📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদারাবার দুটি প্রকার

📄 মুদারাবার দুটি প্রকার


হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ মুদারাবাকে দুভাগে বিভক্ত করেছেন : ১. শর্তহীন (الْمُضَارَبَةُ الْمُطْلَقَةُ) এবং ২. শর্তযুক্ত (الْمُضَارَبَةُ الْمُقَيَّدَةُ)

শর্তহীন মুদারাবা : এক্ষেত্রে পুঁজিদাতা কর্মীর হাতে পুঁজি অর্পণ করলেও কর্মীকে কিসের ব্যবসা করবে, কোথায় করবে, কখন করবে, কোন্ নিয়মে করবে, কাদের সাথে লেনদেন করবে ইত্যাদি কোনো কিছুই বলে দেয় না।

শর্তযুক্ত মুদারাবা : উপরিউক্ত বিষয়গুলোর কোনো এক বা একাধিক বিষয় পুঁজিদাতা তার কর্মীকে নির্দিষ্ট করে বলে দিলে তাকে শর্তযুক্ত মুদারাবা বলে।

হানাফী আলেমগণ বলেন, কর্মী এ দুপ্রকার মুদারাবার যেটিতে জড়িত হোক তা চারভাগে বিভক্ত হবে :
এক. কর্মীকে সে কী করবে তা স্পষ্ট করে বলে দেওয়া ছাড়াই এবং 'তুমি তোমার বিবেচনা মতো করো' এ কথাও বলার প্রয়োজন ছাড়াই সে কাজ করে যাবে।
দুই. কর্মীকে যদি এ কথা বলা হয়, তুমি তোমার বুদ্ধি বিবেচনা অনুযায়ী করো, তবুও সবকিছু স্পষ্ট করে বলে না দেওয়া পর্যন্ত সে কিছুই করবে না।
তিন. যখন তাকে বলা হবে, তুমি তোমার সিদ্ধান্ত মাফিক করো, তাকে স্পষ্ট করে কিছু না বললেও সে সব কিছু করতে পারবে।
চার. সবকিছু স্পষ্ট করে বলার পরও কর্মী কোনো কিছু করতে পারবে না ('বিবেচনা মতো করো'-এ কথা না বলার দরুন)। ২৪

টিকাঃ
২৪. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৭

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদারাবার অপর এক বিভক্তি

📄 মুদারাবার অপর এক বিভক্তি


মুসেলী বলেছেন, মুদারাবা দু প্রকার : এক. সাধারণ (عامةً) ও দুই. বিশেষ (خاصة)।

সাধারণ মুদারাবা দু প্রকার
এক. মূলধন-যোগানদাতা কর্মীকে মুদারাবার ভিত্তিতে অর্থ সম্পদ প্রদান করবে। কিন্তু তাকে এ কথা বলবে না, তুমি তোমার মর্জিমত কাজ করো। কিন্তু কর্মী ব্যবসা করতে যা কিছু করা লাগে সব কিছু করার অধিকার পাবে। বন্ধক রাখা, বন্ধক দেওয়া, ভাড়া দেওয়া, ভাড়া নেওয়া, দোষের দরুন মালের মূল্য কম ধরা, ব্যবসা চালু রাখার জন্যে প্রয়োজনীয় যে কোনো কাজ ও কৌশল অবলম্বন করা ইত্যাদি সবকিছুই তার কাজের আওতায় থাকবে। ব্যবসায়ীরা আরো যা কিছু করে থাকে- অংশীদার হওয়া, কাউকে অংশীদার বানানো, ঋণ দেওয়া, ঋণ নেওয়া ইত্যাদি সব কিছুই সে করতে পারবে। কেবল দান ও চাঁদা পুঁজিদাতার অনুমতি ছাড়া দিতে পারবে না।

দুই. পুঁজির যোগানদাতা কর্মীকে বলবে, তুমি তোমার বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করো, তাহলে তার জন্যে ব্যবসায়ীর সব ধরনের কাজ বৈধ হবে। অংশীদার হওয়া, অংশীদার করা ইত্যাদি সবই সে করতে পারবে। কেননা সে একজন ব্যবসায়ী, তাই ব্যবসায়ীসুলভ সবই সে করতে পারবে। তবে সে কাউকে ঋণ দেওয়া বা দান করা ইত্যাদি করতে পারবে না, যেহেতু এগুলো ব্যবসার অংশ নয়। তাই 'বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করো' এ নির্দেশের আওতায় দান ও ঋণ অন্তর্ভুক্ত হবে না।

বিশেষ মুদারাবা তিন প্রকার : এক. পুঁজিদাতা তার কর্মীকে নির্দিষ্ট জায়গায় কথা বলবে। যেমন, তুমি এ ব্যবসা অমুক জায়গায় করবে। দুই. ব্যক্তি নির্ধারণ করে দেবে। যেমন বলবে, তুমি অমুকের কাছ থেকে কিনবে, তুমি অমুকের কাছে বিক্রি করতে হবে। এ অবস্থায় যার কথা বলা হয়েছে সে ভিন্ন অন্য কারো সাথে সে লেনদেন করতে পারবে না। যেহেতু লেনদেনে আস্থা ও নির্ভরতা থাকতে হয়। তিন. ব্যবসার কোনো পদ বা পদ্ধতি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। যেমন, বলা হবে, তুমি ধান বা গম কেনাবেচা করবে অথবা বলা হবে, তুমি সারাফ পদ্ধতিতে বিক্রি সম্পন্ন করো। এই তিনটি প্রকারেই যা বলা হয়েছে সেভাবেই মুদারাবার কর্মীকে কাজ করতে হবে, তার বিপরীত করা জায়েয নয়। ২৫

অধিকাংশ ফকীহ ও আলেম মুদারাবাকে শর্তমুক্ত ও শর্তযুক্ত অথবা সাধারণ ও বিশেষ-এভাবে বিভক্ত করেননি। এ সকল বিভক্তি করেছেন হানাফী আলেমগণ। অন্য মাযহাবের আলেমগণ যদিও এ বিভক্তিগুলো করেননি, কিন্তু তারা মুদারাবার মূল অংশ, তার শর্তাবলি ইত্যাদির আলোচনাকালে সে বিভক্তিপ্রসূত কথাগুলো যথারীতি বহাল রেখেছেন। এ সকল আলোচনায় কোথাও তারা হানাফী আলেমদের সাথে একমত হয়েছেন, কোথাও বিপরীত মত পোষণ করেছেন।

টিকাঃ
২৫. আল-ইখতিয়ার লি তালীলি আল-মুখতার, খ. ৩, পৃ. ২১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদারাবার রুকন বা মূল অংশ

📄 মুদারাবার রুকন বা মূল অংশ


অধিকাংশ ফকীহ ও আলেমের মতে মুদারাবার মৌলিক অংশ হচ্ছে : চুক্তি সম্পাদনকারী দু ব্যক্তি-পুঁজি সরবরাহকারী ও কর্মী (عَاقِدَان), পুঁজি (رَأْسٌ مَالٌ), পরিশ্রম (عَمَلٌ), লাভ-ক্ষতি (رِبْحٌ) এবং মুদারাবার অর্থ প্রকাশক নির্ধারিত শব্দ (صِيْغَةٌ)।

মালেকী মাযহাবের কোনো কোনো আলেম বলেছেন, ব্যবসাতে কোনো নির্ধারিত শব্দ বলা মুদারাবার অংশ বলে গণ্য হবে না। তা শর্ত হিসাবেও ধর্তব্য হবে না। তাই নির্ধারিত কোনো শব্দ বলা ছাড়াই মুদারাবা যথাযথ ও সঠিক হবে।

শাফেয়ী মাযহাবের কোনো কোনো আলেম বলেন, কাজের মাধ্যমে কবুল সম্পন্ন হওয়াই যথেষ্ট। এ সময় ঈজাব (প্রস্তাব) হবে নির্দেশক শব্দ। যেমন : পুঁজির মালিক বলল, টাকাটা নাও। কর্মী তার হাত থেকে টাকাটা নেওয়াই কবুল বলে গণ্য হবে। ২৬

হানাফী আলেমগণ বলেন, মুদারাবার মূল অংশ হচ্ছে দুটি : এক. ঈজাব (প্রস্তাব) ও দুই. কবুল। এর জন্যে তারা যে কোনো বাক্য বা শব্দ ব্যবহার করতে পারে। ২৭

টিকাঃ
২৬. আত-তাজ ওয়াল ইকলীল বিহামিশ মাওয়াহিবুল জলীল, খ. ৫, পৃ. ৩৫৫; আল-ফাওয়াকিহ আদ-দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৩; বুলগাতুস সালিক লি আকরাবিল মাসালিক, খ. ২, পৃ. ১৬০, প্রকাশক : হালাবী।
২৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ.৭৯

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 নির্ধারিত শব্দের সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি

📄 নির্ধারিত শব্দের সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি


মুদারাবা বিশুদ্ধ ও নির্ভুলভাবে সম্পাদিত হওয়ার জন্যে ফকীহগণ কতক শর্তের আলোচনা করেছেন। সেগুলো বর্ণনা করা হচ্ছে : ২৮

অধিকাংশ ফকীহের মত, ঈজাব (প্রস্তাব) ও কবুল প্রকাশক শব্দ উচ্চারণ করা মুদারাবা সম্পাদনে অত্যাবশ্যক। এ জন্যে তারা হয়তো মুদারাবা বা এর সমার্থক শব্দ ব্যবহার করবে। যেমন, মূলধন-যোগানদাতা কর্মীর উদ্দেশে বলবে, ضَرَبْكَ أَوْ قَارَضْتُكَ أَوْ عَامَلْتُكَ (আমি তোমার সাথে মুদারাবা বা মুকারাযা চুক্তি করছি)। অথবা এমন কোনো শব্দ বা বাক্য বলবে যা এ ভাব ও বক্তব্য প্রকাশ করে। যেহেতু চুক্তি বা লেনদেনে শব্দ উদ্দেশ্য থাকে না, উদ্দেশ্য থাকে অর্থ ও মর্ম, তাই এ মর্ম প্রকাশক যে-কোনো শব্দ বা বাক্যই তারা এ সময় বলতে পারে। চুক্তি ও লেনদেনে শব্দের গঠন ও রূপ উদ্দেশ্য থাকে না, উদ্দেশ্য থাকে অর্থ ও মর্ম। তাই التمليك -এর শব্দ ব্যবহার করে البيع (বিক্রি) করা বৈধ হয়; এ ব্যাপারে কোনো ফকীহ কোনোরূপ আপত্তি করেননি। তাই মুদারাবা শব্দ না বলে তার মর্মপ্রকাশক অন্য কোনো শব্দ বললেও এবং উভয়পক্ষ তা বুঝলেই চুক্তি সম্পন্ন হবে।

কর্মী কবুল বোঝাতে এমন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করবে যা তার সম্মতি ও রাজি থাকা সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে। তবে তার এ সম্মতিজ্ঞাপন হতে হবে ঈজাব (প্রস্তাব) এর পরেই একই মজলিসে, বিক্রয় এবং অন্য সকল লেনদেনে কবুল বোঝাতে শরীয়তে যা গ্রহণযোগ্য তেমন ধরনের জবাব হতে হবে।

মুদারাবা চুক্তিতে ঈজাব ও কবুল উভয়টি সুস্পষ্ট শব্দ ও বাক্য দ্বারা প্রকাশিত হতে হবে। এটি হানাফী মাযহাবের ফকীহদের অভিমত, যা মালেকী মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহের মত এবং শাফেয়ী মাযহাবের আলেমদের এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত। হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের অভিমত, যা শাফেয়ী আলেমদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতের বিপরীত তা হচ্ছে, তাঁর 'আমি কবুল করলাম' এ বাক্য বা এ ধরনের কোনো বাক্য কবুল হিসাবে বলা জরুরি নয়। বরং কাজের মাধ্যমে কবুল করাও যথেষ্ট। তাই পুঁজিদাতা পুঁজি দেওয়ার পর কর্মী তা নিয়ে ব্যবসাক্ষেত্রে নেমে পড়লে তা-ই কবুল বলে গণ্য হবে। যেমন কাউকে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হলে তার মৌখিক কিছু না বলে তার কাজে লেগে যাওয়াই কবুল বলে গণ্য হয়।

মালেকী মাযহাবের কোনো কোনো আলেম- তন্মধ্যে ইবনে হাজিব অন্যতম- বলেন, মুদারাবা সংঘটিত হওয়ার জন্যে সুস্পষ্ট মুদারাবা শব্দ বলা জরুরি নয়। বরং মুদারাবা বোঝায় এমন যে-কোনো শব্দে একপক্ষ ঈজাব (প্রস্তাব) উত্থাপন করার পর অপর পক্ষ তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করলেই মুদারাবা সম্পন্ন হবে। যেহেতু তাতে এ অর্থ প্রকাশক ইঙ্গিত সুস্পষ্টভাবে রয়েছে। তারা এর কারণ হিসাবে বলেন, মুদারাবা হচ্ছে এক ধরনের ইজারা- ভাড়ায় কর্মী নিয়োজিত করা। এ ইজারাতে কর্মীকে পুঁজি দেওয়া হয়, ব্যবসা করার মাধ্যমে সে লাভ সংগ্রহ করবে, সে লাভের এক অংশ তার পারিশ্রমিক, তা দ্বারা তার পারিশ্রমিক প্রদান করা হবে। ইজারাতে একপক্ষের প্রস্তাব অপরপক্ষ গ্রহণ করেছে এতোটুকু বোঝা যাওয়াই যথেষ্ট, যেমন বেচাকেনার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এমনিভাবে মুদারাবা চুক্তিতেও একপক্ষের প্রস্তাব অপরপক্ষ গ্রহণ করেছে এতোটুকু বোঝা যাওয়াই যথেষ্ট। ২৯

টিকাঃ
২৮. আদ-দুররুল মুখতার, খ. ৪, পৃ. ৪৮৪-৪৮৫; আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়াতুস সাভী, খ. ৩, পৃ. ৬৮৩, মুদ্রণ দারুল মাআরিফ; আল-ফাওয়াকিহ আদ-দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৫; রওযয়াতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১২৪; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, প. ৫০৭-৫০৮
২৯. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, প. ৮০-৮১; আশ-শারহুস সাগীর ও হাশিয়ার তুস সাভী, খ. ৩, প. ৬৮২-৬৮৩; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৫১৭; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১২৪; নিহায়াতুল মুহতাজ ও হাশিয়া আশ শাবরামাল্লিসী, খ. ৫, পৃ. ২৬৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫০৮; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৩২৭-৩২৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00