📄 অমুসলিমের সাথে মুদারাবা
অমুসলিমের সাথে মুদারাবা চুক্তি করা এবং তা পালন করার বিষয়ে ফকীহগণ ভিন্ন ভিন্ন মত প্রদান করেছেন। হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ অমুসলিমের সাথে মুসলিম মুদারাবা ভিত্তিতে ব্যবসা জায়েয হওয়ার মত প্রদান করেছেন। আল্লামা কাসানী বলেন, পুঁজির যোগানদাতা বা কর্মী ব্যবসায়ী এ দুজনের মুসলমান হওয়ার কোনো শর্ত নেই। তাই অমুসলিম ও মুসলিম নাগরিকের মাঝে মুদারাবা চুক্তি সম্পাদন করা বৈধ। তেমনিভাবে মুসলিম এবং মুসলিম দেশে আগত অমুসলমানের মাঝেও এ চুক্তি সম্পাদন করা জায়েয ও বৈধ। তাই যদি কোনো বিদেশী অমুসলিম মুসলমানের দেশে ভিসার মাধ্যমে নিরাপত্তা লাভ করে, সে দেশে আসার পর কোনো মুসলমানকে মুদারাবার উদ্দেশ্যে অর্থ-সম্পদ প্রদান করে অথবা মুসলমান স্থানীয় ব্যক্তি আগত অমুসলিমকে অর্থকড়ি দেয় ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে, তাহলে তা জায়েয ও বৈধ হবে। যেহেতু নিরাপত্তা লাভ করে মুসলমানের দেশে আসা অমুসলিম ব্যক্তি মুসলমানের দেশের অমুসলিম নাগরিকের তুল্য; তার সাথে মুদারাবা করা যায়। তাই অপর দেশের অমুসলিমের সাথেও মুদারাবা করা সঙ্গত হবে।
যদি কর্মী- ব্যবসায়ী মুসলমান হয়, ব্যবসা করার লক্ষ্যে অমুসলমানের দেশে যায়, তাহলে সেখানকার অমুসলমানের পুঁজি হস্তগত হওয়ার পর চুক্তিমাফিক সে ব্যবসাকার্য করতে পারবে। এভাবে আলোচনায় দেখা গেল, অমুসলমান মুসলমানের দেশে আসা এবং মুসলমান অমুসলমানের দেশে গিয়ে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া উভয়ই জায়েয। সে ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে দেশের ভিন্নতা মোটেই ধর্তব্য হয় না।
যদি কর্মী- ব্যবসায়ী অমুসলিম দেশের অমুসলিম নাগরিক হয়ে মুসলমানের দেশে আসে, এরপর তার ব্যবসার অংশ হিসাবে সে তার এলাকায় যায়, তাহলে সে যদি মুসলিম পুঁজিদাতার অনুমতি ছাড়া গিয়ে থাকে তবে মুদারাবা ভেঙ্গে যাবে। কিন্তু পুঁজিদাতার অনুমতি নিয়ে নিজ দেশে ফিরে গেলে তার সাথে কৃত কোনো চুক্তি ভাঙ্গবে না। তাই মুদারাবাও যথারীতি বহাল থাকবে। ব্যবসায়ে অর্জিত লাভ তাদের দুজনের মধ্যে শর্তমাফিক বণ্টিত হবে। যদি কর্মী মুসলমান হয়ে ফিরে আসে অথবা জিম্মী অথবা নিরাপত্তা লাভকারী বিদেশী অমুসলিম অবস্থাতেই ফিরে আসে, তাহলে সূক্ষ্ম কিয়াস অনুযায়ী মুদারাবা জায়েয হয়। যদিও স্বাভাবিক কিয়াস ও যুক্তির দাবি হচ্ছে, এ সকল ক্ষেত্রে মুদারাবা বাতিল হয়ে যায়।
এক্ষেত্রে সূক্ষ্ম কিয়াস হচ্ছে, কর্মী যে অমুসলিম দেশের অমুসলিম নাগরিক সে যখন পুঁজিদাতার অনুমতি বা নির্দেশ ক্রমে কোথাও যায়, তার সাথে পুঁজিদাতাও যেন সেখানে যায়। পুঁজিদাতা যদি তার কর্মীর সাথে অমুসলিম দেশে যায়, তাহলে তাতে মুদারাবা বাতিল বা নষ্ট হয় না। তাই যখন পুঁজিদাতার নির্দেশে কর্মী একা সে দেশে যাবে তাতেও মুদারাবা নষ্ট হবে না। কিন্তু পুঁজিদাতার নির্দেশ বা অনুমতি ছাড়াই যদি কর্মী তার নিজ দেশে প্রবেশ করে, তাহলে মুদারাবা চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। যেহেতু সে পুঁজিদাতার পক্ষ থেকে অনুমতি নেয়নি, ফলে পুঁজিদাতার সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। ধরা হবে, সে নিজের পক্ষ থেকে এ কাজ করেছে এবং নিজেকে সে-ই পরিচালনা করছে।
এক্ষেত্রে স্বাভাবিক কিয়াস ও যুক্তি হচ্ছে : অমুসলিম কর্মী যখন তার নিজ দেশে প্রবেশ করবে, অপর দেশে থাকাকালীন যে নিরাপত্তা লাভ করেছিল তার প্রয়োজন না থাকায় সে নিরাপত্তা প্রদান বাতিল হয়ে যাবে। সে সেই অমুসলিম দেশের পূর্বে যেমন নাগরিক ছিল, এখনও তেমনি সাধারণ একজন নাগরিক হয়ে যাবে। দুজন দুদেশের নাগরিক হওয়ার প্রেক্ষিতে কর্মীর প্রতি পুঁজিদাতার নির্দেশ এখন আর কার্যকর থাকবে না। এ অবস্থায় কর্মী পুঁজিতে হস্তক্ষেপ করলে তা হবে অবৈধ হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ যা তার আওতার বাইরে।
আল্লামা ইবনে কুদামা বলেন, অগ্নিপূজকের সাথে মুদারাবা চুক্তি করা ইমাম আহমদ পছন্দ করেননি। তিনি কেবল এ চুক্তিই নয়, তাদের সাথে কোনো ধরনের লেনদেন ও অংশীদারি কারবার করা পছন্দ করেন নাই। তিনি বলেন, তাদের সাথে মেলামেশা ও লেনদেন আমার পছন্দ নয়; যেহেতু তারা এমন অনেক কিছু বৈধ মনে করে যা অন্যরা বৈধ মনে করে না। ৩৪
শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের আলেমদের এ সম্পর্কে গৃহীত মত হচ্ছে, অমুসলমানের সাথে মুদারাবা বা অন্য কোনো অংশীদারি কারবার করা মাকরুহ। মালেকী আলেমদের অপর একটি মত হচ্ছে, অমুসলিমের সাথে কোনো মুসলমানের মুদারাবা চুক্তি করা হারাম। ইমাম মালেক রহ. বলেন, (অমুসলমান তো বটেই), যদি কোনো লোক মুসলমান হলেও তার হালাল-হারামের জ্ঞান না থাকে অথবা হালাল-হারামের পরোয়া না করে; তবে তার সাথে মুদারাবা চুক্তি করা এবং তার ভিত্তিতে তাকে অর্থকড়ি দেওয়া আমি পছন্দ করি না। ৩৫
টিকাঃ
৩৩. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮১-৮২
৩৪. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪.
৩৫. আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়াতুস সাভী, খ. ৩, পৃ. ৪৫৫-৪৫৮; আল-খিরাশী, খ. ৬, পৃ. ২০০; আল-মুদাওয়ানা, খ. ৫, পৃ. ১০৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২২৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৪
📄 পুঁজির সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি
মুদারাবা যথাযথ ও সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্যে বেশকিছু শর্ত রয়েছে এমন, যেগুলো পুঁজিতে বাস্তবায়িত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। সেগুলো হচ্ছে : পুঁজি হবে মুদ্রা (যেমন টাকা বা ডলার ইত্যাদি), তা হবে জ্ঞাত ও নির্দিষ্ট এবং তা হবে নগদ মুদ্রা, তা দায়িত্বে থাকা ঋণ বা দেনা হিসাবে থাকবে না।
📄 পুঁজি মুদ্রা হওয়া
ফকীহগণ এ কথায় একমত, পুঁজি হবে মুদ্রা, টাকা বা ডলার ইত্যাদি। কারো কারো মতে এ কথায় ফকীহগণ ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন, যেমন শাফেয়ী মাযহাবের আলেম জুওয়াইনী বর্ণনা করেছেন। শাফেয়ী মাযহাবের কতক আলেম বলেছেন, সাহাবায়ে কেরাম এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। ৩৬ এ শর্তের ওপর ভিত্তি করে ফুকাহায়ে কেরাম বেশকিছু নিষিদ্ধ বিষয়, প্রকার ও ধরন এবং কিছু মাসায়েল বের করেছেন; যেগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা ও মতানৈক্য রয়েছে। যা নিম্নরূপ :
টিকাঃ
৩৬. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮২; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৮২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০; কাশশাফুল কিনা', খ. ৫, পৃ. ৫০৭
📄 এক. পণ্য বা বস্তু সামগ্রী দ্বারা মুদারাবা চুক্তি
(الْمُضَارَبَةُ بِالْعُرُوضِ)
হানাফী, শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের অভিমত এবং হাম্বলী মাযহাবের জাহেরী অভিমত হচ্ছে, পণ্য বা বস্তুসামগ্রী দ্বারা মুদারাবা চুক্তি সহীহ হবে না; এ পণ্য মিছলী বা কীমী যাই হোক। এ বিষয়ে তাদের দলিল-প্রমাণ ও বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে; যা নিম্নরূপ :
(নিয়ম হচ্ছে, কোনো পণ্য কিনে তা কজা করে নিজের জিম্মাদারিতে নিয়ে আসার পর তা বিক্রি করা। এক্ষেত্রে পণ্য হচ্ছে দু প্রকার : নির্দিষ্ট করলে তা নির্দিষ্ট হয় অথবা নির্দিষ্ট হয় না।) হানাফী আলেমগণ এ পর্যায়ে বলেন, যা নির্ধারণ করার দ্বারা নির্দিষ্ট হয় (কজা করে তা নিজের নিয়ন্ত্রণে না এনেই) তাতে লাভ করা, বস্তুত যে বস্তু জিম্মাদারিতে আসেনি তাতে লাভ করা। এটি নিষিদ্ধ; যেহেতু এ ধরনের পণ্য কেনার সময়ই নির্দিষ্ট হয়ে যায়, তা নির্দিষ্ট হলেও কব্জা না করার দরুন তা জিম্মাদারিতে আসে না। যদি এ অবস্থায় কর্মী তা হস্তান্তর করার আগে ধ্বংস বা বিনষ্ট হয়ে যায় তাহলে তা বিক্রেতার ক্ষতি বলে গণ্য হবে। কর্মীর তাতে কোনো ক্ষতি হবে না, যেহেতু সে সে সামগ্রী কজা করেনি। কর্মী মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা হিসাবে সে সব সামগ্রী বিক্রি করে যদি লাভ অর্জন করে তবে তা হবে যে জিনিস (কজা না করার দরুন) জিম্মাদারিতে আসেনি তাতে লাভ করা, যা থেকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ رِبْحِ مَا لَمْ يُضْمَنْ “যে বস্তু কারো জিম্মাদারিতে আসেনি তাতে লাভ করা থেকে নবীজী নিষেধ করেছেন।”৩৭
এর বিপরীতে যা নির্দিষ্ট করা হলেই নির্দিষ্ট হয়ে যায় না, তা কেনার পর কজা করে নিজের জিম্মাদারিতে আনতে হয়, এমন বস্তু যদি (নিজের জিম্মাদারিতে এনে) ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার আগে নষ্ট বা ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে তা ব্যবসায়ী-কর্মীর জিম্মায় থাকা অবস্থায় বিনষ্ট হয়েছে বলে সাব্যস্ত হবে এবং ক্রেতা তার ক্ষতিপূরণ পাবে। তাতে যদি লাভ ধরা হয় তবে তা হবে দায়িত্বে থাকা বস্তুতে লাভ, তাই তা জায়েয ও বৈধ হবে।
তা ছাড়া আসবাবপত্র পুঁজি হিসাবে প্রদান করা হলে তা বণ্টনের সময় তাতে লাভ কত হবে তা অনির্দিষ্ট থাকবে। কারণ, জিনিসপত্রের দাম ধরতে হবে আন্দাজে অনুমানে। তা সবার এক হবে না, একজনের দাম ধরা অপরজনের দাম ধরা থেকে ভিন্ন হবে। ফলে লাভ অনির্দিষ্ট থাকার পরিস্থিতি ঝগড়ার পরিস্থিতিতে গড়াবে যা নানা অরাজকতার কারণ হবে। তাই এসবের উৎস আসবাবপত্র পুঁজি হওয়াই জায়েয হবে না। ৩৮
মুদারাবার পুঁজি আসবাবপত্র হওয়া জায়েয নয়, মালেকী মাযহাবের আলেমগণ এর কারণ বর্ণনা করে বলেন, মুদারাবা হচ্ছে শরীয়তের পক্ষ থেকে ছাড় প্রদান। নিয়ম হচ্ছে, কোনো বিষয়ে ছাড় দেওয়া হলে তা ঐ বিষয়েই সীমিত থাকে। তা থেকে অন্য কোনো দিকে বিস্তৃত হয় না। ফলে অন্য সকল ক্ষেত্রে মূল বিধানই বহাল থাকে। শরীয়তে নগদ অর্থে মুদারাবার আলোচনা এসেছে, তাই শরীয়তের ছাড় তাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অন্য যে কোনো কিছু নিষেধের আওতায় থাকবে। এক্ষেত্রে আসবাবের মূল্য ধরা হলেও তা জায়েয হবে না। ৩৯
আসবাবপত্র মুদারাবার পুঁজি হওয়া নাজায়েয, শাফেয়ী আলেমগণ এর কারণ বর্ণনায় বলেন, মুদারাবা চুক্তি হচ্ছে ধোঁকাপূর্ণ এক চুক্তি। যেহেতু তাতে কর্মীর কাজ থাকে অনিয়ন্ত্রিত, লাভ থাকে অনিশ্চিত। তারপরও প্রয়োজনের তাগিদে একে জায়েয গণ্য করা হয়েছে। তাই যেভাবে তার বহুল প্রচলন এবং যেভাবে তা সহজ তাতেই এটি সীমাবদ্ধ থাকবে। তা হচ্ছে, ব্যবসার পুঁজি হিসাবে মুদ্রা সরবরাহ করা। ৪০
তা ছাড়া মুদারাবাতে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে, মূল টাকা যোগানদাতাকে ফেরত দিয়ে লাভে অংশীদার হওয়া। কিন্তু যদি নগদ অর্থ ব্যতীত অন্য কিছুর ওপর ভিত্তি করে মুদারাবা করা হয় তাহলে তাদের এ উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। যদি সে বস্তুটি মিছলী হয় তবে সে পুঁজি ফেরত দেওয়া হিসাবে তার সদৃশ বস্তু সংগ্রহ করে তা পুঁজিদাতাকে প্রদান করতে হবে। যদি পুঁজি হিসাবে প্রদত্ত বস্তুটি কীমী হয় অর্থাৎ তার সদৃশ বস্তু সচরাচর না পাওয়া যায়, তাহলে তার মূল্য হিসাব করে তা পুঁজিদাতাকে ফেরত দিতে হবে। এ অবস্থায় কর্মী মিছলী বা কীমী যে বস্তুই হোক, তা নেওয়ার সময় সে বস্তুটির যে দাম ছিল ফেরত দেওয়ার সময় তার দাম তা থেকে বাড়তেও পারে, কমতেও পারে। যদি বেড়ে যায় তাহলে কর্মী ব্যবসা করে যা কামাই করেছে হয়তো মূল বস্তুটি বা তার মূল্য ফেরত দিতে গিয়ে তার সবটাই তাকে খরচ করে ফেলতে হবে। এটা হবে কর্মীর বড়ই ক্ষতি, কারণ তার যাবতীয় শ্রম ব্যর্থ হয়ে যাবে। যদি এখন ফেরত দেওয়ার সময় বস্তুটির মূল্য কমে যায় তাহলে তার কামাই থেকে সামান্য কিছু ব্যয় করলেই পুঁজিদাতার মূলধন ফেরত দেওয়া হয়ে যাবে। অবশিষ্ট টাকা লাভের খাতে চলে যাওয়ায় সে টাকায় দুজনে সমান অংশীদার হবে। এভাবে পুঁজিদাতার ক্ষতি সাধিত হবে। সুতরাং যদি বস্তু না দিয়ে নগদ অর্থ কর্মীর হাতে দেওয়া হয়, তাহলেই কর্মী বা পুঁজিদাতা কারোরই কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। তাতে যা নগদ দেওয়া হয় তা-ই ফেরত দিতে হয়, বেশিও নয়, কমও নয়। ৪১
হাম্বলী আলেমদের গৃহীত মত হচ্ছে, আসবাবপত্র পুঁজি হিসাবে দেওয়া যাবে না। তারা বলেন, দ্রব্যসামগ্রীতে অংশীদারি জায়েয নয়। আবু তালেব ও হারবের বর্ণনায় পাওয়া যায়, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল নিজেই এ কথা বলেছেন। ইবনে মুনযিরও আহমদের বক্তব্য হিসাবে তা বর্ণনা করেছেন। তারা বলেন, সামগ্রীতে অংশীদারি হলে তাতে তিনটি সম্ভাব্য রূপ হতে পারে : এক. মূল বস্তুতে অংশীদারি; দুই. তার মূল্যে অংশীদারি; তিন, বস্তুর বাজারমূল্যে অংশীদারি। মূল বস্তুতে অংশীদারি সম্ভব নয়। যখন অংশীদাররা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তখন অংশীদারি কারবারের চাহিদা হচ্ছে, মূল বস্তু বা তার সদৃশ ফিরিয়ে দিতে হবে। এ বস্তুটির হয়তো সদৃশও পাওয়া যাবে না যা ফেরত দেওয়া যাবে। এ ধরনের কোনো বস্তু দিতে গেলে হয়তো এটির মূল্য পূর্বেরটির তুলনায় বেশি হবে। ফলে, এটি হয়তো সবটুকু লাভ অথবা লাভসহ সম্পূর্ণ সম্পদই গ্রাস করে ফেলবে। অথবা পূর্বেরটির তুলনায় বর্তমানের বস্তুটির মূল্য কম হবে। তাহলে অপরজন কর্মী-ব্যবসায়ী সে এ বস্তুর মূল মূল্যে অংশীদার হয়ে যাবে, যা প্রকৃতপক্ষে লাভ নয়।
বস্তুর মূল্যে অংশীদারিও জায়েয নয়, যেহেতু মূল্য উভয়পক্ষ মিলে সাব্যস্ত করা হয়নি। এখন মূল্য সাব্যস্ত করতে গিয়ে উভয়ের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যেতে পারে। যে দাম ধরা হবে বস্তুটি তা থেকে আরো বেশিদামের হতে পারে। তা ছাড়া কারো হাতে কখনো বস্তুর মূল্য বেড়ে যেতে পারে তা বিক্রি করার আগেই, তাহলে সে বস্তুতে অপরজনও অংশীদার হয়ে যাবে, যা ঠিক নয়।
বস্তুর বাজারমূল্য ধার্য করে তাতে অংশীদার হওয়াও জায়েয ও বৈধ নয়। যেহেতু যখন জিনিসটি কর্মীর হাতে অর্পণ করা হচ্ছে তখন তার কোনো বাজারমূল্য সাব্যস্ত হয়নি, তখন তারা দুজন সে বাজার মূল্যের মালিকও ছিল না। তা ছাড়া, এখানে কোন মূল্য ধার্য হবে তাও সুস্পষ্ট নয়। যদি যে মূল্যে সে বস্তুটি কিনেছিল তা ধরা হয় তা ঠিক হবে না, যেহেতু জিনিসটি সেখান থেকে বের হয়ে বিক্রেতার হাতে চলে গেছে। যদি বিক্রি করার মূল্য ধরা হয় তা-ও ঠিক হবে না, যেহেতু তাতে নির্দিষ্ট বস্তু বিক্রির শর্তে শর্তযুক্ত অংশীদারী সম্পন্ন হয় যা জায়েয নয়।
ইমাম আহমদ র.-এর পক্ষ থেকে অপর একটি মত বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলো, অংশীদারি কারবার ও মুদারাবা নগদ অর্থের বদলে কোনো বস্তু প্রদান করার দ্বারাও জায়েয হবে। চুক্তি সম্পাদনকালে বস্তুটির যে মূল্য রয়েছে তা-ই মূলধন বলে ধার্য হবে। ইমাম আহমদ বলেন, যদি দু ব্যক্তি কোনো বস্তুতে অংশীদার হয় তাহলে তারা যা শর্ত করবে সে হিসাবেই তার লাভ তাদের মাঝে বণ্টিত হবে। আছরাম বলেন, আমি আবু আবদিল্লাহকে বলতে শুনেছি। তিনি ইমাম আহমদকে প্রশ্ন করেছেন, মুদারাবাতে পুঁজি হিসাবে কোনো বস্তু দেওয়া জায়েয কি-না। জবাবে ইমাম আহমদ বলেছেন, জায়েয। এই প্রশ্নোত্তর এ ধরনের চুক্তি বৈধ হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়েছে। আবুবকর ও আবুল খাত্তাব এ মতটিই গ্রহণ করেছেন। মারদাভী এ মতটিই সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন। ইবনে আবি লায়লারও এটিই অভিমত। তাওস, আওযায়ী ও হাম্মাদ ইবনে আবু সুলায়মান এ মাসআলাই বর্ণনা করেছেন। তারা বলেন, দুজন দুজনের সম্পদে অংশীদার হয় তাতে উদ্দেশ্য থাকে উভয়ের এ সম্পদগুলোতে কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। দুটোতে যে লাভ হবে তা-ও দুজনের মাঝে বণ্টিত হওয়া। লাভে অংশীদার হওয়া যেমন বস্তুর মূল্যে হওয়া সম্ভব, বস্তুতেও হওয়া সম্ভব। তাই যে কোনো বস্তুতে অংশীদারি ও মুদারাবা করা জায়েয, যেমন বস্তুর মূল্যে অংশীদারি ও মুদারাবা জায়েয। যখন তারা ভিন্ন হয়ে যাবে, চুক্তি সম্পাদনকালে বস্তুটির যে মূল্য ছিল সে মূল্য হিসাবে নিজ নিজ অংশ বুঝে নেবে। যেমন যাকাতের নেসাব সাব্যস্ত করতে মূল্য হিসাব করা হয়। ৪২
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি পুঁজিদাতা জিনিসপত্র দিয়ে বলে, এগুলো বিক্রি করে মূল্য সংগ্রহ করে তা দিয়ে মুদারাবা ব্যবসা করো। সে জিনিসগুলো বিক্রি করে, যেমন দামেই হোক, তার মূল্য সংগ্রহ করে যদি তা দিয়ে মুদারাবা ব্যবসা করে তবে তা জায়েয হবে। এটি এ জন্যে যে, পুঁজিদাতা এ জিনিসগুলোকে তার পুঁজি বলে নাই, পুঁজি সাব্যস্ত করেছে জিনিসের মূল্যকে। মূল্য দ্বারা মুদারাবা সঠিক ও যথাযথ, তাই এভাবে পুঁজির যোগান দেওয়া যথার্থ হবে।
কর্মীকে পুঁজিদাতা যে জিনিসগুলো দিয়েছে সেগুলো সে যদি গম ও ধানের ন্যায় পরিমাপযোগ্য, ওজনের বস্তুর বিপরীতে বিক্রি করে তাহলে ইমাম আবু হানিফার মতে তা জায়েয হবে। কাউকে যদি কোনো জিনিস বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হয় সে যেমন বস্তুটি নগদ অর্থে হোক বা অন্য কোনো বস্তুর বিনিময়ে হোক তা বিক্রি করতে পারে, তেমনি মুদারাবা চুক্তির কর্মীও গম যব ইত্যাদির বদলে আসবাবপত্র বিক্রি করতে পারবে। তবে তাতে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে। কেননা, গম যব ইত্যাদি এমন বস্তু যেগুলোকে মুদারাবার পুঁজি হিসাবে গণ্য করা যায় না। অবশ্য ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ রহ.-এর মতে পুঁজিদাতার দ্রব্যসামগ্রী গম যব ইত্যাদির বিনিময়ে বিক্রি করা জায়েয হবে না। যেহেতু তাঁদের মতে কাউকে কোনো কিছু বিক্রি করার দায়িত্ব দিলে নগদ অর্থ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর বিনিময়ে বিক্রি করা তার জন্যে জায়েয নয়। তবে জিনিস-পত্র বিক্রি করে গম যব ইত্যাদি কেনায় মুদারাবা বাতিল হবে না। যেহেতু মুদারাবা চুক্তিতে গম ও যব ইত্যাদিকে পুঁজি বলা হয় নাই, বরং এগুলোর মূল্যকে পুঁজি বলা হয়েছে। আর এগুলো নগদ অর্থে বিক্রি করলেই পুঁজির টাকা হাতে এসে যাবে। ৪৩
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি কর্মীকে পুঁজিদাতা বলে, তুমি গম যব ইত্যাদি বিক্রি করে তার মূল্যটা পুঁজি হিসাবে নিয়ে নাও, তাহলে মুদারাবা ভেঙ্গে যাবে। তারা এ পর্যায়ে বলেন, কেউ লাভ করা ব্যতীত স্বাভাবিক মূল্যে সে সম্পদ বিক্রি করলে এ জন্যে যথাযথ পারিশ্রমিক পাবে। যদি মুদারাবা-কর্মী লাভ করে বিক্রি করে তাহলে চুক্তি অনুযায়ী কর্মী লাভের অংশ পাবে। কিন্তু যদি তা বিক্রি করে সে কোনো লাভ করতে না পারে তাহলে পুঁজিদাতার তাকে কিছু দিতে হবে না। মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যে মুদ্রার প্রচলন রয়েছে তা ব্যতীত অন্য মুদ্রা দ্বারা মুদারাবা জায়েয নেই, যে মুদ্রার একক প্রচলন রয়েছে পুঁজি হিসাবে কেবল তা দেওয়া জায়েয হবে। যেমন এধরনের মুদ্রাই কেবল আমানত রাখা যাবে। কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন, বাহ্যিকভাবে বোঝা যায়, এ ধরনের মুদ্রা প্রদান জায়েয। ৪৪
টিকাঃ
৩৭. হাদীসটির বর্ণনাকারী সাহাবী হচ্ছেন আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা.। হাদীসটি তিরমিজী শরীফের, খ. ৩, পৃ. ৫২৭-এ উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম তিরমিযী হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, حديث حسن صحيح
৩৮. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮২
৩৯. আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়াতুস সাভী, খ. ৩, পৃ. ৬৮৩-৬৮৬; শারহুষ যুরকানী ও হাশিয়া আল-বুনানী, খ. ৬, পৃ. ২১৩
৪০. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১০
৪১. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৮৫
৪২. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩-১৭
৪৩. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮২
৪৪. আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়া তুস সাভী, খ. ৩, পৃ. ৬৮৬