📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদারাবা শরীয়তসম্মত হওয়ার আলোচনা

📄 মুদারাবা শরীয়তসম্মত হওয়ার আলোচনা


মুদারাবা শরীয়তসম্মত ও জায়েয, ফকীহগণ এ কথায় একমত। তারা এটি বলেছেন শরীয়তের পক্ষ থেকে প্রদত্ত ছাড় হিসাবে এবং বিভিন্ন দলিল প্রমাণের আলোকে।১৪ নতুবা স্বাভাবিক কিয়াস ও যুক্তির বিধান হচ্ছে, এটি নাজায়েয ও অবৈধ। কেননা, মুদারাবাতে যাকে পুঁজি দেওয়া হয় তাকে কার্যত কর্মী হিসাবে ব্যবসায়িক কাজে নিয়োজিত করা হয়। কিন্তু তাতে পারিশ্রমিক থাকে অজ্ঞাত ও অজানা। বরং কাজ হচ্ছে অজানা এবং পারিশ্রমিক বর্তমানে অস্তিত্বহীন।

তবে ফকীহগণ কিয়াস বাদ দিয়ে শরীয়তের ছাড় ও অনুমতি কাজে লাগিয়েছেন। মুদারাবাকে জায়েয ও বৈধ বলে আভিহিত করার সপক্ষে তাদের নিকট যে সকল দলিল রয়েছে সেগুলোকে তারা উত্তম বিবেচনা করেছেন। এ পর্যায়ে আল্লামা কাসানী বলেন, আমরা এ বিষয়টিতে কিয়াস বর্জন করেছি, মুদারাবার পক্ষে পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা থাকার দরুন। পবিত্র কুরআনের আয়াত হচ্ছে : وَآخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُونَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ “তারা আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশে দেশে সফর করে।”১৫ মুদারাবা ব্যবসাকার্যে নিয়োজিত ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তালাশ করে দেশে দেশে সফর করে। অতএব তার এ ব্যবসাকার্য হবে বৈধ।

টিকাঃ
১৪. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৭৯; মাওয়াহিবুল জলীল, খ. ৫, পৃ. ৩৫৬; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২১৮; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫০৭
১৫. সূরা মুযযাম্মিল, আয়াত ২০

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 হাদীস শরীফের বর্ণনা

📄 হাদীস শরীফের বর্ণনা


عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّهُ قَالَ : كَانَ الْعَبَّاسُ بْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ إِذَا دَفَعَ مَالًا مُضَارَبَةُ اشْتَرَطَ عَلَى صَاحِبِهِ أَنْ لَا يَسْلُكَ بِهِ بَحْرًا ، وَلَا يَنْزِلَ بِهِ وَادِيًا ، وَلَا يَشْتَرِيَ بِهِ ذَاتَ كَبِدِ رَطْبَةٍ ، فَإِنْ فَعَل فَهُوَ ضَامِنٌ ، فَرُفِعَ شَرْطُهُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَجَازَهُ
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (তাঁর পিতা) আব্বাস রা. কাউকে মুদারাবার ভিত্তিতে ব্যবসা করার জন্যে পুঁজি দেওয়ার সময় তাকে শর্ত প্রদান করতেন, সে যেন সাগরপথে সফরে না যায়, কোনো উপত্যকায় অবতরণ না করে, সেখানে কোনো সজীব যকৃতধারী (অর্থাৎ ক্রীতদাস) যেন খরিদ না করে। যদি (নিষেধ করার পরও) সে তা করে তবে সে এর জন্যে দায়ী থাকবে। পরবর্তী সময়ে তিনি তার এ সকল শর্তের কথা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করলে নবীজী তাতে অনুমতি ও বৈধতা প্রদান করেন।১৬

এমনিভাবে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী যখন দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছেন মানুষ তখন মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা করত। তিনি তাদের নিষেধ করেন নাই, এভাবে বিষয়টিতে নীরব থাকা তাঁর সম্মতি প্রকাশ করে। নবীজীর সম্মতিও হাদীসের দলিলের অন্তর্ভুক্ত।

ইজমা বা সকলের ঐকমত্যের আলোচনা : অনেক সাহাবীর পক্ষ হতে বর্ণিত আছে, তারা মুদারাবা চুক্তি অনুযায়ী ব্যবসা করার জন্যে এতীমের সম্পদ লোকদের দিতেন। বর্ণনাকারী সাহাবী হচ্ছেন : উমর, উসমান, আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, উবায়দুল্লাহ ইবনে উমর ও আয়েশা রা.। তারা তাদের বর্ণনায় এ কথা উল্লেখ করেননি, তাদের সমসাময়িক কেউ এ এতীমের মাল অপরের হাতে তুলে দেওয়ায় আপত্তি করেছেন। এভাবেই বিষয়টি সাহাবীদের ইজমা বা ঐকমত্যের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়।

এমনি অপর এক দলিল হচ্ছে মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রচলন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে বিষয়টি লোকজন ব্যাপকভাবে করে যাচ্ছে, তাতে কারো কোনো আপত্তি শুনতে পাওয়া যায়নি। এভাবে বিষয়টিতে সাহাবীদের যুগ থেকে প্রতি যুগের আলেমদের ঐকমত্য প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব দলিলের উপস্থিতিতে কিয়াস বর্জিত হবে, মুদারাবা বৈধ ও জায়েয বলে ঘোষিত হবে।১৭

টিকাঃ
১৬. হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বর্ণনায় বায়হাকী, খ. ৬, পৃ. ১১১ তে বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটির সনদে দুর্বলতা রয়েছে।
১৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৭৯

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদারাবা বৈধ হওয়ার তাৎপর্য

📄 মুদারাবা বৈধ হওয়ার তাৎপর্য


মুদারাবা বৈধ হওয়ার তাৎপর্য ও গূঢ় রহস্য
মুদারাবা বৈধ ও জায়েয; প্রয়োজন তা জায়েয করেছে। দেখা যায়, একজনের হাতে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের অধিক সম্পদ রয়েছে প্রচুর, সে তাতে কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে তা বাড়াতে চায়। কিন্তু ব্যবসা করে তা বাড়ানোর ক্ষমতা বা সুযোগ তার নেই। এ পর্যায়ে সে বাধ্য হয় তার প্রতিনিধি নির্ধারণ করতে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এ জন্যে সে ব্যবসাকাজে অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তিকে বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসাবে রাখতে পারে না। হয়তো কেউ কর্মচারী হতে রাজি হয় না, বরং সে বেতনের পরিবর্তে লাভে অংশীদার হতে চায়। অথবা কর্মচারী পাওয়া গেলেও তাকে পুঁজির মালিক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে পারে না, যেহেতু পুঁজির অধিকারী ব্যক্তির ব্যবসা পরিচালনার ক্ষমতা বা যোগ্যতা থাকে না। এমনি পরিস্থিতিতে মানবগোষ্ঠীর মাঝে মুদারাবা পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, শরীয়তও পরিস্থিতি বিবেচনা করে তার অনুমোদন দিয়েছে। এক্ষেত্রে যদিও অজ্ঞাত ভাড়ায় ইজারা দেওয়া হয়, যা জায়েয নয়। তথাপি প্রয়োজনের এ দিকটি বিবেচনা করে শরীয়ত এ ধরনের ইজারা থেকে ভিন্ন করে বৈধতার ফয়সালা দিয়েছে, যেমন মুসাকাত ও মুযারাআর বেলায় ঘটেছে।

আল্লামা কাসানী বলেন, কখনো পরিস্থিতি এমন হয়, কারো হাতে সম্পদ রয়েছে সে ব্যবসা করতে আগ্রহী, কিন্তু সে ব্যবসা করতে পারছে না। অপরদিকে কারো ব্যবসা সম্পর্কিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রচুর, কিন্তু তার হাতে মোটে সম্পদ নেই। এ অবস্থায় শরীয়ত উভয়ের চাহিদা পূরণ করেছে, মুদারাবা বৈধ করে দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তো শরীয়তের বিধান প্রবর্তনই করেছেন বান্দার উপকার ও মঙ্গল সাধনের জন্যে, তার প্রয়োজন পূরণের নিমিত্তে।১৮, ১৯

টিকাঃ
১৮. মাওয়াহিবুল জলীল, খ. ৫, পৃ. ৩৫৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫০৭
১৯. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৭৯

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদারাবা চুক্তির বৈশিষ্ট্য

📄 মুদারাবা চুক্তির বৈশিষ্ট্য


হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের মত হচ্ছে, মুদারাবা চুক্তিটি উভয় পক্ষ থেকে জায়েয; জরুরি পর্যায়ের নয়। তাই দুজনের যে কোনো একজন তা বাতিল করে দিলে তা বাতিল হয়ে যায়। যেহেতু একজনের সম্পদে তার অনুমতিক্রমে অপরজন হস্তক্ষেপ করে, তাই মুদারাবা হচ্ছে প্রতিনিধি নির্ধারণের তুল্য। তাই প্রতিনিধি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেমন, মুদারাবা চুক্তিতেও তেমন যে কেউ তা ভেঙ্গে দিতে পারে। এ অবস্থায় প্রদত্ত অর্থে কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পূর্বে বা পরে এ চুক্তি ভেঙ্গে দেওয়ায় কোনো পার্থক্য নেই।২০

হানাফী আলেমগণ এক্ষেত্রে শর্ত করেন, একপক্ষ চুক্তি ভেঙ্গে দিলে অপর পক্ষকে তা জানাতে হবে, তাহলে ভেঙ্গে দেওয়া বৈধ ও কার্যকর হবে। তারা বলেন, আরো একটি শর্ত রয়েছে। তা হলো, চুক্তি ভেঙ্গে দেওয়ার সময় নগদ টাকা পয়সা পুঁজি হিসাবে ফিরিয়ে দিতে হবে।২১

শাফেয়ী আলেমগণ বলেন, দুপক্ষের যে কেউ এ চুক্তি ভেঙ্গে দেওয়ার সময় অপরপক্ষ উপস্থিত থাকা জরুরি নয়, তার সম্মতিরও প্রয়োজন নেই। তাই অপরপক্ষের অনুপস্থিতিতে তার সম্মতির অপেক্ষা না করেই একপক্ষ তা ভেঙ্গে দিতে পারে।২২

মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, পুঁজিদাতা ও কর্মী এ দুজনের যে কেউ মুদারাবা চুক্তি ভেঙ্গে দিতে পারে, সে পুঁজি দ্বারা কোনো ব্যবসায়পণ্য কেনার পূর্ব পর্যন্ত তাদের এ এখতিয়ার রয়েছে। যদি কর্মী পুঁজি হাতে পাওয়ার পর সফরে বের হওয়ার পূর্বে পুঁজির অর্থে সফরের প্রস্তুতি ও পথসম্বল ব্যবস্থা করে, এ সময় কেবল পুঁজিদাতা এ চুক্তি ভেঙ্গে ফেলতে পারে। যদি কর্মী হাতে টাকা পাওয়ার পর শহরেই তা নিয়ে ব্যবসা শুরু করে অথবা সফরে বের হয়ে যায়, তখন কর্মীর হাতে মূলধনের টাকা সঞ্চিত থাকবে, সব টাকা দ্বারা ব্যবসায়পণ্য কেনা পর্যন্ত সে তা দ্বারা এভাবে ব্যবসা করতে থাকবে। এ সময় তাদের দুজনের কারোরই মুদারাবা ভেঙ্গে ফেলার আর সুযোগ থাকবে না।২৩

টিকাঃ
২০. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১০৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৬৪
২১. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১০৯
২২. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১৪১
২৩. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৭০৫-৭০৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00