📄 খ. الْقَرْضُ
الْقَرْضُ শব্দের আভিধানিক অর্থ : ما تعطيه غَيْرَكَ مِنَ الْمَالِ لتَتَقَاضَاهُ 'যা নিজের কিছু সম্পদ অপরকে তার প্রয়োজন পূরণের জন্যে দেওয়া।’ বাংলা ভাষায় একে কর্জ বা ঋণ দেওয়া বলে। এ শব্দ থেকেই বলা হয় : أَقْرَضَهُ الْمَالِ إِقْرَاضًا ও اقرض منى 'সে আমার নিকট কর্জ চাইলে আমি তাকে কর্জ দিলাম ও استقرَضَ منی 'সে আমার নিকট কর্জ চাইল’। اقرض 'সে কর্জ নিল বা ঋণ গ্রহণ করল।
পরিভাষায় الْقَرْض (কারয) হচ্ছে دَفْعُ مَالِ إِرْفَاقًا لِمَنْ يَنْتَفِعُ بِهِ وَيَرُدُّ بَدَلَهُ এমন কাউকে সেবা ও সহায়তা করতে সম্পদ দেওয়া যে এর দ্বারা উপকৃত হবে এবং পরে তার বদল ফিরিয়ে দেবে।১০
الْقَرْضَ ও الْمُضَارَبَةُ এ দুটোতে কিছু সাদৃশ্য এবং কিছু বৈসাদৃশ্য রয়েছে। সাদৃশ্য হচ্ছে, এ উভয়টিতে একে অপরকে সম্পদ প্রদান করে। বৈসাদৃশ্য হচ্ছে, মুদারাবাতে সম্পদটা গ্রহীতার হাতে থাকে আমানত হিসাবে এবং কর্জের মধ্যে তা থাকে জামানত হিসাবে।
টিকাঃ
৯. আল-মিসবাহুল মুনীর, আমীমুল ইহসান কৃত কাওয়াইদুল ফিকহ قرض مادة
১০. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩১২
📄 গ. الشَّرِكَةُ
عقد بين اثنين : أَوْ أَكْثَرَ لِلْقِيَامِ بِعَمَلٍ مُشْتَرَك : ‘কোনো সম্মিলিত ও যৌথ কাজে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির অংশগ্রহণের চুক্তি।’ الشركة শব্দটি شرك ক্রিয়ার মাসদার বা মূলধাতু। বলা হয় : شَرِكُتُهُ فِي الْأَمْرِ أَشْرَكُهُ شَرْكًا وَشَرِكَةً 'আমি তাকে বিষয়টিতে অংশীদার করলাম।’১১
الشركة এর অর্থ الخلطة وثبوت الحصة : ‘সংযুক্ত হওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া।’১২ অথবা ثُبُوتُ الْحَقِّ فِي شَيْءٍ لَاثْنَيْنِ فَأَكْثَرَ عَلَى جِهَةِ السُّيُوعِ বিস্তৃতির সাথে কোনো বস্তুতে একাধিক ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া। الْمُضَارَبَةُ ও الشركة এ দুটোতে সম্পর্ক হচ্ছে, মুদারাবার তুলনায় শারিকা ব্যাপক।
টিকাঃ
১১. লিসানুল আরব, আল-মিসবাহুল মুনীর, আল-মুজামুল ওয়াসীত شرك- مادة আল-ইখতিয়ার, খ. ৩, পৃ. ১১
১২. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১১
📄 মুদারাবা শরীয়তসম্মত হওয়ার আলোচনা
মুদারাবা শরীয়তসম্মত ও জায়েয, ফকীহগণ এ কথায় একমত। তারা এটি বলেছেন শরীয়তের পক্ষ থেকে প্রদত্ত ছাড় হিসাবে এবং বিভিন্ন দলিল প্রমাণের আলোকে।১৪ নতুবা স্বাভাবিক কিয়াস ও যুক্তির বিধান হচ্ছে, এটি নাজায়েয ও অবৈধ। কেননা, মুদারাবাতে যাকে পুঁজি দেওয়া হয় তাকে কার্যত কর্মী হিসাবে ব্যবসায়িক কাজে নিয়োজিত করা হয়। কিন্তু তাতে পারিশ্রমিক থাকে অজ্ঞাত ও অজানা। বরং কাজ হচ্ছে অজানা এবং পারিশ্রমিক বর্তমানে অস্তিত্বহীন।
তবে ফকীহগণ কিয়াস বাদ দিয়ে শরীয়তের ছাড় ও অনুমতি কাজে লাগিয়েছেন। মুদারাবাকে জায়েয ও বৈধ বলে আভিহিত করার সপক্ষে তাদের নিকট যে সকল দলিল রয়েছে সেগুলোকে তারা উত্তম বিবেচনা করেছেন। এ পর্যায়ে আল্লামা কাসানী বলেন, আমরা এ বিষয়টিতে কিয়াস বর্জন করেছি, মুদারাবার পক্ষে পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা থাকার দরুন। পবিত্র কুরআনের আয়াত হচ্ছে : وَآخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُونَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ “তারা আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশে দেশে সফর করে।”১৫ মুদারাবা ব্যবসাকার্যে নিয়োজিত ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তালাশ করে দেশে দেশে সফর করে। অতএব তার এ ব্যবসাকার্য হবে বৈধ।
টিকাঃ
১৪. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৭৯; মাওয়াহিবুল জলীল, খ. ৫, পৃ. ৩৫৬; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২১৮; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫০৭
১৫. সূরা মুযযাম্মিল, আয়াত ২০
📄 হাদীস শরীফের বর্ণনা
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّهُ قَالَ : كَانَ الْعَبَّاسُ بْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ إِذَا دَفَعَ مَالًا مُضَارَبَةُ اشْتَرَطَ عَلَى صَاحِبِهِ أَنْ لَا يَسْلُكَ بِهِ بَحْرًا ، وَلَا يَنْزِلَ بِهِ وَادِيًا ، وَلَا يَشْتَرِيَ بِهِ ذَاتَ كَبِدِ رَطْبَةٍ ، فَإِنْ فَعَل فَهُوَ ضَامِنٌ ، فَرُفِعَ شَرْطُهُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَجَازَهُ
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (তাঁর পিতা) আব্বাস রা. কাউকে মুদারাবার ভিত্তিতে ব্যবসা করার জন্যে পুঁজি দেওয়ার সময় তাকে শর্ত প্রদান করতেন, সে যেন সাগরপথে সফরে না যায়, কোনো উপত্যকায় অবতরণ না করে, সেখানে কোনো সজীব যকৃতধারী (অর্থাৎ ক্রীতদাস) যেন খরিদ না করে। যদি (নিষেধ করার পরও) সে তা করে তবে সে এর জন্যে দায়ী থাকবে। পরবর্তী সময়ে তিনি তার এ সকল শর্তের কথা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করলে নবীজী তাতে অনুমতি ও বৈধতা প্রদান করেন।১৬
এমনিভাবে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী যখন দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছেন মানুষ তখন মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা করত। তিনি তাদের নিষেধ করেন নাই, এভাবে বিষয়টিতে নীরব থাকা তাঁর সম্মতি প্রকাশ করে। নবীজীর সম্মতিও হাদীসের দলিলের অন্তর্ভুক্ত।
ইজমা বা সকলের ঐকমত্যের আলোচনা : অনেক সাহাবীর পক্ষ হতে বর্ণিত আছে, তারা মুদারাবা চুক্তি অনুযায়ী ব্যবসা করার জন্যে এতীমের সম্পদ লোকদের দিতেন। বর্ণনাকারী সাহাবী হচ্ছেন : উমর, উসমান, আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, উবায়দুল্লাহ ইবনে উমর ও আয়েশা রা.। তারা তাদের বর্ণনায় এ কথা উল্লেখ করেননি, তাদের সমসাময়িক কেউ এ এতীমের মাল অপরের হাতে তুলে দেওয়ায় আপত্তি করেছেন। এভাবেই বিষয়টি সাহাবীদের ইজমা বা ঐকমত্যের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এমনি অপর এক দলিল হচ্ছে মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রচলন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে বিষয়টি লোকজন ব্যাপকভাবে করে যাচ্ছে, তাতে কারো কোনো আপত্তি শুনতে পাওয়া যায়নি। এভাবে বিষয়টিতে সাহাবীদের যুগ থেকে প্রতি যুগের আলেমদের ঐকমত্য প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব দলিলের উপস্থিতিতে কিয়াস বর্জিত হবে, মুদারাবা বৈধ ও জায়েয বলে ঘোষিত হবে।১৭
টিকাঃ
১৬. হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বর্ণনায় বায়হাকী, খ. ৬, পৃ. ১১১ তে বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটির সনদে দুর্বলতা রয়েছে।
১৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৭৯