📄 হানাফীদের বক্তব্য অনুসারে শারিকাতুল আবদান দু'প্রকার
প্রথম প্রকার: কতক কাজ বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট কতক গুলোর সাথে সম্পর্কিত। যেমন ছুতারের কাজ বা কামারবৃত্তি। কাজ দুটি এক হোক বা ভিন্ন ভিন্ন হোক।
দ্বিতীয় প্রকার: হলো নিঃশর্ত যৌথ কারবার, যাউল্লিখিত শর্তের সাথে যুক্ত নয়। যেমন তারা একমত হয়ে যে-কোনো পারিশ্রমিকের বিনিময়ে যে-কোনো প্রকার কাজ করবে। ৪২
শারিকাতুল ওজুহ : (شركة وجوه) হলো দুই বা ততোধিক ব্যক্তি পুঁজি ছাড়া চুক্তিবদ্ধ হওয়া এই মর্মে যে, তারা বাকিতে পণ্যসামগ্রী কিনবে আর তা নগদ মূল্যে বিক্রি করবে। আর পণ্যের মূল্যের দায় অনুপাতে তাদের মাঝে লাভ বণ্টিত হবে। ৪৩
এমনই মত হাম্বলী মাযহাবের কাজী ঈয়ায ও ইবনে আকীলের। তারা লাভ নির্ধারণ করেছেন পণ্যের মালিকানা অনুসারে, যেন তা দায়মুক্ত বস্তুর লাভ না হয়। কিন্তু অধিকাংশ হাম্বলী ফকীহ এ কারবারের লাভ উভয় শরীকের শর্ত অনুযায়ী বণ্টনের মত দিয়েছেন। যেমন শারিকাতুল আনান-এ তাদের মত। যেহেতু এই শারিকায় শারিকাতুল আনানের অনুরূপ কাজ ও অন্যান্য বিষয় রয়েছে। বিশেষত ব্যবসায়িক দক্ষতা ও মানুষের কাছে সম্মানের ক্ষেত্রে দুই শরীকের মাঝে যে ব্যবধান আছে তা-ও লক্ষণীয়। বরং ইবনে কুদামা এই শারিকার চূড়ান্ত পর্যায় লক্ষ করে তা পুঁজিমুক্ত হওয়াকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মুদারাবা: মুদারাবার পরিচয় ও বিধানাবলি এ সংক্রান্ত আলাদা অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। দেখুন : مُضَارَبَةٌ
টিকাঃ
৪২. আল-খানিয়া হিন্দিয়্যাসহ, খ. ৩, পৃ. ৬২৪; আল-খিরাশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৬৭
৪৩. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩০
📄 সমান বা কমবেশির বিবেচনায় শারিকাতুল আকদের প্রকারভেদ
পাঁচটি বিষয়ে সমান বা কমবেশি হওয়া উদ্দেশ্য: ১. যৌথ কারবারের পুঁজি (نفوذ): যৌথ কারবারের উপযোগী উভয় শরীকের সকল অর্থ সম্পদ এর অন্তর্ভুক্ত; ২. পুঁজির দ্বারা সকল ব্যবসায়িক কার্য সম্পাদন; ৩. লাভ; ৪. ব্যবসায়িক ঋণ থেকে প্রত্যেক শরীকের আবশ্যক অংশের কাফালাত বা দায়িত্ব গ্রহণ। ৫. কার্য পরিচালনার যোগ্যতা। ৪৪
এ বিষয়গুলোর বিচারে যৌথ চুক্তি দুভাগে বিভক্ত: ১. শারিকাতুল মুফাওয়াযা (شَرِكَةُ مُفَاوَضَةِ), ২. শারিকাতুল আনান (شركة عنان)।
হানাফী ফকীহদের মতে শারিকাতুল মুফাওয়াযা হলো : যে শারিকায় উভয় শরীকের মাঝে শারিকার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণ সময়ব্যাপী উপরিউক্ত পাঁচ বিষয়ে সমতা পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান। কেননা শারিকাতুল মুফাওয়াযা হলো দুই পক্ষ থেকে সম্পাদিত সকল জায়েয চুক্তির অন্যতম। প্রত্যেকের যখন ইচ্ছা তা বাতিল করার অধিকার আছে। তাই এ শারিকার থাকা অব্যাহত অবস্থায় প্রাথমিক অবস্থার বিধান দেওয়া হয়েছে। আর প্রাথমিক অবস্থায় সমতাবিধান শর্ত করা হয়েছে। ৪৬
শর্তাদি ব্যাখ্যার আলোচনায় উল্লিখিত পাঁচ বিষয়ের পূর্ণ ব্যাখ্যা আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
শারিকাতুল আনান হচ্ছে ঐ শারিকা যার মাঝে উল্লিখিত সমতা নেই। মৌলিকভাবে এই সমতা অনুপস্থিত অথবা চুক্তির সময় বর্তমান থাকলেও পরে তা দূর হয়ে গেছে। যেমন চুক্তির সময় উভয় শরীকের সম্পদ ছিল সমান। এরপর তা দিয়ে কেনার পূর্বে একজনের সম্পদের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পেল। তখন এই মূল্যবৃদ্ধির কারণেই চুক্তিটি শারিকাতুল আনান-এ রূপান্তরিত হবে। ৪৭
উল্লিখিত বিষয়গুলোতে পরস্পরের সমতা বিধানের কারণেই এই শারিকাকে শারিকাতুল মুফাওয়াযা নামে নামকরণ করা হয়েছে। কেননা মুফাওয়াযা শব্দের অর্থ অগ্রিম বিচারে সমতা বিধান, যেমনটা মুহীতুল মুহীত গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে।
لا يصلح الناس فوضى لاسراة لهم ( "লা ইয়াসলুহুন নাসু ফাওদান লা-ইসরাতা লাহুম) এর অর্থ বিশৃঙখল অবস্থায় লোকদের সংশোধন হবে না, যাদের কোন নেতা নেই। উলিখিত ফাওদা র অর্থ, সবাই এক পর্যায়ের। তাদের এমন কোন নেতা নেই, যে তাদের ঝগড়া বিবাদ মীমাংসা করবে আর সবল থেকে দুর্বলের প্রাপ্য আদায় করবে।
শারিকায় কাফালাত কি বাতিল হবে? স্পষ্ট বিধান হলো, হ্যাঁ বাতিল হবে। কেননা তা অজ্ঞাত ব্যক্তির জন্য কাফালাত। সুতরাং গৌণ হওয়া ছাড়া তা বৈধ নয়। আর শারিকাতুল আনানে কাফালাত অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে কাফালাত শারিকায় উদ্দিষ্ট বিষয় হয়। আর তা এমন উদ্দিষ্ট বিষয় যা অজ্ঞাত ব্যক্তির পক্ষে গ্রহণ করা বৈধ নয়। তবে ফাতাওয়া খানিয়াতে বৈধতার মত উদ্ধৃত হয়েছে। সম্ভবত এর কারণ, কাফালাত সর্বাবস্থায় শারিকায় অমৌল বিষয়, যদিও কাফালাতের কথা পরিষ্কারভাবে বলা হোক না কেন। ৪৮
মুফাওয়াযা বৈধ হওয়ার জন্য উলিখিত পাঁচ বিষয়ের সমতাবিধান মালেকীদের মতে শর্ত নয়। বরং তাদের মতে শারিকাতুল আনান ও শারিকাতুল মুফাওয়াযা'র বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য হলো, শারিকাতুল মুফাওয়াযায় প্রত্যেক শরীক অন্য শরীকের জন্য কার্যসম্পাদনকে শর্তমুক্ত করে। ফলে প্রতিটি হস্তক্ষেপে এক শরীক অপর শরীকের কাছে যেতে বাধ্য থাকে না। শারিকা সংক্রান্ত যে-কোনো হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে তার মতামত আছে কিনা তা যাচাইয়ের প্রয়োজন হয় না। শারিকাতুল আনানের বিষয় ভিন্ন, সেখানে উল্লিখিত বিষয়ে অপর শরীকের অনুমতি ও অনুমোদন আবশ্যক। ৪৯
টিকাঃ
৪৪. স্পষ্ট এই পাঁচটি বিষয় বিন্যস্ত করা হয়েছে সম্পদের অংশীদারী বিবেচনায় রেখে। সকল যৌথচুক্তিতে এর প্রয়োগ করতে যে ব্যাখ্যার প্রয়োজন তা তো স্পষ্ট। যেমন শারিকাতুল আমাল-এর ক্ষেত্রে কাজ গ্রহণ করা পুঁজির স্থলবর্তী। আর কাজের দেখাশোনো মূলপুঁজিকে খাটানোর স্থলবর্তী। শারিকার কারণে যে বিষয়াদির কাফালাত গ্রহণ আবশ্যক তা ব্যবসায়ে ঋণের কাফালাত গ্রহণের স্থলবর্তী। আর শারিকাতুল ওজুহ-এর ক্ষেত্রে দু শরীকের ব্যক্তিসম্মানের পাশাপাশি পণ্যাদির মূল্যের ক্ষেত্রে তাদের আবশ্যকীয় দায় শারিকায় পুঁজির স্থলবর্তী।
৪৫. عنان (আনান) শব্দের উৎপত্তি عن (আন) শব্দ থেকে। অর্থ : মনে হওয়া। সুতরাং মনে হওয়ার আগের ও পরের অবস্থা এক সমান হবে না। শারিকাতুল আনান-এর শরীকের অবস্থাও অনুরূপ। শারিকাতুল মুফাওয়াযায় যে বিষয়গুলোর সমতা শর্ত সেগুলোর সবগুলোতে বা কোনো কোনটিতে সমতা রয়েছে বলে এই শরীকের ধারণা হয়। পরে হয়তো সমপর্যায় ক্ষুণ্ণ হয়। কাসানী ও আসমাঈ-র মতে শব্দটি عنان الفرس (আনানুল ফারাস) ঘোড়ার লাগাম শব্দ থেকে গৃহীত। এ নামকরণের সূত্র হচ্ছে ঘোড়সওয়ার একহাতে লাগাম ধরে। অপরহাতে ঘোড়া পরিচালনা করে। অনুরূপ অবস্থা শারিকাতুল আনান-এর এই শরিকায়, শরীকের আংশিক সম্পদে শারেকা হয়ে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে আপত্তি হলো, জামিদ ইসম থেকে শব্দের নির্গত হওয়া শ্রুতি নির্ভর। যেমন استحسف و استحجر (ইস্তাহসাফা ও ইস্তাহজারা) শারিকাতুল আনান আরবদের পরিচিত কারবার ছিল। তাই অযৌক্তিক শব্দ নির্গত ব্যাখ্যার কোনো প্রয়োজন নেই। বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৫৭; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২০
৪৬. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৬
৪৭. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৬
৪৮. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২০; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫
৪৯. আল-খিরাশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৮-২৬৫; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৭১; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭৪
📄 হাম্বলীদের মতে মুফাওযাযা-র দুটি অর্থ রয়েছে
প্রথম অর্থ: চারটি শারিকা অর্থাৎ আনান, মুফাওয়াযা, আবদান ও ওজুহ-এর একত্রিত অবস্থান। দুই শরীকের প্রত্যেকে তার শরীকের জন্য মুদারাবা ও এ সকল শারিকার সকল কার্যসম্পাদনের দায়িত্ব অর্পণ করলে শারিকা সহীহ হবে। কেননা এটি একাধিক সহীহ শারিকার সমষ্টি। উভয় শরীকের কৃত শর্ত অনুসারে লাভ বণ্টিত হবে। আর লোকসান উভয়ের পুঁজি অনুপাতে।
দ্বিতীয় অর্থ: দুই বা ততোধিক শরীক কারবারের অনুকূলে ও প্রতিকূলে যা কিছু সাব্যস্ত হয় তাতে শরীক থাকবে। এটিও সঠিক, তবে এ শর্তে যে, এর মাঝে তারা বিরল উপার্জন বা ক্ষতিপূরণ অন্তর্ভুক্ত করবে না। অন্যথায় প্রত্যেক শরীক নিজ অর্জিত সম্পদ ও কর্ম এবং এর সাথে আবশ্যক বিভিন্ন দায়ের ক্ষেত্রে একক থাকবে। 'কেননা প্রত্যেক মানুষ ভালো যা অর্জন করে তা তার। আর মন্দ যা উপার্জন করে তাও তার।' (لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ) ৫০
বিরল উপার্জনের নমুনা হলো কুড়িয়ে পাওয়া সম্পদ, ভূতলে প্রোথিত সম্পদ ও মীরাছ। আর ক্ষতিপূরণের নমুনা হলো: কাফালাত, ছিনতাই, অপরাধের কারণে বা ধারকৃত বস্তু নষ্ট করার কারণে যা আবশ্যক হয়। ৫১
এই প্রকারের ক্ষেত্রে হাম্বলীগণ উভয় শরীকের সম্পদ অথবা কার্যক্ষমতা ও যোগ্যতা সমান হওয়ার শর্ত করেন না।
টিকাঃ
৫০. সুরা বাকারা, আয়াত ২৮৬
৫১. আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৫, পৃ. ১৯৮; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৫৩; আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪৬৪
📄 সাধারণ ও বিশেষ অবস্থা বিবেচনায় যৌথ চুক্তির প্রকারভেদ
হানাফী ফকীহদের মতে এই বিবেচনায় যৌথ চুক্তি দু'প্রকার: ১. مُطْلَقَةٌ : মুতলাক বা শর্তমুক্ত; ২. মুকাইয়াদ বা مُقَيَّدَةً: শর্তযুক্ত।
মুতলাক বা শর্তহীন হলো যাকে এক বা একাধিক শরীকের কাঙ্ক্ষিত কোনো শর্ত দ্বারা শর্তযুক্ত করা হয় না। যেমন নির্দিষ্ট ব্যবসাকেন্দ্র, সময়, স্থান অথবা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির সাথে লেনদেনের শর্ত না করা। অর্থাৎ দুই শরীক সব ধরনের ব্যবসায়ে যৌথ অংশগ্রহণ করবে এবং কোনো ধরনের কোনো শর্ত করবে না। এই নিঃশর্ত রাখার দিক তারা দুইয়ের অধিক গ্রহণ করবে না- শর্তহীন সময় বা অন্য কিছু- তাহলে তা হবে শারিকাতুল আনানে।
শারিকাতুল মুফাওয়াযায় অবশ্যই সকল প্রকার ব্যবসা নিঃশর্ত ভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। যেমনটা হিদায়া'র স্পষ্টভাষ্য দ্বারা বুঝে আসে। যদিও আল বাহরুর রায়েকে রয়েছে, এই শারিকা কখনো নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসার শর্তে শর্তযুক্ত হতে পারে। ৫২ নিঃশর্ত সময় এই কারবারে একটি সম্ভাব্য বিষয়, আবশ্যিক নয়।
শর্তযুক্ত যৌথচুক্তি হলো যা উল্লিখিত শর্তাদিযুক্ত হয়। যেমন কোনো বস্তু, সময় বা স্থানের শর্তযুক্ত হওয়া। যেমন বিভিন্ন শস্য, তৈরি পোশাক, যানবাহন বা তরিতরকারীর শর্ত করা। অথবা এ বছরের তুলার মওসুমে বা এই জেলায় কারবার পরিচালনার শর্ত করা। কতক দোকান বা ব্যবসাকেন্দ্রের শর্ত করা শারিকাতুল মুফাওয়াযায় গৃহীত নয়। কোনো সময়ের সাথে যুক্ত করা মুফাওয়াযা ও আনান উভয় শারিকায় হতে পারে।
'শর্তমুক্ত' ও 'শর্তযুক্ত' সময়ের শর্ত যুক্ত করার কারণে শারিকার এই প্রকারভেদ সকল মাযহাবে বিদিত। শাফেয়ীদের স্পষ্ট বক্তব্য অনুসারে এক শরীকের কার্য সম্পাদন শর্তযুক্ত করে অন্য শরীকের কার্য পরিচালনা শর্তমুক্ত করা জায়েয। তবে কতক ফকীহ থেকে বর্ণিত, এক্ষেত্রে প্রত্যেক শরীকের কার্য পরিচালনার সীমা নির্ধারিত হওয়া আবশ্যক। সময় নির্দিষ্ট করার কারণে শারিকা বাতিল হবে- কতক মালেকীর বক্তব্যে এর সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও তাদের স্পষ্ট বিধান হলো, মেয়াদ অনাবশ্যক হলেও শারিকা বৈধ হবে। ৫৩
টিকাঃ
৫২. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫১
৫৩. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৩; হাওয়াশী তুহফাতি ইবনি আসিম, খ. ২, পৃ. ২১০