📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মূলপুঁজি সংক্রান্ত শারিকাতুল মুফাওযাযার সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি

📄 মূলপুঁজি সংক্রান্ত শারিকাতুল মুফাওযাযার সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি


এগুলো এমন শর্ত, যার একটি লঙ্ঘিত হলে শারিকাতুল মুফাওয়াযা শারিকাতুল আনানে পরিণত হয়।

প্রথম শর্ত : হানাফীদের মতে মূল পুঁজিতে সমপরিমাণ থাকা শর্ত। এটি শুরু এবং শেষ উভয় অবস্থাতেই বিবেচ্য। সুতরাং যতক্ষণ পুঁজিতে অংশীদারী বহাল থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত পুরো সময় সমপরিমাণ থাকা আবশ্যক। (এর উদাহরণ হলো, এক শরীকের পক্ষ থেকে এক হাজার দীনার, অপর শরীকের পক্ষ থেকে অনুরূপ এক হাজার দীনার।) কেননা শারিকা এমন চুক্তি, যা আবশ্যক নয়। প্রত্যেক শরীকের যখন ইচ্ছা তা বাতিলের অধিকার আছে। তাই এর অবস্থা হলো প্রতি মুহূর্তে নবায়িত চুক্তির ন্যায়। আর এই শারিকার 'মুফাওয়াযা' নামের দাবিতেই চুক্তির শুরু থেকে সমতা অব্যাহত থাকা শর্ত। সুতরাং সমান পুঁজির ভিত্তিতে শারিকা চুক্তি সম্পাদনের পর এক শরীক যদি মীরাস বা অন্যসূত্র যেমন দানসূত্রে মূল্যজাতীয় এমন সম্পদের মালিক হয়, যা দ্বারা শারিকা সম্পাদন বৈধ, আর শরীক তা কজা করে, তাহলে শারিকাতুল মুফাওয়াযা বাতিল হবে। সমতা নষ্ট হওয়ায় চুক্তিটি শারিকাতুল আনানে পরিণত হবে।

অপরদিকে যদি সে ঋণ বা পণ্যজাতীয় স্থাবর বা অস্থাবর এমন সম্পদের মালিক হয়- যা দ্বারা শারিকা সম্পাদন বৈধ নয়, তাহলে এগুলোর মালিক হওয়া শারিকার মূল পুঁজি হওয়ার যোগ্য সম্পদের ক্ষেত্রে সমতার পরিপন্থী নয়। তাই এটি মুফাওয়াযা অব্যাহত রাখারও বিপরীত নয়। তবে যদি মূল্য হিসাবে ঋণ কব্জা করে তাহলে তখন পরিপন্থী হওয়া সাব্যস্ত হবে। সুতরাং মুফাওয়াযা বাতিল হয়ে তা আনানে পরিবর্তিত হবে। ৮৬

আবু হানীফা রহ.-এর সূত্রে দুটি বর্ণনার প্রসিদ্ধটি অনুসারে পুঁজি সমান হওয়ার ক্ষেত্রে মুদ্রার ভিন্নতা ধর্তব্য নয়। যেমন এক শরীকের স্বর্ণজাতীয় মুদ্রা, অপর শরীকের রৌপ্যজাতীয় মুদ্রা- যদি বাজারমূল্য হিসেবে উভয়ের প্রদত্ত অংশ সমান হয়। যদি এক শরীকের প্রদত্ত অংশের বাজারমূল্য বেড়ে যায় তাহলে শারিকাটি মুফাওয়াযা থেকে আনানে পরিণত হবে। তবে পণ্য কেনার পর যদি উভয়ের অংশে বা একজনের অংশের বাজারমূল্য বেড়ে যায় তাহলে ভিন্ন কথা। কেননা প্রথম অবস্থায় যৌথপুঁজি মূল পুঁজি থেকে পণ্যের মূল্যে পরিণত হয়েছে। সুতরাং পুঁজির ক্ষেত্রে যুগপৎ অংশীদারীতেও তারতম্য হয়নি। আর দ্বিতীয় অবস্থায় পণ্যের মূল্য বাদে অতিরিক্ত অংশ যেন উভয়ের যৌথ মালিকানার। কেননা পণ্যের মূল্যের অর্ধেক অপর শরীকের প্রাপ্য; যেহেতু উভয়ের প্রদত্ত অংশের সমুদয় দিয়ে পণ্য কেনা খুব কম হয়ে থাকে। তাই সূক্ষ্ম যুক্তির দাবি হলো জটিলতা দূর করার স্বার্থে এটিকে প্রথম অবস্থার সাথে যুক্ত করা। যদিও সাধারণ যুক্তির চাহিদা হচ্ছে, এ অবস্থায় মুফাওয়াযা চুক্তি বাতিল হওয়া।

ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে, ৮৭ মালেকী ও হাম্বলীগণ মুফাওয়াযার সম্পাদন বৈধ হওয়ার জন্য পুঁজিতে উভয় শরীকের সমান হারে অংশগ্রহণ শর্ত করেন না। ৮৮

দ্বিতীয় শর্ত : পুঁজি হওয়ার যোগ্য উভয় শরীকের সমুদয় সম্পদ পুঁজিরূপে : شُمُوْلُ رَأْسِ الْمَالِ لِكُلِّ مَا يَصْلُحُ لَهُ مِنْ مَالِ الشَّرِيْكَيْنِ
পূর্বে আলোচিত হয়েছে, হানাফীদের মতে মূল্যজাতীয় বস্তুই শুধু পুঁজি হওয়ার যোগ্য, যদি তা নগদ বস্তু হয়; ঋণ নয় এবং তা বর্তমান হয়; অনুপস্থিত নয়। এক্ষেত্রে সৃষ্টিগতভাবে মূল্যজাতীয় বা প্রচলনের ভিত্তিতে মূল্যজাতীয় হওয়ার বিধান এক।

সুতরাং কোনো শরীকের যদি পুঁজি হওয়ার যোগ্য কোনো সম্পদ থাকে যা সে পুঁজির বাইরে রাখা প্রাধান্য দেয়, তাহলে শারিকাটি শারিকাতুল আনান হবে; শারিকাতুল মুফাওয়াযার সংজ্ঞা প্রয়োগ না হওয়ায় এটি মুফাওয়াযা হবে না। এক্ষেত্রে সে সম্পদ শরীকের হস্তগত নাও হতে পারে, যেমন অন্যের কাছে গচ্ছিত সম্পদ। যে সম্পদ পুঁজি হওয়ার অযোগ্য দুই শরীকের যার ইচ্ছা সে সম্পদের একক মালিক হলে তাতে মুফাওয়াযার পরিবর্তন হবে না। এর কারণ এমন সম্পদ অংশীদারী গ্রহণ করে না। তাই একক মালিকানার বিষয়টি কোনো শরীকের স্ত্রী ও সন্তানসন্ততির অধিকারী হওয়ার অনুরূপ। সুতরাং যে কোন পণ্য (এর আওতায় বাজারে সদৃশ বিদ্যমান বস্তু ও স্থাবর সম্পত্তি অন্তর্ভুক্ত), ঋণ বা অবর্তমান মুদ্রা তার ইচ্ছা অনুযায়ী সে তা নিজ মালিকানায় নিয়ে আসতে পারে, যতক্ষণ এ মুদ্রা অবর্তমান আছে। এ বিষয়ে ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মতপার্থক্য রয়েছে। সুতরাং সে যদি মুদ্রাকে ঋণরূপে কজা করে অথবা অবর্তমান মুদ্রা বর্তমান হয়, তাহলে শারিকাটি মুফাওয়াযা থেকে পরিবর্তিত হয়ে আনান হয়ে যাবে, যেহেতু সমপরিমাণ সম্পদের মালিকানা অব্যাহত রাখা মুফাওয়াযার ক্ষেত্রে শর্ত। ৮৯

তৃতীয় শর্ত : প্রত্যেক শরীকের জন্য সকল ব্যবসা করার সুযোগ থাকা إِطْلَاقُ التَّصَرُّفِ لِكُلِّ شَرِيكَ فِي جَمِيعِ أَنْوَاعِ التَّجَارَةِ
এটি হানাফীদের মতে শর্ত। প্রত্যেক শরীক নিজ ইচ্ছামাফিক যে কোনো প্রকার ব্যবসা করবে। সে ব্যবসার আকার কম হোক বা বেশি, সহজ হোক বা কঠিন, সস্তা হোক বা চড়া মূল্যের বিধান অভিন্ন। এমনকি দুই শরীক যদি শর্ত করে যে, তাদের উভয়ে বা একজন কতক প্রকার ব্যবসায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, যেমন জমির ফসলাদি বা মেশিন ও যন্ত্রপাতির ব্যবসা করবে না অথবা একজন শুধু এটার ব্যবসা করবে, সেটার ব্যবসা নয়; অপরজন শুধু সেটার ব্যবসা করবে, এটার ব্যবসা নয়; তাহলে এই শারিকা মুফাওয়াযা থাকবে না। বরং তা আনান হয়ে যাবে। এর কারণ, ব্যবসাযোগ্য সকল বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকা এবং কোনো প্রকার ব্যবসার সাথে শারিকাকে বিশিষ্ট না করা মুফাওয়াযার দাবি। যেমনটা হিদায়া গ্রন্থকার বলেছেন।

প্রত্যেক শরীকের নিঃশর্ত কার্যক্রমের শর্ত মালেকীগণ ও হাম্বলীদের মতে বিদিত নয়। এর কারণ, মালেকীগণ মুফাওয়াযাকে দুভাবে বিভক্ত করেন। ১. সাধারণ, কোনো এক প্রকার ব্যবসার সাথে যা নির্দিষ্ট নয়। ২. খাস, যা সাধারণের বিপরীত।

হাম্বলীদের বক্তব্য থেকে উল্লিখিত মতটি তাদেরও মত বলে বোঝা যায়। কেননা তারা যদিও সকল প্রকার ব্যবসায়ী কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করে এমন এক নির্দিষ্ট প্রকার মুফাওয়াযার মত দেন, তবুও তাদের মতে একটি প্রকার এমন রয়েছে যেখানে কতক শরীক কতককে নির্দিষ্ট প্রকারে সীমিত করতে পারে। ২০

টিকাঃ
৮৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭৮; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫০
৮৭. আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৪; আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬৬, ৩৬৭
৮৮. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৬; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬১
৮৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬১; ফাতহুল কাদীর আল ইনায়া, আল হিদায়া, খ. ৫, পৃ. ৬; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৮
২০. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৫-৬; আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়‍্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৮; তাদের পূর্বে ইবনে নুজাইম আর পর ইবনে আবিদীন। রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫১; আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৯; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৫৩

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 শারিকাতুল আমাল-এর সাথে বিশিষ্ট শর্তাবলি

📄 শারিকাতুল আমাল-এর সাথে বিশিষ্ট শর্তাবলি


প্রথম শর্ত : এই শারিকার ক্ষেত্র হচ্ছে কাজ। কেননা কাজ সম্পাদন শারিকাতুল আমালের মূল পুঁজি। কোনো শরীকের পক্ষ থেকে যদি কাজ সম্পাদন না হয় তাহলে শারিকা সহীহ হবে না। তবে এই কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে উভয় শরীকের কাজ গ্রহণে চুক্তিবদ্ধ হওয়া যথেষ্ট। যদিও উভয়ের জন্য কাজ গ্রহণের অধিকার সাব্যস্ত করা হয়, অথবা একজনের জন্য কার্য বিচারে আর অপরের জন্য তাত্ত্বিক বিচারে অর্থাৎ যৌথচুক্তির চাহিদা অনুযায়ী প্রত্যেকের অধিকার থাকবে উভয়ের সম্মতিপূর্ণ কাজ গ্রহণ করা। যেহেতু যৌথচুক্তির দাবি হিসেবে প্রত্যেক শরীক কাজ গ্রহণের ক্ষেত্রে অপরের ওকীল, যদিও গ্রহণকৃত কাজ সে সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম না দেয়। কিন্তু কোনো কারণে সে যদি তার শরীকের জন্য কাজ গ্রহণের অধিকার ছেড়ে দেয়- কখনো কখনো শারিকা চুক্তি ও উভয় শরীকের বিচারে তা যৌক্তিকও হয়ে থাকে-সে যদি অধিকার ছেড়ে দেওয়ার পর কাজ গ্রহণের ক্ষেত্রে তার অধিকার পুনরায় প্রয়োগ করতে চায়, তাহলে তাকে বাধা দেওয়ার অধিকার অপর শরীকের নেই।

যৌথচুক্তি সম্পাদনের পর এক শরীক যদি কাজ গ্রহণ করে এবং এককভাবে কাজ আঞ্জাম দেয়, যেমন কাপড় সেলাইয়ের কাজ গ্রহণ করল। তারপর সে কাপড় কাটল ও সেলাই করল, তাহলে পারিশ্রমিক তার ও অন্য শরীকের মাঝে অর্ধেকহারে ভাগ হবে- যদি শারিকাতুল মুফাওয়াযা হয়ে থাকে; অথবা উভয়ের সম্মতিপূর্ণ আনুপাতিক হারে বণ্টিত হবে- যদি শারিকাতুল আনান হয়ে থাকে। এর কারণ, কাজ গ্রহণ উভয়ের পক্ষ থেকে হয়েছে, যেহেতু অর্ধেক কাজগ্রহণ হয়েছে অপর শরীকের পক্ষ থেকে ওকালাতের ভিত্তিতে। আর কাজটি গ্রহণ করার পর তা উভয়ের দায়ে যুক্ত হয়েছে। সুতরাং সম্পূর্ণ কাজ এক শরীকের সম্পাদন করা তার পক্ষ থেকে অপর শরীকের কাজ সম্পাদনে সহযোগিতা ও স্বেচ্ছাসেবা হিসেবে ধর্তব্য হবে। যেহেতু দায় আবশ্যক হয় লাভের ভিত্তিতে। ২১

কোনো শরীকের শ্রমমুক্ত ফাসিদ শারিকার নমুনা হলো, কাপড় ধোওয়ার যৌথচুক্তি ৯৩। এ চুক্তিতে উভয় শরীক একমত হয় যে, একজন ওয়াশিং মেশিন পেশ করবে আর অপরজন কাজগ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার পুরো কাজ করবে। পরে লাভ বণ্টন ছাড়া প্রথমজনের কোনো কাজ নেই। এই শারিকা ফাসেদ হওয়ার কারণে কার্য সম্পাদনকারী পাবে পারিশ্রমিক। কেননা তার কাজ দ্বারা সে এই পারিশ্রমিকের হকদার হয়েছে। আর ওয়াশিং মেশিন সরবরাহকারীকে সে মেশিনের ভাড়া হিসাব করে টাকা দেবে।

হানাফীদের মতে উল্লিখিত শারিকা ফাসিদ। তবে হাম্বলীদের মতে কাপড় ধোওয়া ও অন্যান্য পেশার যৌথচুক্তি বৈধ এই শর্তে যে, উভয় শরীক কাজ করবে একজনের যন্ত্র দিয়ে অন্যজনের জায়গায়। আর পারিশ্রমিক তাদের মাঝে বণ্টিত হবে। কেননা পারিশ্রমিক কাজের পরিবর্ত; মেশিন ও জায়গার পরিবর্ত নয়। মোটকথা, এক শরীক যন্ত্রের অর্ধেক দিয়ে স্বেচ্ছাসেবা ও সহযোগিতা করেছে আর অপর শরীক অর্ধেক জায়গা দিয়ে সহযোগিতা করেছে। তবে হ্যাঁ, যদি শারিকা ফাসিদ হয়ে যায় তাহলে মেশিন, জায়গা ইত্যাদি শরীকদের দেওয়া বস্তু ও তাদের কাজের অনুপাতে অর্জিত পারিশ্রমিক বণ্টন করা হবে। এটিই হাম্বলীদের স্পষ্টভাষ্যের মত। ১৪

শারিকাতুল আমাল হলে, শরীক লাভে অংশীদার হবে, যদিও সে কাজ না করে। এটি হাম্বলীদের স্থিরীকৃত মৌলিক বিষয়। যদিও তাদের কতক ফকীহ, যেমন ইবনে কুদামা এ মত প্রকাশ করেন যে, ওজর ছাড়া যে কাজ ছেড়ে দেবে সে শরীককে লাভের অংশ থেকে বঞ্চিত করা হবে, যেহেতু সে নিজের ওপর শর্তকৃত বিষয় আদায়ে ত্রুটি করেছে।

উল্লিখিত অবস্থায় শারিকা বাতিল হওয়ার বিষয় স্পষ্টভাবে না বললেও মালেকীদের স্থিরীকৃত মত হচ্ছে, এক শরীকের দীর্ঘ অসুস্থতা বা অনুপস্থিতির পর শারিকাতুল আমালে অপর শরীক যে কাজ করবে সে কাজের দায়, সম্পাদন ও কাজের পারিশ্রমিক তার সাথে নির্দিষ্ট হবে। তবে যদি দ্বিতীয় শরীক প্রথম শরীকের সুস্থ অবস্থায় উপস্থিতির সময় অথবা সামান্য সময়ের অসুস্থতা বা অনুপস্থিতির পর কাজ গ্রহণ করে তাহলে ভিন্ন বিধান হবে। ৯৫

মালেকীগণ যন্ত্রকে কাজের সম্পূরক গণ্য করেন। সুতরাং অবশ্যই যন্ত্র হবে কাজে শরীকের অংশের সমান। যেমন কাজে কোনো শরীকের উদাহরণত তিন ভাগের এক ভাগ বা অর্ধেক অংশ থাকলে তার জন্য দুই তৃতীয়াংশ যন্ত্র প্রদানের শর্ত করা যাবে না, চুক্তিতে এই অতিরিক্ত অংশ বিবেচনা করা যথার্থ হবে না। অতিরিক্ত অংশের শর্তের প্রেক্ষিতে কাজ ও লাভের ক্ষেত্রে তারতম্য হওয়ার দরুন তা শারিকা বাতিলের কারণ হবে, পার্থক্যের বিবেচনা পরিপূর্ণভাবে গুরুত্ব প্রদান করা হবে। যদিও চুক্তির পর স্বেচ্ছাদানের সীমা অনির্ধারিত। সুতরাং এক শরীক চুক্তিতে সম্পূর্ণ যন্ত্র বিনামূল্যে প্রদান করলে কেমন হবে?

যদিও সাহনূন ও তার অনুসারী মালেকী ফকীহগণ এক শরীকের যন্ত্রপ্রদান যথেষ্ট মনে করেন না। বরং তাদের মতে, উভয় পক্ষের বস্তুর মালিকানা বা উপকার গ্রহণের মালিকানা অথবা একপক্ষের বস্তুমালিকানা আর অপর পক্ষের উপকার গ্রহণের মালিকানা হিসেবে যন্ত্র উভয় শরীকের যৌথ মালিকানাধীন হওয়া শর্ত। একপক্ষের বস্তুমালিকানা আর অপরপক্ষের উপকার গ্রহণের মালিকানার উদাহরণ হলো, যন্ত্রটি এক শরীকের মালিকানাধীন। সে অপর শরীকের কাছে কাজে তার অংশ পরিমাণ যন্ত্র ভাড়া দিল। অথবা উভয় শরীকের নিজমালিকানার যন্ত্র আছে। তবে তারা চুক্তিতে উদ্দিষ্ট আনুপাতিক অংশহারে নিজ যন্ত্রের অংশ অপরের যন্ত্রের অংশের বিনিময়ে ভাড়া নিল। বরং ইবনুল কাসিম যন্ত্রের জামানাতের ক্ষেত্রে উভয় শরীক সমান হওয়া আবশ্যক মনে করেন। সুতরাং যন্ত্র একজনের বস্তুমালিকানাধীন আর অপরের উপকার গ্রহণের মালিকানাধীন এমন হওয়া বৈধ নয়।

কোনো শরীকের জন্য নির্দিষ্টভাবে শ্রমদানের শর্ত করা হলে তাতে শারিকা ফাসেদ হওয়ার বিষয়ে অধিকাংশ হাম্বলী ফকীহ অভিন্ন মত পোষণ করেন। তবে ইবনে কুদামা শারিকা সহীহ হওয়ার মত গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সে শ্রমদানের জন্য অপরকে নিজ জন্তু দেয় আর উপার্জন উভয়ের মাঝে বণ্টন হয়। এ মাসআলায় ইমাম আহমদ ও আওযাঈ রহ.-এর স্পষ্ট বক্তব্যে এটি কিয়াসসম্মত মত। ইবনে তাইমিয়া এ মত পোষণ করেন।

সব শরীকের জন্য শ্রমদানের শর্ত করা হোক বা কতক শরীকের জন্য, সর্বাবস্থায় শারিকা বাতিল হওয়া শাফেয়ীদের মত। কেননা এগুলো পৃথক পৃথক সম্পদ। সুতরাং সহীহ শারিকার আওতায় এগুলো একত্র হতে পারে না। সুতরাং এক্ষেত্রে ফাসেদ শারিকার বিধানাবলি প্রযোজ্য হবে। ৯৬

দ্বিতীয় শর্ত : যৌথ কাজটি এমন হওয়া চাই ইজারা চুক্তিতে যার দাবি করা যায়। যেমন কাপড় বোনা, কাপড় বানানো, কাপড় সেলাই করা, অলংকার তৈরি করা, কামারের কাজ ও ছুতাবের কাজ এবং লেখা বা অংক বা চিকিৎসাশাস্ত্র বা ইঞ্জিনিয়ারিং বা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া। অনুরূপভাবে পরবর্তী যুগের ফকীহদের ফতোয়া অনুযায়ী সূক্ষ্ম যুক্তির আলোকে কুরআন, ফিকহ, হাদীস ইত্যাদি সকল শরয়ী ইলমের শিক্ষাদান। যদিও শেষোক্তগুলোর ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, অন্যান্য দীনী কাজের মতো এগুলোতে ইজারা বৈধ না হওয়া।

যে কাজ ইজারাচুক্তির মাধ্যমে দাবি করা যায় না, সে কাজের ক্ষেত্রে শারিকাতুল আমাল সহীহ হবে না। শরীয়তনিষিদ্ধ সকল কাজ এর আওতাভুক্ত। যেমন মৃত ব্যক্তির শোকে কাঁদার জন্য লোক ভাড়া করা, উলঙ্গ নৃত্য এবং মাখরাজ সহীভাবে উচ্চারণে বিঘ্নতা ঘটায় এমন সুরে কুরআনের তেলাওয়াত। অনুরূপ সকল দীনী কাজ এর আওতাভুক্ত। তবে পরবর্তী ফকীহগণ তীব্র প্রয়োজনের কারণে যেগুলো ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করেছেন সেগুলোর বিধান ভিন্ন।

যেন শরয়ী ইলমগুলো লুপ্ত না হয় আর দীনী নিদর্শানাবলি পরিত্যক্ত না হয়। যেমন আযান দেওয়া, ইমামতি করা ও কুরআনের শিক্ষাদান। ৯৭ সুতরাং ওয়াজকারীদের চুক্তি বৈধ নয়, যারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওয়াজ করবে এবং আখেরাত স্মরণ করাবে। অনুরূপ সাক্ষীদের যৌথচুক্তি বৈধ নয়। যেহেতু মিথ্যা সাক্ষ্য হলে তা শরীয়তে নিষিদ্ধ আর সত্য হলে তা দীনী কাজ বা ফরজ পর্যায়ের। সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে সাক্ষ্যগ্রহণ ও সাক্ষ্যপ্রদান এক, যেমনটা যথাস্থানে বিস্তারিত বিবৃত হয়েছে। ৯৮

টিকাঃ
২১. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৮; আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়‍্যা, খ. ২, পৃ. ৩২৯
৯৩. বর্তমানে এটি المنجلة নামে পরিচিত। মিসবাহ অভিধানে আছে : قصرت الثوب قصراً بيضته 'কাপড় সাদা করা। القصارة অর্থ শিল্প। এর ইসমে ফায়েল হচ্ছে: قصار
১৪. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৮; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৪; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৫০
৯৫. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩৩; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৬১; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১১৫
৯৬. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬৮, ২৭০-২৭১; বুলগাতুল সালিক, খ. ২, পৃ. ১৭২; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৫০; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৭
৯৭. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২২৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৬
৯৮. মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৩৬৯; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৮-৩৫৯

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 শারিকাতুল ওজূহ-এর সাথে নির্দিষ্ট শর্ত

📄 শারিকাতুল ওজূহ-এর সাথে নির্দিষ্ট শর্ত


হানাফী এবং হাম্বলী ফকীহ কাজী ও ইবনে আকিলের মতে, দুই শরীকের মাঝে লাভ পণ্যের মূল্যে উভয়ের দায় অনুপাতে বণ্টিত হওয়া শর্ত। উভয়ে একত্রে বা প্রত্যেকে আলাদাভাবে যা কিনবে, তাদের অংশ অনুপাতে তার মূল্যে তাদের দায় নির্ধারিত হবে। আর অংশের পরিমাণ শারিকা চুক্তিতে উভয়ের সম্মত শর্তগুলোর অনুগামী হবে।

জায়েয ও শরীয়তসম্মত হলো শারিকাতুল ওজুহ-এ উভয়ে চুক্তিবদ্ধ হবে এই মর্মে যে, তারা উভয়ে বা একজনে যা কিনবে তা তাদের মাঝে অর্ধেক হিসেবে দায়বদ্ধ থাকবে। অথবা তাদের জ্ঞাত কমবেশ পরিমাণ হিসেবে, সে পরিমাণ যাই হোক না কেন, দায়বদ্ধ থাকবে। যেমন, এক শরীকের এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ, অথবা এর চেয়ে কম বা বেশি আর অপরের দুই তৃতীয়াংশ বা তিন চতুর্থাংশ পরিমাণ। যেহেতু জানা আছে, হানাফীদের মতে শারিকাতুল মুফাওয়াযায় লাভে সমতা আবশ্যক, সুতরাং এক্ষেত্রে পণ্যের অংশ ও মূল্যের ক্ষেত্রে সমতাও আবশ্যক।

জামানাতের অংশের চেয়ে কম বা বেশি পরিমাণে লাভ কোনো শরীকের জন্য শর্ত করা হলে এই শর্ত বাতিল। এই শর্তের কোনো ক্রিয়া নেই। লাভ উভয়ের জামানাত অনুপাতে বণ্টিত হবে। কেননা জামানাত ছাড়া এই শারিকায় লাভের দাবি করার কোনো কারণ নেই। তাই লাভ জামানাত অনুপাতেই হবে। এর কারণ, লাভের অধিকারী হওয়া যায় সম্পদ, শ্রমদান বা জামানাত দ্বারাই। যেমন বিধানাবলির আলোচনায় আলোচিত হবে। এখানে কোনো পুঁজি বা শ্রম যেহেতু নেই, তাই জামানাতের কারণে লাভের হকদার হওয়া নির্ধারিত। সুতরাং কেবল জামানাত অনুপাতে লাভ বণ্টিত হবে, জামানাতের আওতাভুক্ত নয় এমন বস্তুর লাভ আবশ্যক হবে না।

হাম্বলীদের মাযহাবে শারিকাতুল ওজুহ-এর ক্ষেত্রে উভয় শরীকের ঐকমত্য অনুযায়ী লাভ বণ্টিত হবে। কেননা এই শারিকায় উভয় শরীক ব্যবসা করে। আর ব্যবসা এমন কাজ, যার মান ও পরিমাণ বিচারে তারতম্য হয়। যেমন ব্যবসা সম্পাদনকারীদের জানাশোনা/অভিজ্ঞতা ও উদ্যমতার বিচারে ভিন্নতা হয়। সুতরাং ন্যায়সঙ্গত মত হলো, উভয় শরীককে স্বাধীনতা দেওয়া, যেন তারা সকল অবস্থাকে সে অনুপাতে নির্ধারণ করতে পারে। এমনকি যদি তা লাভে তারতম্যও দাবি করে তাহলে উভয় শরীকের মত অনুসারে একে অপরকে এ বিষয় শর্তযুক্ত করতে কোনো বাধা নেই। এর উদাহরণ, এই ব্যক্তি অন্য একাধিক শারিকাতুল আনান বা মুদারাবায় যুক্ত হতে পারে। এ দুটিতে প্রাপ্য ব্যক্তিদের মাঝে নির্দিষ্ট পরিমাণ অনুপাতে-সমান সমান বা তারতম্য করে এই তারতম্য যেমনই হোক না কেন-লাভ বণ্টন করাই যথেষ্ট। ৯৯

টিকাঃ
৯৯. আল ফুরূ', খ. ২, পৃ. ৭৩১; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৩-১২৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 শারিকার বিধান এবং এর প্রতিক্রিয়া

📄 শারিকার বিধান এবং এর প্রতিক্রিয়া


أَحْكَامُ الشَّرِكَةِ وَالْآثَارُ الْمُتَرَتِّبَةُ عَلَيْهَا : শরীকাহ বিষয়ক বিধি-বিধান

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00