📄 মুদারাবা চুক্তির বৈশিষ্ট্য
হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের মত হচ্ছে, মুদারাবা চুক্তিটি উভয় পক্ষ থেকে জায়েয; জরুরি পর্যায়ের নয়। তাই দুজনের যে কোনো একজন তা বাতিল করে দিলে তা বাতিল হয়ে যায়। যেহেতু একজনের সম্পদে তার অনুমতিক্রমে অপরজন হস্তক্ষেপ করে, তাই মুদারাবা হচ্ছে প্রতিনিধি নির্ধারণের তুল্য। তাই প্রতিনিধি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেমন, মুদারাবা চুক্তিতেও তেমন যে কেউ তা ভেঙ্গে দিতে পারে। এ অবস্থায় প্রদত্ত অর্থে কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পূর্বে বা পরে এ চুক্তি ভেঙ্গে দেওয়ায় কোনো পার্থক্য নেই।২০
হানাফী আলেমগণ এক্ষেত্রে শর্ত করেন, একপক্ষ চুক্তি ভেঙ্গে দিলে অপর পক্ষকে তা জানাতে হবে, তাহলে ভেঙ্গে দেওয়া বৈধ ও কার্যকর হবে। তারা বলেন, আরো একটি শর্ত রয়েছে। তা হলো, চুক্তি ভেঙ্গে দেওয়ার সময় নগদ টাকা পয়সা পুঁজি হিসাবে ফিরিয়ে দিতে হবে।২১
শাফেয়ী আলেমগণ বলেন, দুপক্ষের যে কেউ এ চুক্তি ভেঙ্গে দেওয়ার সময় অপরপক্ষ উপস্থিত থাকা জরুরি নয়, তার সম্মতিরও প্রয়োজন নেই। তাই অপরপক্ষের অনুপস্থিতিতে তার সম্মতির অপেক্ষা না করেই একপক্ষ তা ভেঙ্গে দিতে পারে।২২
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, পুঁজিদাতা ও কর্মী এ দুজনের যে কেউ মুদারাবা চুক্তি ভেঙ্গে দিতে পারে, সে পুঁজি দ্বারা কোনো ব্যবসায়পণ্য কেনার পূর্ব পর্যন্ত তাদের এ এখতিয়ার রয়েছে। যদি কর্মী পুঁজি হাতে পাওয়ার পর সফরে বের হওয়ার পূর্বে পুঁজির অর্থে সফরের প্রস্তুতি ও পথসম্বল ব্যবস্থা করে, এ সময় কেবল পুঁজিদাতা এ চুক্তি ভেঙ্গে ফেলতে পারে। যদি কর্মী হাতে টাকা পাওয়ার পর শহরেই তা নিয়ে ব্যবসা শুরু করে অথবা সফরে বের হয়ে যায়, তখন কর্মীর হাতে মূলধনের টাকা সঞ্চিত থাকবে, সব টাকা দ্বারা ব্যবসায়পণ্য কেনা পর্যন্ত সে তা দ্বারা এভাবে ব্যবসা করতে থাকবে। এ সময় তাদের দুজনের কারোরই মুদারাবা ভেঙ্গে ফেলার আর সুযোগ থাকবে না।২৩
টিকাঃ
২০. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১০৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৬৪
২১. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১০৯
২২. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১৪১
২৩. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৭০৫-৭০৬
📄 মুদারাবার দুটি প্রকার
হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ মুদারাবাকে দুভাগে বিভক্ত করেছেন : ১. শর্তহীন (الْمُضَارَبَةُ الْمُطْلَقَةُ) এবং ২. শর্তযুক্ত (الْمُضَارَبَةُ الْمُقَيَّدَةُ)
শর্তহীন মুদারাবা : এক্ষেত্রে পুঁজিদাতা কর্মীর হাতে পুঁজি অর্পণ করলেও কর্মীকে কিসের ব্যবসা করবে, কোথায় করবে, কখন করবে, কোন্ নিয়মে করবে, কাদের সাথে লেনদেন করবে ইত্যাদি কোনো কিছুই বলে দেয় না।
শর্তযুক্ত মুদারাবা : উপরিউক্ত বিষয়গুলোর কোনো এক বা একাধিক বিষয় পুঁজিদাতা তার কর্মীকে নির্দিষ্ট করে বলে দিলে তাকে শর্তযুক্ত মুদারাবা বলে।
হানাফী আলেমগণ বলেন, কর্মী এ দুপ্রকার মুদারাবার যেটিতে জড়িত হোক তা চারভাগে বিভক্ত হবে :
এক. কর্মীকে সে কী করবে তা স্পষ্ট করে বলে দেওয়া ছাড়াই এবং 'তুমি তোমার বিবেচনা মতো করো' এ কথাও বলার প্রয়োজন ছাড়াই সে কাজ করে যাবে।
দুই. কর্মীকে যদি এ কথা বলা হয়, তুমি তোমার বুদ্ধি বিবেচনা অনুযায়ী করো, তবুও সবকিছু স্পষ্ট করে বলে না দেওয়া পর্যন্ত সে কিছুই করবে না।
তিন. যখন তাকে বলা হবে, তুমি তোমার সিদ্ধান্ত মাফিক করো, তাকে স্পষ্ট করে কিছু না বললেও সে সব কিছু করতে পারবে।
চার. সবকিছু স্পষ্ট করে বলার পরও কর্মী কোনো কিছু করতে পারবে না ('বিবেচনা মতো করো'-এ কথা না বলার দরুন)। ২৪
টিকাঃ
২৪. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৮৭
📄 মুদারাবার অপর এক বিভক্তি
মুসেলী বলেছেন, মুদারাবা দু প্রকার : এক. সাধারণ (عامةً) ও দুই. বিশেষ (خاصة)।
সাধারণ মুদারাবা দু প্রকার
এক. মূলধন-যোগানদাতা কর্মীকে মুদারাবার ভিত্তিতে অর্থ সম্পদ প্রদান করবে। কিন্তু তাকে এ কথা বলবে না, তুমি তোমার মর্জিমত কাজ করো। কিন্তু কর্মী ব্যবসা করতে যা কিছু করা লাগে সব কিছু করার অধিকার পাবে। বন্ধক রাখা, বন্ধক দেওয়া, ভাড়া দেওয়া, ভাড়া নেওয়া, দোষের দরুন মালের মূল্য কম ধরা, ব্যবসা চালু রাখার জন্যে প্রয়োজনীয় যে কোনো কাজ ও কৌশল অবলম্বন করা ইত্যাদি সবকিছুই তার কাজের আওতায় থাকবে। ব্যবসায়ীরা আরো যা কিছু করে থাকে- অংশীদার হওয়া, কাউকে অংশীদার বানানো, ঋণ দেওয়া, ঋণ নেওয়া ইত্যাদি সব কিছুই সে করতে পারবে। কেবল দান ও চাঁদা পুঁজিদাতার অনুমতি ছাড়া দিতে পারবে না।
দুই. পুঁজির যোগানদাতা কর্মীকে বলবে, তুমি তোমার বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করো, তাহলে তার জন্যে ব্যবসায়ীর সব ধরনের কাজ বৈধ হবে। অংশীদার হওয়া, অংশীদার করা ইত্যাদি সবই সে করতে পারবে। কেননা সে একজন ব্যবসায়ী, তাই ব্যবসায়ীসুলভ সবই সে করতে পারবে। তবে সে কাউকে ঋণ দেওয়া বা দান করা ইত্যাদি করতে পারবে না, যেহেতু এগুলো ব্যবসার অংশ নয়। তাই 'বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করো' এ নির্দেশের আওতায় দান ও ঋণ অন্তর্ভুক্ত হবে না।
বিশেষ মুদারাবা তিন প্রকার : এক. পুঁজিদাতা তার কর্মীকে নির্দিষ্ট জায়গায় কথা বলবে। যেমন, তুমি এ ব্যবসা অমুক জায়গায় করবে। দুই. ব্যক্তি নির্ধারণ করে দেবে। যেমন বলবে, তুমি অমুকের কাছ থেকে কিনবে, তুমি অমুকের কাছে বিক্রি করতে হবে। এ অবস্থায় যার কথা বলা হয়েছে সে ভিন্ন অন্য কারো সাথে সে লেনদেন করতে পারবে না। যেহেতু লেনদেনে আস্থা ও নির্ভরতা থাকতে হয়। তিন. ব্যবসার কোনো পদ বা পদ্ধতি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। যেমন, বলা হবে, তুমি ধান বা গম কেনাবেচা করবে অথবা বলা হবে, তুমি সারাফ পদ্ধতিতে বিক্রি সম্পন্ন করো। এই তিনটি প্রকারেই যা বলা হয়েছে সেভাবেই মুদারাবার কর্মীকে কাজ করতে হবে, তার বিপরীত করা জায়েয নয়। ২৫
অধিকাংশ ফকীহ ও আলেম মুদারাবাকে শর্তমুক্ত ও শর্তযুক্ত অথবা সাধারণ ও বিশেষ-এভাবে বিভক্ত করেননি। এ সকল বিভক্তি করেছেন হানাফী আলেমগণ। অন্য মাযহাবের আলেমগণ যদিও এ বিভক্তিগুলো করেননি, কিন্তু তারা মুদারাবার মূল অংশ, তার শর্তাবলি ইত্যাদির আলোচনাকালে সে বিভক্তিপ্রসূত কথাগুলো যথারীতি বহাল রেখেছেন। এ সকল আলোচনায় কোথাও তারা হানাফী আলেমদের সাথে একমত হয়েছেন, কোথাও বিপরীত মত পোষণ করেছেন।
টিকাঃ
২৫. আল-ইখতিয়ার লি তালীলি আল-মুখতার, খ. ৩, পৃ. ২১
📄 মুদারাবার রুকন বা মূল অংশ
অধিকাংশ ফকীহ ও আলেমের মতে মুদারাবার মৌলিক অংশ হচ্ছে : চুক্তি সম্পাদনকারী দু ব্যক্তি-পুঁজি সরবরাহকারী ও কর্মী (عَاقِدَان), পুঁজি (رَأْسٌ مَالٌ), পরিশ্রম (عَمَلٌ), লাভ-ক্ষতি (رِبْحٌ) এবং মুদারাবার অর্থ প্রকাশক নির্ধারিত শব্দ (صِيْغَةٌ)।
মালেকী মাযহাবের কোনো কোনো আলেম বলেছেন, ব্যবসাতে কোনো নির্ধারিত শব্দ বলা মুদারাবার অংশ বলে গণ্য হবে না। তা শর্ত হিসাবেও ধর্তব্য হবে না। তাই নির্ধারিত কোনো শব্দ বলা ছাড়াই মুদারাবা যথাযথ ও সঠিক হবে।
শাফেয়ী মাযহাবের কোনো কোনো আলেম বলেন, কাজের মাধ্যমে কবুল সম্পন্ন হওয়াই যথেষ্ট। এ সময় ঈজাব (প্রস্তাব) হবে নির্দেশক শব্দ। যেমন : পুঁজির মালিক বলল, টাকাটা নাও। কর্মী তার হাত থেকে টাকাটা নেওয়াই কবুল বলে গণ্য হবে। ২৬
হানাফী আলেমগণ বলেন, মুদারাবার মূল অংশ হচ্ছে দুটি : এক. ঈজাব (প্রস্তাব) ও দুই. কবুল। এর জন্যে তারা যে কোনো বাক্য বা শব্দ ব্যবহার করতে পারে। ২৭
টিকাঃ
২৬. আত-তাজ ওয়াল ইকলীল বিহামিশ মাওয়াহিবুল জলীল, খ. ৫, পৃ. ৩৫৫; আল-ফাওয়াকিহ আদ-দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৩; বুলগাতুস সালিক লি আকরাবিল মাসালিক, খ. ২, পৃ. ১৬০, প্রকাশক : হালাবী।
২৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ.৭৯