📄 খ. চুক্তি আবশ্যক না হওয়া
মালেকীগণ ছাড়া এটি অন্যদের সম্মিলিত মত। প্রত্যেক শরীকের এককভাবে শারিকা বাতিল করার অধিকার আছে। অপর শরীক খুশি হোক বা অসন্তুষ্ট, উপস্থিত হোক বা অনুপস্থিত, পুঁজি মুদ্রা হোক বা পণ্য- সর্বাবস্থায় বিধান অভিন্ন।
তবে চুক্তি বাতিল হওয়া হানাফীদের মতে বাস্তবায়িত হবে অপর শরীক বাতিল হওয়ার বিষয়টি জানার পর থেকে। কারণ, যৌথচুক্তির দাবি হিসেবে তাকে হস্তক্ষেপের অধিকার থেকে অপসারণ করা হচ্ছে। আর এটি ইচ্ছাকৃতভাবে শরীকের অপসারণ করা, যা বাতিলকারী শরীক নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী অগ্রবর্তী করেছে। তাই তাকে অন্যের ক্ষতি করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
শাফেয়ী ও হাম্বলীগণের মতে চুক্তি বাতিল হওয়ার জন্যে বিষয়টি শরীকের জানা শর্ত নয়; যেমন ওকীলকে অপসারণের ক্ষেত্রে শর্ত না। ১০১ তবে হানাফীদের মধ্যে তাহাবী ও যায়লায়ী, মালেকীদের ইবনে রুশদ ও তার নাতী এবং কতক হাম্বলী ফকীহর মতে, ১০২ চুক্তি বাতিল হওয়ার জন্য নগদ অর্থ হিসেবে পুঁজি বর্তমান থাকা শর্ত; পণ্যরূপে নয়। এর অন্যথা হলে শারিকা বহাল থাকবে এবং চুক্তি বাতিল করা নাকচ হবে। তবে কতক হাম্বলী ফকীহর মতে চুক্তি রহিত করা বাতিল হবে না। বরং তাদের মতে পুঁজি নগদ অর্থ হওয়ার ওপর চুক্তির বাতিল হওয়া নির্ভর করে। সুতরাং পুঁজি নগদ অর্থ হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক শরীকের পুঁজিতে হস্তক্ষেপের অধিকার আছে। তবে তাতে তাদের অন্য কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই। যেমন বন্ধক রাখা, হাওয়ালা করা অথবা পুঁজি যে নগদ অর্থ ও মুদ্রা হবে তা ছাড়া অন্য মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করা। ১০৩
চুক্তি বাতিল করার শ্রেণীভুক্ত হচ্ছে, এক শরীক অপর শরীককে বলল : আমি এই শারিকায় তোমার সাথে কাজ করব না। উপরিউক্ত অবস্থার পর যদি অপর শরীক শারিকার পুঁজিতে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে চুক্তি বাতিল হওয়ার সময় সে এই পুঁজিতে অন্য শরীকের অংশের দায় গ্রহণ করবে। যদি তা মিছলী হয় (বাজারে যার সদৃশ বিদ্যমান) তাহলে মিছলী বস্তু দ্বারা আর বাজারে যার সদৃশ নেই তার বাজার মূল্য দ্বারা ক্ষতিপূরণ দেবে। ১০৪
পুঁজি ব্যবহৃত হওয়া শর্ত না হলে শারিকা যখন শেষ হয়ে যাবে তখন যদি পুঁজি পণ্য অবস্থায় থাকে, তাহলে উভয় শরীকের মত অনুযায়ী তারা তা বণ্টন কিংবা বিক্রি করে মূল্য বণ্টন করতে পারে। যদি তাদের মতভেদ হয়, একজন বণ্টনের ইচ্ছুক আর অপরজন বিক্রির, তাহলে বণ্টন ইচ্ছুক শরীকের বক্তব্য গ্রহণ করা হবে।
কেননা পণ্যের বণ্টন প্রত্যেক শরীকের প্রাপ্য পুঁজি ও লাভ নিশ্চিত করে, অতিরিক্ত কোনো কার্যক্রমের ক্লেশ ছাড়া। এই বিবেচনায় শরীক মুদারাবার কর্মী থেকে ভিন্ন। যেহেতু বিক্রির মাধ্যমেই কর্মীর প্রাপ্য প্রকাশিত হয়। সুতরাং যে যখন বিক্রির দাবি করবে তখন তা গৃহীত হবে। হাম্বলীগণের স্থিরীকৃত মত এটিই। ১০৫
ইবনে রুশদ, তার নাতী এবং তাদের মতানুসারী ফকীহগণ বাদে অন্য মালেকী ফকীহদের মত হলো, যৌথচুক্তি আবশ্যকীয় চুক্তি। পুঁজি ব্যবহৃত হওয়া বা শরীকের গ্রহণ করার পর আমলে পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এই আবশ্যকতা অব্যাহত থাকবে। কতক হাম্বলী ফকীহও কাজ গ্রহণ করার পর শারিকাতুল আমাল (যৌথ কাজের চুক্তি) আবশ্যক হওয়ার মত প্রকাশ করেছেন। ১০৬
টিকাঃ
১০১. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৫; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০২
১০২. বুলগাতুস মালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৮; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২৫৫; আল ফুরূ', খ. ২, পৃ. ৭২৭
১০৩. আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩৩; আল ফুরূ', খ. ২, পৃ. ৭২৭; বাদায়েউস সানায়ে, ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩৪; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৬২
১০৪. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩৪; মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৪৩৯
১০৫. আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩৩-১৩৪
১০৬. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৭; মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৫৮০; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৫; আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৮২; আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৫ ও ২৬৭; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৪৭
📄 গ. শরীকের কর্তৃত্ব আমানতের কর্তৃত্ব
ফকীহদের ঐকমত্যে শারিকার পুঁজিতে শরীকের কর্তৃত্ব আমানতের কর্তৃত্ব, যে-কোনো প্রকার শারিকা হোক না কেন। কেননা পুঁজি গচ্ছিত সম্পদের ন্যায়, যা তার মালিকের অনুমতিতে কব্জা করা হয়েছে, তাতে বদল পরিশোধ করা বা কজার মাধ্যমে চুক্তি মজবুত করার উদ্দেশ্য করা হয় নাই। ১০৭
আমানতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, সীমালঙ্ঘন বা ব্যবহারে অবহেলা ছাড়া তার ক্ষতিপূরণ আবশ্যক হয় না। সুতরাং শরীক যদি সীমালঙ্ঘন, অযত্ন বা ব্যবহারে অবহেলা না করে, তাহলে সে শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ দেবে না- যদিও শারিকার পুঁজি নষ্ট হোক বা শেষ হোক না কেন। লাভ ও লোকসানের ক্ষেত্রে পূর্ণ বা আংশিক পুঁজি নষ্ট বা শেষ হওয়ার ক্ষেত্রে এবং পুঁজি অপর শরীককে দেয়ার ক্ষেত্রে তার দাবি কসমের সাথে সত্যায়ন করা হবে। ১০৮
শরীকের কর্তৃত্ব আমানতের কর্তৃত্ব হওয়া, লাভ লোকসান এবং অবশিষ্ট ও ব্যয়কৃত পুঁজির ক্ষেত্রে কসমসহ তার বক্তব্য গ্রহণ করার ফল হলো, সে অন্য আমানতদারের মতো, যেমন অসী ও ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক; তার বিশদ হিসাব পেশ করা আবশ্যক নয়। বরং এভাবে সংক্ষিপ্ত হিসাব দেওয়াই যথেষ্ট যে, শারিকার পুঁজি থেকে আমার কাছে অবশিষ্ট আছে এত দীনার বা আমি এই পরিমাণ ক্ষতির শিকার হয়েছি অথবা আমি এত পরিমাণ দীনার লাভ করেছি। যদি তার থেকে হিসাব গ্রহণ করা হয় তাহলে এতটুকু হিসাবই। অন্যথায় সে কসম খাবে, এর অতিরিক্ত কোনো কিছু করা যাবে না।
আল হিদায়ার ব্যাখ্যাকারগণ এভাবেই নিঃশর্তভাবে ফতোয়া দিয়েছেন। তবে ফকীহগণ বিচারের দিক বিবেচনায় একে শর্তযুক্ত করেছেন। তারা বলেন, উপরিউক্ত সংক্ষিপ্ত হিসাব পেশ করা যথেষ্ট, যদি বাস্তবে এই আমীন আমানতদারির বিচারে পরিচিত হয়ে থাকেন। তেমন পরিচিত না হলে বিচারক তার কাছে বিশদ হিসাব তলব করবেন এবং সে পেশ না করলে শাস্তির হুশিয়ারি দেবেন। তবে আমীন যদি সংক্ষিপ্ত হিসাব দানেই অনমনীয় থাকে তাহলে কসম ছাড়া তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। ১০৯ শাফেয়ীগণও একথাই বলেন। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য মতে, যদি শরীকের বিরুদ্ধে খেয়ানত করার দোষ দেওয়া হয় তাহলে খেয়ানত না করাই হলো এক্ষেত্রে মৌলিক অবস্থা। ১১০
সীমালঙ্ঘনের একটি হলো অপর শরীকের নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ। দুই শরীকের যত কর্তৃত্ব ব্যবহারের সুযোগ আছে এর মধ্যে এক শরীক যদি অপর শরীককে কোনো হস্তক্ষেপ/কারবার করতে নিষেধ করে, তাহলে অপর শরীক তা থেকে বিরত থাকবে। যদি নিষেধের বিরোধিতা করে তাহলে শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ দেবে। যেমন এক শরীক অপরকে বলল, ব্যবসার পুঁজি নিয়ে সমুদ্র ভ্রমণ করো না এরপর অপর শরীক ভ্রমণ করল। অথবা বলল, তুমি শুধু নগদ বিক্রি করবে, এরপর অপর শরীক বাকিতে বিক্রি করল। ১১১
এটিই হাম্বলীদের স্থিরীকৃত মত। তারা বলেন, যদি শরীকের জন্য বাকিতে বিক্রির অনুমতি না থাকে আর সে বাকিতে বিক্রি করে, তাহলে বিক্রি বাতিল হবে, যেহেতু বিক্রি হয়েছে অনুমোদনছাড়া। তবে যদি এ মূলনীতি অনুসরণ করি যে তৃতীয় পক্ষের বিক্রি স্থগিত, তাহলে এই বিক্রি স্থগিত থাকবে। যদিও এক্ষেত্রে হাম্বলী ফকীহ খিরকীর স্পষ্ট মত হলো বিক্রি বৈধ, তবে ক্ষতিপূরণ আবশ্যক। ক্ষতিপূরণ দ্বারা উদ্দেশ্য পণ্যের মূল্যের ক্ষতিপূরণ। আর বিক্রি বাতিল হওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দ্বারা উদ্দেশ্য পণ্যের বাজারমূল্যের ক্ষতিপূরণ। তবে ক্ষতিপূরণ দ্বারা সব অবস্থায় বাজারমূল্যের ক্ষতিপূরণ উদ্দিষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেহেতু বাজারমূল্য ছাড়া কোনো সম্পদ হাতছাড়া হয়নি। ১১২
সীমাতিক্রমের একটি হলো অপর শরীকের অংশ না জানা এবং এ অবস্থায় মারা যাওয়া। যদি সে শরীকের অংশের অবস্থা বিশদভাবে না জানিয়ে মারা যায় তাহলে তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ বহন করা হবে। তবে যদি কোনো ওয়ারিস জানে এবং তার জানার প্রমাণ পেশ করে এবং এমনভাবে শরীকের অংশের বিবরণ দেয় যা ক্ষতিপূরণ বহনকে রহিত করে তাহলে ভিন্ন কথা। মৃত শরীক অপর শরীকের অংশের বিশদ বিবরণ এভাবে দেবে যে, অপর শরীক কি তার কাছ থেকে নিজ অংশ বুঝে নিয়েছে, না তার অংশ সীমাতিরিক্ত ব্যবহার বা অন্য কোনো কারণে নষ্ট হয়েছে বা শেষ হয়েছে অথবা এর কোনোটা হয়নি? সে সম্পদ কি তার কাছে বা অন্য কারো কাছে নগদ আছে, না মানুষের কাছে ঋণ হিসেবে আছে? আল আশবাহ গ্রন্থে ইবনে নুজাইম রহ.-এর বক্তব্য থেকে এমনটা বুঝে আসে। তিনি বলেন, না জানিয়ে মারা যাওয়ার অর্থ হলো সে আমানতের অবস্থা বিশদভাবে বলেনি। আর তার জানা ছিল যে, তার ওয়ারিস অবস্থা জানে না। ১১৩
উল্লিখিত অজ্ঞাত রাখাকে শাফেয়ী ও হাম্বলীগণ অসীয়ত বর্জন করা শব্দে প্রকাশ করেছেন। তবে এক্ষেত্রে তাদের মত হানাফীদের চেয়ে কঠিন। তাদের মতে, এই শরীক তার ওয়ারিসকে তার কাছে থাকা অপর শরীকের অংশ সংক্রান্ত অসীয়ত করলেও জামানাত (ক্ষতিপূরণ) থেকে মাফ পাবে না। বরং বিচারকের কাছে অসীয়ত করা আবশ্যক। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে সাক্ষী রেখে কোনো আমীনের কাছে অসীয়ত করবে। ১১৪
মালেকীদের মত হানাফীদের মতের অনুরূপ। তবে তারা দশ বছর অতিক্রান্ত হলে ক্ষতিপূরণ রহিত হওয়ার মত দেন। তারা বলেন, এক্ষেত্রে ধরে নেয়া হবে সে সম্পদ ফেরত দিয়েছে, যদি সে সম্পদ কোনো দৃঢ় প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করে থাকে। ১১৫
টিকাঃ
১০৭. তাবযীমুল হাকাইক, খ. ৫, পৃ. ৬৪; আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬২; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৩; আশবাহ সুয়ূতী, পৃ. ২৮৩; কাওয়াঈদ, ইবনে রজব, পৃ. ৬৭; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫০৫; বুলগাতুস মালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৯-১৭০; দালীলুত তালিব, পৃ. ১৩৪; আল ফুরূ', খ. ২, পৃ. ৭২৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৬
১০৮. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৬ ও ৩৫৭; আল ইতহাফবি আশবাহি ইবনি নুজাইম, পৃ. ৩৩৮
১০৯. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৭, ৪৩৮; আল ইতহাফ বি আশবাহি ইবনি নুজাইম, পৃ. ৩৩৭
১১০. আল মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৪৫; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২৮০; আল মুগনী, আশ শরহুল কাবীর, খ. ৫, পৃ. ১২৯
১১১. ১১২. আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৫০-১৫১
১১৩. আল ইতহাফ বি আশবাহি ইবনি নুজাইম, পৃ. ৪১৫
১১৪. আল ফুরু', খ. ২, পৃ. ৭৮৭
১১৫. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ৩২৯; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ২০০
📄 ঘ. লাভের হকদার হওয়া
শ্রম বা জামানাত ছাড়া সম্পদ লাভের হকদার হওয়া যায় না। সম্পদ দিয়ে এর হকদার হওয়া যায়। কেননা সম্পদের বর্ধনই তো লাভ। তাই সম্পদের মালিকের তা প্রাপ্য। একারণেই পুঁজিদাতা মুদারাবায় লাভের হকদার। শ্রমদানের মাধ্যমে লাভের হকদার হবে যখন শ্রমদান হবে লাভের কারণ। যেমন ইজারার সাথে বিবেচনা করে মুদারাবার লাভে শ্রমিক মুযারিবের অংশ।
জামানতের মাধ্যমে লাভের হকদার হওয়া যায়। যেমন শারিকাতুল ওজুহ-এর ক্ষেত্রে। এর দলিল : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : الْخَرَاجُ بِالضَّمَانِ অর্থাৎ ১১৬ 'যে ব্যক্তি কোনো বস্তুর দায় নেবে বস্তুর লাভ তার হবে।' এজন্যই এক ব্যক্তি কোনো একটি কাজ, যেমন কাপড় সেলাইয়ের অর্ডার নিল আর নির্দিষ্ট ও জ্ঞাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তা আঞ্জাম দেয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো। এরপর এই পারিশ্রমিকের চেয়ে আরো কমে এই কাজ অন্য কারো দ্বারা করালো এবং উভয় পারিশ্রমিকের মধ্যবর্তী অর্থ সে হালাল ও পবিত্র হিসেবে ভক্ষণ করল; এমন কারবার জায়েয। কেননা সে কাজ না করলেও শুধু কাজের দায়গ্রহণ করেছে। অথচ হতে পারে তার কোনো মৌল পুঁজি ছিল না।
এই তিনটি কারণ, যেগুলো দ্বারা লাভের হকদার হওয়া যায়, এর একটিও যদি বর্তমান না থাকে, সেক্ষেত্রে লাভ প্রাপ্য হওয়ার অন্য কোনো পন্থা নেই। এজন্য কারো অপরকে এ কথা বলা ঠিক নয় যে, তুমি তোমার সম্পদে হস্তক্ষেপ করো এই শর্তে যে, লাভ আমার হবে অথবা আমাদের মাঝে বণ্টিত হবে। সকল ফকীহর মতে এটি অর্থহীন কথা ছাড়া কিছু হবে না। আর লাভ সম্পূর্ণ পুঁজি বিনিয়োগকারীর হবে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া। ১১৭
শারিকাতুল আমওয়াল-এর দুপ্রকার : মুফাওয়াযা ও আনান-এর ক্ষেত্রে সাধারণত পুঁজি ও শ্রমদান উভয়টি হয়ে থাকে। আমরা যেমনটা জেনেছি, শারিকাতুল মুফাওয়াযায় লাভ সর্বদা সমানহারে বণ্টিত হবে। আর শারিকাতুল আনান-এর লাভ বণ্টন হবে উভয়ের পুঁজি অনুসারে, যদি শ্রমদানের বিষয়টি উভয় শরীক অগ্রাহ্য করে। শ্রমদানের দরুন লাভের পরিমাণ নির্ধারিত করার অধিকার উভয় শরীকের আছে। যে লাভ এককভাবে হবে তার, যার জন্য চুক্তিতে শ্রমদানের শর্ত করা হবে, এটি হবে পুঁজিতে তার প্রদত্ত পরিমাণ অনুপাতে চুক্তির দাবি অনুযায়ী লাভের অংশের অতিরিক্ত। যেন এই লাভের পরিমাণ শ্রমদানকারী শরীক কোনো পুঁজি, শ্রম বা জামানাত ছাড়া গ্রহণের হকদার না হয়। এক্ষেত্রে অপর শরীকের শ্রমদানের শর্ত করুক বা না করুক, এই শরীক শর্ত অনুযায়ী শ্রমদান করুক বা না করুক, বিধান অভিন্ন। অভিন্নতার কারণ হলো শ্রমদানের শর্ত; শ্রমদান বর্তমান হওয়া নয়।
এ কারণেই শারিকাতুল আনান-এ উভয়ের পুঁজি সমান হওয়া আর লাভে কমবেশ হওয়া, অথবা পুঁজিতে কমবেশ করে লাভ সমানহারে বণ্টন হওয়া, উভয়টি আমাদের বর্ণিত পন্থা অনুযায়ী বৈধ; নিঃশর্তভাবে এবং যখন শ্রমদানের শর্ত করা হবে না তখন নয়। এর অন্যথা হলে শর্ত বাতিল হবে, আর উভয়ের পুঁজি হিসেবে লাভ বণ্টন হবে। লোকসান হলে সর্বাবস্থায় উভয়ের পুঁজি অনুপাতে হবে। কেননা লোকসান পুঁজির ব্যয়কৃত অংশ। সুতরাং তা পুঁজি অনুপাতে নির্ধারিত হবে।
হানাফী ফকীহ আন্নাহর-এর গ্রন্থকার বলেন : যদি উভয় শরীক নিজেদের শ্রমদানের শর্ত করে- যদি পুঁজি সমান হয় আর লাভে কমবেশ করা হয়, তাহলে আমাদের তিন ইমামের মতে জায়েয। যুফার রহ. ভিন্নমত পোষণ করেন। উভয়ের শর্ত অনুযায়ী লাভ উভয়ের মাঝে বণ্টিত হবে, যদিও এক শরীকই শ্রমদান করুক না কেন।
যদি এক শরীকের জন্য শ্রমদানের শর্ত করে আর উভয়ের পুঁজি অনুপাতে লাভের শর্ত করে তাহলে এটা জায়েয। যে শরীকের শ্রম নেই তার পুঁজি শ্রমদানকারী শরীকের নিকট পণ্য হিসেবে থাকবে। এর লাভ তার, ক্ষতিও তার। যদি শ্রমদানকারী শরীকের জন্য তার পুঁজির আনুপাতিক হার থেকে বেশি পরিমাণ লাভের শর্ত করে তাহলে এটা জায়েয। শ্রম ছাড়া শরীকের সম্পদ শ্রমদানকারীর কাছে মুদারাবার পুঁজি হিসেবে থাকবে। যদি এই শ্রম ছাড়া শরীকের জন্য আনুপাতিক হিসেবে তার পুঁজির বেশি পরিমাণ লাভের শর্ত করে, তাহলে এই শর্ত সহীহ নয়। তার পুঁজি শ্রমদানকারীর নিকট পণ্য হিসেবে থাকবে, প্রত্যেকে সর্বদা নিজ পুঁজির লভ্যাংশ পাবে। আর লোকসান উভয়ের মাঝে নিজ পুঁজি অনুপাতে ধর্তব্য হবে। ১১৮
মালেকী ও শাফেয়ীগণের মতে লভ্যাংশের মূলনীতি লোকসানের মতোই; উভয়ের পুঁজি অনুপাতে তা বণ্টিত হওয়া আবশ্যক। যদি চুক্তিতে এর বিপরীত শর্ত করা হয় তাহলে চুক্তিই বাতিল হবে। ১১৯
হাম্বলীদের মতে, লাভ উভয়ের পুঁজি অনুপাতে। তবে এর বিপরীত শর্ত করা হলে শর্ত অনুযায়ী লাভের বণ্টন হবে। ১২০ কতক মুতাআখখির (পরবর্তী) হাম্বলী ফকীহ হানাফীদের সাথে পুরোপুরি অভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের মতে লাভ বণ্টন হবে উভয়ের পুঁজি অনুপাতে। তবে শ্রমদানকারীর জন্য অতিরিক্ত লাভের শর্ত করা হলে সে শর্ত সহীহ। ১২১
মালেকীগণ পুঁজি অনুপাতে শ্রমদানের শর্ত যোগ করেন। এর অন্যথা হলে শারিকা বাতিল হবে। যেমন পুঁজিতে এক শরীকের অংশ হলো একশ, অপর শরীকের দুইশ, এরপর তারা সমান শ্রমদানের শর্তে চুক্তিবদ্ধ হলো। (পুঁজির তারতম্য হওয়ার পর সমান শ্রমদানের শর্ত করায় এই চুক্তি বাতিল হবে।) যদি এই যৌথচুক্তি তারা বাস্তবায়ন করে তাহলে এক-তৃতীয়াংশের শরীক অপর শরীকের কাছে তার এক ষষ্ঠাংশ শ্রমের সমপারিশ্রমিক উসুল করার হকদার হবে। তবে চুক্তি সহীহভাবে সম্পাদন হওয়ার পর স্বেচ্ছাসেবা হিসেবে কোনো শরীকের আংশিক বা পূর্ণ শ্রম দান বৈধ। ১২২
অন্যান্য মাযহাবের স্পষ্ট ভাষ্যমতে শারিকাতুল আনান-এ এক শরীকের পক্ষ থেকে শ্রমদান সহীহ। অর্থাৎ এক শরীক অপর শরীককে হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ করার অনুমতি দেবে। এর অন্যথা হবে না, তাই অনুমতিপ্রাপ্ত শরীক শারিকার পূর্ণ পুঁজিতে কার্য পরিচালনা করবে। অপর শরীক ইচ্ছা হলে শুধু নিজ পুঁজিতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে। এই শরীককে তার নিজ পুঁজিতে হস্তক্ষেপ না করার শর্ত করা বৈধ নয়। বরং এমন শর্ত চুক্তি বাতিলের কারণ হবে, যেহেতু এর মাধ্যমে মালিককে নিজ সম্পদে হস্তক্ষেপ করতে নিষেধ করা হয়।
তবে এই শরীক যদি অঙ্গীকার করে যে, সে শ্রমদান করবে না এবং নিজের জন্য তা শর্ত করে, তাহলে হাম্বলীদের মতে এভাবে শ্রমদান এক শরীকের জন্য সীমিত করা বৈধ। এরপর এই শরীকের জন্য শ্রমদানের বদলা হিসেবে যদি পুঁজিতে তার অংশ অনুপাতে প্রাপ্য লভ্যাংশের অতিরিক্ত লাভ দেওয়া হয় তাহলে এই কারবার শারিকাতুল আনান ও মুদারাবা-য় পরিণত হবে। আর যদি অতিরিক্ত লাভ ছাড়া পুঁজি অনুপাতে লাভ নির্ধারণ করা হয় তাহলে এটি শারিকা হবে না। বরং হবে ইবযা। আর যদি অতিরিক্ত লভ্যাংশ শ্রমদানকারী শরীক ছাড়া অন্য শরীকের জন্য নির্ধারণ করা হয় তাহলে বিশুদ্ধতম বর্ণনা অনুসারে নির্ধারণের শর্ত বাতিল হবে। আর এটিও ইবযা হবে যা তাদের বক্তব্যের দাবি। তবে ইবনে কুদামা রহ.-এর বক্তব্যে স্পষ্ট বিবৃত হয়েছে যে, শারিকাতুল আনান যৌথ শ্রমদানের দাবি করে। ১২৩
টিকাঃ
১১৬. الخراج بالضان হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ হযরত আয়েশা রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। খ. ৩, পৃ. ৭৮০; তাহকীক, ইযযত উবায়দ, ইবনেল কাত্তান হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, যেমন উল্লিখিত রয়েছে আত তালখীসুল হাবীব-এ, খ. ৩, পৃ. ২২; হাপা, শারিকাতুত তিবাআতিল ফান্নিয়্যাহ।
১১৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬২; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩১; হাওয়াশী তুহফাতি ইবনি আসিম, খ. ২, পৃ. ২১৪; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৬, পৃ. ৮; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫২; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ৭০; আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৫; আশ শারকাওয়ী, আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ১১২; আল বাজুরী আলা ইবনি কাসিম, খ. ১, পৃ. ৪০০; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৪০
১১৮. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬২; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫২
১১৯. বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ৭০; আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৫
১২০. আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৪০
১২১. জ্ঞাতব্য যে শারিকাতুল মুফাওয়াযা ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে এটি তাদের মত। রদ্দুর মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫২; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৯
১২২. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬১; আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৩
১২৩. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৩; আল ফুরু, খ. ২, পৃ. ৭২৫; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৯
📄 মুফাওযাযা ও আনান- উভয়ে প্রযোজ্য বিধান
প্রথম : শরীকদের প্রদত্ত পুঁজির গুণ ও শ্রেণী ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও এ দুটি কারবার বৈধ হওয়া, যখন কতক বিজ্ঞ ব্যক্তির নির্ধারণে উভয়ের সম্পদের সমতা হয়। এটিই উদ্দিষ্ট শর্তপূরণের জন্য যথেষ্ট। মুফাওয়াযা বা আনান কোনোটাতেই হানাফীগণ পুঁজির শ্রেণী ও গুণ এক হওয়ার শর্ত করেন না। উভয় শরীকের সম্পদ ভিন্ন শ্রেণীর হলেও এই দুটি কারবার সহীহ হবে। তারা সমান হিসেবে নির্ধারণ করুক বা তারতম্য হিসাব করে, আর এই তারতম্য যে পর্যায়ের-ই হোক না কেন, অথবা চুক্তির সময় তারা পরিমাপ না করুক, বিধান অভিন্ন। ১২৪ ভিন্ন শ্রেণীর পুঁজি দ্বারাও জায়েয হবে, যেমন এক শরীকের পক্ষ থেকে দীনার অপর শরীকের পক্ষ থেকে দিরহাম দেওয়া হলো। ভিন্ন গুণের মুদ্রা দ্বারাও হবে, যেমন সাদা ও কালো, যদিও এগুলোর বাজারমূল্যে তারতম্য হয়। ১২৫
মালেকীদের স্পষ্ট বক্তব্যমতে উভয়ের পুঁজি বিশেষত মুদ্রার ক্ষেত্রে এক জাতীয় হওয়া শর্ত, গুণ এক হওয়া নয়। এটি আশহাব ও সাহনূন রহ. ছাড়া অধিকাংশ মালেকী ফকীহর মত।
দ্বিতীয় : উভয়ের সম্পদ অমিশ্রণ হওয়া সত্ত্বেও উভয় চুক্তি বৈধ হওয়া; এটি হানাফী, মালেকী ও হাম্বলীগণের মত। শাফেয়ীদের মতপার্থক্য রয়েছে, যেমনটা ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে।
তৃতীয় : উভয়ের সম্পদ অর্পণ ছাড়াই শারিকাদ্বয় বৈধ হওয়া। শারিকাতুল মুফাওয়াযা বা শারিকাতুল আনান কোনোটি সহীহ হওয়ার জন্য এই শর্ত নেই যে, প্রত্যেক শরীক অপর শরীককে তার সম্পদের ব্যবহারে জটিলতামুক্ত সুযোগ করে দেবে। মুদারাবা এ থেকে ভিন্ন; মুদারাবার বৈধতা শ্রমিকের কাছে পুঁজি প্রদানের ওপর নির্ভর করে।
চতুর্থ : প্রত্যেক শরীকের নগদে ও বাকিতে বিক্রির অধিকার। প্রত্যেক শরীকের দরদাম করে, লাভ করে সমান মূল্য দিয়ে বা মূল্যের কম দিয়ে এবং যেভাবে ভালো মনে করে কেনাবেচার অধিকার রয়েছে। কেননা এটি ব্যবসায়ীদের স্বভাব। প্রত্যেক শরীকের বিক্রীত পণ্য কজা করা, মূল্য কজা করা, পণ্য ও মূল্য কজা করা, ঋণ নিয়ে বিবাদ করা, ঋণ আদায়ের দাবি করা, হাওয়ালা করা, হাওয়ালা গ্রহণ করা এবং যে পণ্যে সে অথবা তার সঙ্গী শরীক দায়িত্ববান তা দোষের কারণে ফেরত দেওয়ার অধিকার আছে। বাকিতে বিক্রির ক্ষেত্রে হানাফীদের মত হলো, প্রত্যেক শরীকের নগদ ও বাকিতে বেচাকেনা করার অধিকার আছে, যেহেতু এভাবে ও যেভাবে সম্ভব ব্যবসায়ীদের লেনদেনের ধারা বর্তমান। শারিকা চুক্তিতে এই ধারা ও স্বভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। এর কারণ, হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ করার যে অনুমতি এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত তা নিঃশর্ত, যেমন শর্ত সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে।
শারিকা চুক্তিতে যদি পরস্পর শর্তাবদ্ধ হয় যে, তারা শুধু নগদে বিক্রি করবে; বাকিতে নয়, অথবা বাকিতে বিক্রি করবে; নগদে নয় অথবা শারিকাতুল আনান-এর ক্ষেত্রে এই শর্তাবদ্ধ হয় যে, এক শরীক নগদে বিক্রি করবে আর অপরজন বাকিতে বিক্রি করবে। তাহলে উভয়ের কৃত শর্তে তারা বহাল থাকবে। বরং চুক্তি সম্পাদনের পর যদি তারা এই শর্তাদিতে আবদ্ধ হয় তাহলেও তার বাস্তবায়ন আবশ্যক। একইভাবে যদি এক শরীক অপর শরীককে শারিকাতুল আনান-এ নির্দিষ্ট কোনো পন্থায় বিক্রি করতে নিষেধ করে, যেমন তাকে বাকিতে বিক্রি করতে বা নগদে বিক্রি করতে নিষেধ করল, তাহলে এই শরীকের জন্য সে নিষিদ্ধ পন্থা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। এমনকি যদি সে এর বিরোধিতা করে তাহলে শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ তার ওপর বর্তাবে। এ কারণেই ইবনে নুজাইম ফতোয়া দিয়েছেন, যে শরীককে তার শরীক নিষেধ করার পর সে বাকিতে বিক্রি করে তার বিক্রি শুধু তার অংশে কার্যকর হবে; আর শরীকের অংশের বিক্রি তার অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে। এমনকি যদি সে তাকে না জানায় তাহলে বিক্রি বাতিল হবে। অর্থাৎ তখন অংশ হাতছাড়া হওয়ার ক্ষতিপূরণ আবশ্যক হবে। ১২৬
নগদ ও বাকিতে বিক্রি করা সংক্রান্ত যে বিধান আলোচনা করা হয়েছে, বাকি ও নগদে কেনার ক্ষেত্রে বিধান অনুরূপ। তারা এক্ষেত্রে মতবিরোধ করতে পারবে না, যদিও অন্যত্র তারা মতবিরোধ করতে পারে। তারা যখন মুফাওয়াযা করবে তখন খরিদ করা হবে শুধুই শারিকার জন্যে। উভয় শরীকের ব্যক্তিগত চাহিদা বাদে। শারিকাতুল আনান সর্বদা এমন নয়, এ সম্পর্কিত আলোচনা সামনে আসছে।
তবে ফাতাওয়া কাযীখানে বলা হয়েছে, যদি মুফাওয়াযার শরীক বাকিতে কোনো খাদ্যদ্রব্য কেনে তাহলে তার দায় উভয়ের কাঁধে আসবে। কিন্তু যদি এ কাজটি আনান-এর শরীক করে তবে তার মূল্য পরিশোধের দায় শুধু তার উপর বর্তাবে। যদি মুফাওয়াযার শরীক সালাম বিক্রিতে শস্য বিক্রি করে তবে তা তার অপর শরীকের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে। ১২৭
মালেকী ও হাম্বলীগণের মত হানাফীদের অনুরূপ, প্রত্যেক শরীকের বাকি ও নগদে কেনাবেচা করার অধিকার আছে। তবে তারা মুফাওয়াযা ও আনান-এর মাঝে বিধানগত পার্থক্য করেন না। ১২৮ শাফেয়ীগণ ও কতক হাম্বলী ফকীহর মতে বাকীতে বিক্রি জায়েয নেই। যেহেতু এতে ধোঁকা এবং শারিকার পুঁজি নষ্ট হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এই বিধান সকল শরীকের অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত প্রযোজ্য। ১২৯ শাফেয়ীদের মতে, যদি নিঃশর্তভাবে বাকীতে অথবা ব্যাপক শব্দ ব্যবহার করে অনুমতি দেওয়া হয়, যেমন তোমার যেভাবে ইচছা বিক্রি করো তবে এই অনুমতি প্রচলিত মেয়াদে ধর্তব্য হবে; অন্য মেয়াদে যেমন দশ বছর ইত্যাদির অর্থে নয়। ১৩০
পঞ্চম : হানাফী, মালেকী ও কতক হাম্বলী ফকীহর মতে কেনা, বেচা ও সকল হস্তক্ষেপে, যেমন তাদের কোনো ব্যবসার প্রয়োজনে মজদুর, কারিগর, নির্মাতা ও পশু চিকিৎসককে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিয়োগ করা এবং জন্তু বা ঠেলাগাড়ি ভাড়া নেওয়া এবং শারিকার সুবিধার খাতগুলোতে ব্যয় করা- এ সকল কারবার করার অধিকার প্রত্যেক শরীকের আছে। তবে এক শরীকের নিয়োগকৃত ওকীলকে অন্য শরীকের অপসারণ করা বৈধ, যখনই সে চায়, ওকীলের ওকীলের অবস্থার অনুরূপ। ১৩১
শাফেয়ীগণ ও অধিকাংশ হাম্বলী ফকীহর মতে এক শরীকের অনুমতি ছাড়া অন্য শরীকের ওকীল নিয়োগের অধিকার নেই। এর কারণ, অপর শরীক তার ক্ষমতা প্রয়োগকেই অনুমোদন করেছে। আর তাদের মূলনীতি হলো, যে (অন্যের) অনুমতি ছাড়া শ্রমদান করতে পারে না সে (তার) অনুমতি ছাড়া ওকীল নিয়োগ করতে পারে না। ১৩২
ষষ্ঠ : শারিকায় শ্রমদানের জন্য কাউকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অধিকার রয়েছে উভয় শরীকের। নিয়োগদান শারিকার সম্পদ সংস্কার করার জন্য হোক, যেমন শারিকার গবাদিপশুকে সুস্থ করা বা যন্ত্রগুলো তৈরি করা অথবা সম্পদ পাহারা ও সংরক্ষণের জন্য হোক বা সম্পদ দ্বারা ব্যবসা করার জন্য হোক অথবা অন্য যে কারণেই হোক না কেন। অপর শরীকের অনুমোদনে তা বাস্তবায়িত হবে। নিয়োগদানের অধিকার থাকার কারণ, ব্যবসায়ীদের স্বভাব হলো, যে সকল খাতের লাভ ব্যবসায়ে অর্জিত হবে সে খাতগুলোতে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মজদুর নিয়োগ করা। ১৩৩
সপ্তম : যে শরীক নিজে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শ্রমদান করে তার পারিশ্রমিক দেওয়া আবশ্যক হবে কার? তার পারিশ্রমিক শারিকার পক্ষ থেকে দেওয়া আবশ্যক। যদি সে নিজেকে খেদমতের উদ্দেশ্যে শ্রমদানে নিয়োগ না করে, শারিকাতুল আনানে খেদমততুল্য কোনো কাজে লিপ্ত না হয়, তাহলে পারিশ্রমিক এককভাবে তার জন্যই হবে।
আর শারিকাতুল মুফাওয়াযার ক্ষেত্রে, ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া থেকে স্পষ্টভাষ্যে তারা উদ্ধৃত করেছেন, যদি দুই শরীকের একজন কোনো বস্তু সংরক্ষণ, কাপড় সেলাই বা কোনো কাজের জন্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শ্রমদান করে, তাহলে পারিশ্রমিক উভয়ের মাঝে বণ্টন হবে। আর যদি নিজে সেবার জন্য শ্রমদান করে, তাহলে পারিশ্রমিক এককভাবে তার মালিকানাধীন হবে। ১৩৪ এটি বাদায়েউস সানায়ে থেকে গৃহীত মত। সেবাদানের বিষয়টি ভিন্ন হওয়ার কারণ কাসানী এভাবে বলেন, এক্ষেত্রে শরীক অন্য শরীক বাদে নিজের জন্য কাজ গ্রহণের অধিকার লাভ করে। অন্য ক্ষেত্রগুলো এর ব্যতিক্রম। যখন সে সেবাদানকে আবশ্যক করল এবং তা আঞ্জাম দিল, তখন সে নিজের জন্য একক আবশ্যকীয় দায় পূর্ণ করল। সুতরাং অনুরূপভাবে বিশেষভাবে তার জন্য পারিশ্রমিক সাব্যস্ত হবে। যদি সে সেবাদান ছাড়া অন্য কোনো কাজ গ্রহণ করে, তা নিজের জন্য আবশ্যক করে নেয়, তাহলে এই কাজগ্রহণ ও আবশ্যক করে নেওয়া উভয় শরীকের ওপর বর্তাবে। কেননা এ জাতীয় কাজ অংশীদারী গ্রহণ করে। আবশ্যকীয় কাজ যদি একজন এককভাবে আঞ্জাম দেয় তবুও উভয়ের পক্ষ থেকে শ্রমদান ধর্তব্য হবে। আর যে শ্রমদান করেছে সে হবে তার শরীকের অংশের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাদানকারী। তাই পারিশ্রমিক উভয়ের মাঝে বণ্টিত হবে। ১৩৫ অনুরূপ বিধান প্রতিটি কাজের যা তাদের একজন করবে সেটার পারিশ্রমিক উভয়ের মাঝে বণ্টিত হবে।
মুফাওয়াযা বা আনান কোনোটির শরীক তাদের ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো কাজের জন্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শ্রমদান করে এর পারিশ্রমিক এককভাবে ভোগ করার অধিকার নেই। তবে অন্য শরীক স্পষ্ট অনুমতি দিলে ভিন্ন কথা। এর কারণ, কোনো শরীক অপর শরীকের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া শারিকা চুক্তির কোনো দাবি পরিবর্তনের অধিকার রাখে না, যেমনটা ইবনুল হুমাম ও অন্যদের স্থিরীকৃত মত।
মালেকী ও হাম্বলীগণের স্থিরীকৃত মত হলো, শারিকা চুক্তির বাইরে সে তার শ্রমদানের পারিশ্রমিক এককভাবে গ্রহণ করবে, যদিও সে কাজটি শারিকার শ্রেণীভুক্ত কাজ হোক না কেন। যেমন সে শারিকার শ্রেণীভুক্ত তৈরি পোশাক একই ব্যবসার প্রকারে মুদারাবার জন্য পুঁজি নিল। মোদ্দাকথা হলো, যদি সে অন্য কাজের কারণে শারিকাভুক্ত কাজ সম্পর্কে অমনোযোগী হয় তাহলে অবশ্যই তার শরীকের অনুমতি লাগবে। যেন এই অনুমতির সে তার কাজের মাধ্যমে স্বেচ্ছাদান করতে পারে। অনুমতি না নিয়ে করলে এই শরীকের অধিকার রয়েছে, তার পক্ষ থেকে যে শ্রমদান সে করেছে তার পারিশ্রমিক সে তার কাছ থেকে উসুল করতে পারবে। ১৩৬
অষ্টম : হানাফী, মালেকী ও কতক হাম্বলী ফকীহর মতে তৃতীয় ব্যক্তিকে মুদারাবার পুঁজি হিসেবে শারিকার পুঁজি প্রদানের অধিকার রয়েছে প্রত্যেক শরীকের। কেননা মুদারাবা শারিকা থেকে লঘু, আর ভারী বিষয় লঘু বিষয়কে অনুগামী করে। মুদারাবা লঘু হওয়ার কারণ হচ্ছে, মুদারাবার লোকসান এককভাবে পুঁজিদাতার হয়। অথচ শারিকার ক্ষেত্রে তা উভয় শরীকের ওপর নিজ পুঁজির পরিমাণ অনুযায়ী বর্তায়। ফাসিদ মুদারাবায় মুদারিব শ্রমিক লভ্যাংশ পায় না। অথচ ফাসিদ শারিকায় উভয় শরীকের মাঝে তা নিজ পুঁজি অনুপাতে বণ্টিত হয়। তা ছাড়া শারিকার মৌলিক দাবি লাভ ও পুঁজিতে অংশীদার হওয়া আর মুদারাবার মৌল দাবি হলো লাভে যৌথভাবে অংশগ্রহণ; পুঁজিতে নয়। ১৩৭ তবে মালেকীগণ মুদারাবা জায়েয হওয়ার জন্য সম্পদ ব্যাপ্ত হওয়ার শর্ত করেন।
শাফেয়ীগণ ও হাম্বলীগণ, যারা এক শরীকের অনুমতি ছাড়া অপর শরীকের উকীল নিয়োগ করা, ব্যবসার জন্য মজদুর নিয়োগ করা বৈধ বলেন না তাদের মতে, তৃতীয় ব্যক্তিকে শারিকার পুঁজি মুদারাবার পুঁজি হিসেবে প্রদান জায়েয নয়।
নবম : হানাফীদের মতে, প্রত্যেক শরীকের শারিকার পুঁজি গচ্ছিত রাখার জন্য দেওয়ার অধিকার রয়েছে। কেননা তার জন্য এই পুঁজি একজন পাহারাদারের দায়িত্বে রাখা বৈধ, যাকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এটি সংরক্ষণের জন্য সে দিতে পারে। সুতরাং পারিশ্রমিক ছাড়া সংরক্ষণের জন্য দেওয়া তো জায়েয হওয়ার অধিক উপযুক্ত। তা ছাড়া গচ্ছিত রাখা ব্যবসার অন্যতম স্বার্থ, যেহেতু এর মাধ্যমে চুরি, রাস্তার ও অন্য বিষয়ের বিপদ থেকে সংরক্ষণ হয়। ১৩৮
হানাফীগণ ছাড়া অন্যদের মতে, নেহায়েত প্রয়োজন হওয়া ছাড়া শরীকের গচ্ছিত রাখা জায়েয নেই। যেহেতু গচ্ছিত রাখার মাধ্যমে কখনো কখনো সম্পদ নষ্ট হয়। সুতরাং যদি প্রয়োজন ছাড়া শরীক তা গচ্ছিত রাখে আর নষ্ট হয় তাহলে সে তার ক্ষতিপূরণ দেবে। ১৩৯
দশম : ইমাম আবু হানীফা, মুহাম্মদ ও হানাফী ফকীহদের মতে, রাস্তা আশঙ্কামুক্ত হলে প্রত্যেক শরীক অপর শরীকের অনুমতি ছাড়া শারিকার সম্পদ নিয়ে সফর করার অধিকার রাখে। কেননা শারিকাকে শর্তমুক্ত রাখা হয়েছে। তা কোনো জায়গার সাথে শর্তযুক্ত নয়। তাই প্রত্যেক শরীকের হস্তক্ষেপ নিঃশর্তভাবে প্রয়োগ হবে। যেহেতু দলিল ছাড়া শর্তমুক্ত বিষয়কে শর্তযুক্ত করা যায় না। এখানে দলিল অনুপস্থিত। এরপর সফর নিকটে হোক বা দূরে, সম্পদ হালকা হোক বা ভারী, বিধান একই। তবে দুটি অংশেই মতভেদ রয়েছে। ১৪০
শাফেয়ীগণ ও আবু ইউসুফ রহ.-এর মতে, স্পষ্ট অনুমতি, প্রচলনে পরিচিত অনুমতি বা তীব্র প্রয়োজন ছাড়া শরীকের জন্য শারিকার সম্পদ নিয়ে সফর করা বৈধ নয়।
'প্রচলনে পরিচিত অনুমতি'র একটি হলো, শারিকা চুক্তি জাহাজে সম্পাদিত হলো। এরপর গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত থাকল। তীব্র প্রয়োজনের একটি হলো, বড় বিপদ বা প্রবলপরাক্রম শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্য শহরবাসীকে শহর থেকে নির্বাসিত করা।
যদি শরীক বিরোধিতা করে অননুমোদনপ্রাপ্ত এলাকা সফর করে, সম্পদ ধ্বংস হলে তাকে সঙ্গী শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ অবশ্যই দিতে হবে; কিন্তু সে যদি কোনো কিছু বিক্রি করে তাহলে তার বিক্রি বহাল থাকবে। এ মাসআলার সাথে ক্ষতিপূরণ সাব্যস্ত হওয়ার কোনো বৈপরীত্য নেই। ১৪১ শারিকাতুল আনান-এর ক্ষেত্রে মালেকীদের মত অনুরূপ। শারিকাতুল মুফাওয়াযা-য় তাদের মত সুবিধা লক্ষ্য রাখার শর্তযুক্ত। ১৪২
একাদশ : হানাফীদের মতে শারিকার বিক্রি হয়ে যাওয়া সম্পদ ইকালা করার অধিকার রয়েছে প্রত্যেক শরীকের। পণ্যের বিক্রেতা সে হোক বা তার শরীক। কেননা ইকালা (পণ্য বিক্রির পর ফেরত নেয়া) প্রকারান্তরে ক্রয় করা। আর প্রত্যেক শরীক নিজে বা তার শরীক যা বিক্রি করেছে তা ইকালা করার অধিকার রাখে। ১৪৩ এটি মালেকীদেরও মাযহাবসম্মত মত এবং হাম্বলীদের নির্ভরযোগ্য মত। যদিও তাদের মতে ত্রুটির কারণে পণ্য ফেরত দেওয়ার ওপর ভিত্তি করে, দুই সম্ভাবনার এক সম্ভাবনামতে ইকালা হচ্ছে বিক্রি ভেঙ্গে দেওয়া। তবে তারা এটিকে সুবিধার সাথে শর্তযুক্ত করেছেন, যেমন মূল্য পরিশোধে ক্রেতার অপারগতা বা শারিকা চুক্তির স্পষ্ট লোকসান হওয়া ইত্যাদি হলে ইকালা করা যাবে। ১৪৪
দ্বাদশ : শারিকার সম্পদ নষ্ট করা বা স্বেচ্ছায় দান করা দুই শরীকের কারো জন্য বৈধ নয়, যেহেতু শারিকার উদ্দেশ্য হলো লাভ অর্জন করা। সুতরাং যতক্ষণ অন্য শরীকের স্পষ্ট অনুমতি থাকবে না, কম বা বেশি শারিকার সম্পদ হেবা করা বা ঋণ দেওয়ার অধিকার নেই কোনো শরীকের। ১৪৫ কেননা হেবা করা স্রেফ স্বেচ্ছাদান আর ঋণ দেওয়া প্রথম অবস্থায় স্বেচ্ছাদান, যেহেতু ঋণ হলো তাৎক্ষণিক নগদ বিনিময় ছাড়া সম্পদ হস্তান্তর। সুতরাং যদি কোনো শরীক তা (হেবা বা ঋণ দেওয়া) করে তাহলে স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া অপর শরীকের ওপর তা বর্তাবে না। এই কাজ শুধু তার অংশের ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হবে।
তবে পরবর্তী ফকীহগণ হেবা নিষিদ্ধ হওয়া থেকে কিছু বিষয়কে ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করেছেন। যেমন গোশত, রুটি ও ফলমূল ইত্যাদির ক্ষেত্রে তারা হেবার অনুমোদন দিয়েছেন। যেগুলো লোকেরা পরস্পর হাদিয়া দেয় এবং সেগুলোতে উদারতার আচরণ করে। আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাতে উদ্ধৃত হয়েছে, শরীকের অধিকার রয়েছে শারিকার সম্পদ দ্বারা হাদিয়া দেওয়ার ও দাওয়াতের আয়োজন করার। এক্ষেত্রে খরচের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। বিশুদ্ধ মত হলো, এর পরিমাণ প্রচলনের ওপর নির্ভরশীল। আর প্রচলন হলো যে পরিমাণ খরচ ব্যবসায়ীরা অন্যায় গণ্য করে না। ১৪৬
অনুরূপভাবে আবু ইউসুফ রহ.-এর মত, যে শরীক বিক্রির দায়িত্ব পালন করে সে পণ্যের মূল্য হেবা করা অথবা ক্রেতাকে মূল্য থেকে অব্যাহতি দান করা আর অন্য শরীকের মূল্য হেবা করা বা মূল্য থেকে দায়মুক্ত করার বিধান এক; প্রত্যেকের কাজ দু'জনের মধ্যেই সীমিত থাকবে। এই মতকে হানাফী ফকীহগণ নির্ভরযোগ্য মত হিসাবে গ্রহণ করেননি। আবু ইউসুফ রহ.-এর বিপরীতে তাঁদের মত হলো, যে শরীক বিক্রির দায়িত্ব আঞ্জাম দেয় সে যদি ক্রেতাকে পণ্যের মূল্য হেবা করে বা মূল্য থেকে দায়মুক্ত করে, তাহলে অপর শরীকের ওপর তা বর্তাবে না। অন্য শরীক তার কাছে নিজ অংশের যেটুকু ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সেটুকু উসুল করবে। যেমন বিক্রির জন্য নিয়োগকৃত ওকীলের অবস্থা। যদি ওকীল এমন (হেবা বা দায়মুক্তি) করে তাহলে তা বাস্তবায়িত হয়। আর তার নিয়োগদানকারী তার কাছ থেকে তার মূল্য উসুল করে। ১৪৭
মালেকীদের মতেও বিধান অনুরূপ। তবে তারা অনুমোদিত মূল্যের দায়মুক্ত করাকে আংশিক মূলহ্রাসের সাথে সীমাবদ্ধ করেন। এছাড়া অন্য বিষয়ে তারা নিঃশর্ত মত দেন। সুতরাং চুক্তি সম্পাদনকারীর পক্ষ থেকে মূল্যহ্রাস হওয়ার অথবা অন্য শরীকের পক্ষ থেকে মূল্যহ্রাস সমান। অনুরূপভাবে তারা ব্যাপকভাবে শরীকের জন্য অনুমোদিত স্বেচ্ছাদানকে সীমিত করেন ঐ খরচে যা প্রচলন অনুমোদন করে এবং যা শারিকার মূল সম্পদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। এটি একটি ব্যাপক মৌলনীতি, যা শারিকার সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে আগ্রহদানের জন্য হাদিয়া উপঢৌকন, দাওয়াত নিমন্ত্রণ ও ঋণ দেয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। হাম্বলীদের অনুরূপ মত রয়েছে, তবে এ ক্ষেত্রে তারা কম ছাড় দেন এবং শারিকার উপকারের বিষয়টি অধিক লক্ষ্য রাখেন। ১৪৮
ত্রয়োদশ : শরীকের অনুমতি ছাড়া অন্য শরীক যাকাত আদায় করতে পারবে না। এর কারণ, তাদের যৌথচুক্তি হয়েছে ব্যবসা-সংক্রান্ত। আর যাকাত ব্যবসা চুক্তির অন্তর্ভুক্ত বিষয় নয়। উপরন্ত মালিকের অনুমতি ছাড়া যাকাত প্রদান যথাযথভাবে আদায় হবে না। যেহেতু যাকাত সহীহভাবে প্রদানের জন্য নিয়ত শর্ত। ফলে অন্য শরীকের যাকাত প্রদান স্বেচ্ছাদানের সাথে যুক্ত হবে। আর এই শরীক অন্যের সম্পদ দিয়ে স্বেচ্ছাদানের অধিকার রাখে না। তবে অন্য শরীক অনুমতি দিলে তার অনুমতির কারণে যাকাত প্রদান সহীহ হবে। ১৪৯
চতুর্দশ : এক শরীক অপর শরীকের অনুমতি ছাড়া শারিকার সম্পদ নিজের একক সম্পদের সাথে একত্র করা জায়েয নেই। এর কারণ, একত্র করা একাধিক হক স্বাধীন হস্তক্ষেপে বিভিন্ন বাধা আবশ্যক করে। সুতরাং (এভাবে) এক শরীকের ওপর অন্য শরীককে কর্তৃত্ববান হতে দেওয়া যাবে না, যেন তার কর্তৃত্ব সম্পদের মালিকের অনুমোদনকৃত সীমা অতিক্রম না করে। হানাফী ও হাম্বলীগণ স্পষ্ট ভাষায় এটি উল্লেখ করেছেন। ১৫০
জ্ঞাতব্য : শরীকের পক্ষ থেকে ব্যাপক অনুমতি : যেমন এক শরীক অপর শরীককে বলল, তোমার যেভাবে ভালো মনে হয় নিয়ন্ত্রণ করো। তার এ কথা বলার দরুন ব্যবসায়ে সংঘটিত সকল কারবারের ক্ষেত্রে, যেমন বন্ধক রাখা, বন্ধক গ্রহণ করা, সফর করা, একক সম্পদের সাথে একত্র করা এবং তৃতীয় ব্যক্তির সাথে যৌথচুক্তি করা ইত্যাদিতে স্বতন্ত্র অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন থাকবে না। কারো মতে উল্লিখিত কাজগুলো অনুমতি ছাড়া অবৈধ হয়, তার মতে এক্ষেত্রে সাধারণ অনুমতিই যথেষ্ট।
কিন্তু এই ব্যাপক অনুমতি হেবা করা, ঋণ দেওয়া ইত্যাদি কারবার যেগুলো সম্পদকে নষ্ট করা বা বিনিময়ছাড়া মালিক বানানোর শ্রেণীভুক্ত সেগুলো করার অনুমোদনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। জাতীয় কারবারগুলো যৌথভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য স্পষ্ট অনুমোদন আবশ্যক। হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলীগণ এ মত স্পষ্টভাবে বলেছেন। ১৫১
টিকাঃ
১২৪. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬১; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৬
১২৫. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫১, ৩৫২
১২৬. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৪-৩৫৫ ও ৩৫৭; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৮-৭১; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৯; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৮; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৬; আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ৩২৩
১২৭. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৪-৩৫৫ ও ৩৫৭; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৮-৭১; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৯; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৮; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৬; আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ৩২৩
১২৮. হাওয়াশী তুহফাতি ইবনি আসিম, খ. ২, পৃ. ২০৯; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৯; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৫০
১২৯. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৪-২১৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৮-৯
১৩০. টীকাসহ, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৯
১৩১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৯; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৬; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৫; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৯, ১৩২; আল ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪১৭; আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৯
১৩২. আল মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৫৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২২৬; আল ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪১৭
১৩৩. বাদায়েউস সানায়ে, র. ৬, পৃ. ৬০, ৭০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৪
১৩৪. আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩১০
১৩৫. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭৫
১৩৬. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬০; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৯; হাওয়াশী তুহফাতি ইবনি আসিম, খ. ২, পৃ. ২১৪; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩৩
১৩৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৯; আল ঈনায়া, আল হিদায়া, ফাতহুল কাদীরসহ, খ. ৫, পৃ. ২৫; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৮; আল ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪১৪
১৩৮. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৮-৬৯; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৫; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৫
১৩৯. বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৮; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩২
১৪০. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭১; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৪
১৪১. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৫
১৪২. আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৪
১৪৩. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭১
১৪৪. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৯; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৩
১৪৫. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৬
১৪৬. আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩১২
১৪৭. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৭; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৫-৩৫৬
১৪৮. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৯, ২৬০; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৮-১৬৯; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৯৫
১৪৯. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৬২
১৫০. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৯; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৬, ৫০৮
১৫১. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৬; নিহায়াতুর মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১০; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৮; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩২