📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 বাজারদরের কম মূল্যে শারিকাতুল আনান-এর শরীকের বিক্রি করা

📄 বাজারদরের কম মূল্যে শারিকাতুল আনান-এর শরীকের বিক্রি করা


শাফেয়ীদের স্পষ্ট বক্তব্যমতে, অনেক লোকসান দিয়ে শরীক কেনাবেচা করবে না। যদি এমন লোকসান কেনাবেচা করে, তাহলে শুধু তার অংশে চুক্তি সহীহ হবে। এবং এ সময়ে ক্রেতা বা বিক্রেতার ইচ্ছাধিকার থাকবে। তবে যদি শরীক দায়ে আবশ্যক মূল্যের বিনিময়ে ক্রয় করে, তাহলে সকলের ক্ষেত্রেই চুক্তিটি সহীহ ও ধর্তব্য হবে। আর এককভাবে ক্রেতার জন্য কেনা হয়েছে বলে ধরা হবে; শারিকাহর জন্য নয়। ১৯২

তারা বলেন, বাজারদরের স্বাভাবিক মূল্যের বিনিময়ে কোনো শরীকের বিক্রির অধিকার নেই, যদি অধিক মূল্য দিয়ে কিনতে আগ্রহী ক্রেতা থাকে। এমনকি যদি শরীক কার্যত বিক্রি করে, আর খেয়ারের সময়ে অধিক মূল্য দিয়ে কিনতে আগ্রহী ক্রেতা প্রকাশ পায়, তাহলে শরীকের জন্য আবশ্যক পূর্ব বিক্রিচুক্তি বাতিল করা। অন্যথায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুক্তিটি বাতিল হয়ে যাবে। ১৯৩

টিকাঃ
১৯২. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৫
১৯৩. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৬, পৃ. ৮

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 শারিকাতুল আনান-এর শরীকের জন্য তার শরীক ছাড়া অন্য কারো সাথে শারিকা চুক্তি সম্পাদন করা

📄 শারিকাতুল আনান-এর শরীকের জন্য তার শরীক ছাড়া অন্য কারো সাথে শারিকা চুক্তি সম্পাদন করা


শারিকাতুল আনান-এর কোনো শরীকের জন্য তার শরীকের অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো শারিকা : মুফাওয়াযা বা আনান-এ চুক্তিবদ্ধ হওয়া জায়েয নেই। এর কারণ, বস্তু নিজের অনুরূপ বস্তুকে অনুগামী করতে পারে না। তাহলে তার ঊর্ধ্ব বিষয়কে কীভাবে অনুগামী করবে? তবে যদিও সে শারিকায় চুক্তিবদ্ধ হওয়ার অধিকার রাখে না তবে সে ওকীল নিয়োগের অধিকার রাখে। সুতরাং যদি সে শারিকা চুক্তি করে তাহলে শারিকা চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। তবে শারিকা চুক্তি বাতিল হওয়ার কারণে তাতে অন্তর্ভুক্ত ওকালাত বাতিল হওয়া আবশ্যক নয়। এর কারণ, অংশ বিষয় বাতিল হওয়ার কারণে পুরো বিষয় বাতিল হওয়া আবশ্যক নয়। এটি হানাফীদের মত। ১৯৪

অন্যান্য শরীকের অনুমতি ছাড়া শ্রমদানের জন্য শারিকার পুঁজি তৃতীয় ব্যক্তিকে দেওয়া শাফেয়ী ও হাম্বলীগণের মতে সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। যদিও বিনিময় ছাড়া শারিকার সেবাদানের উদ্দেশ্যে তৃতীয় ব্যক্তিকে দেয়া হোক না কেন। (বিনিময় ছাড়া সেবাদানের নাম হলো ইবযা)। এর কারণ, শারিকা চুক্তিতে শরীকদের অনুমোদন শুধু শরীকের কর্তৃত্ব ও হস্তক্ষেপে সীমিত; অন্য কারো কর্তৃত্বে ও হস্তক্ষেপে শরীকদের অনুমোদন নেই। ১৮৫ তাই এ মাসআলাটির বিধান কোনো শরীকের শারিকা চুক্তি থেকে সরে গিয়ে অন্যকে তার স্থলবর্তী করার অনুরূপ বিধান। (এক্ষেত্রে অন্যান্য শরীকের অনুমোদন যেমন আবশ্যক, তেমন অন্যকে শ্রমদানের জন্য শারিকার পুঁজি প্রদানে শরীকদের অনুমোদন আবশ্যক।)

টিকাঃ
১৯৪. তারা এমনটি বলেছেন। এর কারণ হিসেবে যা মনে হয় তা হলো, শরীক তার হাতে থাকা নিজ সম্পদ ও শারিকার সম্পদের অর্ধেকের ক্ষেত্রে মূল ব্যক্তি আর বাকি অর্ধেককে সে উওকীল। কিতাবগুলোর ভাষ্য এ ব্যাপারে প্রায় পার্থক্যমুক্ত। তবে স্পষ্টকরণে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। দ্রষ্টব্য: বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৯; আল-ফাতাওয়া আল- হিন্দিয়‍্যা, খ. ২, পৃ. ৩২২
১৮৫. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৯; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩২; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৬

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 আনান ও ওজূহ-এর বিধান

📄 আনান ও ওজূহ-এর বিধান


এই দুটি শারিকা মুফাওয়াযা বা আনান-এর আওতাধীন হবে। সুতরাং শারিকাতুল মুফাওয়াযার শ্রেণীভুক্ত হলে পুঁজির ক্ষেত্রে শারিকাতুল মুফাওয়াযার বিধান প্রয়োগ হবে। আর শারিকাতুল আনান-এর শ্রেণীভুক্ত হলে পুঁজির ক্ষেত্রে শারিকাতুল আনান-এর বিধান প্রয়োগ হবে। যদি এ দুটির কোনোটির শ্রেণীভুক্ত হওয়া থেকে শর্তমুক্ত হয় তাহলে শারিকাটি হবে শারিকাতুল আনান-এর শ্রেণীভুক্ত। কেননা শারিকাতুল আনান-এর শ্রেণীভুক্ত হওয়া সর্বদার মৌলনীতি। ১৯৬

তবে শারিকাতুল আমাল শারিকাতুল আনান-এর শ্রেণীভুক্ত হলে তা সর্বদা দুটি মাসআলায় শারিকাতুল মুফাওয়াযার বিধান গ্রহণ করে।

প্রথম মাসআলা : এক শরীকের কাজ গ্রহণ উভয়ের জন্য দায় আবশ্যক করে। তারা উভয়ে এক ব্যক্তি হলে যে বিধান হতো সে বিধানের অনুরূপ বিধান হবে। যদিও তা তাদের একজনের জন্য নিজে শ্রমদান আবশ্যক করে না, যতক্ষণ না কাজের অর্ডারদাতা নিজে শ্রমদানের শর্ত করে। এই শর্ত করা ছাড়া কাজ গ্রহণকারী শরীক শ্রমদান করা বা তার শরীকের শ্রমদান করা অথবা তাতে তৃতীয় কারো শ্রমদান করা সমান। যেমন তারা দুজন কাউকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মজদুর নিয়োগ করল, যে গ্রহণকৃত কাজ আঞ্জামে সক্ষম। কেননা এক্ষেত্রে নিঃশর্ত কাজ আঞ্জাম দেওয়াই হলো চুক্তির বিষয়। ১৯৭

তবে কাজের অর্ডারদাতার পক্ষ থেকে শর্ত করা হলে শ্রমদান হবে শর্তের অনুগামী। তবে উভয়ের জন্য দায়বদ্ধতা আবশ্যক হওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে মাসআলা পূর্বাবস্থায় বহাল থাকবে। যে শরীকের কাছে কাজে শ্রমদানের দাবি করা হয়নি এই শর্ত তাকে দায়বদ্ধতার বিধান থেকে মুক্ত করবে না। তবে হ্যাঁ, এই শর্ত শারিকা অব্যাহত থাকার সময় তার অধিকার আদায়ের দাবি করা শর্তমুক্ত করে- যদি এই শরীক কাজ গ্রহণকারী না হয়। তবে কাজগ্রহণে যদি এই শর্ত না থাকে, তাহলে শারিকা সমাপ্তির পরও দায়বদ্ধতা অব্যাহত থাকবে।

এই মূলনীতির আলোকে আহরিত মাসআলা হলো :
১. কাজের নির্দেশদাতার অধিকার রয়েছে যে শরীককে ইচ্ছা তার কাছে পূর্ণ কাজের তাগাদা করার;
২. নির্দেশদাতার কাছে পূর্ণ পারিশ্রমিক আদায়ের অধিকার রয়েছে যে কোনো শরীকের;
৩. ইচ্ছামত যে-কোনো শরীককে পূর্ণ পারিশ্রমিক প্রদানের মাধ্যমে নির্দেশদাতার দায়মুক্তি। এটি হানাফী, মালেকী ও হাম্বলীদের মত। ১৯৮

দ্বিতীয় মাসআলা : কোনো শরীকের কারণে দুই শরীকের শ্রমদানের বস্তুটি যদি দোষযুক্ত হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার ক্ষতিপূরণ উভয়ের ওপর আবশ্যক হবে। কাজের নির্দেশদাতা এই ক্ষতিপূরণ যে-কোনো শরীকের কাছ থেকে দাবি করার অধিকার রাখে। এটি হানাফী, মালেকী ও হাম্বলীদের মত। ১৯৯

হাম্বলীদের স্পষ্ট বক্তব্যমতে, কোনো শরীকের ব্যবহারে অবহেলা হওয়ার সাথে যৌথ ক্ষতিপূরণ ঝুলন্ত। যদি কারো ব্যবহারে অবহেলাহেতু পণ্যটি দোষযুক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে এককভাবে তার ক্ষতিপূরণ প্রদান আবশ্যক হবে। ২০০

হানাফীদের মতে, শারিকাতুল আনান শ্রেণীভুক্ত এ দুই মাসআলা ছাড়া শারিকাতুল আমাল অন্যান্য ক্ষেত্রে শারিকাতুল আনান-এর মতোই। এ জন্যই তারা শারিকাতুল আমালের শ্রেণীভিন্নতার অর্থাৎ মুফাওয়াযা ও আনান ভিত্তিতে শরীকের স্বীকারোক্তির বিধান ভিন্ন হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলেন। সুতরাং শারিকাতুল আমাল-এর কোনো শরীক অতীত সময়ের সাথে যুক্ত করে কোনো ব্যবহৃত বস্তুর মূল্য যেমন সাবান, পরিষ্কারক দ্রব্য বা অন্যজাতীয় দ্রব্যের মূল্য অথবা শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বা দোকানভাড়া সংক্রান্ত কোনো ঋণের স্বীকারোক্তি করে, আর তার শরীক তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাহলে অপর শরীকের বিপরীতে তাকে সত্যায়ন করা হবে, যদি এটি শারিকাতুল মুফাওয়াযার শ্রেণীভুক্ত হয়। আর প্রমাণ ছাড়া তাকে সত্যায়িত করা হবে না, যদি এটি শারিকাতুল আনান-এর শ্রেণীভুক্ত হয়। এর কারণ, স্বীকারকারীর জন্য তার দেওয়া স্বীকারোক্তি আবশ্যক। আর অপর শরীকের জন্য তার স্বীকারোক্তি আবশ্যক নয়, তবে যদি সে অপর শরীকের কাফীল হয় তাহলে ভিন্ন কথা। আর শারিকাতুল মুফাওয়াযায় শরীকের অবস্থা এমনই অর্থাৎ প্রত্যেকে অপর শরীকের কাফীল। আর শারিকাতুল আনান কাফালাতের শর্তমুক্ত হলে তা কাফালাতমুক্ত হয়। তবে বিক্রিত পণ্য নষ্ট হওয়ার আগে বা ইজারার সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে ঋণের স্বীকারোক্তি দায় নিঃশর্তভাবে শারিকার ওপর আবশ্যক হবে। এক্ষেত্রে মুফাওয়াযা ও আনানের কোনো পার্থক্য নেই।

অনুরূপ দুই শরীকের শ্রমদানের বস্তু; যেমন কাপড়ের কোনো অংশ কোনো দাবিদার দাবি করল, তাতে এক শরীক তার মালিকানা স্বীকার করে আর অপরজন অস্বীকার করে, তাহলে মুফাওয়াযা ছাড়া অন্য শারিকায় স্বীকারকারীকে তার শরীকের বিপক্ষে সত্যায়ন করা হবে না। তবে এক্ষেত্রে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. ভিন্নমত পোষণ করেন। এ মাসআলায় তিনি সাধারণ যুক্তি ছেড়ে সূক্ষ্ম যুক্তি গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, শারিকাতুল আনানেও স্বীকারকারী শরীকের স্বীকারোক্তির দায় শারিকার ওপর আবশ্যক হবে; শ্রমদানের ক্ষেত্রে শারিকাতুল আনানকে শারিকাতুল মুফাওয়াযার সাথে যুক্ত করার বিবেচনায়। যেমন যৌথ দায়বদ্ধতা ও পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে শারিকাতুল আনানকে শারিকাতুল মুফাওয়াযা-র সাথে যুক্ত করা হয়েছে। ২০১

মালেকীদের মতে, শারিকাতুল আমালের ক্ষেত্রে উভয় শরীক এক ব্যক্তির পর্যায়ভুক্ত। ২০২ এই ব্যাপক মূল বিধানের দাবি হলো প্রত্যেক শরীকের স্বীকারোক্তি গৃহীত হওয়া এবং নিঃশর্তভাবে উভয়ের ওপর তা প্রয়োগ হওয়া। এক্ষেত্রে মুফাওয়াযা ও আনানে কোনো পার্থক্য হবে না। এবং নগদ ও ঋণজাতীয় বস্তুতেও পার্থক্য হবে না।

হাম্বলীদের মতে, এক শরীকের স্বীকারোক্তি উভয়ের ওপর প্রয়োগ হবে, যদি তার কর্তৃত্বে থাকা বস্তু সংক্রান্ত স্বীকারোক্তি হয়ে থাকে। কেননা এখানে তার কর্তৃত্ব রয়েছে। আর যদি কর্তৃত্বে অবর্তমান বস্তু সংক্রান্ত স্বীকারোক্তি হয় তাহলে স্বীকারোক্তি কার্যকর হবে না, যেহেতু এক্ষেত্রে কর্তৃত্ব অনুপস্থিত। ২০৩

টিকাঃ
১৯৬. আল-খিরাশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৭০; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৫৩; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১২; আশ-শারকাওয়ী আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ১১
১৯৭. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৯; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫১১
১৯৮. আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭২; আল-খিরাশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৭১
১৯৯. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১২
২০০. হাওয়াশীত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২১১; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৯
২০১. 'আল বাজীরামী আলাল মানহাজ, খ. ৩, পৃ. ৪০
২০২. 'বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৩১
২০৩. 'নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৩

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 শারিকাতুল আমাল-এর উভয় শরীকের মাঝে উপার্জন বণ্টন এবং উভয়ের ক্ষতি বহন করা

📄 শারিকাতুল আমাল-এর উভয় শরীকের মাঝে উপার্জন বণ্টন এবং উভয়ের ক্ষতি বহন করা


হানাফী, হাম্বলী ও কতক মালেকী ফকীহের মতে, শারিকাতুল আমাল শারিকাতুল আনানভুক্ত হলে তা থেকে লব্ধ উপাজর্ন উভয় শরীকের মাঝে শর্তকৃত হারে বণ্টিত হবে। এক্ষেত্রে উভয় শরীকের জন্য শর্তের সমন্বয় বা শ্রমদানের শর্তের সাথে এই শর্তের অসমন্বয়কে বিবেচনা করা হবে না। এ বিধানের কারণ ও শারিকাতুল ওজুহ-এ লাভ বণ্টনের ক্ষেত্রে এ বিধানের বিপরীত হওয়ার কারণ ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে।

এটি একটি মৌলিক নীতি। উভয় শরীক শ্রমদান করম্নক বা এক শরীক, শ্রমদানে অনিচ্ছুক শরীক কোনো ওজরের কারণে; যেমন সফর বা অসুস্থতা অথবা অন্য কোনো কারণে; যেমন অলসতা ও অহংকারের কারণে শ্রমদানে বিরত থাকুক না কেন এই মৌলনীতি কার্যকর। কেননা শ্রমদাতা শরীক অপর শরীকের সাহায্যকারী, আর শর্তকৃত বিষয় হলো নিঃশর্ত শ্রমদান। এ কারণে শ্রমদানের জন্য মজদুর নিয়োগ করা, এমনকি বিনামূল্যে সহযোগিতা নিতে কোনো বাধা নেই। ২০৪

যদি উভয় শরীক নির্দিষ্ট অংশ অনুপাতে শর্তকৃত শ্রমদানে উদ্যোগী না হয়, তাহলে শ্রমদান আবশ্যক হবে উভয়ের শর্তকৃত লাভ অনুপাতে। কেননা লাভ অনুপাতে শ্রম বণ্টনই মূল নীতি। সুতরাং স্পষ্ট বক্তব্য ছাড়া এর অন্যথা করা যাবে না।

শারিকাতুল আমাল-এর ক্ষতি কাজের দায় অনুপাতেই বণ্টিত হবে। কাজের দায় বলে উদ্দেশ্য প্রত্যেক শরীকের জন্য যে পরিমাণ কাজ করার শর্ত করা হয়েছে তার পরিমাণ হিসাব। শারিকাতুল আমওয়ালে যেমন পুঁজির পরিমাণ হিসেবে ক্ষতি বহন করা লাগে, তেমনি শারিকাতুল আমাল-এর শর্তকৃত কাজের পরিমাণ হিসেবে ক্ষতি বহন করা আবশ্যক, যেহেতু কাজের দায়বদ্ধতা এই শারিকায় পুঁজির স্থলবর্তী। এ কারণে যদি উভয়ে শর্ত করে এক শরীকের ওপর দুই তৃতীয়াংশ কাজের দায় আর অপরের জন্য এক তৃতীয়াংশ, আর ক্ষতি উভয়ে অর্ধেক হারে বহন করবে, তাহলে ক্ষতিবহন সংক্রান্ত শর্ত বাতিল হবে। এবং ক্ষতি উভয়ের শর্তকৃত কাজের দায় অনুপাতে বহন করা আবশ্যক হবে। ২০৫ হাম্বলীদের স্পষ্ট বক্তব্যমতে, (কাজ ও দায়বদ্ধতা) নিঃশর্ত রাখা হলে তা কাজ ও পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে সমানহারে বণ্টনের অর্থে গ্রহণ করা হবে। যেমন জিআলার (পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মজদুর নিয়োগ শর্তমুক্ত হলে) বিধান, যেহেতু এক্ষেত্রে (কারো অংশ বাড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে) অগ্রাধিকার প্রদানমূলক কোনো দলিল মজুদ নেই। ২০৬

অধিকাংশ মালেকী ফকীহের মতে, শারিকাতুল আমাল-এর উভয় শরীকের কাজ অনুপাতে লাভ বণ্টন আবশ্যক। এতে সামান্য ব্যবধানের বেশি করা যাবে না। এটি শারিকা চুক্তি সম্পাদনকালের বিধান। চুক্তি সম্পাদনের পর কোনো শরীক স্বেচ্ছাশ্রম দিলে তাতে কোনো নিষেধ নেই, যদিও সে পুরো কাজ স্বেচ্ছাশ্রম হিসেবে করে। যদি উভয়ের কাজের হার ও লাভের হারে বিস্তর ব্যবধানের ভিত্তিতে চুক্তি সম্পাদিত হয়, তাহলে এটি ফাসেদ চুক্তি হবে। আর প্রত্যেক শরীক অপরের পক্ষ থেকে কৃত কাজ অনুপাতে লাভ উসুল করবে। ২০৭

তবে মালেকীগণ বিধানগত এই কাজের কঠোরতার সাথে সাথে শারিকার কাজের সময় ছাড়া অন্য সময়ে কোনো শরীক শ্রমদান করে যে লাভ পায় তা গ্রহণের ক্ষেত্রে উদার মত দেন। তারা উক্ত লাভ এই শরীকের একক বলে মত দেন। যেমন তারা শারিকাতুল আমওয়াল-এ উলিখিত ক্ষেত্রে এই মত দিয়েছেন। ২০৮

দ্রষ্টব্য : কাজের প্রকার এবং স্থান এক হওয়া হানাফীদের মতে শারিকাতুল আমাল সহীহ হওয়ার জন্যে শর্ত নয়। এটি হাম্বলীদের বিশুদ্ধ মত। তবে শারিকাতুল তাকাব্বুল বৈধ হওয়ার মত অনুযায়ী যুফার রহ.-এর মত উল্লিখিত মতের বিপরীত। উল্লিখিত মতের কারণ হচ্ছে, শারিকার উদ্দেশ্য অর্থাৎ লাভ অর্জন করা, কাজের প্রকার এক হওয়া ও অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও অর্জিত হওয়া সম্ভব, যেমন সম্ভব কাজের স্থান এক হওয়া এবং একাধিক হওয়া সত্ত্বেও অর্জিত হওয়া। ২০৯

মালেকীগণ ও হাম্বলী ফকীহ আবুল খাত্তাবের মতে, কাজের প্রকার এক হওয়া শর্ত। তবে মালেকীগণ উভয় শরীকের কাজ পরস্পর আবশ্যকীয় হওয়া এবং একজনের কাজ অপরের কাজের ওপর নির্ভরশীল হওয়াকে এক জাতীয় হওয়া গণ্য করেন। যেমন সুতা তৈরি করা ও বুনন করা, স্বর্ণ ও রূপা ছাঁচে ঢালা এবং গয়না তৈরি করা। বরং কতক মালেকী ফকীহের মতে শিল্প বা কাজে উভয় শরীক সমান সুচারুরূপে করার যোগ্য হওয়া শর্ত। এমন কঠোর শর্তারোপের কারণ, এক শরীকের শ্রমঅর্জিত লাভ ও কষ্টের ফল ভক্ষণ থেকে অন্য শরীককে বাঁচানো। তবে ইবনে কুদামা রহ. তাদেরকে পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন, যদি এক শরীক বলে, আমি কাজ গ্রহণ করব আর তুমি কাজ করবে তাহলে উভয়ের কাজ ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও শারিকা চুক্তি বৈধ হয়। ২১০

শ্রমদানের জায়গা এক হওয়ার শর্ত আল মুদাওয়ানা-য় বর্ণিত মালেকী মাযহাবের মত। তবে পরবর্তী মালেকী ফকীহগণ এর বিপরীত মতকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। তারা আল মুদাওয়ানা-য় বর্ণিত মতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ মতটি প্রযোজ্য সে ক্ষেত্রে যেখানে উভয়ের জায়গায় কাজের প্রচলন এক না হয়, যেন এক শরীক অপর শরীকের উপার্জন ভক্ষণ করা আবশ্যক না হয় অথবা মতটি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে যখন এক শরীকের জায়গার কাজটি অপর শরীকের জায়গার কাজ থেকে পৃথক হয়। অর্থাৎ শরীকদ্বয় তাদের গ্রহণকৃত কাজে একে অপরকে তার জায়গায় সহযোগিতা করতে পারে না অথবা মতটি প্রযোজ্য তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যেখানে একজনের কর্তৃত্বে গৃহীত কাজে অপর শরীকের কর্তৃত্ব সচল না হয় সেক্ষেত্রে। তাদের স্পষ্ট বক্তব্যমতে, উদ্দেশ্য যদি ব্যবসা হয় তাহলে পেশার প্রতি লক্ষ্য করা হবে না। ২১১

টিকাঃ
২০৪. 'নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪-৫২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১২
২০৫. 'হাওয়াশী তুহফাতি ইবনি আসিম, খ. ২, পৃ. ২১১; আল-বিরাশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৭১
২০৬. 'ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩৩; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৬১
২০৭. 'আল-খিরাশী আলা খলীল, টীকাসহ, খ. ৪, পৃ. ২৮৪
২০৮. 'আশ-শারকাওয়ী আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ১১৩
২০৯. 'ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৬
২১০. বাদাইউস সানাইঈ, খ. ৬, পৃ. ৭৭; আল-বিরাশী, খ. ৪, পৃ. ২৭১; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১১৫
২১১. 'আল-খিরাশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬৮; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00