📄 মুফাওযাযার সাথে নির্দিষ্ট বিধান
এ বিধানগুলোর মূলকথা হলো, শারিকাতুল মুফাওয়াযা'র দুই শরীক ব্যবসা ও ব্যবসা সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে বিধানগত বিচারে এক ব্যক্তির পর্যায়ভুক্ত, যদিও বাস্তবে তারা দুজন। ১৫২ এ বিধানের মূল কারণ হলো শারিকাতুল মুফাওয়াযা ওকালাত ও কাফালাতকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেহেতু প্রত্যেক শরীক অন্য শরীকের আবশ্যক বিষয়াদিতে তার ওকীল; আর তার ওপর আরোপিত বিষয়াদিতে তার কাফীল। ১৫৩ এই মূলনীতির ভিত্তিতে কয়েকটি শাখা মাসআলা ও বিভিন্ন ফলাফল আহরিত হয়:
প্রথমত : এক শরীক যা কিছু কিনবে তা শারিকার জন্য কেনা বলে ধর্তব্য হবে। তবে তার নিজস্ব প্রয়োজনীয় বিষয়াদি এবং তার পরিবারের মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়াদি এর ব্যতিক্রম। এভাবে যে কোনো শরীকের যাবতীয় ক্রয়কৃত বিষয় শারিকার জন্য ধর্তব্য হওয়ার কারণ হলো, শারিকাতুল মুফাওয়াযা চুক্তির দাবি হলো, যা কিছুতে যৌথ অংশগ্রহণ সহীহ তাতে সমতাবিধান করা। ব্যবসায়িক চুক্তি যৌথ অংশগ্রহণ সহীহ বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। ইজারাও এর অন্তর্ভুক্ত, যেহেতু ইজারা হলো উপকার কেনা। আর উপকার ভোগ যৌথভাবে হওয়া বৈধ। সুতরাং এক শরীক যা ভাড়া করবে তাও শারিকার জন্য বলে ধর্তব্য হবে। হানাফীগণ এ মতটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। ১৫৪
মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়াদিকে ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করার কারণ হচ্ছে, প্রচলন এগুলোকে ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করে। যেহেতু এগুলো এমন কিছু যা প্রত্যেক শরীকের নিজের জন্য ও পরিবারের জন্য এককভাবে প্রয়োজন হয়। এতে অপর শরীক কোনো দায় বহন করে না। আর প্রচলনমতে যা শর্ত তা স্পষ্ট বাক্যে শর্ত করার অনুরূপ। তাই এই মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়াদি এককভাবে তার ক্রেতার মালিকানাধীন হবে। যদিও উল্লিখিত ইঙ্গিতকে অগ্রাহ্য করলে এগুলো শারিকাতুল মুফাওয়াযার আওতাধীন বিষয়, যেহেতু এগুলো ব্যবসাযোগ্য পণ্য ও যৌথ মালিকানা গ্রহণযোগ্য, শারিকার জন্য উপযুক্ত এবং যেহেতু উপকার কেনা শারিকা গ্রহণ করে। এমন মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, ঘর, বসবাসের জন্য যা ভাড়া নেওয়া হয়, ঠেলাগাড়ি, জাহাজ, বিমান ও গবাদি পশু যেগুলো আরোহণ করার জন্য অথবা বিশেষ ফায়দার জন্য বহন করা যেমন হজ্জ, কর্মস্থল থেকে দূরে ছুটিকালীন সময় কাটানো এবং এককভাবে কারো সামানাপত্র বহন করা।
এক্ষেত্রে অন্য একটি পার্থক্য রয়েছে। মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়াদির পূর্ণ মূল্য এর ক্রেতা বহন করবে, যেহেতু এ বিষয়গুলো এককভাবে তার মালিকানাধীন। এ কারণে যদি কোনো শরীক বস্তুগুলোর মূল্য শারিকার সম্পদ থেকে পরিশোধ করে তাহলে অপর শরীকের অধিকার রয়েছে মূল্যে তার অংশ আদায় করার।
মুতাআখখির মালেকী ফকীহদের মতে, শারিকাতুল মুফাওয়াযার শরীকের একক ব্যক্তিগত খরচ, তার পানাহার, পোশাক, সামানপত্র নিঃশর্তভাবে বাদ যাবে। শারিকার সম্পদ থেকে শরীক এই খরচ ব্যয় করলেও তা হিসাবভুক্ত হবে না। দুই শরীকের প্রদত্ত পুঁজির অংশ, উভয়ের খরচ, উভয়ের দেশের মূল্যমান এগুলো সবগুলো ভিন্ন হোক বা অভিন্ন, বিধান এক। এরপর তারা এর কারণ বলেছেন যে, সাধারণত এগুলো সামান্য খরচ বা ব্যবসায় অন্তর্ভুক্ত। ১৫৫
শরীকের পারিবারিক খরচ বাদ দেয়ার জন্য শর্ত হলো উভয়ের শরীকের পরিবারের সদস্যসংখ্যা সমান হওয়া এবং সামাজিক বিচারে এক পর্যায়ের হওয়া। অন্যথায় পারিবারিক খরচ হিসাবভুক্ত হবে। সুতরাং এক শরীক যদি তার অংশের অতিরিক্ত সম্পদ নেয় তাহলে তার খরচকৃত সম্পদে অপর শরীক নিজ অংশ ফেরত নেবে। ১৫৬ মালেকী ফকীহগণ মুফাওয়াযা-র শরীককে নিজের জন্য ও পরিবারের জন্য কেনার দাবিতে সত্যবাদী মনে করেন খাদ্যদ্রব্য ও পোশাক ইত্যাদিতে, সকল কিছুতে নয়। ১৫৭
শারিকাতুল মুফাওয়াযায় এক শরীকের ঋণের স্বীকারোক্তি অন্য শরীকের জন্য প্রয়োগ হওয়া
দ্বিতীয়ত : শারিকাতুল মুফাওয়াযা-য় এক শরীকের জন্য ব্যবসার ঋণ বা এর স্থলবর্তী যে ঋণ আবশ্যক হয় তা অপর শরীকের জন্যও আবশ্যক হবে। এক শরীকের ঋণের স্বীকারোক্তি, তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তার ওপর ঋণ আবশ্যক হওয়ার এবং কাফালাত হিসেবে তার শরীকের জন্যও আবশ্যক হওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট; এটি হানাফীদের মত। ১৫৮
মালেকীদের স্পষ্ট বক্তব্যমতে, উপরিউক্ত বিধান শারিকা বিদ্যমান অবস্থায় ঋণের স্বীকারোক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট। কোনো নগদ বস্তু যেমন গচ্ছিত সম্পদ বা বন্ধককৃত সম্পদ, অথবা ঋণের স্বীকারোক্তি হয় শারিকা চুক্তি শেষ হওয়ার পর, তাহলে স্বীকারকারী শরীকের জন্য নগদ বস্তু বা ঋণের অংশ আবশ্যক হবে। ১৫৯ এরপর সে তার শরীকের অংশের জন্যে নিছক সাক্ষী হবে। যার জন্যে স্বীকৃতি সে এই সাক্ষীর সাথে কসম খাবে। এবং শরীকের অংশের সে হকদার হবে। ১৬০
হাম্বলী ফকীহগণ বলেন, শিরকাতুল আনানে যে পর্যন্ত তা বহাল থাকবে শরীক ঋণ নেওয়ার বা শারিকা হিসাবে কোনো পণ্য নেওয়ার কথা থাকবে। কেউ কেউ তা পছন্দও করেছেন। তাহলে তা মুফাওয়াযায়ও অবশ্যই আসবে। ১৬১
তৃতীয় : শারিকাতুল মুফাওয়াযার পক্ষে মতদানকারী সকলের ঐক্যমতে শারিকার সম্পদে এক শরীকের পরিচালিত চুক্তির হকসমূহ উভয় শরীকের বিচারে সমান। হকসমূহের উদাহরণ হলো, দোষের কারণে পণ্য ফেরত দেওয়া, ১৬২ পণ্যের হকদার বের হলে মূল্য উসুল করা, পণ্য বা মূল্য অর্পণের দাবি করা, এই দুটোকে কব্জা করা বা কজা করতে দেওয়া। এ সকল বিষয় তাদের পক্ষে হোক বা বিপক্ষে, বিধান অভিন্ন। সুতরাং কোনো শরীক যদি শারিকার জন্য কোনো বস্তু কেনে, আর কারণ বর্তমান থাকার কারণে এই অধিকারগুলোর কোনোটি প্রয়োগ করতে চায়, তাহলে প্রয়োগের অধিকার তার জন্য সীমিত হবে না। বরং তার শরীকের জন্যও প্রয়োগের অধিকার সাব্যস্ত হবে। যে কারবারগুলো কেনার শ্রেণীভুক্ত সেগুলোর বিধান অনুরূপ। ১৬৩
কেউ শারিকা চুক্তির কোনো পণ্য কেনার পর তাতে কোনো দোষ পেলে তার অধিকার থাকে দুই শরীকের যাকে ইচ্ছা তার কাছে বস্তুটি ফেরত দেওয়ার। যদি ক্রেতার কাছে থাকা পণ্যের কোনো হকদার প্রকাশিত হয়, তাহলে তার বিধান যেমন প্রকাশ পেল যে, পণ্যটি গসবকৃত বা চুক্তিকৃত। তাহলে ক্রেতার অধিকার রয়েছে যে শরীককে ইচ্ছা তার কাছে প্রদত্ত মূল্য ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করবে। যদিও সে শরীক হয়তো বিক্রির চুক্তি সম্পাদন করেনি বা মূল্য কজা করেনি।
অনুরূপভাবে ক্রেতার অধিকার রয়েছে চুক্তির প্রথম অবস্থায় দুই শরীকের যাকে ইচ্ছা তার নিকট পণ্য অর্পণের দাবি করার, যদিও সে শরীক তার কাছে পণ্যটি বিক্রি করেনি। আর প্রত্যেক শরীকের মূল্য কব্জা করার অধিকার রয়েছে, অধিকার রয়েছে দাবিকৃত পণ্য অর্পণ করার। অথবা একজন কব্জা করবে অপরজন অর্পণ করবে অথবা এর বিপরীত করবে, এমন সব করার অধিকার রয়েছে। তবে যদি কোনো শরীক নিজের ব্যক্তিগত কোনো বস্তু বিক্রি করে বা ভাড়া দেয় সেক্ষেত্রে চুক্তির অধিকারগুলো একান্ত তার জন্য সাব্যস্ত হবে। সুতরাং যে ব্যক্তি তার নিকট থেকে এমন বস্তু কিনবে সে অপর শরীককে পণ্য সোপর্দ করার দাবি করার অধিকার পাবে না। আর অপর শরীকও তার কাছে মূল্য উসুলের দাবি করার অধিকার পাবে না। ১৬৪
চতুর্থ : শারিকাতুল মুফাওয়াযা-র শরীকের কার্যক্রম তার ও তার শরীকের জন্য বাস্তবায়িত হবে, এমন সকল ক্ষেত্রে যার লাভ ও উপকার শারিকা ভোগ করে। এক্ষেত্রে এ কার্যক্রম ব্যবসা বা তার সংশ্লিষ্ট কারবার জাতীয় হোক বা অন্য কিছু, বিধান অভিন্ন।
এই বিধান শারিকাতুল মুফাওয়াযার পক্ষে মতদানকারী সকলের ঐকমত্যপূর্ণ। অর্থাৎ হানাফী, মালেকী ও হাম্বলীগণ। মালেকীদের স্পষ্ট বক্তব্যমতে, সুবিধা পরিপন্থী প্রতিটি কারবার এক শরীকের পূর্ব অনুমতি ছাড়া অন্য শরীকের শারিকার জন্য বাস্তবায়ন অপর শরীকের পরবর্তী অনুমতির ওপর নির্ভরশীল। যদি অন্য শরীক অনুমতি না দেয় তাহলে তা শুধু এই কারবারকারী শরীকের ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হবে। আর সে অপর শরীকের হকের ক্ষতিপূরণ দেবে। সুতরাং যদি তৃতীয় ব্যক্তিকে মূল মূল্যের দায়িত্ব দেয়া হয় এমন চুক্তিতে যা সে বা তার শরীক সম্পাদন করে, আর লাভের অনুপাত হলো একশতে পঞ্চাশ, এরপর তার শরীক যদি অনুমোদন না করে তাহলে একশতে পঁচিশ দীনার হারে তার শরীক তার নিকট থেকে উসুল করবে, যদি শারিকা হয়ে থাকে আধাঅধি লাভের অনুপাতে। কেননা মুহাবাত স্বেচ্ছাদানের ন্যায়। তবে এক্ষেত্রে মুহাবাতের জন্য পুঁজিদাতা শারিকার মঙ্গলার্থে ঝুঁকিগ্রহণকারী কর্মীর প্রতি সদয় আচরণ করছে।
পঞ্চম : হানাফীদের নিকট যার সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যাত সে মুফাওয়াযা করলে তা সহীহ ও কার্যকর হবে। মুহাবাতের অপবাদ কোনো প্রভাব ফেলবে না। এর কারণ, এক্ষেত্রে দুজন শরীক হবে এক ব্যক্তি তুল্য। আনান এর বিপরীত। তাতে একজন অপর জনের ওকীল হয়। নিয়ম হচ্ছে, অপবাদের স্থান ওকালাত থেকে বাদ রাখা হয়। এটি আবু হানীফা রহ.-এর মত। তবে যদি ওকীলকে বলা হয়, তুমি যার সাথে ইচ্ছা লেনদেন করো, তাহলে সে স্বাভাবিক মূল্যে লেনদেন করতে পারবে। আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ রহ. এ সময় যে কোনো অবস্থায় স্বাভাবিক মূল্যে লেনদেন সহীহ হওয়াকে আবশ্যিক বলেছেন। ১৬৫
মালেকীগণ বলেন, মুফাওয়াযায় এক শরীকের অনুমতি না নিয়ে অপর শরীক যে কোনো কর্তৃত্ব করতে পারবে যদি তা শারিকার কল্যাণে হয়। সেক্ষেত্রে মুহাবাতের স্থানে বিক্রিরও তারা অনুমতি দেন যদি মুহাবাত প্রমাণিত না হয়। ১৬৬
শারিকাতুল মুফাওয়াযায় তৃতীয় ব্যক্তির সাথে চুক্তি করা ( مُشَارَكَةُ الْمُفَارِضِ لِشَخْصِ ثَالِثٍ )
শারিকাতুল মুফাওয়াযার শরীকের শারিকাতুল আনান চুক্তি করার অধিকার আছে। এই চুক্তি অপর শরীকের অধিকারে বাস্তবায়িত হবে, সে পছন্দ বা অপছন্দ করুক না কেন। কেননা শারিকাতুল আনান শারিকাতুল মুফাওয়াযা থেকে লঘু। তাই শারিকাতুল মুফাওয়াযার আওতায় শারিকাতুল আনান সম্পাদন করতে এবং মুফাওয়াযার অনুগামীরূপে সংঘটিত হতে কোনো বাধা নেই। যেমন সাধারণভাবে যে-কোনো শারিকার আওতায় মুদারাবা চুক্তি সম্পাদন বৈধ। মুদারাবার সম্পাদন এভাবে হবে যে, শারিকার পুঁজি দিয়ে কোনো শরীক তৃতীয় ব্যক্তির সাথে মুদারাবার চুক্তিতে আবদ্ধ হবে। এটি সাহেবাইনের মত। ১৬৭
এর কারণ হলো, শারিকাতুল মুফাওয়াযার আওতায় অন্য শারিকাতুল মুফাওয়াযা সম্পাদন বৈধ নয়। অর্থাৎ শারিকাতুল মুফাওয়াযার কোনো শরীকের জন্য অপর শরীকের অনুমতি ছাড়া তৃতীয় ব্যক্তির সাথে শারিকাতুল মুফাওয়াযার চুক্তিবদ্ধ হওয়া বৈধ নয়। কারণ, বস্তু তার অনুরূপ বস্তুকে নিজের অধীন করতে পারে না।
ইমাম আবু ইউসুফ রহ. উক্ত মতটি গ্রহণ করেছেন। ১৬৮ মুতাআখখির হানাফী ফকীহদের মতে এটিই নির্ভরযোগ্য মত। তবে তারা শারিকাতুল মুফাওয়াযার সম্পাদন বৈধ না হওয়ার ব্যাখ্যা করেছেন, এই চুক্তি শারিকাতুল আনান-এ পরিণত হবে। যার সাথে এই শরীক দ্বিতীয় শারিকা চুক্তি করল যে যদি এমন হয় যে, ঐ ব্যক্তির পক্ষে এই শরীকের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়, তবু এই শারিকার লাভ তার ও তার প্রথম শরীকের মাঝে ভাগ হবে। ১৬৯
ইমাম মুহাম্মদ রহ. শারিকাতুল মুফাওয়াযার শরীক অন্য শারিকাতুল মুফাওয়াযা সম্পাদনের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধক আছে বলে মনে করেন না। হাসান বিন যিয়াদ রা.-এর সূত্রে ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর মত বর্ণিত হয়েছে, শারিকাতুল মুফাওয়াযার শরীকের অন্য শারিকাতুল মুফাওয়াযা সম্পাদনের অধিকার নেই এবং তার জন্য শারিকাতুল আনান সম্পাদনের সুযোগ নেই। এর কারণ, উভয় নবচুক্তিতে প্রথম শারিকার চুক্তিকৃত দাবিকে পরিবর্তন করা হচ্ছে, যেহেতু প্রথম শারিকার পুঁজিতে অবর্তমান নতুন শরীকের এতে অধিকার সাব্যস্ত হয়। আর মূলপুঁজিতে অবর্তমান ব্যক্তির অধিকার সাব্যস্ত করা সকল শরীকের সম্মতি ছাড়া জায়েয নয়। ১৭০
হাম্বলীদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো আবু হানীফা রহ.-এর মতের সমর্থন। ১৭১ মালেকীদের মতে, শারিকাতুল মুফাওয়াযার শরীকের জন্য শারিকার আংশিক পুঁজির ক্ষেত্রে শারিকাতুল মুফাওয়াযা বা অন্য কোনো শারিকা সম্পাদনের সুযোগ আছে। তবে এই আংশিক পুঁজি নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত হতে হবে, অনির্দিষ্ট ও ব্যাপক নয়। যেমন কোনো শরীক শারিকার পুঁজি থেকে একশ দীনার আলাদা করল, আর তৃতীয় ব্যক্তি অনুরূপ একশ দীনার আনল। এরপর তারা উভয়ে দুইশ দীনারে ব্যবসা করল। এই তৃতীয় ব্যক্তি হবে প্রথম শারিকার বাকি পুঁজি থেকে সম্পর্ক মুক্ত। ১৭২
টিকাঃ
১৫২. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭৩
১৫৩. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৭
১৫৪. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৯; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৮-৩৪৯; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭৩-৭৪
১৫৫. আল খিরশী আলা খলীল, টীকাসহ, খ. ৪, পৃ. ২৬৪
১৫৬. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬৪; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৭০-১৭১
১৫৭. বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৭১
১৫৮. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭২; আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৯; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪১; মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ১৮৮
১৫৯. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬৩
১৬০. আল ফুরূ', খ. ২, পৃ. ৭২৬
১৬১. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬১-২৬২
১৬২. হাওয়াশী তুহফাতি ইবনি আসিম, খ. ২, পৃ. ২০৯; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৫৩; বুলগাতুস মালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৮
১৬৩. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৬
১৬৪. আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩১০
১৬৫. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭২-৭৩; রদ্দুর মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৬; আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৪; আল বিরশী আলা খলীল, টীকাসহ, খ. ৪, পৃ. ২৫৯
১৬৬. রদ্দুর মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৬; মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ২২৫; আল আতাসী, আলাল মাজালা, খ. ৪, পৃ. ২৯৭
১৬৭. আল ফাওযাকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৪
১৬৮. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৬; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭৪
১৬৯. আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩১৩; রদ্দুর মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৬
১৭০. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭৪; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৭
১৭১. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৬
১৭২. আল খিরশী আলা খলীল ও টীকা, খ. ৪, পৃ. ২৫৯
📄 শারিকাতুল আনানের সাথে নির্দিষ্ট বিধান
প্রথম : প্রত্যেক শরীক যা কিছু কিনবে তা-ই শারিকার জন্য ক্রয়কৃত গণ্য হবে না। এর কারণ, যে শরীকের হাতে শারিকার পুঁজির কোনো অংশ নেই সে অপর শরীকের অনুমতি ছাড়া কোনো বস্তু শারিকার জন্য কিনতে পারবে না। বরং পুঁজিশূন্য অবস্থায় সে যা কিনবে তা নিজের জন্য বা শারিকা ছাড়া অন্য বৈধ পন্থায় যার জন্য সে কিছু কিনতে চায়, তার জন্য হবে। তার কেনা বস্তু শারিকার মালিকানাধীন হতে পারে না।
অনুরূপভাবে ঐ শরীক যার কর্তৃত্বে শারিকার সমুদয় সম্পদ পণ্য হিসেবে আছে; মুদ্রা হিসেবে নয় অথবা তার কাছে নগদ মুদ্রা আছে, যা পণ্যের মূল্য পরিমাণ নয়, এই শরীকের কৃত মুদ্রার (অর্থাৎ মূল্যজাতীয় বস্তু দ্বারা) বিনিময়ে কেনা চুক্তি শারিকার জন্য সাব্যস্ত হবে না। এমনকি চুক্তির দাবি হিসেবে যে প্রকার ব্যবসা শারিকা সীমিত তা ভিন্ন অন্য জাতীয় পণ্য শরীক কিনলে তার কেনা পণ্যের কোনো অংশ শারিকার জন্য সাব্যস্ত হবে না। যেমন শরীক কিনল চাল অথচ শারিকার চুক্তিকৃত ব্যবসা হলো তুলার ক্ষেত্রে, অথবা এর বিপরীত হলো। ১৭৪
উপরিউক্ত আলোচনার অর্থ হলো অন্য শরীকের একান্ত অনুমতি ছাড়া শারিকাতুল আনান-এর অন্য শরীক যা কিনবে ১৭৫ তা তিনটি শর্ত ছাড়া শারিকার জন্য সাব্যস্ত হবে না। ১৭৬ ১. শরীকের হাতে শারিকার এই পরিমাণ পুঁজির অংশ থাকা যা তার ক্রয়কৃত বস্তুর মূল্য পরিশোধের জন্য যথেষ্ট; ২. যদি মুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করে তবে তার হাতে পুঁজির যে অংশ থাকবে তা হবে নগদ মুদ্রা; পণ্য নয়; ৩. শরীকের ক্রয়কৃত বস্তু শারিকার চুক্তিকৃত ব্যবসা শ্রেণীভুক্ত হওয়া।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে চতুর্থ শর্ত গ্রহণ করা যায়। তা হলো: ৪. অন্য শরীক পণ্যটি তার একক মালিকানার জন্য হওয়ার স্পষ্ট অনুমোদন না দেওয়া।
যখন এই চার শর্ত পূর্ণরূপে মজুদ হবে, তখন কেনাবেচা শারিকার জন্য সাব্যস্ত হবে, যদিও শরীক দাবি করে যে, সে নিজের জন্য কিনেছে বা পণ্যটি কেনার সময় সে এ সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়া অর্থাৎ পণ্যটি শারিকার জন্য কেনার কথা বলে সাক্ষ্য দেওয়া পর্যন্ত তার থাকবে। কেননা সে অপর শরীকের অবগতি ছাড়া নিজেকে ওকালাতের দায়মুক্ত করতে পারে না। এটি হানাফীদের মত। ১৭৭
৭২. অন্যান্য মাযহাবে উল্লিখিত শর্তগুলো নেই। তবে শারিকাতুল আনান ও শারিকাতুল ওজুহে শর্ত সংক্রান্ত হাম্বলীদের একটি মত রয়েছে। তা হলো, শরীকের নিজের জন্য কেনার দাবি অগ্রহণযোগ্য। তবে উভয়ে শারিকাহর এক্ষেত্রে তারা কসমসহ শরীরকর সত্যায়নের মতকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ১৭৮ শাফেয়ী মাযহাবের স্পষ্ট বক্তব্যমতে শারিকাতুল আনান-এ হাম্বলীদের উলিখিত মত আসলযোগ্য। ১৭৯ এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, শরীক একজন আমীন যে একটি সম্ভাব্য বিষয় দাবি করেছে। তার তরফ থেকে জানা ছাড়া এটা জানা সম্ভব নয়। যদি কেনার সময় তার নিয়ত স্পষ্টভাবে জানার ও সে সংক্রান্ত সাক্ষ্য রাখার সম্ভাবনা থাকত তাহলে কসম ছাড়া শরীকের বক্তব্য গ্রহণ করা হতো। বরং শাফেয়ীদের বক্তব্য হলো, নিজের জন্য কেনার দাবিতে তাকে সত্যায়ন করা হবে, যদিও এতে সে লাভবান হয় এবং শারিকাহর জন্য কেনার দাবিতে তাকে সত্যায়ন করা হবে, যদিও এতে সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে তাদের মতে, শরীক যদি শারিকাহর জন্য কেনার দাবি করে আর নিজ অংশ দোষের কারণে ফেরত দিতে চায় তাহলে শারিকাহর জন্য কেনার দাবিতে তাকে সত্যায়ন করা হবে না। যেহেতু বাহ্য অবস্থা হলো বস্তুটি তাকে সুযোগ দেয়া হবে না। তবে বিক্রেতা যদি শারিকাহর জন্য কেনার দাবিতে শরীককে সত্যায়ন করে, শাফেয়ীদের মতে তাকে চুক্তির বিভাজনের এবং তার একক অংশ ফেরত দেয়ার সুযোগ দেয়া হবে। কেননা শরীক নিজ অংশের ক্ষেত্রে মূলব্যক্তি আর শরীকের অংশের ক্ষেত্রে সে ওকীল। তাই তার এক চুক্তি প্রকারান্তরে দুই চুক্তি। ১৮০ মালেকীদের মতে, নিজের জন্য কেনার দাবিতে শরীককে সকল প্রকার শারিকায় সত্যায়ন করা হবে। তবে ওয়ারিছদের মাঝে সম্পাদিত শারিকাতুল জাবর এর বিষয় ভিন্ন। শারিকাতুল মুফাওয়াযায় তারা স্পষ্টভাবে এ বিষয়টি বলেছেন। এক্ষেত্রে তারা পণ্যের কেনাকে সীমিত করেছেন শরীকের জন্য ও তার পরিবারের জন্য উপযুক্ত বিষয়াদি অর্থাৎ খাবার পানীয় ও পোশাক কেনার ক্ষেত্রে; অন্য পণ্যাদি স্থাবর সম্পত্তি ও প্রাণী কেনার ক্ষেত্র নয়। ১৮১
দ্বিতীয় : হানাফীদের মতে, এক শরীকের ওপর যে ঋণ আবশ্যক হবে তা আদায়ের জন্য অপর শরীককে বলা হবে না। এর কারণ, শারিকাতুল আনান একমাত্র ওকালাতের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়। তবে পারস্পরিক দায়গ্রহণের কথা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করলে ভিন্ন কথা। যেমনটা ফতোয়া খানিয়াতে উদ্ধৃত হয়েছে। যদিও ইবনুল হুমাম রহ. এক্ষেত্রেও কাফালাত বাতিল হওয়ার মতকে সমর্থন করেছেন। সমর্থন করার কারণ, এই কাফালাত অজ্ঞাত বিষয়ের কাফালাত। স্পষ্ট কাফালাতও অজ্ঞাত বিষয়ের জন্য বৈধ হয় না। সুতরাং স্পষ্ট কাফালাতের চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের কাফালাত বৈধ হওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না। ১৮২
হাম্বলীদের মতে, শারিকা চুক্তি সংক্রান্ত শারিকাতুল আনান-এর শরীকের নগদ বস্তু বা ঋণের স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এই শরীক শুধু ব্যবসার ক্ষেত্রে অনুমতিপ্রাপ্ত। আর স্বীকারোক্তি ব্যবসার অংশ নয়। তাই তার স্বীকারোক্তি শুধু তার অংশের ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হবে। ১৮৩ তারা এভাবেই নিঃশর্ত মত ব্যক্ত করেছেন। সম্পদ তার হাতে রয়েছে কিনা এ সংক্রান্ত বিশদ বিবরণ দেননি। তবে ঋণ হবে ব্যবসার অনুগামী, যেমন শারিকার জন্য কেনা পণ্যের মূল্য অথবা বহনকারী, সংরক্ষক ও প্রহরীর পারিশ্রমিক, যেহেতু এটি হবে তার স্বীকারোক্তি। যেমন পণ্য অর্পণ করা স্বীকৃতি প্রকাশ করে, অথবা এটি হবে মূল্য কব্জা করতে দেয়া।
হানাফীদের মতে এই বিশদ বিবরণ নেই। হাম্বলীগণ কখনো এ মত উল্লেখ করেন। হাম্বলী ফকীহ কাজী রহ.-এর মত-এর উত্তর দেওয়ার জন্য। শারিকা চুক্তির ক্ষেত্রে নিঃশর্তভাবে শরীকের স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য হওয়ার মত ব্যক্ত করেছেন কাজী ইয়াস রহ.। তিনি বলেন, নিশ্চয় শরীকের অধিকার আছে পণ্য কিনে মজলিসে মূল্য অর্পণ না করার। তাই মূল্য সংক্রান্ত তার স্বীকারোক্তি যদি গ্রহণ না করা হয় তাহলে লোকদের সম্পদ নষ্ট হবে। আর লোকেরাও তার সাথে লেনদেন থেকে বিরত থাকবে। আল-ইনসাফ গ্রন্থপ্রণেতা তার সূত্রে এ মতটি উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন এটিই সঠিক। ১৮৪
তৃতীয় : হানাফী ফকীহদের মতে, এক শরীক যে চুক্তির কার্যক্রম সম্পাদন করে সে চুক্তির হকগুলো সে শরীকের মাঝে সীমিত থাকবে, যেহেতু যতক্ষণ পর্যন্ত একথা স্বীকৃত থাকবে, কোনো কাফালা নয়, ততক্ষণ পর্যন্ত চুক্তির হকগুলো চুক্তি সম্পাদনকারীর জন্যই হবে। সুতরাং কোনো শরীক শারিকার সম্পদ বিক্রি করলে বা ভাড়া দিলে সে শরীকই মূল্য বা ভাড়া উসুল করবে এবং তার কাছে বিক্রিত পণ্য বা ভাড়া দেয়া বস্তু অর্পণের দাবি করা হবে। মতবিরোধ হলে সে সময় সে বিবাদ করবে। হয়তো সে দলিল দেবে বা তাকে দলিল শোনানো হবে। হয়তো তাকে কসম খেতে বলা হবে বা সে কসম খেতে বলবে। এসকল বিষয়ে তার শরীক ও অন্য কেউ এক বরাবর। শরীকের পক্ষে বা বিপক্ষে এখানে কিছুই করা হবে না। বন্ধক রাখার ক্ষেত্রে ক্রেতা হলো চুক্তিকারী আর বন্ধক গ্রহণের ক্ষেত্রে বিক্রেতা হলো চুক্তি কারী। যদিও অন্য ব্যক্তি সে চুক্তিতে শরীক ছিল যা ঋণ আবশ্যক করেছে। এর কারণ, বন্ধক রাখা হলো অন্য শরীকের সম্পদ থেকে তার ঋণ পূর্ণ পরিশোধ করা যেহেতু আলোচনা চলছে শারিকার কোনো বস্তু বন্ধক রাখার বিষয়ে আর কেউ অন্যের ঋণ তার সম্পদ থেকে তার অনুমতি ছাড়া পরিশোধের অধিকার রাখে না। আর বন্ধক গ্রহণ করা হলো এককভাবে অংশ পূর্ণরূপে গ্রহণ করা। আর এটিও তার অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ করার অধিকার রাখে না ১৮৫। ১৮৬
মালেকীদের স্পষ্ট বক্তব্যমতে শারিকাতুল আনান-এর কোনো শরীকের জন্য অপর শরীকের জানা ও অনুমতি ছাড়া একক ক্ষমতায় শারিকায় কিছু করার অধিকার নেই। ১৮৭
হাম্বলীদের মত সম্পর্কে আলমুগনী গ্রন্থে ইবনে কুদামা রহ. বলেন, শারিকাতুল আনান-এর প্রত্যেক শরীকের জন্য পণ্য ও মূল্য কব্জা করার এবং কব্জা করতে দেওয়া, ঋণ নিয়ে বিবাদ করা, ঋণ আদায়ের দাবি করা, হাওয়ালা করা ও হাওয়ালা গ্রহণ করা, যে চুক্তি সে বা তার শরীক সম্পাদন করেছে দোষের কারণে সে চুক্তির পণ্য ফেরত দেয়া ইত্যাদি কার্যক্রম তার বাস্তবায়ন করার অধিকার আছে। কেননা চুক্তির হকগুলো চুক্তিকারীর সাথে বিশিষ্ট নয়। ১৮৮ শাফেয়ীদের স্পষ্ট বক্তব্যমতে, শারিকাতুল আনান-এর কোনো শরীক এককভাবে দোষের কারণে পণ্য ফিরিয়ে দেওয়ার হক রাখে। ১৮৯
যে ক্ষেত্রে শারিকাতুল আনান-এর এক শরীকের কার্যক্রম অন্য শরীকের ওপর প্রযোজ্য হয়
চতুর্থ : সকল ফকীহের ঐকমত্যে এক শরীকের কার্যক্রম অন্য শরীকের জন্য প্রযোজ্য হওয়া ব্যবসার সাথে সীমিত। সুতরাং এক শরীক যদি কোনো বস্তু গসব করে বা নষ্ট করে, তাহলে সে শরীক এককভাবে ক্ষতিপূরণ বহন করবে। এক্ষেত্রে অন্য শরীক তার সাথে অংশ নেবে না। বিপরীতে শরীক যদি কোনো জিনিস শারিকার জন্য সহীহভাবে ক্রয় করে, আর চুক্তির দাবি হিসেবে সে তা কেনার অধিকারও রাখে তাহলে তার কেনা তার জন্য এবং তার শরীকের জন্য প্রযোজ্য হবে। এই শরীক যদি নিজ সম্পদ থেকে পণ্যের মূল্য পরিশোধ করে তাহলে তার শরীকের নিকট থেকে মূল্যে তার অংশ উসুল করতে পারে। বরং বিক্রি যদি ফাসিদ হয় আর কেনা বস্তু যদি নষ্ট হয় তাহলে সে এ বস্তুটির ক্ষতিপূরণ বহন করবে না। বরং ক্ষতিপূরণ বহনে অন্য শরীক তার সাথে অংশগ্রহণ করবে। তা হবে ব্যবসার পুঁজিতে উভয়ের আনুপাতিক অংশ হিসেবে।
শারিকাতুল আনান-এর এক শরীকের কার্যক্রম অন্য শরীকের ওপর প্রযোজ্য হওয়ার ক্ষেত্রে এই কার্যক্রমে শারিকার পুঁজির লাভ হওয়া যথেষ্ট মনে করেন ইমাম আবু ইউসুফ রহ., যেমনটা তাঁর মত শারিকাতুল মুফাওয়াযার কোনো শরীকের কার্যক্রম অন্য শরীকের ওপর প্রয়োগ হওয়ার ক্ষেত্রে।
মাবসুত গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে, ভাড়া করা যানবাহন যা শারিকাতুল আনান-এর এক শরীক তার একান্ত কোনো প্রয়োজনে, যেমন তার পরিবারের খাবার বহন করার জন্যে ভাড়া করলে এই বাহনটি এককভাবে তার জন্য হবে। ১৯০ সুতরাং তার শরীক এটি ব্যবহার করলে ক্ষতিপূরণ দেবে। তবে যদি প্রথম শরীক শারিকার প্রয়োজনে, যেমন শারিকার কোনো পণ্য বহন করার জন্যে বাহনটি ভাড়া করে, তাহলে এই বাহনটি যৌথ ভাড়ার আওতাধীন হবে। তখন এর বিধান হবে, যদি উভয় শরীক বাহনটি ভাড়া করত তখন আরোপিত বিধানের অনুরূপ। এমনকি যদি অন্য কেউ পূর্বে বহনকৃত পণ্যের সদৃশ পণ্য বহন করে আর বাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে কোনো ক্ষতিপূরণ আবশ্যক হবে না। ১৯১
টিকাঃ
১৭৩. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৮, ৭২; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৫
১৭৪. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৮; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৩, ৩৬২
১৭৫. আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়ায় উদ্ধৃত আংশিক বক্তব্যে এই বিশেষায়ণের বিপলীত মত বোঝা যায়। সতর্কীকরণ ছাড়া পরস্পর বিরোধী মতামত উল্লেখ করার ক্ষেত্রে হিন্দিয়্যা গ্রন্থকারগণ তেমন খেয়াল করেন না। তবে এই বিশেষায়ণের বিপরীত মতের উপর নির্ভর করা যায় না, খ. ২, পৃ. ৩১১। ফাতাওয়া খানিয়াতে এক্ষেত্রে শারিকাতুল মুফাওয়াযা ও শারিকাতুল আনানের পার্থক্যের স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৫।
১৭৬. স্পষ্ট, যে সম্পদ শারিকাহর আওতাভুক্ত হবে না তা হলো শরীকের হাতে থাকা শারিকাহর নগদ পুঁজির অতিরিক্ত সম্পদ। এছাড়া অবশিষ্ট সম্পদ শারিকাহর জন্যই হবে। মুষারাবার আলোচনায় ইবনে আবিদীন এর সাদৃশ একটি মত সমর্থন করেছেন। রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫০৭
১৭৭. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৩
১৭৮. আল ফুরু', খ. ২, পৃ. ৭২৯
১৭৯. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৬
১৮০. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৬;
১৮১. বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৭১
১৮২. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২০৯; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫১, ৩৫৬, ৩৬৩
১৮৩. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩১; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০
১৮৪. আশ শরহুল কাবীর, খ. ৫, পৃ. ১২৪; আল ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪২১
১৮৫. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২২; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৩
১৮৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭০
১৮7. আল-খিরাশী, আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬৫
১৮৮. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৯, ১৩০
১৮৯. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১০
১৯০. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩২৬; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭৪; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৬
১৯১. আল-খিরাশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬০; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৫; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৫৩; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০২; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩০
📄 বাজারদরের কম মূল্যে শারিকাতুল আনান-এর শরীকের বিক্রি করা
শাফেয়ীদের স্পষ্ট বক্তব্যমতে, অনেক লোকসান দিয়ে শরীক কেনাবেচা করবে না। যদি এমন লোকসান কেনাবেচা করে, তাহলে শুধু তার অংশে চুক্তি সহীহ হবে। এবং এ সময়ে ক্রেতা বা বিক্রেতার ইচ্ছাধিকার থাকবে। তবে যদি শরীক দায়ে আবশ্যক মূল্যের বিনিময়ে ক্রয় করে, তাহলে সকলের ক্ষেত্রেই চুক্তিটি সহীহ ও ধর্তব্য হবে। আর এককভাবে ক্রেতার জন্য কেনা হয়েছে বলে ধরা হবে; শারিকাহর জন্য নয়। ১৯২
তারা বলেন, বাজারদরের স্বাভাবিক মূল্যের বিনিময়ে কোনো শরীকের বিক্রির অধিকার নেই, যদি অধিক মূল্য দিয়ে কিনতে আগ্রহী ক্রেতা থাকে। এমনকি যদি শরীক কার্যত বিক্রি করে, আর খেয়ারের সময়ে অধিক মূল্য দিয়ে কিনতে আগ্রহী ক্রেতা প্রকাশ পায়, তাহলে শরীকের জন্য আবশ্যক পূর্ব বিক্রিচুক্তি বাতিল করা। অন্যথায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুক্তিটি বাতিল হয়ে যাবে। ১৯৩
টিকাঃ
১৯২. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৫
১৯৩. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৬, পৃ. ৮
📄 শারিকাতুল আনান-এর শরীকের জন্য তার শরীক ছাড়া অন্য কারো সাথে শারিকা চুক্তি সম্পাদন করা
শারিকাতুল আনান-এর কোনো শরীকের জন্য তার শরীকের অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো শারিকা : মুফাওয়াযা বা আনান-এ চুক্তিবদ্ধ হওয়া জায়েয নেই। এর কারণ, বস্তু নিজের অনুরূপ বস্তুকে অনুগামী করতে পারে না। তাহলে তার ঊর্ধ্ব বিষয়কে কীভাবে অনুগামী করবে? তবে যদিও সে শারিকায় চুক্তিবদ্ধ হওয়ার অধিকার রাখে না তবে সে ওকীল নিয়োগের অধিকার রাখে। সুতরাং যদি সে শারিকা চুক্তি করে তাহলে শারিকা চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। তবে শারিকা চুক্তি বাতিল হওয়ার কারণে তাতে অন্তর্ভুক্ত ওকালাত বাতিল হওয়া আবশ্যক নয়। এর কারণ, অংশ বিষয় বাতিল হওয়ার কারণে পুরো বিষয় বাতিল হওয়া আবশ্যক নয়। এটি হানাফীদের মত। ১৯৪
অন্যান্য শরীকের অনুমতি ছাড়া শ্রমদানের জন্য শারিকার পুঁজি তৃতীয় ব্যক্তিকে দেওয়া শাফেয়ী ও হাম্বলীগণের মতে সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। যদিও বিনিময় ছাড়া শারিকার সেবাদানের উদ্দেশ্যে তৃতীয় ব্যক্তিকে দেয়া হোক না কেন। (বিনিময় ছাড়া সেবাদানের নাম হলো ইবযা)। এর কারণ, শারিকা চুক্তিতে শরীকদের অনুমোদন শুধু শরীকের কর্তৃত্ব ও হস্তক্ষেপে সীমিত; অন্য কারো কর্তৃত্বে ও হস্তক্ষেপে শরীকদের অনুমোদন নেই। ১৮৫ তাই এ মাসআলাটির বিধান কোনো শরীকের শারিকা চুক্তি থেকে সরে গিয়ে অন্যকে তার স্থলবর্তী করার অনুরূপ বিধান। (এক্ষেত্রে অন্যান্য শরীকের অনুমোদন যেমন আবশ্যক, তেমন অন্যকে শ্রমদানের জন্য শারিকার পুঁজি প্রদানে শরীকদের অনুমোদন আবশ্যক।)
টিকাঃ
১৯৪. তারা এমনটি বলেছেন। এর কারণ হিসেবে যা মনে হয় তা হলো, শরীক তার হাতে থাকা নিজ সম্পদ ও শারিকার সম্পদের অর্ধেকের ক্ষেত্রে মূল ব্যক্তি আর বাকি অর্ধেককে সে উওকীল। কিতাবগুলোর ভাষ্য এ ব্যাপারে প্রায় পার্থক্যমুক্ত। তবে স্পষ্টকরণে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। দ্রষ্টব্য: বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৯; আল-ফাতাওয়া আল- হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩২২
১৮৫. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৯; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩২; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৬