📄 শারিকাতুল আমাল-এর সাথে বিশিষ্ট শর্তাবলি
প্রথম শর্ত : এই শারিকার ক্ষেত্র হচ্ছে কাজ। কেননা কাজ সম্পাদন শারিকাতুল আমালের মূল পুঁজি। কোনো শরীকের পক্ষ থেকে যদি কাজ সম্পাদন না হয় তাহলে শারিকা সহীহ হবে না। তবে এই কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে উভয় শরীকের কাজ গ্রহণে চুক্তিবদ্ধ হওয়া যথেষ্ট। যদিও উভয়ের জন্য কাজ গ্রহণের অধিকার সাব্যস্ত করা হয়, অথবা একজনের জন্য কার্য বিচারে আর অপরের জন্য তাত্ত্বিক বিচারে অর্থাৎ যৌথচুক্তির চাহিদা অনুযায়ী প্রত্যেকের অধিকার থাকবে উভয়ের সম্মতিপূর্ণ কাজ গ্রহণ করা। যেহেতু যৌথচুক্তির দাবি হিসেবে প্রত্যেক শরীক কাজ গ্রহণের ক্ষেত্রে অপরের ওকীল, যদিও গ্রহণকৃত কাজ সে সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম না দেয়। কিন্তু কোনো কারণে সে যদি তার শরীকের জন্য কাজ গ্রহণের অধিকার ছেড়ে দেয়- কখনো কখনো শারিকা চুক্তি ও উভয় শরীকের বিচারে তা যৌক্তিকও হয়ে থাকে-সে যদি অধিকার ছেড়ে দেওয়ার পর কাজ গ্রহণের ক্ষেত্রে তার অধিকার পুনরায় প্রয়োগ করতে চায়, তাহলে তাকে বাধা দেওয়ার অধিকার অপর শরীকের নেই।
যৌথচুক্তি সম্পাদনের পর এক শরীক যদি কাজ গ্রহণ করে এবং এককভাবে কাজ আঞ্জাম দেয়, যেমন কাপড় সেলাইয়ের কাজ গ্রহণ করল। তারপর সে কাপড় কাটল ও সেলাই করল, তাহলে পারিশ্রমিক তার ও অন্য শরীকের মাঝে অর্ধেকহারে ভাগ হবে- যদি শারিকাতুল মুফাওয়াযা হয়ে থাকে; অথবা উভয়ের সম্মতিপূর্ণ আনুপাতিক হারে বণ্টিত হবে- যদি শারিকাতুল আনান হয়ে থাকে। এর কারণ, কাজ গ্রহণ উভয়ের পক্ষ থেকে হয়েছে, যেহেতু অর্ধেক কাজগ্রহণ হয়েছে অপর শরীকের পক্ষ থেকে ওকালাতের ভিত্তিতে। আর কাজটি গ্রহণ করার পর তা উভয়ের দায়ে যুক্ত হয়েছে। সুতরাং সম্পূর্ণ কাজ এক শরীকের সম্পাদন করা তার পক্ষ থেকে অপর শরীকের কাজ সম্পাদনে সহযোগিতা ও স্বেচ্ছাসেবা হিসেবে ধর্তব্য হবে। যেহেতু দায় আবশ্যক হয় লাভের ভিত্তিতে। ২১
কোনো শরীকের শ্রমমুক্ত ফাসিদ শারিকার নমুনা হলো, কাপড় ধোওয়ার যৌথচুক্তি ৯৩। এ চুক্তিতে উভয় শরীক একমত হয় যে, একজন ওয়াশিং মেশিন পেশ করবে আর অপরজন কাজগ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার পুরো কাজ করবে। পরে লাভ বণ্টন ছাড়া প্রথমজনের কোনো কাজ নেই। এই শারিকা ফাসেদ হওয়ার কারণে কার্য সম্পাদনকারী পাবে পারিশ্রমিক। কেননা তার কাজ দ্বারা সে এই পারিশ্রমিকের হকদার হয়েছে। আর ওয়াশিং মেশিন সরবরাহকারীকে সে মেশিনের ভাড়া হিসাব করে টাকা দেবে।
হানাফীদের মতে উল্লিখিত শারিকা ফাসিদ। তবে হাম্বলীদের মতে কাপড় ধোওয়া ও অন্যান্য পেশার যৌথচুক্তি বৈধ এই শর্তে যে, উভয় শরীক কাজ করবে একজনের যন্ত্র দিয়ে অন্যজনের জায়গায়। আর পারিশ্রমিক তাদের মাঝে বণ্টিত হবে। কেননা পারিশ্রমিক কাজের পরিবর্ত; মেশিন ও জায়গার পরিবর্ত নয়। মোটকথা, এক শরীক যন্ত্রের অর্ধেক দিয়ে স্বেচ্ছাসেবা ও সহযোগিতা করেছে আর অপর শরীক অর্ধেক জায়গা দিয়ে সহযোগিতা করেছে। তবে হ্যাঁ, যদি শারিকা ফাসিদ হয়ে যায় তাহলে মেশিন, জায়গা ইত্যাদি শরীকদের দেওয়া বস্তু ও তাদের কাজের অনুপাতে অর্জিত পারিশ্রমিক বণ্টন করা হবে। এটিই হাম্বলীদের স্পষ্টভাষ্যের মত। ১৪
শারিকাতুল আমাল হলে, শরীক লাভে অংশীদার হবে, যদিও সে কাজ না করে। এটি হাম্বলীদের স্থিরীকৃত মৌলিক বিষয়। যদিও তাদের কতক ফকীহ, যেমন ইবনে কুদামা এ মত প্রকাশ করেন যে, ওজর ছাড়া যে কাজ ছেড়ে দেবে সে শরীককে লাভের অংশ থেকে বঞ্চিত করা হবে, যেহেতু সে নিজের ওপর শর্তকৃত বিষয় আদায়ে ত্রুটি করেছে।
উল্লিখিত অবস্থায় শারিকা বাতিল হওয়ার বিষয় স্পষ্টভাবে না বললেও মালেকীদের স্থিরীকৃত মত হচ্ছে, এক শরীকের দীর্ঘ অসুস্থতা বা অনুপস্থিতির পর শারিকাতুল আমালে অপর শরীক যে কাজ করবে সে কাজের দায়, সম্পাদন ও কাজের পারিশ্রমিক তার সাথে নির্দিষ্ট হবে। তবে যদি দ্বিতীয় শরীক প্রথম শরীকের সুস্থ অবস্থায় উপস্থিতির সময় অথবা সামান্য সময়ের অসুস্থতা বা অনুপস্থিতির পর কাজ গ্রহণ করে তাহলে ভিন্ন বিধান হবে। ৯৫
মালেকীগণ যন্ত্রকে কাজের সম্পূরক গণ্য করেন। সুতরাং অবশ্যই যন্ত্র হবে কাজে শরীকের অংশের সমান। যেমন কাজে কোনো শরীকের উদাহরণত তিন ভাগের এক ভাগ বা অর্ধেক অংশ থাকলে তার জন্য দুই তৃতীয়াংশ যন্ত্র প্রদানের শর্ত করা যাবে না, চুক্তিতে এই অতিরিক্ত অংশ বিবেচনা করা যথার্থ হবে না। অতিরিক্ত অংশের শর্তের প্রেক্ষিতে কাজ ও লাভের ক্ষেত্রে তারতম্য হওয়ার দরুন তা শারিকা বাতিলের কারণ হবে, পার্থক্যের বিবেচনা পরিপূর্ণভাবে গুরুত্ব প্রদান করা হবে। যদিও চুক্তির পর স্বেচ্ছাদানের সীমা অনির্ধারিত। সুতরাং এক শরীক চুক্তিতে সম্পূর্ণ যন্ত্র বিনামূল্যে প্রদান করলে কেমন হবে?
যদিও সাহনূন ও তার অনুসারী মালেকী ফকীহগণ এক শরীকের যন্ত্রপ্রদান যথেষ্ট মনে করেন না। বরং তাদের মতে, উভয় পক্ষের বস্তুর মালিকানা বা উপকার গ্রহণের মালিকানা অথবা একপক্ষের বস্তুমালিকানা আর অপর পক্ষের উপকার গ্রহণের মালিকানা হিসেবে যন্ত্র উভয় শরীকের যৌথ মালিকানাধীন হওয়া শর্ত। একপক্ষের বস্তুমালিকানা আর অপরপক্ষের উপকার গ্রহণের মালিকানার উদাহরণ হলো, যন্ত্রটি এক শরীকের মালিকানাধীন। সে অপর শরীকের কাছে কাজে তার অংশ পরিমাণ যন্ত্র ভাড়া দিল। অথবা উভয় শরীকের নিজমালিকানার যন্ত্র আছে। তবে তারা চুক্তিতে উদ্দিষ্ট আনুপাতিক অংশহারে নিজ যন্ত্রের অংশ অপরের যন্ত্রের অংশের বিনিময়ে ভাড়া নিল। বরং ইবনুল কাসিম যন্ত্রের জামানাতের ক্ষেত্রে উভয় শরীক সমান হওয়া আবশ্যক মনে করেন। সুতরাং যন্ত্র একজনের বস্তুমালিকানাধীন আর অপরের উপকার গ্রহণের মালিকানাধীন এমন হওয়া বৈধ নয়।
কোনো শরীকের জন্য নির্দিষ্টভাবে শ্রমদানের শর্ত করা হলে তাতে শারিকা ফাসেদ হওয়ার বিষয়ে অধিকাংশ হাম্বলী ফকীহ অভিন্ন মত পোষণ করেন। তবে ইবনে কুদামা শারিকা সহীহ হওয়ার মত গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সে শ্রমদানের জন্য অপরকে নিজ জন্তু দেয় আর উপার্জন উভয়ের মাঝে বণ্টন হয়। এ মাসআলায় ইমাম আহমদ ও আওযাঈ রহ.-এর স্পষ্ট বক্তব্যে এটি কিয়াসসম্মত মত। ইবনে তাইমিয়া এ মত পোষণ করেন।
সব শরীকের জন্য শ্রমদানের শর্ত করা হোক বা কতক শরীকের জন্য, সর্বাবস্থায় শারিকা বাতিল হওয়া শাফেয়ীদের মত। কেননা এগুলো পৃথক পৃথক সম্পদ। সুতরাং সহীহ শারিকার আওতায় এগুলো একত্র হতে পারে না। সুতরাং এক্ষেত্রে ফাসেদ শারিকার বিধানাবলি প্রযোজ্য হবে। ৯৬
দ্বিতীয় শর্ত : যৌথ কাজটি এমন হওয়া চাই ইজারা চুক্তিতে যার দাবি করা যায়। যেমন কাপড় বোনা, কাপড় বানানো, কাপড় সেলাই করা, অলংকার তৈরি করা, কামারের কাজ ও ছুতাবের কাজ এবং লেখা বা অংক বা চিকিৎসাশাস্ত্র বা ইঞ্জিনিয়ারিং বা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া। অনুরূপভাবে পরবর্তী যুগের ফকীহদের ফতোয়া অনুযায়ী সূক্ষ্ম যুক্তির আলোকে কুরআন, ফিকহ, হাদীস ইত্যাদি সকল শরয়ী ইলমের শিক্ষাদান। যদিও শেষোক্তগুলোর ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, অন্যান্য দীনী কাজের মতো এগুলোতে ইজারা বৈধ না হওয়া।
যে কাজ ইজারাচুক্তির মাধ্যমে দাবি করা যায় না, সে কাজের ক্ষেত্রে শারিকাতুল আমাল সহীহ হবে না। শরীয়তনিষিদ্ধ সকল কাজ এর আওতাভুক্ত। যেমন মৃত ব্যক্তির শোকে কাঁদার জন্য লোক ভাড়া করা, উলঙ্গ নৃত্য এবং মাখরাজ সহীভাবে উচ্চারণে বিঘ্নতা ঘটায় এমন সুরে কুরআনের তেলাওয়াত। অনুরূপ সকল দীনী কাজ এর আওতাভুক্ত। তবে পরবর্তী ফকীহগণ তীব্র প্রয়োজনের কারণে যেগুলো ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করেছেন সেগুলোর বিধান ভিন্ন।
যেন শরয়ী ইলমগুলো লুপ্ত না হয় আর দীনী নিদর্শানাবলি পরিত্যক্ত না হয়। যেমন আযান দেওয়া, ইমামতি করা ও কুরআনের শিক্ষাদান। ৯৭ সুতরাং ওয়াজকারীদের চুক্তি বৈধ নয়, যারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওয়াজ করবে এবং আখেরাত স্মরণ করাবে। অনুরূপ সাক্ষীদের যৌথচুক্তি বৈধ নয়। যেহেতু মিথ্যা সাক্ষ্য হলে তা শরীয়তে নিষিদ্ধ আর সত্য হলে তা দীনী কাজ বা ফরজ পর্যায়ের। সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে সাক্ষ্যগ্রহণ ও সাক্ষ্যপ্রদান এক, যেমনটা যথাস্থানে বিস্তারিত বিবৃত হয়েছে। ৯৮
টিকাঃ
২১. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৮; আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩২৯
৯৩. বর্তমানে এটি المنجلة নামে পরিচিত। মিসবাহ অভিধানে আছে : قصرت الثوب قصراً بيضته 'কাপড় সাদা করা। القصارة অর্থ শিল্প। এর ইসমে ফায়েল হচ্ছে: قصار
১৪. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৮; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৪; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৫০
৯৫. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩৩; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৬১; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১১৫
৯৬. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬৮, ২৭০-২৭১; বুলগাতুল সালিক, খ. ২, পৃ. ১৭২; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৫০; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৭
৯৭. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২২৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৬
৯৮. মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৩৬৯; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৮-৩৫৯
📄 শারিকাতুল ওজূহ-এর সাথে নির্দিষ্ট শর্ত
হানাফী এবং হাম্বলী ফকীহ কাজী ও ইবনে আকিলের মতে, দুই শরীকের মাঝে লাভ পণ্যের মূল্যে উভয়ের দায় অনুপাতে বণ্টিত হওয়া শর্ত। উভয়ে একত্রে বা প্রত্যেকে আলাদাভাবে যা কিনবে, তাদের অংশ অনুপাতে তার মূল্যে তাদের দায় নির্ধারিত হবে। আর অংশের পরিমাণ শারিকা চুক্তিতে উভয়ের সম্মত শর্তগুলোর অনুগামী হবে।
জায়েয ও শরীয়তসম্মত হলো শারিকাতুল ওজুহ-এ উভয়ে চুক্তিবদ্ধ হবে এই মর্মে যে, তারা উভয়ে বা একজনে যা কিনবে তা তাদের মাঝে অর্ধেক হিসেবে দায়বদ্ধ থাকবে। অথবা তাদের জ্ঞাত কমবেশ পরিমাণ হিসেবে, সে পরিমাণ যাই হোক না কেন, দায়বদ্ধ থাকবে। যেমন, এক শরীকের এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ, অথবা এর চেয়ে কম বা বেশি আর অপরের দুই তৃতীয়াংশ বা তিন চতুর্থাংশ পরিমাণ। যেহেতু জানা আছে, হানাফীদের মতে শারিকাতুল মুফাওয়াযায় লাভে সমতা আবশ্যক, সুতরাং এক্ষেত্রে পণ্যের অংশ ও মূল্যের ক্ষেত্রে সমতাও আবশ্যক।
জামানাতের অংশের চেয়ে কম বা বেশি পরিমাণে লাভ কোনো শরীকের জন্য শর্ত করা হলে এই শর্ত বাতিল। এই শর্তের কোনো ক্রিয়া নেই। লাভ উভয়ের জামানাত অনুপাতে বণ্টিত হবে। কেননা জামানাত ছাড়া এই শারিকায় লাভের দাবি করার কোনো কারণ নেই। তাই লাভ জামানাত অনুপাতেই হবে। এর কারণ, লাভের অধিকারী হওয়া যায় সম্পদ, শ্রমদান বা জামানাত দ্বারাই। যেমন বিধানাবলির আলোচনায় আলোচিত হবে। এখানে কোনো পুঁজি বা শ্রম যেহেতু নেই, তাই জামানাতের কারণে লাভের হকদার হওয়া নির্ধারিত। সুতরাং কেবল জামানাত অনুপাতে লাভ বণ্টিত হবে, জামানাতের আওতাভুক্ত নয় এমন বস্তুর লাভ আবশ্যক হবে না।
হাম্বলীদের মাযহাবে শারিকাতুল ওজুহ-এর ক্ষেত্রে উভয় শরীকের ঐকমত্য অনুযায়ী লাভ বণ্টিত হবে। কেননা এই শারিকায় উভয় শরীক ব্যবসা করে। আর ব্যবসা এমন কাজ, যার মান ও পরিমাণ বিচারে তারতম্য হয়। যেমন ব্যবসা সম্পাদনকারীদের জানাশোনা/অভিজ্ঞতা ও উদ্যমতার বিচারে ভিন্নতা হয়। সুতরাং ন্যায়সঙ্গত মত হলো, উভয় শরীককে স্বাধীনতা দেওয়া, যেন তারা সকল অবস্থাকে সে অনুপাতে নির্ধারণ করতে পারে। এমনকি যদি তা লাভে তারতম্যও দাবি করে তাহলে উভয় শরীকের মত অনুসারে একে অপরকে এ বিষয় শর্তযুক্ত করতে কোনো বাধা নেই। এর উদাহরণ, এই ব্যক্তি অন্য একাধিক শারিকাতুল আনান বা মুদারাবায় যুক্ত হতে পারে। এ দুটিতে প্রাপ্য ব্যক্তিদের মাঝে নির্দিষ্ট পরিমাণ অনুপাতে-সমান সমান বা তারতম্য করে এই তারতম্য যেমনই হোক না কেন-লাভ বণ্টন করাই যথেষ্ট। ৯৯
টিকাঃ
৯৯. আল ফুরূ', খ. ২, পৃ. ৭৩১; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৩-১২৪
📄 শারিকার বিধান এবং এর প্রতিক্রিয়া
أَحْكَامُ الشَّرِكَةِ وَالْآثَارُ الْمُتَرَتِّبَةُ عَلَيْهَا : শরীকাহ বিষয়ক বিধি-বিধান
📄 প্রথম : সাধারণ বিধানাবলি
ক. পুঁজি ও লাভে অংশীদার হওয়া
যৌথচুক্তির বিধান হলো চুক্তিকৃত বিষয় এবং তা থেকে অর্জিত বিষয় দুই চুক্তিকারীর মাঝে যৌথ হওয়া। ১০০
খ. চুক্তি আবশ্যক না হওয়া (عَدَمُ لُزُومِ الْعَقْدِ)
মালেকীগণ ছাড়া এটি অন্যদের সম্মিলিত মত। প্রত্যেক শরীকের এককভাবে শারিকা বাতিল করার অধিকার আছে। অপর শরীক খুশি হোক বা অসন্তুষ্ট, উপস্থিত হোক বা অনুপস্থিত, পুঁজি মুদ্রা হোক বা পণ্য- সর্বাবস্থায় বিধান অভিন্ন।
তবে চুক্তি বাতিল হওয়া হানাফীদের মতে বাস্তবায়িত হবে অপর শরীক বাতিল হওয়ার বিষয়টি জানার পর থেকে। কারণ, যৌথচুক্তির দাবি হিসেবে তাকে হস্তক্ষেপের অধিকার থেকে অপসারণ করা হচ্ছে। আর এটি ইচ্ছাকৃতভাবে শরীকের অপসারণ করা, যা বাতিলকারী শরীক নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী অগ্রবর্তী করেছে। তাই তাকে অন্যের ক্ষতি করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
শাফেয়ী ও হাম্বলীগণের মতে চুক্তি বাতিল হওয়ার জন্যে বিষয়টি শরীকের জানা শর্ত নয়; যেমন ওকীলকে অপসারণের ক্ষেত্রে শর্ত না। ১০১ তবে হানাফীদের মধ্যে তাহাবী ও যায়লায়ী, মালেকীদের ইবনে রুশদ ও তার নাতী এবং কতক হাম্বলী ফকীহর মতে, ১০২ চুক্তি বাতিল হওয়ার জন্য নগদ অর্থ হিসেবে পুঁজি বর্তমান থাকা শর্ত; পণ্যরূপে নয়। এর অন্যথা হলে শারিকা বহাল থাকবে এবং চুক্তি বাতিল করা নাকচ হবে। তবে কতক হাম্বলী ফকীহর মতে চুক্তি রহিত করা বাতিল হবে না। বরং তাদের মতে পুঁজি নগদ অর্থ হওয়ার ওপর চুক্তির বাতিল হওয়া নির্ভর করে। সুতরাং পুঁজি নগদ অর্থ হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক শরীকের পুঁজিতে হস্তক্ষেপের অধিকার আছে। তবে তাতে তাদের অন্য কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই। যেমন বন্ধক রাখা, হাওয়ালা করা অথবা পুঁজি যে নগদ অর্থ ও মুদ্রা হবে তা ছাড়া অন্য মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করা। ১০৩
চুক্তি বাতিল করার শ্রেণীভুক্ত হচ্ছে, এক শরীক অপর শরীককে বলল : আমি এই শারিকায় তোমার সাথে কাজ করব না। উপরিউক্ত অবস্থার পর যদি অপর শরীক শারিকার পুঁজিতে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে চুক্তি বাতিল হওয়ার সময় সে এই পুঁজিতে অন্য শরীকের অংশের দায় গ্রহণ করবে। যদি তা মিছলী হয় (বাজারে যার সদৃশ বিদ্যমান) তাহলে মিছলী বস্তু দ্বারা আর বাজারে যার সদৃশ নেই তার বাজার মূল্য দ্বারা ক্ষতিপূরণ দেবে। ১০৪
পুঁজি ব্যবহৃত হওয়া শর্ত না হলে শারিকা যখন শেষ হয়ে যাবে তখন যদি পুঁজি পণ্য অবস্থায় থাকে, তাহলে উভয় শরীকের মত অনুযায়ী তারা তা বণ্টন কিংবা বিক্রি করে মূল্য বণ্টন করতে পারে। যদি তাদের মতভেদ হয়, একজন বণ্টনের ইচ্ছুক আর অপরজন বিক্রির, তাহলে বণ্টন ইচ্ছুক শরীকের বক্তব্য গ্রহণ করা হবে।
কেননা পণ্যের বণ্টন প্রত্যেক শরীকের প্রাপ্য পুঁজি ও লাভ নিশ্চিত করে, অতিরিক্ত কোনো কার্যক্রমের ক্লেশ ছাড়া। এই বিবেচনায় শরীক মুদারাবার কর্মী থেকে ভিন্ন। যেহেতু বিক্রির মাধ্যমেই কর্মীর প্রাপ্য প্রকাশিত হয়। সুতরাং যে যখন বিক্রির দাবি করবে তখন তা গৃহীত হবে। হাম্বলীগণের স্থিরীকৃত মত এটিই। ১০৫
ইবনে রুশদ, তার নাতী এবং তাদের মতানুসারী ফকীহগণ বাদে অন্য মালেকী ফকীহদের মত হলো, যৌথচুক্তি আবশ্যকীয় চুক্তি। পুঁজি ব্যবহৃত হওয়া বা শরীকের গ্রহণ করার পর আমলে পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এই আবশ্যকতা অব্যাহত থাকবে। কতক হাম্বলী ফকীহও কাজ গ্রহণ করার পর শারিকাতুল আমাল (যৌথ কাজের চুক্তি) আবশ্যক হওয়ার মত প্রকাশ করেছেন। ১০৬
গ. শরীকের কর্তৃত্ব আমানতের কর্তৃত্ব : يَدُ الشَّريك يَدُ أَمَانَة
ফকীহদের ঐকমত্যে শারিকার পুঁজিতে শরীকের কর্তৃত্ব আমানতের কর্তৃত্ব, যে-কোনো প্রকার শারিকা হোক না কেন। কেননা পুঁজি গচ্ছিত সম্পদের ন্যায়, যা তার মালিকের অনুমতিতে কব্জা করা হয়েছে, তাতে বদল পরিশোধ করা বা কজার মাধ্যমে চুক্তি মজবুত করার উদ্দেশ্য করা হয় নাই। ১০৭
আমানতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, সীমালঙ্ঘন বা ব্যবহারে অবহেলা ছাড়া তার ক্ষতিপূরণ আবশ্যক হয় না। সুতরাং শরীক যদি সীমালঙ্ঘন, অযত্ন বা ব্যবহারে অবহেলা না করে, তাহলে সে শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ দেবে না- যদিও শারিকার পুঁজি নষ্ট হোক বা শেষ হোক না কেন। লাভ ও লোকসানের ক্ষেত্রে পূর্ণ বা আংশিক পুঁজি নষ্ট বা শেষ হওয়ার ক্ষেত্রে এবং পুঁজি অপর শরীককে দেয়ার ক্ষেত্রে তার দাবি কসমের সাথে সত্যায়ন করা হবে। ১০৮
শরীকের কর্তৃত্ব আমানতের কর্তৃত্ব হওয়া, লাভ লোকসান এবং অবশিষ্ট ও ব্যয়কৃত পুঁজির ক্ষেত্রে কসমসহ তার বক্তব্য গ্রহণ করার ফল হলো, সে অন্য আমানতদারের মতো, যেমন অসী ও ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক; তার বিশদ হিসাব পেশ করা আবশ্যক নয়। বরং এভাবে সংক্ষিপ্ত হিসাব দেওয়াই যথেষ্ট যে, শারিকার পুঁজি থেকে আমার কাছে অবশিষ্ট আছে এত দীনার বা আমি এই পরিমাণ ক্ষতির শিকার হয়েছি অথবা আমি এত পরিমাণ দীনার লাভ করেছি। যদি তার থেকে হিসাব গ্রহণ করা হয় তাহলে এতটুকু হিসাবই। অন্যথায় সে কসম খাবে, এর অতিরিক্ত কোনো কিছু করা যাবে না।
আল হিদায়ার ব্যাখ্যাকারগণ এভাবেই নিঃশর্তভাবে ফতোয়া দিয়েছেন। তবে ফকীহগণ বিচারের দিক বিবেচনায় একে শর্তযুক্ত করেছেন। তারা বলেন, উপরিউক্ত সংক্ষিপ্ত হিসাব পেশ করা যথেষ্ট, যদি বাস্তবে এই আমীন আমানতদারির বিচারে পরিচিত হয়ে থাকেন। তেমন পরিচিত না হলে বিচারক তার কাছে বিশদ হিসাব তলব করবেন এবং সে পেশ না করলে শাস্তির হুশিয়ারি দেবেন। তবে আমীন যদি সংক্ষিপ্ত হিসাব দানেই অনমনীয় থাকে তাহলে কসম ছাড়া তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। ১০৯ শাফেয়ীগণও একথাই বলেন। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য মতে, যদি শরীকের বিরুদ্ধে খেয়ানত করার দোষ দেওয়া হয় তাহলে খেয়ানত না করাই হলো এক্ষেত্রে মৌলিক অবস্থা। ১১০
সীমালঙ্ঘনের একটি হলো অপর শরীকের নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ। দুই শরীকের যত কর্তৃত্ব ব্যবহারের সুযোগ আছে এর মধ্যে এক শরীক যদি অপর শরীককে কোনো হস্তক্ষেপ/কারবার করতে নিষেধ করে, তাহলে অপর শরীক তা থেকে বিরত থাকবে। যদি নিষেধের বিরোধিতা করে তাহলে শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ দেবে। যেমন এক শরীক অপরকে বলল, ব্যবসার পুঁজি নিয়ে সমুদ্র ভ্রমণ করো না এরপর অপর শরীক ভ্রমণ করল। অথবা বলল, তুমি শুধু নগদ বিক্রি করবে, এরপর অপর শরীক বাকিতে বিক্রি করল। ১১১
এটিই হাম্বলীদের স্থিরীকৃত মত। তারা বলেন, যদি শরীকের জন্য বাকিতে বিক্রির অনুমতি না থাকে আর সে বাকিতে বিক্রি করে, তাহলে বিক্রি বাতিল হবে, যেহেতু বিক্রি হয়েছে অনুমোদনছাড়া। তবে যদি এ মূলনীতি অনুসরণ করি যে তৃতীয় পক্ষের বিক্রি স্থগিত, তাহলে এই বিক্রি স্থগিত থাকবে। যদিও এক্ষেত্রে হাম্বলী ফকীহ খিরকীর স্পষ্ট মত হলো বিক্রি বৈধ, তবে ক্ষতিপূরণ আবশ্যক। ক্ষতিপূরণ দ্বারা উদ্দেশ্য পণ্যের মূল্যের ক্ষতিপূরণ। আর বিক্রি বাতিল হওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দ্বারা উদ্দেশ্য পণ্যের বাজারমূল্যের ক্ষতিপূরণ। তবে ক্ষতিপূরণ দ্বারা সব অবস্থায় বাজারমূল্যের ক্ষতিপূরণ উদ্দিষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেহেতু বাজারমূল্য ছাড়া কোনো সম্পদ হাতছাড়া হয়নি। ১১২
সীমাতিক্রমের একটি হলো অপর শরীকের অংশ না জানা এবং এ অবস্থায় মারা যাওয়া। যদি সে শরীকের অংশের অবস্থা বিশদভাবে না জানিয়ে মারা যায় তাহলে তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ বহন করা হবে। তবে যদি কোনো ওয়ারিস জানে এবং তার জানার প্রমাণ পেশ করে এবং এমনভাবে শরীকের অংশের বিবরণ দেয় যা ক্ষতিপূরণ বহনকে রহিত করে তাহলে ভিন্ন কথা। মৃত শরীক অপর শরীকের অংশের বিশদ বিবরণ এভাবে দেবে যে, অপর শরীক কি তার কাছ থেকে নিজ অংশ বুঝে নিয়েছে, না তার অংশ সীমাতিরিক্ত ব্যবহার বা অন্য কোনো কারণে নষ্ট হয়েছে বা শেষ হয়েছে অথবা এর কোনোটা হয়নি? সে সম্পদ কি তার কাছে বা অন্য কারো কাছে নগদ আছে, না মানুষের কাছে ঋণ হিসেবে আছে? আল আশবাহ গ্রন্থে ইবনে নুজাইম রহ.-এর বক্তব্য থেকে এমনটা বুঝে আসে। তিনি বলেন, না জানিয়ে মারা যাওয়ার অর্থ হলো সে আমানতের অবস্থা বিশদভাবে বলেনি। আর তার জানা ছিল যে, তার ওয়ারিস অবস্থা জানে না। ১১৩
উল্লিখিত অজ্ঞাত রাখাকে শাফেয়ী ও হাম্বলীগণ অসীয়ত বর্জন করা শব্দে প্রকাশ করেছেন। তবে এক্ষেত্রে তাদের মত হানাফীদের চেয়ে কঠিন। তাদের মতে, এই শরীক তার ওয়ারিসকে তার কাছে থাকা অপর শরীকের অংশ সংক্রান্ত অসীয়ত করলেও জামানাত (ক্ষতিপূরণ) থেকে মাফ পাবে না। বরং বিচারকের কাছে অসীয়ত করা আবশ্যক। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে সাক্ষী রেখে কোনো আমীনের কাছে অসীয়ত করবে। ১১৪
মালেকীদের মত হানাফীদের মতের অনুরূপ। তবে তারা দশ বছর অতিক্রান্ত হলে ক্ষতিপূরণ রহিত হওয়ার মত দেন। তারা বলেন, এক্ষেত্রে ধরে নেয়া হবে সে সম্পদ ফেরত দিয়েছে, যদি সে সম্পদ কোনো দৃঢ় প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করে থাকে। ১১৫
ঘ. লাভের হকদার হওয়া : اِسْتِحْقَاقُ الرّبْح
শ্রম বা জামানাত ছাড়া সম্পদ লাভের হকদার হওয়া যায় না। সম্পদ দিয়ে এর হকদার হওয়া যায়। কেননা সম্পদের বর্ধনই তো লাভ। তাই সম্পদের মালিকের তা প্রাপ্য। একারণেই পুঁজিদাতা মুদারাবায় লাভের হকদার। শ্রমদানের মাধ্যমে লাভের হকদার হবে যখন শ্রমদান হবে লাভের কারণ। যেমন ইজারার সাথে বিবেচনা করে মুদারাবার লাভে শ্রমিক মুযারিবের অংশ।
জামানতের মাধ্যমে লাভের হকদার হওয়া যায়। যেমন শারিকাতুল ওজুহ-এর ক্ষেত্রে। এর দলিলঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : الْخَرَاجُ بِالضَّمَانِ অর্থাৎ ১১৬ 'যে ব্যক্তি কোনো বস্তুর দায় নেবে বস্তুর লাভ তার হবে।' এজন্যই এক ব্যক্তি কোনো একটি কাজ, যেমন কাপড় সেলাইয়ের অর্ডার নিল আর নির্দিষ্ট ও জ্ঞাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তা আঞ্জাম দেয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো। এরপর এই পারিশ্রমিকের চেয়ে আরো কমে এই কাজ অন্য কারো দ্বারা করালো এবং উভয় পারিশ্রমিকের মধ্যবর্তী অর্থ সে হালাল ও পবিত্র হিসেবে ভক্ষণ করল; এমন কারবার জায়েয। কেননা সে কাজ না করলেও শুধু কাজের দায়গ্রহণ করেছে। অথচ হতে পারে তার কোনো মৌল পুঁজি ছিল না।
এই তিনটি কারণ, যেগুলো দ্বারা লাভের হকদার হওয়া যায়, এর একটিও যদি বর্তমান না থাকে, সেক্ষেত্রে লাভ প্রাপ্য হওয়ার অন্য কোনো পন্থা নেই। এজন্য কারো অপরকে এ কথা বলা ঠিক নয় যে, তুমি তোমার সম্পদে হস্তক্ষেপ করো এই শর্তে যে, লাভ আমার হবে অথবা আমাদের মাঝে বণ্টিত হবে। সকল ফকীহর মতে এটি অর্থহীন কথা ছাড়া কিছু হবে না। আর লাভ সম্পূর্ণ পুঁজি বিনিয়োগকারীর হবে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া। ১১৭
শারিকাতুল আমওয়াল-এর দুপ্রকার : মুফাওয়াযা ও আনান-এর ক্ষেত্রে সাধারণত পুঁজি ও শ্রমদান উভয়টি হয়ে থাকে। আমরা যেমনটা জেনেছি, শারিকাতুল মুফাওয়াযায় লাভ সর্বদা সমানহারে বণ্টিত হবে। আর শারিকাতুল আনান-এর লাভ বণ্টন হবে উভয়ের পুঁজি অনুসারে, যদি শ্রমদানের বিষয়টি উভয় শরীক অগ্রাহ্য করে। শ্রমদানের দরুন লাভের পরিমাণ নির্ধারিত করার অধিকার উভয় শরীকের আছে। যে লাভ এককভাবে হবে তার, যার জন্য চুক্তিতে শ্রমদানের শর্ত করা হবে, এটি হবে পুঁজিতে তার প্রদত্ত পরিমাণ অনুপাতে চুক্তির দাবি অনুযায়ী লাভের অংশের অতিরিক্ত। যেন এই লাভের পরিমাণ শ্রমদানকারী শরীক কোনো পুঁজি, শ্রম বা জামানাত ছাড়া গ্রহণের হকদার না হয়। এক্ষেত্রে অপর শরীকের শ্রমদানের শর্ত করুক বা না করুক, এই শরীক শর্ত অনুযায়ী শ্রমদান করুক বা না করুক, বিধান অভিন্ন। অভিন্নতার কারণ হলো শ্রমদানের শর্ত; শ্রমদান বর্তমান হওয়া নয়।
এ কারণেই শারিকাতুল আনান-এ উভয়ের পুঁজি সমান হওয়া আর লাভে কমবেশ হওয়া, অথবা পুঁজিতে কমবেশ করে লাভ সমানহারে বণ্টন হওয়া, উভয়টি আমাদের বর্ণিত পন্থা অনুযায়ী বৈধ; নিঃশর্তভাবে এবং যখন শ্রমদানের শর্ত করা হবে না তখন নয়। এর অন্যথা হলে শর্ত বাতিল হবে, আর উভয়ের পুঁজি হিসেবে লাভ বণ্টন হবে। লোকসান হলে সর্বাবস্থায় উভয়ের পুঁজি অনুপাতে হবে। কেননা লোকসান পুঁজির ব্যয়কৃত অংশ। সুতরাং তা পুঁজি অনুপাতে নির্ধারিত হবে।
হানাফী ফকীহ আন্নাহর-এর গ্রন্থকার বলেন: যদি উভয় শরীক নিজেদের শ্রমদানের শর্ত করে- যদি পুঁজি সমান হয় আর লাভে কমবেশ করা হয়, তাহলে আমাদের তিন ইমামের মতে জায়েয। যুফার রহ. ভিন্নমত পোষণ করেন। উভয়ের শর্ত অনুযায়ী লাভ উভয়ের মাঝে বণ্টিত হবে, যদিও এক শরীকই শ্রমদান করুক না কেন।
যদি এক শরীকের জন্য শ্রমদানের শর্ত করে আর উভয়ের পুঁজি অনুপাতে লাভের শর্ত করে তাহলে এটা জায়েয। যে শরীকের শ্রম নেই তার পুঁজি শ্রমদানকারী শরীকের নিকট পণ্য হিসেবে থাকবে। এর লাভ তার, ক্ষতিও তার। যদি শ্রমদানকারী শরীকের জন্য তার পুঁজির আনুপাতিক হার থেকে বেশি পরিমাণ লাভের শর্ত করে তাহলে এটা জায়েয। শ্রম ছাড়া শরীকের সম্পদ শ্রমদানকারীর কাছে মুদারাবার পুঁজি হিসেবে থাকবে। যদি এই শ্রম ছাড়া শরীকের জন্য আনুপাতিক হিসেবে তার পুঁজির বেশি পরিমাণ লাভের শর্ত করে, তাহলে এই শর্ত সহীহ নয়। তার পুঁজি শ্রমদানকারীর নিকট পণ্য হিসেবে থাকবে, প্রত্যেকে সর্বদা নিজ পুঁজির লভ্যাংশ পাবে। আর লোকসান উভয়ের মাঝে নিজ পুঁজি অনুপাতে ধর্তব্য হবে। ১১৮
মালেকী ও শাফেয়ীগণের মতে লভ্যাংশের মূলনীতি লোকসানের মতোই; উভয়ের পুঁজি অনুপাতে তা বণ্টিত হওয়া আবশ্যক। যদি চুক্তিতে এর বিপরীত শর্ত করা হয় তাহলে চুক্তিই বাতিল হবে। ১১৯
হাম্বলীদের মতে, লাভ উভয়ের পুঁজি অনুপাতে। তবে এর বিপরীত শর্ত করা হলে শর্ত অনুযায়ী লাভের বণ্টন হবে। ১২০ কতক মুতাআখখির (পরবর্তী) হাম্বলী ফকীহ হানাফীদের সাথে পুরোপুরি অভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের মতে লাভ বণ্টন হবে উভয়ের পুঁজি অনুপাতে। তবে শ্রমদানকারীর জন্য অতিরিক্ত লাভের শর্ত করা হলে সে শর্ত সহীহ। ১২১
মালেকীগণ পুঁজি অনুপাতে শ্রমদানের শর্ত যোগ করেন। এর অন্যথা হলে শারিকা বাতিল হবে। যেমন পুঁজিতে এক শরীকের অংশ হলো একশ, অপর শরীকের দুইশ, এরপর তারা সমান শ্রমদানের শর্তে চুক্তিবদ্ধ হলো। (পুঁজির তারতম্য হওয়ার পর সমান শ্রমদানের শর্ত করায় এই চুক্তি বাতিল হবে।) যদি এই যৌথচুক্তি তারা বাস্তবায়ন করে তাহলে এক-তৃতীয়াংশের শরীক অপর শরীকের কাছে তার এক ষষ্ঠাংশ শ্রমের সমপারিশ্রমিক উসুল করার হকদার হবে। তবে চুক্তি সহীহভাবে সম্পাদন হওয়ার পর স্বেচ্ছাসেবা হিসেবে কোনো শরীকের আংশিক বা পূর্ণ শ্রম দান বৈধ। ১২২
অন্যান্য মাযহাবের স্পষ্ট ভাষ্যমতে শারিকাতুল আনান-এ এক শরীকের পক্ষ থেকে শ্রমদান সহীহ। অর্থাৎ এক শরীক অপর শরীককে হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ করার অনুমতি দেবে। এর অন্যথা হবে না, তাই অনুমতিপ্রাপ্ত শরীক শারিকার পূর্ণ পুঁজিতে কার্য পরিচালনা করবে। অপর শরীক ইচ্ছা হলে শুধু নিজ পুঁজিতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে। এই শরীককে তার নিজ পুঁজিতে হস্তক্ষেপ না করার শর্ত করা বৈধ নয়। বরং এমন শর্ত চুক্তি বাতিলের কারণ হবে, যেহেতু এর মাধ্যমে মালিককে নিজ সম্পদে হস্তক্ষেপ করতে নিষেধ করা হয়।
তবে এই শরীক যদি অঙ্গীকার করে যে, সে শ্রমদান করবে না এবং নিজের জন্য তা শর্ত করে, তাহলে হাম্বলীদের মতে এভাবে শ্রমদান এক শরীকের জন্য সীমিত করা বৈধ। এরপর এই শরীকের জন্য শ্রমদানের বদলা হিসেবে যদি পুঁজিতে তার অংশ অনুপাতে প্রাপ্য লভ্যাংশের অতিরিক্ত লাভ দেওয়া হয় তাহলে এই কারবার শারিকাতুল আনান ও মুদারাবা-য় পরিণত হবে। আর যদি অতিরিক্ত লাভ ছাড়া পুঁজি অনুপাতে লাভ নির্ধারণ করা হয় তাহলে এটি শারিকা হবে না। বরং হবে ইবযা। আর যদি অতিরিক্ত লভ্যাংশ শ্রমদানকারী শরীক ছাড়া অন্য শরীকের জন্য নির্ধারণ করা হয় তাহলে বিশুদ্ধতম বর্ণনা অনুসারে নির্ধারণের শর্ত বাতিল হবে। আর এটিও ইবযা হবে যা তাদের বক্তব্যের দাবি। তবে ইবনে কুদামা রহ.-এর বক্তব্যে স্পষ্ট বিবৃত হয়েছে যে, শারিকাতুল আনান যৌথ শ্রমদানের দাবি করে। ১২৩
টিকাঃ
১০০. আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০২
১০১. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৫; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০২
১০২. বুলগাতুস মালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৮; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২৫৫; আল ফুরূ', খ. ২, পৃ. ৭২৭
১০৩. আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩৩; আল ফুরূ', খ. ২, পৃ. ৭২৭; বাদায়েউস সানায়ে, ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩৪; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৬২
১০৪. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩৪; মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৪৩৯
১০৫. আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩৩-১৩৪
১০৬. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৭; মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৫৮০; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৫; আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৮২; আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৫ ও ২৬৭; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৪৭
১০৭. তাবযীমুল হাকাইক, খ. ৫, পৃ. ৬৪; আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬২; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৩; আশবাহ সুয়ূতী, পৃ. ২৮৩; কাওয়াঈদ, ইবনে রজব, পৃ. ৬৭; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫০৫; বুলগাতুস মালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৯-১৭০; দালীলুত তালিব, পৃ. ১৩৪; আল ফুরূ', খ. ২, পৃ. ৭২৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৬
১০৮. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৬ ও ৩৫৭; আল ইতহাফবি আশবাহি ইবনি নুজাইম, পৃ. ৩৩৮
১০৯. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৭, ৪৩৮; আল ইতহাফ বি আশবাহি ইবনি নুজাইম, পৃ. ৩৩৭
১১০. আল মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৪৫; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২৮০; আল মুগনী, আশ শরহুল কাবীর, খ. ৫, পৃ. ১২৯
১১১. ১১২. আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৫০-১৫১
১১৩. আল ইতহাফ বি আশবাহি ইবনি নুজাইম, পৃ. ৪১৫
১১৪. আল ফুরু', খ. ২, পৃ. ৭৮৭
১১৫. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ৩২৯; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ২০০
১১৬. الخراج بالضان হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ হযরত আয়েশা রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। খ. ৩, পৃ. ৭৮০; তাহকীক, ইযযত উবায়দ, ইবনেল কাত্তান হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, যেমন উল্লিখিত রয়েছে আত তালখীসুল হাবীব-এ, খ. ৩, পৃ. ২২; হাপা, শারিকাতুত তিবাআতিল ফান্নিয়্যাহ।
১১৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬২; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩১; হাওয়াশী তুহফাতি ইবনি আসিম, খ. ২, পৃ. ২১৪; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৬, পৃ. ৮; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫২; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ৭০; আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৫; আশ শারকাওয়ী, আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ১১২; আল বাজুরী আলা ইবনি কাসিম, খ. ১, পৃ. ৪০০; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৪০
১১৮. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬২; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫২
১১৯. বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ৭০; আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৫
১২০. আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৪০
১২১. জ্ঞাতব্য যে শারিকাতুল মুফাওয়াযা ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে এটি তাদের মত। রদ্দুর মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫২; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৯
১২২. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬১; আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৩
১২৩. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৩; আল ফুরু, খ. ২, পৃ. ৭২৫; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৯