📄 তৃতীয় : কোনো শরীকের পক্ষ থেকে শ্রমদানের শর্ত না করা
যদি (শারিকাতুল মুফাওয়াযায়) কোনো এক শরীকের শ্রমদানের শর্ত করা হয় তাহলে হানাফীদের মতে এই যৌথ কারবার বাতিল হবে। ৭৫ কেননা এই শর্তারোপ মৌলিক কার্য পরিচালনার যেগুলোতে অংশগ্রহণ সম্ভব সেগুলোতে সমতাবিধান শীর্ষক করা মুফাওয়াযা চুক্তির বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী। মালেকীদের মত এক্ষেত্রে হানাফীদের মতের কাছাকাছি। যেহেতু সাধারণভাবে সকল যৌথ পুঁজির কারবারে তাদের শর্ত হলো, মূল পুঁজি অনুসারে শরীকের শ্রমদান। অর্থাৎ প্রত্যেক শরীক তার পুঁজি অনুপাতে শ্রমদান করবে। সুতরাং যদি মূল পুঁজির অর্ধেক তার হয় তাহলে এই কারবারে তাকে অর্ধেক শ্রমদান করতে হবে। আর যদি তার প্রদত্ত পুঁজি হয় তিন ভাগের দুভাগ তাহলে ওই পরিমাণ শ্রমদান করতে হবে। এটিই মৌলনীতি, যদি ব্যতিক্রম কোনো শর্ত না করা হয়। যেমন এক বা দুই তৃতীয়াংশ শ্রমদানের শর্ত করা হয় অর্ধেক পুঁজি দেওয়া শরীকের জন্য; সেক্ষেত্রে শারিকা ফাসেদ হবে, আর লাভ বণ্টিত হবে পুঁজিতে প্রদত্ত পরিমাণ অনুসারে। প্রত্যেক শরীক অপর শরীকের নিকট থেকে তার প্রাপ্য শ্রমের বিনিময় উসুল করবে। শর্ত করা ছাড়া কোনো শরীক যদি স্বেচ্ছাদান হিসেবে অতিরিক্ত শ্রমদান করে, তাহলে তাতে সমস্যা নেই। এটি তার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও স্বেচ্ছাদান। ৭৬
টিকাঃ
৭৫. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৫০
৭৬. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৫; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৭০; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৩
📄 সাধারণভাবে মূল পুঁজির কারবারের সাথে নির্দিষ্ট শর্তাবলি
সাধারণভাবে অর্থাৎ যৌথ কারবারটি মুফাওয়াযা বা আনান যাই হোক।
প্রথম শর্ত : মূল পুঁজি হতে হবে নগদ; ঋণ নয়। কারণ, যে ব্যবসার মাধ্যমে যৌথ কারবারের উদ্দেশ্য অর্থাৎ লাভ অর্জিত হবে তা ঋণ দ্বারা অর্জিত হবে না। সুতরাং ঋণকে মূল পুঁজি বানানো যৌথ কারবারের উদ্দেশ্য পরিপন্থী। ৭৭
দ্বিতীয় শর্ত : পুঁজি মূল্যজাতীয় হওয়া : পুঁজি মৌলিক অর্থ হবে, যেমন টাকশালের ছাপমারা সোনা, রূপা অথবা প্রচলিত অন্য মুদ্রা অথবা ছাপহীন স্বর্ণ-রৌপ্য ৭৮ -যদি এগুলো দ্বারা লেনদেনের প্রচলন থাকে- এটি হানাফী মাযহাবের স্থিরীকৃত মত।
সকল পণ্য অর্থাৎ মৌলিক দুটি মুদ্রা জাতীয় ধাতু স্বর্ণ ও রৌপ্য ছাড়া অন্য কোনো বস্তু যৌথ কারবারের পুঁজি বা কোনো শরীকের প্রদেয় পুঁজির অংশ হতে পারে না। ৭৯ যদিও এ বস্তুগুলো পাত্র বা ওজন দ্বারা পরিমাপযোগ্য অথবা কাছাকাছি গড়নের গুনে গুনে বিক্রি করার বস্তু হয়। জাহিরুর রিওয়ায়াহ-মতে এটি আবু হানীফা রহ.-এর মত। তার সাথে অভিন্ন মত পোষণ করেন আবু ইউসুফ রহ. ও কতক হাম্বলী ফকীহ।
ইমাম মুহাম্মদ রহ. এবং অনেক শাফেয়ী ফকীহর মতে এ পণ্যজাতীয় বস্তু দুপ্রকারে বিভক্ত। প্রথম প্রকার : পাত্র দ্বারা পরিমাপযোগ্য বস্তু, ওজন করে পরিমাপযোগ্য বস্তু এবং কাছাকাছি গড়নের গণনাযোগ্য পণ্য। দ্বিতীয় প্রকার : অন্যান্য পণ্য।
অন্য ভাষায়, তারা মিছলী বস্তুর ও মূল্য জাতীয় বস্তুর (الْمُتَقَوَّم) মাঝে পার্থক্য করেন। সাধারণভাবে দ্বিতীয় প্রকারে যৌথ কারবার সংঘটিত হতে পারে না বলে মত দিয়েছেন। আর প্রথম প্রকারে হওয়ার মত দিয়েছেন, দুজনের সম্পদ এক শ্রেণীভুক্ত হলে সেগুলো মিশ্রণের পর। এ মতের কারণ, এই প্রকারভুক্ত বস্তুগুলো পণ্যসর্বস্ব বস্তু নয়। বরং এক বিচারে এগুলো পণ্য, যেহেতু নির্দিষ্ট করলে এগুলো নির্দিষ্ট হয়। আবার এক হিসাবে এগুলো মূল্য, যেহেতু অন্যান্য মূল্যের মতো এগুলো দ্বারা দায়িত্বে আবশ্যক ঋণ রেখে কোনো বস্তু কেনা যায়। সুতরাং এ বস্তুগুলোর উভয় সাদৃশ্যে প্রতি লক্ষ রেখে পদক্ষেপ গ্রহণ সঙ্গত। সে হিসাবে উভয়ের সম্পদ এক করার পূর্বে পণ্যের সাদৃশ্যের প্রতি লক্ষ করা হয়েছে। তাই তখন শারিকা সংঘটন নিষিদ্ধ। আর উভয়ের সম্পদ এক করার পর মূল্যের সাদৃশ্যে প্রতি লক্ষ করে এগুলো দ্বারা শারিকা সংঘটন করা অনুমোদিত হলো। কেননা উভয়ের সম্পদ এক করার মাধ্যমে শারিকার অস্তিত্ব লাভ হয়। ফলে সম্পদ এক করার মাধ্যমে যৌথ চুক্তির বিষয়টি শক্তি অর্জন করে।
তবে এ পণ্য জাতীয় বস্তু এক শ্রেণীভুক্ত হলেই কেবল যৌথচুক্তি বৈধ হওয়ার কারণ হবে। এক শ্রেণীর বস্তুকে অন্য শ্রেণীভুক্ত বস্তুর সাথে মেলানো হলে, যেমন গমকে যবের সাথে, তেলকে ঘির সাথে মেলানো হলে, এই মিশ্রণ মিছলী বস্তু থেকে তার মিছলী হওয়ার বৈশিষ্ট্য দূর করে দেবে।
আর বস্তুর এই গুণ দূর হওয়ার পরিণতি হলো, মূল পুঁজি ও লাভ অজ্ঞাত হওয়া এবং লাভ বণ্টনে বিবাদ হওয়া। যেহেতু এর মূল্যমান নির্ধারণের জন্য এর পরিমাণ জানার প্রয়োজন হবে। আর মূল্যমান নির্ধারণ একটি ধারণার বিষয়। নির্ধারণকারীর ভিন্নতার দরুন মূল্য বিভিন্ন হয়। অথচ মিছলী বস্তুর ভিন্ন অবস্থা। যেহেতু তার অনুরূপ বস্তু পাওয়া যায়। (সুতরাং মিছলী বস্তু এক শ্রেণীভুক্ত হলে মূল পুঁজি ও লাভের ক্ষেত্রে বিবাদের কোনো আশঙ্কা নেই।)
অধিকাংশ হাম্বলী ফকীহ এবং কতক শাফেয়ীর মতে যে-কোনো ছাপই হোক না কেন, ছাপকৃত মুদ্রা মূল পুঁজি হওয়া শর্ত। হাম্বলী ফকীহ ইবনে কুদামা বলেন, এক্ষেত্রে খাঁদ থাকার কোনো ছাড় নেই। তবে মুদ্রা তৈরিতে অপরিহার্য পরিমাণে খাঁদ থাকলে তার বিধান ভিন্ন। ৮০
মালেকীদের মতে, প্রত্যেক শরীক স্বর্ণ বা রৌপ্য জমা দিলে যৌথচুক্তির সংঘটন বৈধ হবে। একইভাবে একজন স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করলে আর অপরজন তেমনই করলে চুক্তির সংঘটন বৈধ হবে। অথবা এক পক্ষ থেকে নগদ বস্তু, অন্য পক্ষ থেকে পণ্য অথবা উভয়ের পক্ষ থেকে পণ্য একত্র করলেও যৌথচুক্তি সংঘটিত হবে। উভয়ের পণ্য এক শ্রেণীভুক্ত হোক বা বিভিন্ন শ্রেণীভুক্ত। একপক্ষ থেকে শুধু স্বর্ণ, অপর পক্ষ থেকে শুধু রৌপ্য একত্র করা হলে তাদের মতে চুক্তির সংঘটন বৈধ হবে না, যদিও প্রত্যেক শরীক অপর শরীককে তার প্রদেয় দ্রুত পরিশোধ করে। এর কারণ, এভাবে কারবার করলে একসাথে শারিকা ও সারফ (মুদ্রা কেনাবেচা) করা হয়। এমনিভাবে পরিমাণ ও গুণের বিচারে এক হলেও দু প্রকার খাবারের সমন্বয়ে শারিকা বৈধ নয়। ৮১
ইবনে আবী লায়লা রহ.-এর মতে নিঃশর্তভাবে সকল পণ্যের সমন্বয়ে শারিকা বৈধ। কটনের ক্ষেত্রে চুক্তির সময়ের পণ্যমূল্য ধর্তব্য। ইমাম আহমদ রহ.-এর এমন একটি বর্ণনা রয়েছে, যা হাম্বলী ফকীহ আবু বকর ও আবুল খাত্তাব গ্রহণ করেছেন। এর কারণ, উল্লিখিত পদ্ধতি অনুসারে পণ্যের সমন্বয়ে শারিকার সংঘটন বিশুদ্ধ বলা হলে তা শারিকার উদ্দেশ্য পরিপন্থী হচ্ছে না। কারণ, শারিকার উদ্দেশ্য হলো উভয় শরীকের সম্পদে প্রত্যেক শরীকের হস্তক্ষেপ বৈধ হওয়া এবং এরপর লাভ কটন করা। এই উদ্দেশ্য মূল্যজাতীয় বস্তু দ্বারা যেমন অর্জিত হয়, অন্য বস্তু দ্বারাও তেমন সম্ভব। এক্ষেত্রে তারা দলিলরূপে গ্রহণ করেছেন যাকাতের নেসাব নির্ধারণের সময় ব্যবসার পণ্যের বাজারমূল্য বিবেচনা করা। ৮২ (যাকাতের নেসাব নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ব্যবসার পণ্যের বাজারমূল্য হিসাব করা হয়, তেমনিভাবে লাভ কটনের সময় চুক্তির সময়ে বহাল বাজারমূল্য বিবেচ্য হবে।)
তৃতীয় শর্ত : পুঁজি উপস্থিত থাকা : أَنْ يَكُونَ رَأْسُ الْمَالِ حَاضِرًا
হানাফীদের মতে, পুঁজি উপস্থিত থাকা শর্ত। কাসানী বলেন, চুক্তির সময় নয়, বরং পণ্য ক্রয়ের সময় উপস্থিত থাকা শর্ত। কারণ তখন উপস্থিত থাকা উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট। উদ্দেশ্য হলো, লাভের উদ্দেশ্যে ব্যবসা করা। এ কারণে যে শরীক অপর শরীককে এক হাজার দীনার প্রদান করে এ শর্তে যে, সে অনুরূপ একহাজার দীনার প্রদত্ত অর্থের সাথে মেলাবে। এরপর সে ব্যবসা করবে আর লাভ উভয়ের মাঝে কটন হবে, তাহলে প্রথম শরীক বিশুদ্ধ শারিকা সংঘটন করেছে বলে ধর্তব্য হবে- যদি অপর শরীক শর্তমতো কাজ করে। যদিও দ্বিতীয় শরীক প্রথম শরীককে লোকসানে শামিল করতে পারে না, যতক্ষণ না সে প্রমাণ পেশ করবে যে, উভয়ের ঐকমত্যে গৃহীত কাজই সে করেছে।
এভাবেই বলেছেন কাসানী ও ইবনুল হুমাম। ইবনে আবেদীনও এই মতের কাছাকাছি। খিযানাতুল মুফতীন ও খানিয়ার সূত্রে ফাতাওয়া হিন্দিয়্যায় বক্তব্য হলো, চুক্তির সময় বা পণ্যক্রয়ের সময় পুঁজি উপস্থিত থাকা শর্ত। উভয় অবস্থায়- চুক্তি ও পণ্যক্রয়ের সময়-অনুপস্থিত সম্পদের বিনিময়ে শারিকা সহীহ হবে না। ৮৩
মুদারাবার সাথে তুলনা করে হাম্বলীগণ চুক্তির সময় উভয়ের সম্পদ উপস্থিত থাকার শর্ত করেছেন। তাদের মতে, চুক্তির সময় উভয়ের সম্পদ উপস্থিত থাকা শারিকাকে দৃঢ় করে। যেহেতু সম্পদের উপস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে শারিকার কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ দেয়, আর শারিকার উদ্দেশ্য অর্জন বিলম্বিত হয় না। তবে সেই সাথে তারা বলেছেন, অনুপস্থিত সম্পদ বা দায়ে আবশ্যক সম্পদের ভিত্তিতে শারিকা সম্পাদিত হয়, এরপর সম্পদ উপস্থিত করা হয় এবং শরীকের হস্তক্ষেপ করার মতো উভয় শরীক সে সম্পদে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে এই হস্তক্ষেপ দ্বারাই শারিকা সংঘটিত হবে।
মালেকী আলেম খিরাশী খলীল রহ.-এর বক্তব্যের যে ব্যাখ্যা করেছেন তা থেকে বোঝা যায়, পুঁজি উপস্থিত করা বা উপস্থিতির স্থলবর্তী কোনো কিছু করা মালেকীদের মতে শর্ত। তবে পুঁজির ক্ষেত্রে নগদ অর্থের মধ্যে তিনি আলোচনা সীমিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, যদি এক শরীকের নগদ অর্থ অনুপস্থিত থাকে তাহলে শারিকা সহীহ হবে না। তবে যদি নগদ অর্থ কাছাকাছি সময়ে হস্তগত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে আর সম্পদ হাতে আসার পূর্বে ব্যবসা শুরু না করার ব্যাপারে উভয়ে একমত হয়, তাহলে শারিকা সহীহ হবে। পক্ষান্তরে যদি দূরবর্তী সময়ে সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, অথবা কাছাকাছি সময়ে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা উপস্থিত হওয়ার পূর্বেই উভয় শরীক ব্যবসার কার্যক্রম শুরু করতে একমত হয়, অথবা উভয় শরীকের নগদ অর্থ অনুপস্থিত থাকে, যদিও তা কাছাকাছি সময়ে উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে- উল্লিখিত কোনো ক্ষেত্রে শারিকা শুদ্ধ হবে না। তাদের কতকের মতে দূরবর্তী সময় হলো চার দিন। কারো মতে তা দশ দিশ। শেষোক্তটি খিরাশীর স্থিরীকৃত মত। তবে খিরাশী অন্য ব্যাখ্যার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যার অর্থ এই শর্ত আবশ্যক হওয়ার শর্ত; সহীহ হওয়ার শর্ত নয়। ৮৪
চতুর্থ শর্ত : উভয়ের সম্পদ এক করা : الْخَلْطُ
হানাফী ও হাম্বলী ফকীহদের মতে শারিকাতুল আমওয়ালে (যৌথপুঁজির কারবার) উভয় শরীকের সম্পদ এক করা শর্ত নয়। মালেকীদের সঠিক রায় হলো, এটি মৌলিকভাবে শারিকা সহীহ হওয়ার শর্ত নয়। বরং ইবনুল কাসিমের মতে তা শারিকা আবশ্যক হওয়ার শর্তও নয়। অধিকাংশ মালেকী ফকীহ তার সাথে অভিন্ন মত পোষণ করেন। ইবনে রুশদ ছাড়া অন্যদের মতে চুক্তি সংঘটন করলেই অর্থাৎ চুক্তির শব্দ পূর্ণ হওয়ার মাধ্যমেই শারিকা আবশ্যক হয়। চুক্তির সংঘটন 'আমরা শরীক হলাম' অথবা মৌখিক বা কার্যত কোনো আচরণ যা এই অর্থ ধারণ করে তা দ্বারা হোক না কেন। শর্ত হলো শুধু পুঁজির ক্ষেত্রে উভয় শরীকের দায় বা দায়িত্ব গ্রহণ। সুতরাং জামানাতের পূর্বে সম্পদ নষ্ট হলে মালিকের দায়ে বর্তাবে; অবশিষ্ট অংশের ক্ষেত্রে শারিকা প্রযোজ্য হবে। এ অংশ দ্বারা শারিকার উদ্দেশ্যে যা কিনবে, তা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী শারিকার জন্য কেনা হয়েছে বলে ধর্তব্য হবে। তবে অবশিষ্ট পুঁজির মালিক যদি তার শরীকের সম্পদ নষ্ট হওয়ার বিষয়টি জানার পর পণ্য কেনে, আর তার শরীক অংশগ্রহণ করতে অনিচ্ছুক হয় অথবা ক্রয়কারী শরীক দাবি করে যে পণ্যটি সে নিজের জন্য কিনেছে তাহলে এই পণ্যের মালিকানা ক্রেতার সাথে নির্দিষ্ট হবে। তবে মালেকী ফকীহদের মতে সম্পদ একত্র করার শর্ত মিছলী (বাজারে যার সদৃশ বিদ্যমান) বস্তুর সাথে নির্দিষ্ট। কীমী বস্তুর (বাজারে যার সদৃশ থাকে না) জামানত উভয়ের সম্পদ একত্র করার ওপর নির্ভরশীল নয়।
উভয়ের সম্পদ বাস্তবিকভাবে একত্র করা অর্থাৎ এমনভাবে একত্র করা যে, কারো সম্পদ আলাদা করা যায় না- তা অবাশ্যক নয়। এটি ইবনুল কাসিম-এর পছন্দনীয় মত। অধিকাংশ মালেকী ফকীহ এ মতের অনুসারী। বরং বিধানগত বিচারে একত্র করা যথেষ্ট। তা এভাবে যে, দুই শরীকের সম্পদ এক ব্যক্তির সংরক্ষিত স্থানে রাখা হলো অথবা দুই শরীকের সংরক্ষিত স্থানে রাখা হলো এভাবে যে, এক দোকানে উভয়ের সম্পদ আলাদা করে রাখা হলো আর এক শরীকের কাছে দোকানের চাবি থাকল অথবা প্রত্যেকের সম্পদ আলাদাভাবে এক একজন সংরক্ষকের কাছে রাখা হলো, আর উভয় সংরক্ষক একজন শরীকের নিকট অথবা উভয়ের সম্পদ রাখা স্থানের নিয়ন্ত্রক অথবা তাদের পছন্দমত কোনো বিশ্বস্ত লোকের হাতে তা অর্পণ করল।
শাফেয়ীদের মতে উভয়ের সম্পদ একত্র না করলে যৌথচুক্তি সম্পাদিত হবে না। অনুরূপ যদি এক করা হয়; তারপরও আলাদা থাকে শ্রেণীভিন্নতার কারণে, যেমন দুই দেশের দুই ছাঁচে তৈরি মুদ্রা অথবা সোনা ও রূপার মুদ্রা অথবা প্রকারগত ভিন্নতার কারণে, যেমন নতুন মুদ্রা ও পুরোনো মুদ্রা তাহলেও যৌথচুক্তি সম্পাদিদ হবে না। কারণ, মিশ্রিত মুদ্রাগুলোর পরস্পর ভিন্নতার দরুন তা হবে অমিশ্রণ ঘটানোর মতো। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক শরীক তার প্রদত্ত সম্পদের লাভ ও ক্ষতি বহন করবে। একত্র করার পূর্বে কারো সম্পদ নষ্ট হলে তা শুধু তার মালিকের দায় থেকে নষ্ট হবে। মালিক অন্য শরীকের নিকট থেকে ক্ষতি উসুল করতে পারবে না। চুক্তির পর সম্পদ একত্র করা শাফেয়ীদের মতে বিবেচ্য নয়। যদিও কতক শাফেয়ীর মতে, চুক্তির পর মজলিস ভেঙ্গে যাওয়ার পূর্বে উভয়ের সম্পদ এক করা হলেও চলবে। সেক্ষেত্রে বিলম্বিতভাবে এই সম্পদ একত্র করার পর সম্পদে হস্তক্ষেপের জন্য প্রত্যেক শরীক অপর শরীকের নিকট থেকে অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন হবে। স্পষ্টত দুইজন যে সম্পদ মীরাস হিসেবে বা কেনার সূত্রে বা তাদেরকে হেবা করার দরুন লাভ করে তা নিজে নিজেই চার প্রকার মিশ্রণে মিশ্রিত হয়; যদিও তা বিভিন্ন মূল্যের পণ্যজাতীয় বস্তু হোক না কেন। ৮৫
টিকাঃ
৭৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬০; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫১; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৭
৭৮. এ দুটিকে আভিধানিক ভাবে تبر বলা হয়, আগুনে এগুলোকে গলানো পর্যন্ত। অর্থাৎ খনিজে মিশ্রিত মাটি থেকে পরিষ্কার করার আগে। অন্যথায় এগুলোর নাম نقرة আল মিসবাহ অভিধানে আছে, نقرة অর্থ ঐ রৌপ্যটুকরা, যাকে খনিজ মাটি থেকে পরিস্কার করে আগুনে গলানো হয়েছে।
৭৯. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫০; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৫৯ ও ৩৬১; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১৫-১৬; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৬; আল-ফুরূ, খ. ২, পৃ. ৪১৭
৮০. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৬; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৬; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৭
৮১. আশ-শরহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৪৫৮-৪৬১; আল-খিরাশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৬; আল বাহজা শরহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২১২
৮২. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৫
৮৩. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬০; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১৪ ও ২২; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫১; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৬
৮৪. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৭; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৭, ৪৯৯, ৫০১; আল- খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ৫৮
৮৫. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬০; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৮; হাওয়াশী তুহফাতি ইবনি আসিম, খ. ২,,. ২১৩; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২৫৩; আল- খিরাশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৬, পৃ. ৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৩
📄 মূলপুঁজি সংক্রান্ত শারিকাতুল মুফাওযাযার সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি
এগুলো এমন শর্ত, যার একটি লঙ্ঘিত হলে শারিকাতুল মুফাওয়াযা শারিকাতুল আনানে পরিণত হয়।
প্রথম শর্ত : হানাফীদের মতে মূল পুঁজিতে সমপরিমাণ থাকা শর্ত। এটি শুরু এবং শেষ উভয় অবস্থাতেই বিবেচ্য। সুতরাং যতক্ষণ পুঁজিতে অংশীদারী বহাল থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত পুরো সময় সমপরিমাণ থাকা আবশ্যক। (এর উদাহরণ হলো, এক শরীকের পক্ষ থেকে এক হাজার দীনার, অপর শরীকের পক্ষ থেকে অনুরূপ এক হাজার দীনার।) কেননা শারিকা এমন চুক্তি, যা আবশ্যক নয়। প্রত্যেক শরীকের যখন ইচ্ছা তা বাতিলের অধিকার আছে। তাই এর অবস্থা হলো প্রতি মুহূর্তে নবায়িত চুক্তির ন্যায়। আর এই শারিকার 'মুফাওয়াযা' নামের দাবিতেই চুক্তির শুরু থেকে সমতা অব্যাহত থাকা শর্ত। সুতরাং সমান পুঁজির ভিত্তিতে শারিকা চুক্তি সম্পাদনের পর এক শরীক যদি মীরাস বা অন্যসূত্র যেমন দানসূত্রে মূল্যজাতীয় এমন সম্পদের মালিক হয়, যা দ্বারা শারিকা সম্পাদন বৈধ, আর শরীক তা কজা করে, তাহলে শারিকাতুল মুফাওয়াযা বাতিল হবে। সমতা নষ্ট হওয়ায় চুক্তিটি শারিকাতুল আনানে পরিণত হবে।
অপরদিকে যদি সে ঋণ বা পণ্যজাতীয় স্থাবর বা অস্থাবর এমন সম্পদের মালিক হয়- যা দ্বারা শারিকা সম্পাদন বৈধ নয়, তাহলে এগুলোর মালিক হওয়া শারিকার মূল পুঁজি হওয়ার যোগ্য সম্পদের ক্ষেত্রে সমতার পরিপন্থী নয়। তাই এটি মুফাওয়াযা অব্যাহত রাখারও বিপরীত নয়। তবে যদি মূল্য হিসাবে ঋণ কব্জা করে তাহলে তখন পরিপন্থী হওয়া সাব্যস্ত হবে। সুতরাং মুফাওয়াযা বাতিল হয়ে তা আনানে পরিবর্তিত হবে। ৮৬
আবু হানীফা রহ.-এর সূত্রে দুটি বর্ণনার প্রসিদ্ধটি অনুসারে পুঁজি সমান হওয়ার ক্ষেত্রে মুদ্রার ভিন্নতা ধর্তব্য নয়। যেমন এক শরীকের স্বর্ণজাতীয় মুদ্রা, অপর শরীকের রৌপ্যজাতীয় মুদ্রা- যদি বাজারমূল্য হিসেবে উভয়ের প্রদত্ত অংশ সমান হয়। যদি এক শরীকের প্রদত্ত অংশের বাজারমূল্য বেড়ে যায় তাহলে শারিকাটি মুফাওয়াযা থেকে আনানে পরিণত হবে। তবে পণ্য কেনার পর যদি উভয়ের অংশে বা একজনের অংশের বাজারমূল্য বেড়ে যায় তাহলে ভিন্ন কথা। কেননা প্রথম অবস্থায় যৌথপুঁজি মূল পুঁজি থেকে পণ্যের মূল্যে পরিণত হয়েছে। সুতরাং পুঁজির ক্ষেত্রে যুগপৎ অংশীদারীতেও তারতম্য হয়নি। আর দ্বিতীয় অবস্থায় পণ্যের মূল্য বাদে অতিরিক্ত অংশ যেন উভয়ের যৌথ মালিকানার। কেননা পণ্যের মূল্যের অর্ধেক অপর শরীকের প্রাপ্য; যেহেতু উভয়ের প্রদত্ত অংশের সমুদয় দিয়ে পণ্য কেনা খুব কম হয়ে থাকে। তাই সূক্ষ্ম যুক্তির দাবি হলো জটিলতা দূর করার স্বার্থে এটিকে প্রথম অবস্থার সাথে যুক্ত করা। যদিও সাধারণ যুক্তির চাহিদা হচ্ছে, এ অবস্থায় মুফাওয়াযা চুক্তি বাতিল হওয়া।
ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে, ৮৭ মালেকী ও হাম্বলীগণ মুফাওয়াযার সম্পাদন বৈধ হওয়ার জন্য পুঁজিতে উভয় শরীকের সমান হারে অংশগ্রহণ শর্ত করেন না। ৮৮
দ্বিতীয় শর্ত : পুঁজি হওয়ার যোগ্য উভয় শরীকের সমুদয় সম্পদ পুঁজিরূপে : شُمُوْلُ رَأْسِ الْمَالِ لِكُلِّ مَا يَصْلُحُ لَهُ مِنْ مَالِ الشَّرِيْكَيْنِ
পূর্বে আলোচিত হয়েছে, হানাফীদের মতে মূল্যজাতীয় বস্তুই শুধু পুঁজি হওয়ার যোগ্য, যদি তা নগদ বস্তু হয়; ঋণ নয় এবং তা বর্তমান হয়; অনুপস্থিত নয়। এক্ষেত্রে সৃষ্টিগতভাবে মূল্যজাতীয় বা প্রচলনের ভিত্তিতে মূল্যজাতীয় হওয়ার বিধান এক।
সুতরাং কোনো শরীকের যদি পুঁজি হওয়ার যোগ্য কোনো সম্পদ থাকে যা সে পুঁজির বাইরে রাখা প্রাধান্য দেয়, তাহলে শারিকাটি শারিকাতুল আনান হবে; শারিকাতুল মুফাওয়াযার সংজ্ঞা প্রয়োগ না হওয়ায় এটি মুফাওয়াযা হবে না। এক্ষেত্রে সে সম্পদ শরীকের হস্তগত নাও হতে পারে, যেমন অন্যের কাছে গচ্ছিত সম্পদ। যে সম্পদ পুঁজি হওয়ার অযোগ্য দুই শরীকের যার ইচ্ছা সে সম্পদের একক মালিক হলে তাতে মুফাওয়াযার পরিবর্তন হবে না। এর কারণ এমন সম্পদ অংশীদারী গ্রহণ করে না। তাই একক মালিকানার বিষয়টি কোনো শরীকের স্ত্রী ও সন্তানসন্ততির অধিকারী হওয়ার অনুরূপ। সুতরাং যে কোন পণ্য (এর আওতায় বাজারে সদৃশ বিদ্যমান বস্তু ও স্থাবর সম্পত্তি অন্তর্ভুক্ত), ঋণ বা অবর্তমান মুদ্রা তার ইচ্ছা অনুযায়ী সে তা নিজ মালিকানায় নিয়ে আসতে পারে, যতক্ষণ এ মুদ্রা অবর্তমান আছে। এ বিষয়ে ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মতপার্থক্য রয়েছে। সুতরাং সে যদি মুদ্রাকে ঋণরূপে কজা করে অথবা অবর্তমান মুদ্রা বর্তমান হয়, তাহলে শারিকাটি মুফাওয়াযা থেকে পরিবর্তিত হয়ে আনান হয়ে যাবে, যেহেতু সমপরিমাণ সম্পদের মালিকানা অব্যাহত রাখা মুফাওয়াযার ক্ষেত্রে শর্ত। ৮৯
তৃতীয় শর্ত : প্রত্যেক শরীকের জন্য সকল ব্যবসা করার সুযোগ থাকা إِطْلَاقُ التَّصَرُّفِ لِكُلِّ شَرِيكَ فِي جَمِيعِ أَنْوَاعِ التَّجَارَةِ
এটি হানাফীদের মতে শর্ত। প্রত্যেক শরীক নিজ ইচ্ছামাফিক যে কোনো প্রকার ব্যবসা করবে। সে ব্যবসার আকার কম হোক বা বেশি, সহজ হোক বা কঠিন, সস্তা হোক বা চড়া মূল্যের বিধান অভিন্ন। এমনকি দুই শরীক যদি শর্ত করে যে, তাদের উভয়ে বা একজন কতক প্রকার ব্যবসায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, যেমন জমির ফসলাদি বা মেশিন ও যন্ত্রপাতির ব্যবসা করবে না অথবা একজন শুধু এটার ব্যবসা করবে, সেটার ব্যবসা নয়; অপরজন শুধু সেটার ব্যবসা করবে, এটার ব্যবসা নয়; তাহলে এই শারিকা মুফাওয়াযা থাকবে না। বরং তা আনান হয়ে যাবে। এর কারণ, ব্যবসাযোগ্য সকল বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকা এবং কোনো প্রকার ব্যবসার সাথে শারিকাকে বিশিষ্ট না করা মুফাওয়াযার দাবি। যেমনটা হিদায়া গ্রন্থকার বলেছেন।
প্রত্যেক শরীকের নিঃশর্ত কার্যক্রমের শর্ত মালেকীগণ ও হাম্বলীদের মতে বিদিত নয়। এর কারণ, মালেকীগণ মুফাওয়াযাকে দুভাবে বিভক্ত করেন। ১. সাধারণ, কোনো এক প্রকার ব্যবসার সাথে যা নির্দিষ্ট নয়। ২. খাস, যা সাধারণের বিপরীত।
হাম্বলীদের বক্তব্য থেকে উল্লিখিত মতটি তাদেরও মত বলে বোঝা যায়। কেননা তারা যদিও সকল প্রকার ব্যবসায়ী কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করে এমন এক নির্দিষ্ট প্রকার মুফাওয়াযার মত দেন, তবুও তাদের মতে একটি প্রকার এমন রয়েছে যেখানে কতক শরীক কতককে নির্দিষ্ট প্রকারে সীমিত করতে পারে। ২০
টিকাঃ
৮৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৭৮; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫০
৮৭. আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৪; আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬৬, ৩৬৭
৮৮. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৬; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬১
৮৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬১; ফাতহুল কাদীর আল ইনায়া, আল হিদায়া, খ. ৫, পৃ. ৬; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৮
২০. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৫-৬; আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৮; তাদের পূর্বে ইবনে নুজাইম আর পর ইবনে আবিদীন। রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫১; আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৯; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৫৩
📄 শারিকাতুল আমাল-এর সাথে বিশিষ্ট শর্তাবলি
প্রথম শর্ত : এই শারিকার ক্ষেত্র হচ্ছে কাজ। কেননা কাজ সম্পাদন শারিকাতুল আমালের মূল পুঁজি। কোনো শরীকের পক্ষ থেকে যদি কাজ সম্পাদন না হয় তাহলে শারিকা সহীহ হবে না। তবে এই কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে উভয় শরীকের কাজ গ্রহণে চুক্তিবদ্ধ হওয়া যথেষ্ট। যদিও উভয়ের জন্য কাজ গ্রহণের অধিকার সাব্যস্ত করা হয়, অথবা একজনের জন্য কার্য বিচারে আর অপরের জন্য তাত্ত্বিক বিচারে অর্থাৎ যৌথচুক্তির চাহিদা অনুযায়ী প্রত্যেকের অধিকার থাকবে উভয়ের সম্মতিপূর্ণ কাজ গ্রহণ করা। যেহেতু যৌথচুক্তির দাবি হিসেবে প্রত্যেক শরীক কাজ গ্রহণের ক্ষেত্রে অপরের ওকীল, যদিও গ্রহণকৃত কাজ সে সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম না দেয়। কিন্তু কোনো কারণে সে যদি তার শরীকের জন্য কাজ গ্রহণের অধিকার ছেড়ে দেয়- কখনো কখনো শারিকা চুক্তি ও উভয় শরীকের বিচারে তা যৌক্তিকও হয়ে থাকে-সে যদি অধিকার ছেড়ে দেওয়ার পর কাজ গ্রহণের ক্ষেত্রে তার অধিকার পুনরায় প্রয়োগ করতে চায়, তাহলে তাকে বাধা দেওয়ার অধিকার অপর শরীকের নেই।
যৌথচুক্তি সম্পাদনের পর এক শরীক যদি কাজ গ্রহণ করে এবং এককভাবে কাজ আঞ্জাম দেয়, যেমন কাপড় সেলাইয়ের কাজ গ্রহণ করল। তারপর সে কাপড় কাটল ও সেলাই করল, তাহলে পারিশ্রমিক তার ও অন্য শরীকের মাঝে অর্ধেকহারে ভাগ হবে- যদি শারিকাতুল মুফাওয়াযা হয়ে থাকে; অথবা উভয়ের সম্মতিপূর্ণ আনুপাতিক হারে বণ্টিত হবে- যদি শারিকাতুল আনান হয়ে থাকে। এর কারণ, কাজ গ্রহণ উভয়ের পক্ষ থেকে হয়েছে, যেহেতু অর্ধেক কাজগ্রহণ হয়েছে অপর শরীকের পক্ষ থেকে ওকালাতের ভিত্তিতে। আর কাজটি গ্রহণ করার পর তা উভয়ের দায়ে যুক্ত হয়েছে। সুতরাং সম্পূর্ণ কাজ এক শরীকের সম্পাদন করা তার পক্ষ থেকে অপর শরীকের কাজ সম্পাদনে সহযোগিতা ও স্বেচ্ছাসেবা হিসেবে ধর্তব্য হবে। যেহেতু দায় আবশ্যক হয় লাভের ভিত্তিতে। ২১
কোনো শরীকের শ্রমমুক্ত ফাসিদ শারিকার নমুনা হলো, কাপড় ধোওয়ার যৌথচুক্তি ৯৩। এ চুক্তিতে উভয় শরীক একমত হয় যে, একজন ওয়াশিং মেশিন পেশ করবে আর অপরজন কাজগ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার পুরো কাজ করবে। পরে লাভ বণ্টন ছাড়া প্রথমজনের কোনো কাজ নেই। এই শারিকা ফাসেদ হওয়ার কারণে কার্য সম্পাদনকারী পাবে পারিশ্রমিক। কেননা তার কাজ দ্বারা সে এই পারিশ্রমিকের হকদার হয়েছে। আর ওয়াশিং মেশিন সরবরাহকারীকে সে মেশিনের ভাড়া হিসাব করে টাকা দেবে।
হানাফীদের মতে উল্লিখিত শারিকা ফাসিদ। তবে হাম্বলীদের মতে কাপড় ধোওয়া ও অন্যান্য পেশার যৌথচুক্তি বৈধ এই শর্তে যে, উভয় শরীক কাজ করবে একজনের যন্ত্র দিয়ে অন্যজনের জায়গায়। আর পারিশ্রমিক তাদের মাঝে বণ্টিত হবে। কেননা পারিশ্রমিক কাজের পরিবর্ত; মেশিন ও জায়গার পরিবর্ত নয়। মোটকথা, এক শরীক যন্ত্রের অর্ধেক দিয়ে স্বেচ্ছাসেবা ও সহযোগিতা করেছে আর অপর শরীক অর্ধেক জায়গা দিয়ে সহযোগিতা করেছে। তবে হ্যাঁ, যদি শারিকা ফাসিদ হয়ে যায় তাহলে মেশিন, জায়গা ইত্যাদি শরীকদের দেওয়া বস্তু ও তাদের কাজের অনুপাতে অর্জিত পারিশ্রমিক বণ্টন করা হবে। এটিই হাম্বলীদের স্পষ্টভাষ্যের মত। ১৪
শারিকাতুল আমাল হলে, শরীক লাভে অংশীদার হবে, যদিও সে কাজ না করে। এটি হাম্বলীদের স্থিরীকৃত মৌলিক বিষয়। যদিও তাদের কতক ফকীহ, যেমন ইবনে কুদামা এ মত প্রকাশ করেন যে, ওজর ছাড়া যে কাজ ছেড়ে দেবে সে শরীককে লাভের অংশ থেকে বঞ্চিত করা হবে, যেহেতু সে নিজের ওপর শর্তকৃত বিষয় আদায়ে ত্রুটি করেছে।
উল্লিখিত অবস্থায় শারিকা বাতিল হওয়ার বিষয় স্পষ্টভাবে না বললেও মালেকীদের স্থিরীকৃত মত হচ্ছে, এক শরীকের দীর্ঘ অসুস্থতা বা অনুপস্থিতির পর শারিকাতুল আমালে অপর শরীক যে কাজ করবে সে কাজের দায়, সম্পাদন ও কাজের পারিশ্রমিক তার সাথে নির্দিষ্ট হবে। তবে যদি দ্বিতীয় শরীক প্রথম শরীকের সুস্থ অবস্থায় উপস্থিতির সময় অথবা সামান্য সময়ের অসুস্থতা বা অনুপস্থিতির পর কাজ গ্রহণ করে তাহলে ভিন্ন বিধান হবে। ৯৫
মালেকীগণ যন্ত্রকে কাজের সম্পূরক গণ্য করেন। সুতরাং অবশ্যই যন্ত্র হবে কাজে শরীকের অংশের সমান। যেমন কাজে কোনো শরীকের উদাহরণত তিন ভাগের এক ভাগ বা অর্ধেক অংশ থাকলে তার জন্য দুই তৃতীয়াংশ যন্ত্র প্রদানের শর্ত করা যাবে না, চুক্তিতে এই অতিরিক্ত অংশ বিবেচনা করা যথার্থ হবে না। অতিরিক্ত অংশের শর্তের প্রেক্ষিতে কাজ ও লাভের ক্ষেত্রে তারতম্য হওয়ার দরুন তা শারিকা বাতিলের কারণ হবে, পার্থক্যের বিবেচনা পরিপূর্ণভাবে গুরুত্ব প্রদান করা হবে। যদিও চুক্তির পর স্বেচ্ছাদানের সীমা অনির্ধারিত। সুতরাং এক শরীক চুক্তিতে সম্পূর্ণ যন্ত্র বিনামূল্যে প্রদান করলে কেমন হবে?
যদিও সাহনূন ও তার অনুসারী মালেকী ফকীহগণ এক শরীকের যন্ত্রপ্রদান যথেষ্ট মনে করেন না। বরং তাদের মতে, উভয় পক্ষের বস্তুর মালিকানা বা উপকার গ্রহণের মালিকানা অথবা একপক্ষের বস্তুমালিকানা আর অপর পক্ষের উপকার গ্রহণের মালিকানা হিসেবে যন্ত্র উভয় শরীকের যৌথ মালিকানাধীন হওয়া শর্ত। একপক্ষের বস্তুমালিকানা আর অপরপক্ষের উপকার গ্রহণের মালিকানার উদাহরণ হলো, যন্ত্রটি এক শরীকের মালিকানাধীন। সে অপর শরীকের কাছে কাজে তার অংশ পরিমাণ যন্ত্র ভাড়া দিল। অথবা উভয় শরীকের নিজমালিকানার যন্ত্র আছে। তবে তারা চুক্তিতে উদ্দিষ্ট আনুপাতিক অংশহারে নিজ যন্ত্রের অংশ অপরের যন্ত্রের অংশের বিনিময়ে ভাড়া নিল। বরং ইবনুল কাসিম যন্ত্রের জামানাতের ক্ষেত্রে উভয় শরীক সমান হওয়া আবশ্যক মনে করেন। সুতরাং যন্ত্র একজনের বস্তুমালিকানাধীন আর অপরের উপকার গ্রহণের মালিকানাধীন এমন হওয়া বৈধ নয়।
কোনো শরীকের জন্য নির্দিষ্টভাবে শ্রমদানের শর্ত করা হলে তাতে শারিকা ফাসেদ হওয়ার বিষয়ে অধিকাংশ হাম্বলী ফকীহ অভিন্ন মত পোষণ করেন। তবে ইবনে কুদামা শারিকা সহীহ হওয়ার মত গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সে শ্রমদানের জন্য অপরকে নিজ জন্তু দেয় আর উপার্জন উভয়ের মাঝে বণ্টন হয়। এ মাসআলায় ইমাম আহমদ ও আওযাঈ রহ.-এর স্পষ্ট বক্তব্যে এটি কিয়াসসম্মত মত। ইবনে তাইমিয়া এ মত পোষণ করেন।
সব শরীকের জন্য শ্রমদানের শর্ত করা হোক বা কতক শরীকের জন্য, সর্বাবস্থায় শারিকা বাতিল হওয়া শাফেয়ীদের মত। কেননা এগুলো পৃথক পৃথক সম্পদ। সুতরাং সহীহ শারিকার আওতায় এগুলো একত্র হতে পারে না। সুতরাং এক্ষেত্রে ফাসেদ শারিকার বিধানাবলি প্রযোজ্য হবে। ৯৬
দ্বিতীয় শর্ত : যৌথ কাজটি এমন হওয়া চাই ইজারা চুক্তিতে যার দাবি করা যায়। যেমন কাপড় বোনা, কাপড় বানানো, কাপড় সেলাই করা, অলংকার তৈরি করা, কামারের কাজ ও ছুতাবের কাজ এবং লেখা বা অংক বা চিকিৎসাশাস্ত্র বা ইঞ্জিনিয়ারিং বা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া। অনুরূপভাবে পরবর্তী যুগের ফকীহদের ফতোয়া অনুযায়ী সূক্ষ্ম যুক্তির আলোকে কুরআন, ফিকহ, হাদীস ইত্যাদি সকল শরয়ী ইলমের শিক্ষাদান। যদিও শেষোক্তগুলোর ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, অন্যান্য দীনী কাজের মতো এগুলোতে ইজারা বৈধ না হওয়া।
যে কাজ ইজারাচুক্তির মাধ্যমে দাবি করা যায় না, সে কাজের ক্ষেত্রে শারিকাতুল আমাল সহীহ হবে না। শরীয়তনিষিদ্ধ সকল কাজ এর আওতাভুক্ত। যেমন মৃত ব্যক্তির শোকে কাঁদার জন্য লোক ভাড়া করা, উলঙ্গ নৃত্য এবং মাখরাজ সহীভাবে উচ্চারণে বিঘ্নতা ঘটায় এমন সুরে কুরআনের তেলাওয়াত। অনুরূপ সকল দীনী কাজ এর আওতাভুক্ত। তবে পরবর্তী ফকীহগণ তীব্র প্রয়োজনের কারণে যেগুলো ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করেছেন সেগুলোর বিধান ভিন্ন।
যেন শরয়ী ইলমগুলো লুপ্ত না হয় আর দীনী নিদর্শানাবলি পরিত্যক্ত না হয়। যেমন আযান দেওয়া, ইমামতি করা ও কুরআনের শিক্ষাদান। ৯৭ সুতরাং ওয়াজকারীদের চুক্তি বৈধ নয়, যারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওয়াজ করবে এবং আখেরাত স্মরণ করাবে। অনুরূপ সাক্ষীদের যৌথচুক্তি বৈধ নয়। যেহেতু মিথ্যা সাক্ষ্য হলে তা শরীয়তে নিষিদ্ধ আর সত্য হলে তা দীনী কাজ বা ফরজ পর্যায়ের। সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে সাক্ষ্যগ্রহণ ও সাক্ষ্যপ্রদান এক, যেমনটা যথাস্থানে বিস্তারিত বিবৃত হয়েছে। ৯৮
টিকাঃ
২১. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৮; আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩২৯
৯৩. বর্তমানে এটি المنجلة নামে পরিচিত। মিসবাহ অভিধানে আছে : قصرت الثوب قصراً بيضته 'কাপড় সাদা করা। القصارة অর্থ শিল্প। এর ইসমে ফায়েল হচ্ছে: قصار
১৪. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৮; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৪; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৫০
৯৫. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩৩; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৬১; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১১৫
৯৬. আল খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬৮, ২৭০-২৭১; বুলগাতুল সালিক, খ. ২, পৃ. ১৭২; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৫০; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৭
৯৭. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২২৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৬
৯৮. মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৩৬৯; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৮-৩৫৯