📄 মুদারাবার রুকন বা মূল অংশ
অধিকাংশ ফকীহ ও আলেমের মতে মুদারাবার মৌলিক অংশ হচ্ছে : চুক্তি সম্পাদনকারী দু ব্যক্তি-পুঁজি সরবরাহকারী ও কর্মী (عَاقِدَان), পুঁজি (رَأْسٌ مَالٌ), পরিশ্রম (عَمَلٌ), লাভ-ক্ষতি (رِبْحٌ) এবং মুদারাবার অর্থ প্রকাশক নির্ধারিত শব্দ (صِيْغَةٌ)।
মালেকী মাযহাবের কোনো কোনো আলেম বলেছেন, ব্যবসাতে কোনো নির্ধারিত শব্দ বলা মুদারাবার অংশ বলে গণ্য হবে না। তা শর্ত হিসাবেও ধর্তব্য হবে না। তাই নির্ধারিত কোনো শব্দ বলা ছাড়াই মুদারাবা যথাযথ ও সঠিক হবে।
শাফেয়ী মাযহাবের কোনো কোনো আলেম বলেন, কাজের মাধ্যমে কবুল সম্পন্ন হওয়াই যথেষ্ট। এ সময় ঈজাব (প্রস্তাব) হবে নির্দেশক শব্দ। যেমন : পুঁজির মালিক বলল, টাকাটা নাও। কর্মী তার হাত থেকে টাকাটা নেওয়াই কবুল বলে গণ্য হবে। ২৬
হানাফী আলেমগণ বলেন, মুদারাবার মূল অংশ হচ্ছে দুটি : এক. ঈজাব (প্রস্তাব) ও দুই. কবুল। এর জন্যে তারা যে কোনো বাক্য বা শব্দ ব্যবহার করতে পারে। ২৭
টিকাঃ
২৬. আত-তাজ ওয়াল ইকলীল বিহামিশ মাওয়াহিবুল জলীল, খ. ৫, পৃ. ৩৫৫; আল-ফাওয়াকিহ আদ-দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৩; বুলগাতুস সালিক লি আকরাবিল মাসালিক, খ. ২, পৃ. ১৬০, প্রকাশক : হালাবী।
২৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ.৭৯
📄 নির্ধারিত শব্দের সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি
মুদারাবা বিশুদ্ধ ও নির্ভুলভাবে সম্পাদিত হওয়ার জন্যে ফকীহগণ কতক শর্তের আলোচনা করেছেন। সেগুলো বর্ণনা করা হচ্ছে : ২৮
অধিকাংশ ফকীহের মত, ঈজাব (প্রস্তাব) ও কবুল প্রকাশক শব্দ উচ্চারণ করা মুদারাবা সম্পাদনে অত্যাবশ্যক। এ জন্যে তারা হয়তো মুদারাবা বা এর সমার্থক শব্দ ব্যবহার করবে। যেমন, মূলধন-যোগানদাতা কর্মীর উদ্দেশে বলবে, ضَرَبْكَ أَوْ قَارَضْتُكَ أَوْ عَامَلْتُكَ (আমি তোমার সাথে মুদারাবা বা মুকারাযা চুক্তি করছি)। অথবা এমন কোনো শব্দ বা বাক্য বলবে যা এ ভাব ও বক্তব্য প্রকাশ করে। যেহেতু চুক্তি বা লেনদেনে শব্দ উদ্দেশ্য থাকে না, উদ্দেশ্য থাকে অর্থ ও মর্ম, তাই এ মর্ম প্রকাশক যে-কোনো শব্দ বা বাক্যই তারা এ সময় বলতে পারে। চুক্তি ও লেনদেনে শব্দের গঠন ও রূপ উদ্দেশ্য থাকে না, উদ্দেশ্য থাকে অর্থ ও মর্ম। তাই التمليك -এর শব্দ ব্যবহার করে البيع (বিক্রি) করা বৈধ হয়; এ ব্যাপারে কোনো ফকীহ কোনোরূপ আপত্তি করেননি। তাই মুদারাবা শব্দ না বলে তার মর্মপ্রকাশক অন্য কোনো শব্দ বললেও এবং উভয়পক্ষ তা বুঝলেই চুক্তি সম্পন্ন হবে।
কর্মী কবুল বোঝাতে এমন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করবে যা তার সম্মতি ও রাজি থাকা সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে। তবে তার এ সম্মতিজ্ঞাপন হতে হবে ঈজাব (প্রস্তাব) এর পরেই একই মজলিসে, বিক্রয় এবং অন্য সকল লেনদেনে কবুল বোঝাতে শরীয়তে যা গ্রহণযোগ্য তেমন ধরনের জবাব হতে হবে।
মুদারাবা চুক্তিতে ঈজাব ও কবুল উভয়টি সুস্পষ্ট শব্দ ও বাক্য দ্বারা প্রকাশিত হতে হবে। এটি হানাফী মাযহাবের ফকীহদের অভিমত, যা মালেকী মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহের মত এবং শাফেয়ী মাযহাবের আলেমদের এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত। হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের অভিমত, যা শাফেয়ী আলেমদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতের বিপরীত তা হচ্ছে, তাঁর 'আমি কবুল করলাম' এ বাক্য বা এ ধরনের কোনো বাক্য কবুল হিসাবে বলা জরুরি নয়। বরং কাজের মাধ্যমে কবুল করাও যথেষ্ট। তাই পুঁজিদাতা পুঁজি দেওয়ার পর কর্মী তা নিয়ে ব্যবসাক্ষেত্রে নেমে পড়লে তা-ই কবুল বলে গণ্য হবে। যেমন কাউকে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হলে তার মৌখিক কিছু না বলে তার কাজে লেগে যাওয়াই কবুল বলে গণ্য হয়।
মালেকী মাযহাবের কোনো কোনো আলেম- তন্মধ্যে ইবনে হাজিব অন্যতম- বলেন, মুদারাবা সংঘটিত হওয়ার জন্যে সুস্পষ্ট মুদারাবা শব্দ বলা জরুরি নয়। বরং মুদারাবা বোঝায় এমন যে-কোনো শব্দে একপক্ষ ঈজাব (প্রস্তাব) উত্থাপন করার পর অপর পক্ষ তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করলেই মুদারাবা সম্পন্ন হবে। যেহেতু তাতে এ অর্থ প্রকাশক ইঙ্গিত সুস্পষ্টভাবে রয়েছে। তারা এর কারণ হিসাবে বলেন, মুদারাবা হচ্ছে এক ধরনের ইজারা- ভাড়ায় কর্মী নিয়োজিত করা। এ ইজারাতে কর্মীকে পুঁজি দেওয়া হয়, ব্যবসা করার মাধ্যমে সে লাভ সংগ্রহ করবে, সে লাভের এক অংশ তার পারিশ্রমিক, তা দ্বারা তার পারিশ্রমিক প্রদান করা হবে। ইজারাতে একপক্ষের প্রস্তাব অপরপক্ষ গ্রহণ করেছে এতোটুকু বোঝা যাওয়াই যথেষ্ট, যেমন বেচাকেনার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এমনিভাবে মুদারাবা চুক্তিতেও একপক্ষের প্রস্তাব অপরপক্ষ গ্রহণ করেছে এতোটুকু বোঝা যাওয়াই যথেষ্ট। ২৯
টিকাঃ
২৮. আদ-দুররুল মুখতার, খ. ৪, পৃ. ৪৮৪-৪৮৫; আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়াতুস সাভী, খ. ৩, পৃ. ৬৮৩, মুদ্রণ দারুল মাআরিফ; আল-ফাওয়াকিহ আদ-দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৫; রওযয়াতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১২৪; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, প. ৫০৭-৫০৮
২৯. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, প. ৮০-৮১; আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়ার তুস সাভী, খ. ৩, প. ৬৮২-৬৮৩; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৫১৭; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১২৪; নিহায়াতুল মুহতাজ ও হাশিয়া আশ শাবরামাল্লিসী, খ. ৫, পৃ. ২৬৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫০৮; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৩২৭-৩২৮
📄 চুক্তির দুপক্ষের সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি
মুদারাবা নির্ভুল ও যথাযথ হওয়ার জন্যে মুদারাবা চুক্তির দুপক্ষ : পুঁজির যোগানদাতা ও কর্মী ব্যবসায়ী উভয়ের সাথে সম্পর্কিত কতক শর্ত রয়েছে, নিম্নে সে সব আলোচনা করা হচ্ছে : ৩০
মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, মুদারাবা যথাযথ হওয়ার জন্যে শর্ত হচ্ছে, এটি সংঘটিত হতে হবে এমন দু ব্যক্তির দ্বারা যারা স্বাধীনভাবে তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। অতএব, তাদের হতে হবে স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা যার রয়েছে, যে দায়িত্ব অর্পণ ও দায়িত্বগ্রহণ করতে পারে অর্থাৎ অপরকে নিজের প্রতিনিধি নির্ধারণ করে তাকে দায়িত্ব প্রদান করতে পারে, অন্যের প্রতিনিধি হয়ে তার দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারে এমন ব্যক্তি। কেননা মুদারাবা চুক্তির উভয়পক্ষ অন্যের প্রতিনিধি, আবার অপরকে প্রতিনিধি নিয়োগকারী। তাই যে প্রতিনিধি হওয়ার এবং অপরকে প্রতিনিধি করার যোগ্যতা রাখে সে মুদারাবা চুক্তিতে অংশগ্রহণ করতে পারে। যার এ যোগ্যতা থাকবে না সে মুদারাবার কোনো পক্ষ হতে পারবে না। ক্রীতদাস দাসী স্বাধীন না হওয়ার দরুন দায়িত্ব অর্পণ বা দায়িত্ব গ্রহণ-এ দুটোর কোনোটিরই যোগ্য নয়; তাই তার জন্যে মুদারাবার কোনো এক পক্ষ হওয়া সহীহ ও সঠিক নয়। তবে যদি তার মনিব তাকে মুদারাবা করার অনুমতি প্রদান করে অথবা সে সাধারণভাবে যে কোনো ব্যবসা করার অনুমতি পেয়ে থাকে, তাহলে তার জন্যে এ চুক্তিতে অংশ নেওয়া যথাযথ ও বৈধ হবে। এমনিভাবে যাদের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার যোগ্যতা নেই, যেমন অপ্রকৃতিস্থ, তাদেরও চুক্তিতে অংশগ্রহণের অনুমতি নেই।
আল্লামা রামলী বলেন, যার সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার যোগ্যতা নেই, যেমন অল্পবয়সী বালক-বালিকা, পাগল ও নির্বোধ হাবা, তাদের পক্ষ থেকে তাদের অভিভাবক মুদারাবা ব্যবসা করার জন্যে অপর কাউকে পুঁজি সরবরাহ করতে পারবে। এক্ষেত্রে অভিভাবক তাদের পিতা, দাদা, ভারপ্রাপ্ত অছি, বিচারক বা তার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত যে কেউ হতে পারে, তাতে মাসআলায় পরিবর্তন বা পার্থক্য হবে না। এক্ষেত্রে মুদারাবা চুক্তিতে কর্মীর ভ্রমণের অনুমতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। তবে যদি কর্মীকে ভ্রমণের অনুমতি প্রদান করা হয় তাহলে তা অভিভাবকের নিজেরই ভ্রমণের ইচ্ছার তুল্য বিবেচনা করা হবে।
দেউলিয়া হওয়ার দরুন যাকে বর্তমানে নিজের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে সে মুদারাবা চুক্তিতে পুঁজি-যোগানদাতা হতে পারবে না, কর্মী-ব্যবসায়ী হতে পারবে।
মুমূর্ষু রোগীর মুদারাবা চুক্তি করা বৈধ। সেক্ষেত্রে তার মোট সম্পদের এক তৃতীয়াংশ হিসাব করতে হবে, তা থেকে কর্মীর স্বাভাবিক পারিশ্রমিকে যা অতিরিক্ত হবে তা হিসাব করতে হবে না। যেহেতু যেটুকু সম্পদ সে দিতে পারবে সেটুকু হিসাব করা হবে। যে পর্যন্ত সে তা বিনিয়োগ করবে না, তা থেকে লাভও আসবে না। লাভ হচ্ছে এমন যা পাওয়ার আশা করা যায়। যদি তা পাওয়া যায় তবে তা পাওয়া যাবে কর্মীর প্রচেষ্টায়। (তাই সেটুকু সম্পদেই লাভ হিসাব করা হবে।)
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, পুঁজিদাতা ও কর্মী উভয়ের বেলায় দায়িত্ব প্রদান করার এবং নিজে দায়িত্ব গ্রহণ করার যোগ্যতা থাকতে হবে। কার্যক্ষেত্রে পুঁজিদাতার নির্দেশ অনুযায়ী কর্মী ব্যবসার সকল কাজ সম্পাদন করে। এভাবে কার্যত প্রকাশিত হয়, তার প্রতি পুঁজিদাতার পক্ষ থেকে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে, তাকে এমন লোক হতে হবে, যে নিজেই সে কাজটি করার ক্ষমতা ও যোগ্যতা রাখে, যে কাজটি সে এখন অপরকে করতে দায়িত্ব দিয়েছে। কেননা দায়িত্ব অর্পণের অর্থই হচ্ছে নিজের আওতায় থাকা কাজ অন্যকে করতে দেওয়া। তাই পাগল বা ছোট বালকের পক্ষ থেকে দায়িত্ব অর্পণ করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না, যেহেতু তারা যা অর্পণ করছে তাদের নিজেদের তা করার যোগ্যতা ও ক্ষমতা নেই মোটেই।
দায়িত্ব গ্রহণ ও প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে তাকে পরিপূর্ণ জ্ঞান-বুদ্ধির অধিকারী হতে হবে। তাই উন্মাদ ও ছোট বালকের প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ যথাযথ নয়। প্রতিনিধি হওয়ার ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাধীন হওয়া শর্ত নয়। তাই জ্ঞান-বুদ্ধির অধিকারী বালক ও ক্রীতদাস প্রতিনিধি হতে পারবে, তারা অন্য চুক্তি ও ব্যবসা করার অনুমতি লাভ করুক বা না করুক। ৩১
হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, অংশীদারি কোনোই কারবার, মুদারাবা তার অন্তর্ভুক্ত, যে ব্যক্তি স্বাধীন ইচ্ছায় যে কোনো লেনদেন করার কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা রাখে সে ছাড়া অন্য কেউ তা করতে পারবে না। যেহেতু এ ধরনের লেনদেনে অর্থসম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও হস্তান্তর করা হয়, তাই যার সে ক্ষমতা নেই সে এ ধরনের লেনদেন করতে পারবে না, যেমন ক্রয়বিক্রয় করা তার সাধ্যের বাইরে। ৩২
টিকাঃ
৩০. আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়া তুস সাভী, খ. ৩, পৃ. ৪৫৭-৪৫৮; শারহুল খিরাশী ও হাশিয়া আল-আদাভী, খ. ৬, পৃ. ২০৩; আল-মুদাওয়ানা, খ. ৫, পৃ. ১০৭; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৪; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১৫ ও ২২৬
৩১. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ২০ ও ৮১-৮২
৩২. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১-২
📄 অমুসলিমের সাথে মুদারাবা
অমুসলিমের সাথে মুদারাবা চুক্তি করা এবং তা পালন করার বিষয়ে ফকীহগণ ভিন্ন ভিন্ন মত প্রদান করেছেন। হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ অমুসলিমের সাথে মুসলিম মুদারাবা ভিত্তিতে ব্যবসা জায়েয হওয়ার মত প্রদান করেছেন। আল্লামা কাসানী বলেন, পুঁজির যোগানদাতা বা কর্মী ব্যবসায়ী এ দুজনের মুসলমান হওয়ার কোনো শর্ত নেই। তাই অমুসলিম ও মুসলিম নাগরিকের মাঝে মুদারাবা চুক্তি সম্পাদন করা বৈধ। তেমনিভাবে মুসলিম এবং মুসলিম দেশে আগত অমুসলমানের মাঝেও এ চুক্তি সম্পাদন করা জায়েয ও বৈধ। তাই যদি কোনো বিদেশী অমুসলিম মুসলমানের দেশে ভিসার মাধ্যমে নিরাপত্তা লাভ করে, সে দেশে আসার পর কোনো মুসলমানকে মুদারাবার উদ্দেশ্যে অর্থ-সম্পদ প্রদান করে অথবা মুসলমান স্থানীয় ব্যক্তি আগত অমুসলিমকে অর্থকড়ি দেয় ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে, তাহলে তা জায়েয ও বৈধ হবে। যেহেতু নিরাপত্তা লাভ করে মুসলমানের দেশে আসা অমুসলিম ব্যক্তি মুসলমানের দেশের অমুসলিম নাগরিকের তুল্য; তার সাথে মুদারাবা করা যায়। তাই অপর দেশের অমুসলিমের সাথেও মুদারাবা করা সঙ্গত হবে।
যদি কর্মী- ব্যবসায়ী মুসলমান হয়, ব্যবসা করার লক্ষ্যে অমুসলমানের দেশে যায়, তাহলে সেখানকার অমুসলমানের পুঁজি হস্তগত হওয়ার পর চুক্তিমাফিক সে ব্যবসাকার্য করতে পারবে। এভাবে আলোচনায় দেখা গেল, অমুসলমান মুসলমানের দেশে আসা এবং মুসলমান অমুসলমানের দেশে গিয়ে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া উভয়ই জায়েয। সে ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে দেশের ভিন্নতা মোটেই ধর্তব্য হয় না।
যদি কর্মী- ব্যবসায়ী অমুসলিম দেশের অমুসলিম নাগরিক হয়ে মুসলমানের দেশে আসে, এরপর তার ব্যবসার অংশ হিসাবে সে তার এলাকায় যায়, তাহলে সে যদি মুসলিম পুঁজিদাতার অনুমতি ছাড়া গিয়ে থাকে তবে মুদারাবা ভেঙ্গে যাবে। কিন্তু পুঁজিদাতার অনুমতি নিয়ে নিজ দেশে ফিরে গেলে তার সাথে কৃত কোনো চুক্তি ভাঙ্গবে না। তাই মুদারাবাও যথারীতি বহাল থাকবে। ব্যবসায়ে অর্জিত লাভ তাদের দুজনের মধ্যে শর্তমাফিক বণ্টিত হবে। যদি কর্মী মুসলমান হয়ে ফিরে আসে অথবা জিম্মী অথবা নিরাপত্তা লাভকারী বিদেশী অমুসলিম অবস্থাতেই ফিরে আসে, তাহলে সূক্ষ্ম কিয়াস অনুযায়ী মুদারাবা জায়েয হয়। যদিও স্বাভাবিক কিয়াস ও যুক্তির দাবি হচ্ছে, এ সকল ক্ষেত্রে মুদারাবা বাতিল হয়ে যায়।
এক্ষেত্রে সূক্ষ্ম কিয়াস হচ্ছে, কর্মী যে অমুসলিম দেশের অমুসলিম নাগরিক সে যখন পুঁজিদাতার অনুমতি বা নির্দেশ ক্রমে কোথাও যায়, তার সাথে পুঁজিদাতাও যেন সেখানে যায়। পুঁজিদাতা যদি তার কর্মীর সাথে অমুসলিম দেশে যায়, তাহলে তাতে মুদারাবা বাতিল বা নষ্ট হয় না। তাই যখন পুঁজিদাতার নির্দেশে কর্মী একা সে দেশে যাবে তাতেও মুদারাবা নষ্ট হবে না। কিন্তু পুঁজিদাতার নির্দেশ বা অনুমতি ছাড়াই যদি কর্মী তার নিজ দেশে প্রবেশ করে, তাহলে মুদারাবা চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। যেহেতু সে পুঁজিদাতার পক্ষ থেকে অনুমতি নেয়নি, ফলে পুঁজিদাতার সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। ধরা হবে, সে নিজের পক্ষ থেকে এ কাজ করেছে এবং নিজেকে সে-ই পরিচালনা করছে।
এক্ষেত্রে স্বাভাবিক কিয়াস ও যুক্তি হচ্ছে : অমুসলিম কর্মী যখন তার নিজ দেশে প্রবেশ করবে, অপর দেশে থাকাকালীন যে নিরাপত্তা লাভ করেছিল তার প্রয়োজন না থাকায় সে নিরাপত্তা প্রদান বাতিল হয়ে যাবে। সে সেই অমুসলিম দেশের পূর্বে যেমন নাগরিক ছিল, এখনও তেমনি সাধারণ একজন নাগরিক হয়ে যাবে। দুজন দুদেশের নাগরিক হওয়ার প্রেক্ষিতে কর্মীর প্রতি পুঁজিদাতার নির্দেশ এখন আর কার্যকর থাকবে না। এ অবস্থায় কর্মী পুঁজিতে হস্তক্ষেপ করলে তা হবে অবৈধ হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ যা তার আওতার বাইরে।
আল্লামা ইবনে কুদামা বলেন, অগ্নিপূজকের সাথে মুদারাবা চুক্তি করা ইমাম আহমদ পছন্দ করেননি। তিনি কেবল এ চুক্তিই নয়, তাদের সাথে কোনো ধরনের লেনদেন ও অংশীদারি কারবার করা পছন্দ করেন নাই। তিনি বলেন, তাদের সাথে মেলামেশা ও লেনদেন আমার পছন্দ নয়; যেহেতু তারা এমন অনেক কিছু বৈধ মনে করে যা অন্যরা বৈধ মনে করে না। ৩৪
শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের আলেমদের এ সম্পর্কে গৃহীত মত হচ্ছে, অমুসলমানের সাথে মুদারাবা বা অন্য কোনো অংশীদারি কারবার করা মাকরুহ। মালেকী আলেমদের অপর একটি মত হচ্ছে, অমুসলিমের সাথে কোনো মুসলমানের মুদারাবা চুক্তি করা হারাম। ইমাম মালেক রহ. বলেন, (অমুসলমান তো বটেই), যদি কোনো লোক মুসলমান হলেও তার হালাল-হারামের জ্ঞান না থাকে অথবা হালাল-হারামের পরোয়া না করে; তবে তার সাথে মুদারাবা চুক্তি করা এবং তার ভিত্তিতে তাকে অর্থকড়ি দেওয়া আমি পছন্দ করি না। ৩৫
টিকাঃ
৩৩. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮১-৮২
৩৪. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪.
৩৫. আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়াতুস সাভী, খ. ৩, পৃ. ৪৫৫-৪৫৮; আল-খিরাশী, খ. ৬, পৃ. ২০০; আল-মুদাওয়ানা, খ. ৫, পৃ. ১০৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২২৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৪