয়েছে। ৫৫
টিকাঃ
৫৫. রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১১৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫০৭; আস সামনানী প্রণীত রওযাতুত কুযাহ, খ. ২, পৃ. ৫৮২
📄 তিন. মুদারাবা চুক্তির পুঁজি নগদ অর্থ হওয়া
(كَوْنُ رَأْسِ مَالِ الْمُضَارَبَةِ عَيْنَا )
ফকীহদের মতে মুদারাবা যথাযথ হওয়ার জন্যে শর্ত হচ্ছে, পুঁজি হতে হবে নগদ অর্থ। দায়িত্বে থাকা ঋণ দিয়ে মুদারাবা সহীহ হবে না, যেহেতু তা হবে শর্ত পরিপন্থী। যদি ঋণ-ই পুঁজি হিসাবে বিবেচনা করা হয় তবে তাতে দুটি অবস্থা হতে পারে : এক. হয়তো কর্মীর নিকট থাকা ঋণ অথবা দুই. কর্মী ভিন্ন অন্য কারো নিকট থাকা ঋণ।
📄 কর্মীর নিকট থাকা ঋণ দিয়ে মুদারাবা
হানাফী, মালেকী ও শাফেয়ী আলেমদের সম্মিলিত মত, যা হাম্বলী আলেমদের একটি মত, কর্মীর কাছে পুঁজিদাতার বকেয়া ঋণকে পুঁজি ধরে মুদারাবা ব্যবসা করা যথাযথ ও সঠিক নয়। হাম্বলী কতক আলেম এটি সহীহ বলে মত প্রদান করেছেন। বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে বিধৃত হচ্ছে :
মুদারাবার পুঁজি সম্পর্কে হানাফী মাযহাবের আলেমদের সুস্পষ্ট অভিমত হচ্ছে, এটি হতে হবে নগদ মুদ্রা, তাহলেই মুদারাবা সহীহ হবে। যদি তা না হয়ে ঋণকে পুঁজি ধরা হয় তাহলে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। তাই কারো যদি অপর কারো কাছে ঋণ হিসাবে টাকা পাওনা থাকে, সে যদি ঋণীব্যক্তিকে বলে, তোমার কাছে আমার যা ঋণ রয়েছে তা পুঁজি হিসাবে খাটিয়ে ব্যবসা করো, এ মুদারাবা ব্যবসাতে অর্ধেক করে লাভ বণ্টন করা হবে; তাহলে তা সহীহ হবে না। হানাফী সকল আলেমের মতে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। যদি ঋণদাতার কথা শুনে কর্মী কোনো কিছু কেনে এবং তা বিক্রি করে, তবে লাভ হলেও তা তার একার, ক্ষতি হলেও তার একার হবে এবং ঋণ যথাপূর্বই তার দায়িত্বে বহাল থাকবে। এটি ইমাম আবু হানিফার মত। তিনি এই ফয়সালা প্রদান করেন এ জন্যে যে, কেউ যদি তার পাওনাদারকে প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব দেয়, তার কাছে যা পাওনা রয়েছে তা দ্বারা সে ঋণদাতার পক্ষ থেকে কোনো কিছু কিনবে, তাহলে তা সহীহ হবে না। এটি ইমাম আবু হানিফার মত। অতএব, সে ঋণী ব্যক্তি যদি তার কথা অনুসারে সে বস্তু কেনে তাহলে সে ব্যক্তি ঋণের দায় থেকে মুক্তও হবে না। দায়িত্বে থাকা ঋণ-এর বিপরীতে কোনো কিছু কেনার নির্দেশই যখন যথার্থ নয়, তখন দায়ে থাকা ঋণের দ্বারা মুদারাবা ব্যবসা করা তো বৈধ ও সঠিক হবেই না।
এক্ষেত্রে কারণ বর্ণনা করে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ বলেন, উপরিউক্ত অবস্থায়- যখন পুঁজিদাতা তার ঋণকে পুঁজি সাব্যস্ত করে কর্মীকে ব্যবসা করতে বলবে, তার কথা অনুযায়ী যদি কর্মী কোনো কিছু কেনে বিক্রি করে, তবে লাভ হলে তা পুঁজিদাতার একার হবে, ক্ষতি হলেও তার একার ওপর বর্তাবে। মাসআলার রূপ এমন হওয়ার কারণ, তাদের দৃষ্টিতে ঋণে বা পাওনায় প্রতিনিধিত্ব সহীহ ও যথাযথ, কিন্তু তাকে পুঁজি সাব্যস্ত করে মুদারাবা সহীহ নয়। যেহেতু প্রতিনিধিত্ব সহীহ, তাই ধরা হবে, কর্মী পুঁজিদাতার প্রতিনিধি হয়ে সে জিনিসটি কিনেছে। এরপর পুঁজিদাতা তাকে সে পণ্যটি পুঁজি হিসাবে প্রদান করেছে। যেহেতু সাহেবাইনেরও মত হচ্ছে, মুদারাবাতে পুঁজি হতে হবে নগদ অর্থ; কোনো পণ্য নয়, তাই পণ্যটি পুঁজি হিসাবে ধরা হলেও মুদারাবা সহীহ হবে না। তাই মুদারাবা বাতিল হয়ে কেবল প্রতিনিধিত্ব ধর্তব্য হবে। এভাবে সে পণ্যটি কেবল পুঁজিদাতার একার মালিকানায় থাকায় তা বিক্রিতে যা লাভ বা ক্ষতি তা হবে তার একার; তাতে কর্মীর কোনো অংশ থাকবে না। ৫৬
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, কর্মীর কাছে থাকা পাওনাকে পুঁজি সাব্যস্ত করণ সহীহ নয়। তাই পুঁজি সরবরাহকারী তার দেনাদারকে এ ধরনের কথা বলা সঙ্গত নয়, তোমার কাছে থাকা আমার পাওনাকে পুঁজি ধরে অর্ধেক অর্ধেক লাভের ভিত্তিতে মুদারাবা ব্যবসা করো। যেহেতু এভাবে বলা হলে তা হবে এমন সরফ বিক্রি, যেখানে পণ্য কজা করার পূর্বেই তাতে লাভে বিক্রি করা হচ্ছে, যা জায়েয নয়। তাই এটি কার্যকর হবে না, আর তাই পাওনাদারের পাওনা যথাপূর্ব বহাল থাকবে। যেহেতু এভাবে মুদারাবা সহীহ হবে না এবং পাওনাদারের পাওনাও বহাল থাকবে, তাই কর্মী যা কিনবে বেচবে তাতে লাভ হলে তার হবে, ক্ষতি হলেও হবে তার একার। তবে যদি ইতোমধ্যে পুঁজিদাতা তার কর্মীর নিকট থাকা তার পাওনা নিয়ে নেয় এবং তা পুনরায় কর্মীর হাতে তুলে দেয় মুদারাবার পুঁজি হিসাবে তাহলে তা সহীহ হবে। এর পরবর্তী লেনদেন মুদারাবা হিসাবে গণ্য ও সহীহ হবে। এর পূর্ববর্তী কোনো লেনদেন মুদারাবা বলে গণ্যও হবে না, সে হিসাবের আওতায় আসবেও না। ৫৭
শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি কোনো পুঁজিদাতা তার দেনাদারকে বলে, তোমার কাছে আমার যা পাওনা রয়েছে তা পুঁজি ধরে আমি তোমার সাথে মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা করব, তাহলে তা সহীহ হবে না। পুঁজিদাতা যদি বলে, তোমার সম্পদ থেকে আমার প্রাপ্য সম্পদ পৃথক করো। দেনাদার তা পৃথক করার পর পাওনাদার কব্জা না করেই যদি তা পুঁজি ধার্য করে তাহলেও মুদারাবা সহীহ হবে না। যেহেতু দেনাদার যা তার সম্পদ থেকে দেনা হিসাবে পৃথক করেছে তা পাওনাদার কব্জা না করা পর্যন্ত সেটি তার মালিকানায় আসেনি। তাই তাতে পুঁজিদাতার কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণও আসেনি, তাই তা পুঁজি ধার্য করে কর্মীকে তা প্রদানও সহীহ হবে না।
যদি কর্মী দেনাদার তার পাওনাদারের কথা অনুযায়ী তার প্রাপ্য পৃথক করে তা দিয়ে মুদারাবা হিসাবে পণ্য কেনাবেচা করে তবে তাতে দুটি অবস্থা হতে পারে : এক. হয়তো সে নগদ অর্থব্যয়ে পণ্যটি কিনেছে। তাহলে সে এই পণ্য ক্রয়ে নিজের অর্থব্যয় করা ফুযুলীতুল্য হয়েছে। ফুযুলী হচ্ছে যে ব্যক্তি মূল নয়, তার প্রতিনিধিও নয়, তার অসী বা অভিভাবকও নয়। এমন ব্যক্তির কেনাকাটা মূল ব্যক্তির অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকে। দুই. অথবা সে পণ্যটির মূল্য প্রদান বকেয়া রেখেছে। সেক্ষেত্রে শাফেয়ী আলেমগণ দুটো মত ব্যক্ত করেছেন। এক মতে, পণ্যটি হবে পাওনাদারের, যেহেতু তার অনুমতি বা নির্দেশেই সে এটি কিনেছে। বাগাভী এ মতটি সঠিকতর ও বিশুদ্ধতর বলে দাবি করেছেন। তাদের এক্ষেত্রে অপর মত হচ্ছে, পণ্যটি কর্মীর মালিকানায় থাকবে, আবু হামেদ এটিই অধিক বিশুদ্ধ বলে মত প্রদান করেছেন।
যেহেতু পৃথক করা সম্পদ মালিক কব্জা না করেই তা দিয়ে ব্যবসা করতে দিয়েছে, তাই প্রথম অবস্থায় এবং দ্বিতীয় অবস্থার প্রথম মতে পণ্যের মালিক হবে পুঁজিদাতা একাই, তাই তার লাভ লোকসানও সে একাই ভোগ করবে। যেহেতু এক্ষেত্রে মুদারাবা সহীহ হয়নি, তাই কর্মী লাভে অংশীদার হবে না। তবে মালিকের অনুমতি থাকায় কর্মী হবে তার প্রতিনিধি, সে হিসাবে মালিকের কর্তব্য হবে তাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান করা। ৫৮
হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, পুঁজিদাতা যদি তার দেনাদারকে বলে, তোমার কাছে যা ঋণ ও পাওনা রয়েছে তা দিয়ে আমার সাথে তোমার মুদারাবা চুক্তি, তবে তা সহীহ হবে না। এটিই তাদের গৃহীত মত। অবশ্য ইমাম আহমদ রহ.-এর পক্ষ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তা সহীহ হবে। কাজী ইয়ায তার এ কথার ব্যাখ্যা করেছেন, এ কেনাবেচা কর্মীর পক্ষ থেকে ধর্তব্য হবে। নিহায়া গ্রন্থকার বলেন, ধরা হবে কর্মী এক্ষেত্রে প্রতিনিধি, সে তার পাওনাদার-এর পক্ষ থেকে সে পণ্য কজা করেছে এবং তাতে লেনদেন করেছে। এভাবে এখানে দুটি ব্যাখ্যা এবং দুধরনের বিবরণই আলোচিত হয়েছে। ৫৯
টিকাঃ
৫৬. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৩; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৪৮৪
৫৭. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৭১; আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়াতুসসাভী, খ. ৩, পৃ. ৬৮৩
৫৮. রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১১৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০
৫৯. আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪৩১