📄 পুঁজি মুদ্রা হওয়া
ফকীহগণ এ কথায় একমত, পুঁজি হবে মুদ্রা, টাকা বা ডলার ইত্যাদি। কারো কারো মতে এ কথায় ফকীহগণ ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন, যেমন শাফেয়ী মাযহাবের আলেম জুওয়াইনী বর্ণনা করেছেন। শাফেয়ী মাযহাবের কতক আলেম বলেছেন, সাহাবায়ে কেরাম এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। ৩৬ এ শর্তের ওপর ভিত্তি করে ফুকাহায়ে কেরাম বেশকিছু নিষিদ্ধ বিষয়, প্রকার ও ধরন এবং কিছু মাসায়েল বের করেছেন; যেগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা ও মতানৈক্য রয়েছে। যা নিম্নরূপ :
টিকাঃ
৩৬. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮২; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৮২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০; কাশশাফুল কিনা', খ. ৫, পৃ. ৫০৭
📄 এক. পণ্য বা বস্তু সামগ্রী দ্বারা মুদারাবা চুক্তি
(الْمُضَارَبَةُ بِالْعُرُوضِ)
হানাফী, শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের অভিমত এবং হাম্বলী মাযহাবের জাহেরী অভিমত হচ্ছে, পণ্য বা বস্তুসামগ্রী দ্বারা মুদারাবা চুক্তি সহীহ হবে না; এ পণ্য মিছলী বা কীমী যাই হোক। এ বিষয়ে তাদের দলিল-প্রমাণ ও বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে; যা নিম্নরূপ :
(নিয়ম হচ্ছে, কোনো পণ্য কিনে তা কজা করে নিজের জিম্মাদারিতে নিয়ে আসার পর তা বিক্রি করা। এক্ষেত্রে পণ্য হচ্ছে দু প্রকার : নির্দিষ্ট করলে তা নির্দিষ্ট হয় অথবা নির্দিষ্ট হয় না।) হানাফী আলেমগণ এ পর্যায়ে বলেন, যা নির্ধারণ করার দ্বারা নির্দিষ্ট হয় (কজা করে তা নিজের নিয়ন্ত্রণে না এনেই) তাতে লাভ করা, বস্তুত যে বস্তু জিম্মাদারিতে আসেনি তাতে লাভ করা। এটি নিষিদ্ধ; যেহেতু এ ধরনের পণ্য কেনার সময়ই নির্দিষ্ট হয়ে যায়, তা নির্দিষ্ট হলেও কব্জা না করার দরুন তা জিম্মাদারিতে আসে না। যদি এ অবস্থায় কর্মী তা হস্তান্তর করার আগে ধ্বংস বা বিনষ্ট হয়ে যায় তাহলে তা বিক্রেতার ক্ষতি বলে গণ্য হবে। কর্মীর তাতে কোনো ক্ষতি হবে না, যেহেতু সে সে সামগ্রী কজা করেনি। কর্মী মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা হিসাবে সে সব সামগ্রী বিক্রি করে যদি লাভ অর্জন করে তবে তা হবে যে জিনিস (কজা না করার দরুন) জিম্মাদারিতে আসেনি তাতে লাভ করা, যা থেকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ رِبْحِ مَا لَمْ يُضْمَنْ “যে বস্তু কারো জিম্মাদারিতে আসেনি তাতে লাভ করা থেকে নবীজী নিষেধ করেছেন।”৩৭
এর বিপরীতে যা নির্দিষ্ট করা হলেই নির্দিষ্ট হয়ে যায় না, তা কেনার পর কজা করে নিজের জিম্মাদারিতে আনতে হয়, এমন বস্তু যদি (নিজের জিম্মাদারিতে এনে) ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার আগে নষ্ট বা ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে তা ব্যবসায়ী-কর্মীর জিম্মায় থাকা অবস্থায় বিনষ্ট হয়েছে বলে সাব্যস্ত হবে এবং ক্রেতা তার ক্ষতিপূরণ পাবে। তাতে যদি লাভ ধরা হয় তবে তা হবে দায়িত্বে থাকা বস্তুতে লাভ, তাই তা জায়েয ও বৈধ হবে।
তা ছাড়া আসবাবপত্র পুঁজি হিসাবে প্রদান করা হলে তা বণ্টনের সময় তাতে লাভ কত হবে তা অনির্দিষ্ট থাকবে। কারণ, জিনিসপত্রের দাম ধরতে হবে আন্দাজে অনুমানে। তা সবার এক হবে না, একজনের দাম ধরা অপরজনের দাম ধরা থেকে ভিন্ন হবে। ফলে লাভ অনির্দিষ্ট থাকার পরিস্থিতি ঝগড়ার পরিস্থিতিতে গড়াবে যা নানা অরাজকতার কারণ হবে। তাই এসবের উৎস আসবাবপত্র পুঁজি হওয়াই জায়েয হবে না। ৩৮
মুদারাবার পুঁজি আসবাবপত্র হওয়া জায়েয নয়, মালেকী মাযহাবের আলেমগণ এর কারণ বর্ণনা করে বলেন, মুদারাবা হচ্ছে শরীয়তের পক্ষ থেকে ছাড় প্রদান। নিয়ম হচ্ছে, কোনো বিষয়ে ছাড় দেওয়া হলে তা ঐ বিষয়েই সীমিত থাকে। তা থেকে অন্য কোনো দিকে বিস্তৃত হয় না। ফলে অন্য সকল ক্ষেত্রে মূল বিধানই বহাল থাকে। শরীয়তে নগদ অর্থে মুদারাবার আলোচনা এসেছে, তাই শরীয়তের ছাড় তাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অন্য যে কোনো কিছু নিষেধের আওতায় থাকবে। এক্ষেত্রে আসবাবের মূল্য ধরা হলেও তা জায়েয হবে না। ৩৯
আসবাবপত্র মুদারাবার পুঁজি হওয়া নাজায়েয, শাফেয়ী আলেমগণ এর কারণ বর্ণনায় বলেন, মুদারাবা চুক্তি হচ্ছে ধোঁকাপূর্ণ এক চুক্তি। যেহেতু তাতে কর্মীর কাজ থাকে অনিয়ন্ত্রিত, লাভ থাকে অনিশ্চিত। তারপরও প্রয়োজনের তাগিদে একে জায়েয গণ্য করা হয়েছে। তাই যেভাবে তার বহুল প্রচলন এবং যেভাবে তা সহজ তাতেই এটি সীমাবদ্ধ থাকবে। তা হচ্ছে, ব্যবসার পুঁজি হিসাবে মুদ্রা সরবরাহ করা। ৪০
তা ছাড়া মুদারাবাতে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে, মূল টাকা যোগানদাতাকে ফেরত দিয়ে লাভে অংশীদার হওয়া। কিন্তু যদি নগদ অর্থ ব্যতীত অন্য কিছুর ওপর ভিত্তি করে মুদারাবা করা হয় তাহলে তাদের এ উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। যদি সে বস্তুটি মিছলী হয় তবে সে পুঁজি ফেরত দেওয়া হিসাবে তার সদৃশ বস্তু সংগ্রহ করে তা পুঁজিদাতাকে প্রদান করতে হবে। যদি পুঁজি হিসাবে প্রদত্ত বস্তুটি কীমী হয় অর্থাৎ তার সদৃশ বস্তু সচরাচর না পাওয়া যায়, তাহলে তার মূল্য হিসাব করে তা পুঁজিদাতাকে ফেরত দিতে হবে। এ অবস্থায় কর্মী মিছলী বা কীমী যে বস্তুই হোক, তা নেওয়ার সময় সে বস্তুটির যে দাম ছিল ফেরত দেওয়ার সময় তার দাম তা থেকে বাড়তেও পারে, কমতেও পারে। যদি বেড়ে যায় তাহলে কর্মী ব্যবসা করে যা কামাই করেছে হয়তো মূল বস্তুটি বা তার মূল্য ফেরত দিতে গিয়ে তার সবটাই তাকে খরচ করে ফেলতে হবে। এটা হবে কর্মীর বড়ই ক্ষতি, কারণ তার যাবতীয় শ্রম ব্যর্থ হয়ে যাবে। যদি এখন ফেরত দেওয়ার সময় বস্তুটির মূল্য কমে যায় তাহলে তার কামাই থেকে সামান্য কিছু ব্যয় করলেই পুঁজিদাতার মূলধন ফেরত দেওয়া হয়ে যাবে। অবশিষ্ট টাকা লাভের খাতে চলে যাওয়ায় সে টাকায় দুজনে সমান অংশীদার হবে। এভাবে পুঁজিদাতার ক্ষতি সাধিত হবে। সুতরাং যদি বস্তু না দিয়ে নগদ অর্থ কর্মীর হাতে দেওয়া হয়, তাহলেই কর্মী বা পুঁজিদাতা কারোরই কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। তাতে যা নগদ দেওয়া হয় তা-ই ফেরত দিতে হয়, বেশিও নয়, কমও নয়। ৪১
হাম্বলী আলেমদের গৃহীত মত হচ্ছে, আসবাবপত্র পুঁজি হিসাবে দেওয়া যাবে না। তারা বলেন, দ্রব্যসামগ্রীতে অংশীদারি জায়েয নয়। আবু তালেব ও হারবের বর্ণনায় পাওয়া যায়, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল নিজেই এ কথা বলেছেন। ইবনে মুনযিরও আহমদের বক্তব্য হিসাবে তা বর্ণনা করেছেন। তারা বলেন, সামগ্রীতে অংশীদারি হলে তাতে তিনটি সম্ভাব্য রূপ হতে পারে : এক. মূল বস্তুতে অংশীদারি; দুই. তার মূল্যে অংশীদারি; তিন, বস্তুর বাজারমূল্যে অংশীদারি। মূল বস্তুতে অংশীদারি সম্ভব নয়। যখন অংশীদাররা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তখন অংশীদারি কারবারের চাহিদা হচ্ছে, মূল বস্তু বা তার সদৃশ ফিরিয়ে দিতে হবে। এ বস্তুটির হয়তো সদৃশও পাওয়া যাবে না যা ফেরত দেওয়া যাবে। এ ধরনের কোনো বস্তু দিতে গেলে হয়তো এটির মূল্য পূর্বেরটির তুলনায় বেশি হবে। ফলে, এটি হয়তো সবটুকু লাভ অথবা লাভসহ সম্পূর্ণ সম্পদই গ্রাস করে ফেলবে। অথবা পূর্বেরটির তুলনায় বর্তমানের বস্তুটির মূল্য কম হবে। তাহলে অপরজন কর্মী-ব্যবসায়ী সে এ বস্তুর মূল মূল্যে অংশীদার হয়ে যাবে, যা প্রকৃতপক্ষে লাভ নয়।
বস্তুর মূল্যে অংশীদারিও জায়েয নয়, যেহেতু মূল্য উভয়পক্ষ মিলে সাব্যস্ত করা হয়নি। এখন মূল্য সাব্যস্ত করতে গিয়ে উভয়ের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যেতে পারে। যে দাম ধরা হবে বস্তুটি তা থেকে আরো বেশিদামের হতে পারে। তা ছাড়া কারো হাতে কখনো বস্তুর মূল্য বেড়ে যেতে পারে তা বিক্রি করার আগেই, তাহলে সে বস্তুতে অপরজনও অংশীদার হয়ে যাবে, যা ঠিক নয়।
বস্তুর বাজারমূল্য ধার্য করে তাতে অংশীদার হওয়াও জায়েয ও বৈধ নয়। যেহেতু যখন জিনিসটি কর্মীর হাতে অর্পণ করা হচ্ছে তখন তার কোনো বাজারমূল্য সাব্যস্ত হয়নি, তখন তারা দুজন সে বাজার মূল্যের মালিকও ছিল না। তা ছাড়া, এখানে কোন মূল্য ধার্য হবে তাও সুস্পষ্ট নয়। যদি যে মূল্যে সে বস্তুটি কিনেছিল তা ধরা হয় তা ঠিক হবে না, যেহেতু জিনিসটি সেখান থেকে বের হয়ে বিক্রেতার হাতে চলে গেছে। যদি বিক্রি করার মূল্য ধরা হয় তা-ও ঠিক হবে না, যেহেতু তাতে নির্দিষ্ট বস্তু বিক্রির শর্তে শর্তযুক্ত অংশীদারী সম্পন্ন হয় যা জায়েয নয়।
ইমাম আহমদ র.-এর পক্ষ থেকে অপর একটি মত বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলো, অংশীদারি কারবার ও মুদারাবা নগদ অর্থের বদলে কোনো বস্তু প্রদান করার দ্বারাও জায়েয হবে। চুক্তি সম্পাদনকালে বস্তুটির যে মূল্য রয়েছে তা-ই মূলধন বলে ধার্য হবে। ইমাম আহমদ বলেন, যদি দু ব্যক্তি কোনো বস্তুতে অংশীদার হয় তাহলে তারা যা শর্ত করবে সে হিসাবেই তার লাভ তাদের মাঝে বণ্টিত হবে। আছরাম বলেন, আমি আবু আবদিল্লাহকে বলতে শুনেছি। তিনি ইমাম আহমদকে প্রশ্ন করেছেন, মুদারাবাতে পুঁজি হিসাবে কোনো বস্তু দেওয়া জায়েয কি-না। জবাবে ইমাম আহমদ বলেছেন, জায়েয। এই প্রশ্নোত্তর এ ধরনের চুক্তি বৈধ হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়েছে। আবুবকর ও আবুল খাত্তাব এ মতটিই গ্রহণ করেছেন। মারদাভী এ মতটিই সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন। ইবনে আবি লায়লারও এটিই অভিমত। তাওস, আওযায়ী ও হাম্মাদ ইবনে আবু সুলায়মান এ মাসআলাই বর্ণনা করেছেন। তারা বলেন, দুজন দুজনের সম্পদে অংশীদার হয় তাতে উদ্দেশ্য থাকে উভয়ের এ সম্পদগুলোতে কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। দুটোতে যে লাভ হবে তা-ও দুজনের মাঝে বণ্টিত হওয়া। লাভে অংশীদার হওয়া যেমন বস্তুর মূল্যে হওয়া সম্ভব, বস্তুতেও হওয়া সম্ভব। তাই যে কোনো বস্তুতে অংশীদারি ও মুদারাবা করা জায়েয, যেমন বস্তুর মূল্যে অংশীদারি ও মুদারাবা জায়েয। যখন তারা ভিন্ন হয়ে যাবে, চুক্তি সম্পাদনকালে বস্তুটির যে মূল্য ছিল সে মূল্য হিসাবে নিজ নিজ অংশ বুঝে নেবে। যেমন যাকাতের নেসাব সাব্যস্ত করতে মূল্য হিসাব করা হয়। ৪২
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি পুঁজিদাতা জিনিসপত্র দিয়ে বলে, এগুলো বিক্রি করে মূল্য সংগ্রহ করে তা দিয়ে মুদারাবা ব্যবসা করো। সে জিনিসগুলো বিক্রি করে, যেমন দামেই হোক, তার মূল্য সংগ্রহ করে যদি তা দিয়ে মুদারাবা ব্যবসা করে তবে তা জায়েয হবে। এটি এ জন্যে যে, পুঁজিদাতা এ জিনিসগুলোকে তার পুঁজি বলে নাই, পুঁজি সাব্যস্ত করেছে জিনিসের মূল্যকে। মূল্য দ্বারা মুদারাবা সঠিক ও যথাযথ, তাই এভাবে পুঁজির যোগান দেওয়া যথার্থ হবে।
কর্মীকে পুঁজিদাতা যে জিনিসগুলো দিয়েছে সেগুলো সে যদি গম ও ধানের ন্যায় পরিমাপযোগ্য, ওজনের বস্তুর বিপরীতে বিক্রি করে তাহলে ইমাম আবু হানিফার মতে তা জায়েয হবে। কাউকে যদি কোনো জিনিস বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হয় সে যেমন বস্তুটি নগদ অর্থে হোক বা অন্য কোনো বস্তুর বিনিময়ে হোক তা বিক্রি করতে পারে, তেমনি মুদারাবা চুক্তির কর্মীও গম যব ইত্যাদির বদলে আসবাবপত্র বিক্রি করতে পারবে। তবে তাতে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। কেননা, গম যব ইত্যাদি এমন বস্তু যেগুলোকে মুদারাবার পুঁজি হিসাবে গণ্য করা যায় না। অবশ্য ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ রহ.-এর মতে পুঁজিদাতার দ্রব্যসামগ্রী গম যব ইত্যাদির বিনিময়ে বিক্রি করা জায়েয হবে না। যেহেতু তাঁদের মতে কাউকে কোনো কিছু বিক্রি করার দায়িত্ব দিলে নগদ অর্থ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর বিনিময়ে বিক্রি করা তার জন্যে জায়েয নয়। তবে জিনিস-পত্র বিক্রি করে গম যব ইত্যাদি কেনায় মুদারাবা বাতিল হবে না। যেহেতু মুদারাবা চুক্তিতে গম ও যব ইত্যাদিকে পুঁজি বলা হয় নাই, বরং এগুলোর মূল্যকে পুঁজি বলা হয়েছে। আর এগুলো নগদ অর্থে বিক্রি করলেই পুঁজির টাকা হাতে এসে যাবে। ৪৩
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি কর্মীকে পুঁজিদাতা বলে, তুমি গম যব ইত্যাদি বিক্রি করে তার মূল্যটা পুঁজি হিসাবে নিয়ে নাও, তাহলে মুদারাবা ভেঙ্গে যাবে। তারা এ পর্যায়ে বলেন, কেউ লাভ করা ব্যতীত স্বাভাবিক মূল্যে সে সম্পদ বিক্রি করলে এ জন্যে যথাযথ পারিশ্রমিক পাবে। যদি মুদারাবা-কর্মী লাভ করে বিক্রি করে তাহলে চুক্তি অনুযায়ী কর্মী লাভের অংশ পাবে। কিন্তু যদি তা বিক্রি করে সে কোনো লাভ করতে না পারে তাহলে পুঁজিদাতার তাকে কিছু দিতে হবে না। মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যে মুদ্রার প্রচলন রয়েছে তা ব্যতীত অন্য মুদ্রা দ্বারা মুদারাবা জায়েয নেই, যে মুদ্রার একক প্রচলন রয়েছে পুঁজি হিসাবে কেবল তা দেওয়া জায়েয হবে। যেমন এধরনের মুদ্রাই কেবল আমানত রাখা যাবে। কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন, বাহ্যিকভাবে বোঝা যায়, এ ধরনের মুদ্রা প্রদান জায়েয। ৪৪
টিকাঃ
৩৭. হাদীসটির বর্ণনাকারী সাহাবী হচ্ছেন আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা.। হাদীসটি তিরমিজী শরীফের, খ. ৩, পৃ. ৫২৭-এ উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম তিরমিযী হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, حديث حسن صحيح
৩৮. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮২
৩৯. আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়াতুস সাভী, খ. ৩, পৃ. ৬৮৩-৬৮৬; শারহুষ যুরকানী ও হাশিয়া আল-বুনানী, খ. ৬, পৃ. ২১৩
৪০. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০
৪১. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৮৫
৪২. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩-১৭
৪৩. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮২
৪৪. আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়া তুস সাভী, খ. ৩, পৃ. ৬৮৬
📄 স্বর্ণখণ্ড দিয়ে মুদারাবা
(الْمُضَارَبَةُ بِالتَّبر)
শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, স্বর্ণের টুকরা বা অলংকার মুদারাবার পুঁজি হিসাবে দেওয়া সঠিক ও যথাযথ হবে না। এমনিভাবে রৌপ্য বা অন্য কোনো ধাতুর টুকরো দিয়েও মুদারাবা করা সহীহ হবে না। এর কারণ এগুলোর দামে প্রায়শ পরিবর্তন ঘটে।
হানাফী মাযহাবের আলেমদের মতে স্বর্ণ ও রৌপ্যের টুকরো দিয়ে মুদারাবা করা জায়েয হবে, যদি লোকেরা স্বর্ণের বা রৌপ্যের টুকরো তাদের লেনদেনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। তাহলে টুকরোগুলো স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার স্থলবর্তী হবে। তাই সে অবস্থায় এগুলো পুঁজি হিসাবে ধর্তব্য হবে। যদি লোকসমাজে স্বর্ণের বা রৌপ্যের টুকরার আদান প্রদানে ব্যবহার না থাকে তাহলে এগুলো দ্রব্যসামগ্রীর তুল্য বিবেচিত হবে। ফলে এগুলোর দ্বারা মুদারাবা সহীহ ও সঠিক হবে না।
মালেকী আলেমগণ স্বর্ণের বা রৌপ্যের টুকরো পুঁজি হিসাবে বিনিয়োগ দুটো শর্তসাপেক্ষে জায়েয বলেন। সে শর্তগুলো হচ্ছে : এক. যে শহরে বা দেশে মুদারাবা সংঘটিত হচ্ছে সেখানে এ ধরনের ধাতব টুকরোর ব্যবহার প্রচলিত থাকা। দুই. সে স্থানে ছাপ দেওয়া স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন নেই। যদি দেখা যায়, সেখানে স্বর্ণমুদ্রারও প্রচলন রয়েছে তাহলে স্বর্ণের বা রৌপ্যের টুকরো দিয়ে মুদারাবার পুঁজি যোগান দেওয়া জায়েয ও সঠিক হবে না, যেহেতু সেখানে মূল মুদ্রারই প্রচলন রয়েছে। ৪৫
টিকাঃ
৪৫. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮২; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৮৩-৬৮৪; শারহুয যুরকানী, খ. ৬, পৃ. ২১৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২১৩; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৪৯৮
📄 পয়সা দিয়ে মুদারাবা
(الْمُضَارَبَةُ بِالْقُلُوسِ)
অধিকাংশ ফকীহ, আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ রহ.-এর মত, মালেকী আলেমদের প্রসিদ্ধ মত এবং শাফেয়ী ও হাম্বলী আলেমদের মতে, পয়সা দিয়ে মুদারাবা করা সঠিক ও সহীহ নয়। ৪৯ তারা বলেন, মূলত মুদারাবা হচ্ছে প্রতারণার আশঙ্কায় পূর্ণ চুক্তি, কেবল প্রয়োজনবশত তা জায়েয রাখা হয়েছে। তাই যেভাবে তার বহুল প্রচলন এবং যেভাবে তা সহজ সেভাবেই তা করা হবে। তা হচ্ছে, স্বাভাবিক মুদ্রা দ্বারা মুদারাবা করা। (আরব ও ইসলামী দেশগুলোতে তখন স্বাভাবিক মুদ্রা ছিল দীনার- স্বর্ণমুদ্রা এবং দিরহাম- রৌপ্যমুদ্রা। তাই অন্য মুদ্রাকে এখানে পয়সা বলা হচ্ছে।)
কোনো কোনো ফকীহ পয়সা দিয়ে মুদারাবা করা কতক শর্ত সাপেক্ষে জায়েয বলে মত প্রদান করেছেন।
আল্লামা কাসানী বলেন, যদি পয়সার চাহিদা কম এবং তার প্রচলন মন্দা ধরনের হয়, তাহলে তা দ্রব্যসামগ্রী বলে গণ্য হবে। তাই তা মুদারাবা ব্যবসায়ে পুঁজি হিসাবে বিনিয়োগ করা যাবে না। যদি তার বিপরীত পয়সা বেশ প্রচলিত থাকে, তার চাহিদা থাকে যথেষ্ট তাহলে ইমাম মুহাম্মদের মতে তা বিনিয়োগ করা যাবে। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফ এ অবস্থাতেও তা বিনিয়োগ করা নাজায়েয বলেছেন, এটিই তাদের পক্ষ থেকে প্রসিদ্ধ মত। ৫০
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, পয়সা মুদারাবা চুক্তিতে মূলধন ধার্য করা যথাযথ ও বৈধ নয়। যদিও লেনদেনে তার প্রচলন থাকে; এটি তাদের প্রসিদ্ধ মত। তারা এর কারণ হিসাবে বলেন : স্বর্ণখণ্ড, যদি কোথাও লেনদেনে তার একক প্রচলন থাকে, তবে সে অবস্থা ব্যতীত অন্য ক্ষেত্রে তা চাহিদাহীন বা মন্দা হওয়ার তাতে ধারণাও যদি না করা যায় তথাপি তা মুদারাবা চুক্তিতে পুঁজি হিসাবে বিনিয়োগ করা যথাযথ হয় না। অতএব, পয়সা তো বিনিয়োগ করা যাবেই না, বিশেষত তাতে যখন চাহিদাহীন ও মন্দা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান। তবে যদি কোথাও কেবল পয়সা কড়িই ব্যবহৃত হয় তাহলে সে স্থানে পয়সা মূলধন হিসাবে বিনিয়োগ করা যাবে। যদি কোথাও কেবল স্বর্ণের প্রচলন থাকে তবে তা-ই প্রদান করা হবে। দারদীর বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য ছোটখাট ব্যবসায় বা অল্প মূলধনের ব্যবসায়ে তা বিনিয়োগ করা যাবে যেহেতু তাতে এ মুদ্রার প্রচলন রয়েছে।
মালেকী মাযহাবের কতক আলেম পয়সা দ্বারা মুদারাবা জায়েয বলে মত ব্যক্ত করেছেন। তারা বলেন, দীনার ও দিরহাম-স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রা কোনো মূল উদ্দিষ্ট বস্তু নয়, এগুলো লেনদেনের মাধ্যম। যদি এগুলো মূল উদ্দিষ্ট হতো তাহলে এগুলো ছাড়া অন্য কোনো মুদ্রার ব্যবহার বা প্রচলন থাকত না মোটেই। অথচ অন্য মুদ্রাও প্রচলিত রয়েছে। যেহেতু এ সব ধরনের মুদ্রা দ্বারা উদ্দেশ্য প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন, তাই স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার ন্যায় অন্য মুদ্রা দ্বারাও মুদারাবা করা যথাযথ ও সঠিক হবে। ৫১
টিকাঃ
৪৯. এখানে فلوس শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে যা فلس-এর বহুবচন, অর্থ : মুদ্রা, যা কেনাবেচায় বিপরীত বস্তু না হয়ে বিনিময় হয়। দ্র. আমীমুল ইহসান প্রণীত কাওয়াইদুল ফিকহ ও বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ২৩৬
৫০. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৫৯
৫১. আশ-শারহুস কাবীর ও হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৬১৯; আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়া তুস সাভী, খ. ৩, পৃ. ৬৮৪