📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 কজা করার স্থলবর্তী (مَا يَقُومُ مَقَامَ الْقَبْضِ مَا يُعَادِلُ الْوَفَاءَ)

📄 কজা করার স্থলবর্তী (مَا يَقُومُ مَقَامَ الْقَبْضِ مَا يُعَادِلُ الْوَفَاءَ)


যে বস্তুটি চুক্তির পর কব্জা করার উপযোগী হবে তাতে দু অবস্থা। চুক্তি করার আগেই হয়তো তা সে লোকের হাতে রয়েছে যে তা কজা করবে অথবা তার হাতে নেই, চুক্তির অপরপক্ষের হাতে রয়েছে।

প্রথম অবস্থা: চুক্তির পর কজা করলে যা চুক্তির একপক্ষের হাতে আসবে, চুক্তির পূর্বেই তা যদি তার হাতে থাকে, যেমন- কোনো কিছু কেউ বিক্রি করল বা দান করল বা বন্ধক রাখল ছিনতাইকারীর নিকট বা যে ধার নিয়েছে তার নিকট বা যার কাছে আমানত রাখা আছে তার নিকট বা যে ভাড়া নিয়েছে তার নিকট, তাহলে পূর্ব থেকে বিদ্যমান কজাই কি চুক্তির কজার স্থলবর্তী হবে, না-কি হবে না? তা নিয়ে ফকীহগণ মতবিরোধ করে তিনটি মত বর্ণনা করেছেন।

প্রথম মত: মালেকী ও হাম্বলী ফকীহদের মত: পূর্ববর্তী কজাই চুক্তির ফলশ্রুতিতে কজা করার স্থলবর্তী হবে শর্তহীনভাবে। অর্থাৎ পূর্ববর্তী দখল আমানতের দখল হোক বা ক্ষতিপূরণ ও জরিমানার দখল হোক, এখন যে কজা করার উপযোগী হয়েছে তা আমানতের কব্জা হোক বা ক্ষতিপূরণের কজা হোক; এখানে অনুমতিরও শর্ত নেই, পূর্ববর্তী কজার পর দীর্ঘসময় অতিবাহিত হওয়াও শর্ত নয়। ১০৪

সকল ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী দখলই চুক্তির প্রেক্ষিতে কজা করার স্থলবর্তী বলে গণ্য হবে। কেননা অব্যাহত কজাই সত্যিকার কজা, যেহেতু তাতে কজাকারীর যে কোনো কাজ করার সুযোগ ও অধিকার ছিল, সে অবস্থাতেই কব্জা করার উপযোগী চুক্তি সম্পাদন হয়েছে, ফলে তার সে সুযোগ ও অধিকার অব্যাহত থেকেছে। এক্ষেত্রে এ মর্মে কোনো দলিল নেই যে, চুক্তির পরই কব্জা বাস্তবায়িত হতে হবে, এর পূর্বের কজা গণ্য হবে না।

টিকাঃ
১০৪. শারহু মিয়ারা আলাত তুহফা, খ. ১, পৃ. ১১১; মাজদুদ্দীন ইবনে তাইমিয়া রচিত আল-মুহাররার, খ. ১, পৃ. ৩৭৪; ইবনে তাইমিয়া কৃত নাযারিয়্যাতুল আকদ, পৃ. ২৩৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৪৯ ও ২৭৩ এবং খ. ৪, পৃ. ২৫৩, মুদ্রণ আনসারুস সুন্নাহ আল মুহাম্মাদিয়‍্যা; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৪ এবং খ. ৫, পৃ. ৫৯৪, মুদ্রণ: দারুল মানার

এক্ষেত্রে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা পূর্ণ বা আংশিক ঋণ পরিশোধের সমার্থক। তবে এগুলোর কোনো কোনোটি মূল ঋণদাতার নিকট থেকে কজা করার স্থলবর্তী। কেননা এগুলো প্রকারান্তরে ঋণের দাবি করা। যেমন ঋণদাতার কোনো নিকট পাওনা ঋণগ্রহীতার থাকার মাধ্যমে তার দায় থেকে দেনা ও ঋণ রহিত হয়ে যায়, ঋণ দ্বারা ঋণ শোধ করার বদলাবদলি তরীকা হিসেবে। যেমন ঋণগ্রহীতা ঋণদাতার কাছে কোনো বস্তু বিক্রি করল, বা তাকে ভাড়া দিল বা কর্জ হিসেবে দিল, অথবা তার দেনা ঋণের বিপরীতে কোনো বস্তু দ্বারা সন্ধি করল, বা ঋণের বিপরীতে কোনো কিছু বন্ধক রাখল আর বন্ধক রাখা বস্তুটি নষ্ট হয়ে গেল, অথবা ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কোনো বস্তু নষ্ট বা জবরদখল করল এর পর তা ঋণদাতার কাছে নষ্ট হলো, অথবা ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কোনো বস্তু ফাসিদ চুক্তিতে ক্রয় করেছিল। তার পর তা খোয়া যাওয়া বা তার মালিকানার বাইরে চলে যাওয়ায় ঋণগ্রহীতার হাতছাড়া হলো।
এমনিভাবে এগুলোর কোনো কোনোটি কজা করতে দেওয়া এবং আদায় করার স্থলবর্তী; কজা করা ও দাবি করার স্থলবর্তী নয়। যেমন ঋণদাতার পূর্ব পাওনা ঋণগ্রহীতার নিকট সদ্যকৃত ঋণের মাধ্যমে রহিত হবে। যেহেতু মূলনীতি হচ্ছে, দুটি ঋণ পরস্পর মুখোমুখি পরিশোধযোগ্য হলে দ্বিতীয়টি প্রথমটির পরিশোধ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা প্রথম পরিশোধযোগ্য ঋণটি দ্বিতীয় ঋণ নেওয়ার পূর্বেই আদায় করা আবশ্যক ছিল। যেমন তুমি তার কাছ থেকে কোনো কিছু কিনলে এবং কজা করলে। তারপর বস্তুটির মূল্য সে পুরোপুরি নেওয়ার আগেই তোমার কজায় থাকা বস্তুটি তুমি নষ্ট করলে। (তাহলে মূল্য পরিমাণ ঋণ পরিশোধ বলে গণ্য হবে।)
এ বিষয়গুলোর কোনোটি এমন, যেগুলোতে মূলত ঋণ দ্বারা ঋণ পরিশোধ করা হয় না। বরং তা দ্বারা ধ্বংস ও বিলুপ্ত করা হয়। যেমন কারো ঋণ হেবা করে তাকে ঋণ থেকে দায়মুক্ত করা। অথবা তা দ্বারা ধ্বংস ও বিলুপ্ত করা নয়; তবে তার পরিশোধে কারো অংশীদার হওয়ার সুযোগ থাকে না। যেমন মহিলার দায়ে থাকা ঋণকে তার মহর নির্ধারণ করার দরুন তার ঋণ রহিত হওয়া। অথবা কিসাসের দাবিদার ব্যক্তির দায়ে থাকা ঋণ জিনায়াতুল আমদ (ইচ্ছাকৃত অপরাধ)-এর সন্ধির বিনিময়ের বদল হওয়ার মাধ্যমে রহিত হওয়া। (যেমন হত্যা করা বা ঋণগ্রহীতার মাথায় হাড় পর্যন্ত পৌঁছে এমন আঘাত করা)। উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রে চুক্তি স্বয়ং ঋণের ওপর সংঘটিত হয়েছে। ফলে এ চুক্তিটি স্বয়ং এর অধিকার লাভ করেছে। তারপর স্বামী বা আঘাতকারী কারো দায়ে কোনো কিছুর বিনিময় না রেখে তা রহিত হয়েছে। এভাবে ঋণের বিনিময়ে ঋণ শোধ হয়েছে। আর বাস্তবে কারো অংশীদার হওয়ার সুযোগ থেকে শংকামুক্ত হয়েছে তা যা তারা তাদের দায়ে আবশ্যক করে নিয়েছে। সুস্পষ্ট যে, মহিলার সম্ভোগ এবং অপরাধীর কিসাস রহিত হওয়া এমন বিষয়, যেখানে যৌথ মালিকানা চলে না।
ইমাম মুহাম্মদ-এর পক্ষ থেকে ইজারার ক্ষেত্রে অনুরূপ মত বর্ণিত রয়েছে, যদি ইজারাকে ঋণের সাথে যুক্ত করা হয়। কেননা উপকার লাভ শর্তহীন সম্পদের শ্রেণীভুক্ত নয়। ২৫
হানাফীদের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, যৌথ ঋণের ক্ষেত্রে দুই শরীকের একজন যদি উল্লিখিত কোনো পন্থায় নিজ অংশ পূর্ণ আদায় করে তাহলে তার শরীক তার কাছ থেকে তা আদায়ের অধিকার রাখে না। অধিকার না রাখার অর্থ হলো, এই শরীক তার শরীকের কাছ থেকে অথবা ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায়ের ইচ্ছাধিকার পাবে। তবে যেক্ষেত্রে সে দাবি করে এবং কোনো ভাবে তা কজা করে সেক্ষেত্রে তার খিয়ার থাকবে না। সে সময় অংশীদারীর যোগ্য বস্তু কজাকারীর জন্য নিরাপদ। তবে এটি পরিশোধ করা বা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে নয়।
সন্ধির মাধ্যমে- যার ভিত্তি উদারতা ও ভ্রুক্ষেপ না করা- শোধকৃত ঋণ উসূলের অবস্থা অন্য পন্থায়-যার বৈশিষ্ট্য কষাকষি ও কৃপণতা যেমন বিক্রি ও ইজারার পন্থায়-শোধকৃত ঋণের প্রকৃতি থেকে ভিন্ন। উদাহরণ স্বরূপ, বিক্রির মাধ্যমে শোধের ক্ষেত্রে অর্ধেক পুঁজির শরীক, তার শরীকের নিকট থেকে যে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে নিজ অংশের বিনিময়ে কোনো কিছু কিনেছে, এক চতুর্থাংশ উসুল করা এবং এটা উসুল করতে বাধ্য করা সঙ্গত। সেক্ষেত্রে এটিই প্রকাশ্য, শরীক ক্রেতা নিজ অংশ পুরোপুরি আদায় করতে পারবে তাই, এই উসুলে ক্রেতার কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা ক্রেতার অবস্থা এমন নয় যে, শরীক তাকে যে মূল্য পরিশোধ করছে তার চেয়ে বেশি বা তার বরাবর নেওয়ার সামর্থ্য তার আছে। যে শরীক বস্তুটি কিনেছে তারও এই ক্ষমতা নেই যে, সে যা কিনেছে তা অপর শরীককে দিয়ে দেবে। কেননা, এটি সে কিনেছে তার দায়িত্বে মূল্য বাকি রেখে। এরপর সে মূল্য এবং ঋণগ্রহীতা বিক্রেতার দায়িত্বে থাকা ঋণে বদলা বদলি হয়েছে।
তবে হ্যাঁ, যদি তারা রাজি হয় যে কেনা বস্তুটি তাদের যৌথ, তবে তা তাদের যৌথ মালিকানাধীন হবে। এটি হবে আলাদা চুক্তি। যেন ক্রেতা বিন্ন অন্য শরীক, বস্তুটির অর্ধেক ঋণের এক চতুর্থাংশ দিয়ে কিনল, যা সে ক্রেতা থেকে উসুলের হকদার। সন্ধির মাধ্যমে উসূলের ক্ষেত্রে, যে বস্তুর বিনিময়ে এক শরীক তার অংশের ক্ষেত্রে সন্ধি করেছে তার নিকট থেকে যদি অপর শরীক উসুল করে তাহলে সে ঋণের এক চতুর্থাংশ উসুলে বাধ্য করার অধিকার পাবে না। এর কারণ, হতে পারে সন্ধির মাধ্যমে সে যা উসুল করেছে তা বেশি হবে, যেহেতু সন্ধির ভিত্তি হলো উদারতা। তাই এক্ষেত্রে সন্ধিকারী শরীকের ইচ্ছাধিকার থাকবে। সে ঋণের এক চতুর্থাংশ দিতে পারে অথবা সন্ধিকৃত বস্তুর অর্ধেক দেবে। ২৬
যৌথ ঋণের কোনো পাওনাদার যদি তার ঋণগ্রহীতাকে নিজ পাওনার আংশিক ঋণ থেকে দায়মুক্ত করে, তাহলে এই পাওনাদারের অবশিষ্ট অংশ এবং অন্য শরীকের পূর্ণ অংশ ঋণগ্রহীতার দায়ে আবশ্যক থাকবে।
ঋণের কোনো অংশ তারা কজা করলে সে অংশের ভাগ হবে এই অনুপাতে- দায়মুক্তকারীর অবশিষ্ট অংশ আর অন্য পাওনাদারের পূর্ণ অংশ- যদি এই ভাগ দায়মুক্তি থেকে বিলম্বিত হয়। অথবা তাদের ভাষ্য অনুযায়ী ঋণের ভাগ হবে অবশিষ্ট অংশ অনুপাতে। কজার পর দায়মুক্তি সহীহ হওয়ার কারণে কজার আগে দায়মুক্তি হোক বা পরে, বিধান অভিন্ন। সুতরাং ঋণ যদি হয় এক হাজার প্রত্যেকের পাওনা পাঁচশ করে, এরপর এক পাওনাদার তার পাওনা একশ দায়মুক্ত করল। এখন দায়মুক্তিকারীর জন্য অবশিষ্ট থাকবে অন্য শরীকের পাঁচ ভাগের চার ভাগ। এখন যা কিছু কজা করা হবে তা এই অনুপাতে বণ্টিত হবে। যদি সমানভাবে বণ্টন করার পর দায়মুক্তি হয়, তাহলে বণ্টন সহীহ ভাবে সম্পাদিত হয়েছে বলে ধরা হবে। কারণ, বণ্টনের সময় উভয়ের হক ছিল সমান। এরপর ঋণগ্রহীতা তাকে দায়মুক্তকারী পাওনাদারের কাছ থেকে সে একশ নিয়ে আসবে, যা সে পাওনাদার মাফ করে দিয়েছে। এটি সর্বসম্মত মত, তবে কজা করার পর ঋণ মাফ করা হানাফীদের স্বতন্ত্র মত। ২৭

টিকাঃ
২৫. তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৪৭
২৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৫৫-৬৮; মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৩১৭; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৪৫-৪৮
২৭. প্রাগুক্ত

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 যৌথ চুক্তি (شَرِكَةُ الْعَقْدِ)

📄 যৌথ চুক্তি (شَرِكَةُ الْعَقْدِ)


সংজ্ঞা : ১. হানাফী মাযহাবের ফকীহদের মতে শারিকাতুল আকদ -এর সংজ্ঞা হলো : عَقْدٌ بَيْنَ الْمُتَشَارِكِينَ فِي الأصل والربح ‘পুঁজি ও লাভের মধ্যে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দুই শরীকের যৌথ চুক্তি।’ আল-জাওহারা-এর গ্রন্থকার থেকে এমনটাই তারা উদ্ধৃত করেছেন। 'পুঁজির ক্ষেত্রে দুই শরীকের অংশগ্রহণ' শর্ত করা দ্বারা বোঝা যায়, এটি মুদারাবা থেকে ভিন্ন। কেননা মুদারাবার মধ্যে শ্রমিক ও পুঁজিদাতার অংশগ্রহণ শুধু লাভের মধ্যে হয়ে থাকে, মূল পুঁজিতে নয়। সেক্ষেত্রে পুঁজি একজনই দেবে; বিষয়টি স্পষ্ট। ২৮
হাম্বলী ফকীহদের মতে শারিকাতুল আকদ-এর সংজ্ঞা : اجْتِمَاعٌ فِي تَصَرُّف ‘সম্মিলিতভাবে কার্যপরিচালনায় অংশগ্রহণ।' তাদের এ সংজ্ঞা ও মুদারাবাকে অন্তর্ভুক্ত করে না, যদিও তাদের মতে মুদারাবা যৌথ কারবারের একটি প্রকার। কতক শাফেয়ীর সংজ্ঞা অবশ্য উল্লিখিত সংজ্ঞার কাছাকাছি। তাদের মতে শারিকাতুল আকদ হচ্ছে: عَقْدٌ يَثْبُتُ به حَقٌّ شَائِع في شَيْء المُتَعَدِّد : 'এমন চুক্তি যা দ্বারা একটি বস্তুতে একাধিক ব্যক্তির যৌথ অধিকার সাব্যস্ত হয়।' ইবনে আরাফা এর সংজ্ঞায় বলেন : بَيْعُ مَالِكَ كُلِّ بَعْضَهُ بِبَعْضٍ كُل الآخرِ ، مُوجِبُ صِحَّةِ تَصَرُّفَهُمَا فِي الْجَمِيعِ ' সমুদয় অংশের মালিক তার এক অংশকে অপরের সমুদয় অংশের এক অংশের বিনিময়ে বিক্রি করা যা পুরো অংশে উভয়ের কার্য সম্পাদন বৈধ হওয়ার মাধ্যম। ২৯
শারিকাতুল আকদ-এর (যৌথ চুক্তি) তিনও প্রকার (أَمْوَالٌ-পুঁজিভিত্তিক, أَعْمَالُ -কর্মভিত্তিক وُجُوهٌ-সম্মানভিত্তিক) বৈধ। তা আনান বা মুফাওয়াযা যাই হোক না কেন।

টিকাঃ
২৮. রদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ৩০১; খ. ৩. পৃ. ৩৪৩.
২৯. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৪; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১০৯; আশ-শারকাভী আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ১০৯; আল-খিরাশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৪ ও ২৭১; আল- ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ২৭১; আল-হাওয়াশী আলা তুহফাতি ইবনি আযিম।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 যৌথ চুক্তি শরীয়তসম্মত হওয়ার দলিল

📄 যৌথ চুক্তি শরীয়তসম্মত হওয়ার দলিল


শারিকাতুল আনান (সমান পুঁজির ভিত্তিতে যৌথ কারবার) কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত।
ক. কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَإِنْ كَثِيرًا مِنَ الْخُلَطَاءِ لَيَبْغِي بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَقَلِيلٌ مَا هُمْ 'শরীকদের অনেকে তো একে অন্যের ওপর অবিচার করে; পক্ষান্তরে কেবল মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিগণ অবিচার করে না এবং তারা সংখ্যায় স্বল্প। ৩০
আয়াতে উল্লিখিত الْخُلَطَاءِ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য যৌথ কারবার সম্পাদনকারী ব্যক্তিবর্গ। তবে এটি যৌথ মালিকানাধারী অর্থের অধিক নিকটবর্তী। উপরন্তু আয়াতটি দাউদ আ.-এর জবানে বিধৃত তৎকালীন শরীয়তের বিধান, যা অব্যাহত ও কার্যকর থাকা আবশ্যক নয়। ইবনুল হুমাম রহ. এমনটি বলেছেন। এক্ষেত্রে লক্ষণীয়, 'পূর্ববর্তী শরীয়তের বিধান বর্তমান শরীয়তে গ্রহণযোগ্য হবে কি-না' বিষয়টিতে ফকীহদের মতানৈক্য বিদ্যমান। সম্ভবত ইবনে হুমাম বিষয়টিতে উদারতা অবলম্বন করেছেন, নয়তো তিনি এর বিপরীতে কঠোর।
খ. সুন্নাহ: হযরত আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসে কুদসী। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: إِنَّ اللَّهَ يَقُول : أَنَا ثَالِثُ الشَّرِيكَيْنِ ، مَا لَمْ يَخُنْ أَحَدُهُمَا صَاحِبَهُ ، فَإِذَا خَانَهُ خَرَجْتُ مِنْ بَيْنِهِمَا
'আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি দুই শরীকের মাঝে যৌথ কারবারকারী তৃতীয় ব্যক্তি, যতক্ষণ না একজন তার সঙ্গীর সাথে খেয়ানত করে। যখন খেয়ানত করে তখন আমি তাদের মাঝ থেকে বেরিয়ে যাই।' ৩১
২. হযরত সায়েব ইবনে আবী সায়েব আল-মাখযুমী রা.-এর হাদীস। ইসলামের প্রথমযুগে তিনি নবীজীর সাথে ব্যবসায়ে অংশীদার ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : مَرْحَبًا بِأَخِي وَشَرِيكِي ، لاَ يُدَارِي وَلا يُمَارِي 'আমার ভাই ও আমার অংশীদারকে মোবারকবাদ। সে বাদানুবাদও করে না, প্রতারণাও করে না।' ৩২
ইমাম আহমদের উদ্ধৃত আবুল মিনহাল রা.-এর হাদীস: যায়েদ ইবনে আরকাম ও বারা ইবনে আযিব রা. যৌথ কারবার করতেন। তারা নগদ ও বাকি মূল্য দিয়ে রূপা কিনলেন। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলে তিনি তাদেরকে আদেশ দিলেন, যে রৌপ্য অংশ নগদ মূল্য দিয়ে কেনা হয়েছে তা বহাল রাখো। আর যে অংশ বাকি মূল্য দিয়ে কেনা হয়েছে তা ফেরত দাও। হাদীসটি এ অর্থে সহীহ বুখারীতে রয়েছে। বুখারীতে হাদীসের ভাষ্য হচ্ছে : مَا كَانَ يَدًا بَيَدَ فَخُذُوهُ وَمَا كَانَ نَسِيِّئَةً فَرُدُّوهُ 'যা হাতে হাতে (নগদ) কেনা হয়েছে তা রাখো। আর যা বাকিতে কেনা হয়েছে তা ফেরত দাও।' ৩৩
এ হাদীসে নবীজীর স্পষ্ট অনুমোদন রয়েছে। এটি যৌথ কারবার অনুমোদনমূলক অসংখ্য হাদীসের একটি, যেগুলো মৌলিকভাবে এ কারবার অনুমোদনে সন্দেহ দূর করে। কেননা ইসলামের প্রাথমিক যুগে অধিকাংশ মানুষের কর্ম ছিল ব্যবসা ও অংশীদারি ব্যবসা। এজন্য ইবনুল হুমাম রহ. বলেন, যৌথ কারবারের লেনদেন নবীজীর সময়ে প্রচলিত ছিল। নিরবচ্ছিন্নভাবে তা চলে আসছে। কোনো নির্দিষ্ট হাদীস দ্বারা তা প্রমাণের প্রয়োজন নেই। হেদায়া গ্রন্থকার বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হয়েছিলেন যখন লোকেরা যৌথ কারবার করত। তিনি তাদের এ কারবার বহাল রেখেছেন। ৩৪
গ. ইজমা: লোকেরা বরাবরই সর্বযুগে সর্বস্থানে এ লেনদেন করে আসছে। প্রত্যেক যুগেই বড় বড় ফকীহ ছিলেন। তারপরও এ লেনদেন অপছন্দনীয় হওয়ার কোনো মত শোনা যায়নি।
ঘ. যুক্তি: শারিকাতুল আনান (সমপুঁজির যৌথ কারবার) হচ্ছে সম্পদ বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির একটি পন্থা। সম্পদ কম হোক বা বেশি, এমন লেনদেনের প্রয়োজন রয়েছে; মানুষের প্রচলনই এর বড় প্রমাণ। এমনকি যৌথ বিশাল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যা সাধারণত একজন ব্যক্তির পক্ষে গড়ে তোলা সম্ভব নয় তা বর্তমান সময়ে লেনদেনের বড় এক ধারা হতে চলেছে। এটা হলো একদিক; অন্যদিকে শারিকাতুল আনানের বিধান ও প্রয়োগে এমন কোনো বিষয় নেই যা শরীয়তের বিপরীত। মূলত শারিকাতুল আনান এক প্রকার ওকালাত (প্রতিনিধি নিয়োগকরণ), কারণ এই শারিকায় প্রত্যেক শরীক অপর শরীকের উকীল। এককভাবে কোনো ব্যক্তি কারো উকীল হলে তা শরীয়তসম্মত হওয়ার বিষয়ে কোনো বিবাদ নেই। সুতরাং দুজনের প্রত্যেকে অপরজনের পক্ষে উকীল হলে তার বিধানও অনুরূপ হবে। তখন একাধিক ওকালাত সংঘটিত হবে। এভাবে এখানে ওকালাত বৈধ হওয়ার দাবি বর্তমান এবং এর বিপরীতে কোনো প্রতিবন্ধক নেই। যেমনটা ফকীহগণ বলেন। শারিকাতে যদিও অজ্ঞাত বিষয়ের ওকালাত অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে শারিকার আওতায় এমন অজ্ঞাত চুক্তি বৈধ। কেননা অজ্ঞাত বিষয়ের ওকালাত শিরকাতে মূল বিষয় না হওয়ায় তা হয় ক্ষমার্হ। আর কোনো বিষয় যা ক্ষমার্হ তা এড়িয়ে যাওয়া হয়; মৌল বিষয় হলে ঐ বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়া হয় না। ৩৫
শারিকাতুল আমওয়ালে (যৌথপুঁজির কারবার) মুফাওয়াযা চুক্তি (সকল বিষয়ে সমতার পর সমান যৌথ পুঁজির কারবার) বৈধতার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। হানাফীগণ এটিকে বৈধ বলেছেন এবং আগত হাদীস দিয়ে দলিল দিয়েছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: فَاوِضُوا ، فَإِنَّهُ أَعْظَمُ الْبَرَكَة 'তোমরা মুফাওয়াযা করো তা অধিক বরকতসম্পন্ন।' হাদীসের কিতাবে এ হাদীসটি অপরিচিত (পাওয়া যায় না)। তবে এ চুক্তি জায়েয হওয়ার পক্ষে দলিল দেওয়া হয় মৌলিক বৈধতা দিয়ে। যেহেতু চুক্তির মূল অবস্থা হলো বৈধতা- যতক্ষণ না অবৈধতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, এক্ষেত্রে অবৈধতার কোনো প্রমাণ নেই। ৩৬ ৩৭
অজ্ঞাত বস্তুতে ওকালাত এবং অজ্ঞাত বস্তুর জন্য অজ্ঞাত ব্যক্তির পক্ষে কাফালাত অন্তর্ভুক্ত করার কারণে শাফেয়ীগণ এই কারবারকে অবৈধ বলেন। কারণ উল্লিখিত উভয় কারবার স্বতন্ত্রভাবে অবৈধ। সুতরাং যে কারবার উভয় বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে তা অবশ্যই অবৈধতর গণ্য হবে।
শারিকাতুল আমাল ও শারিকাতুল ওজুহ হানাফী ও হাম্বলী ফকীহদের মতে বৈধ। শাফেয়ীগণ ভিন্ন মত পোষণ করেন। শারিকাতুল ওজুহের ক্ষেত্রে মালেকীদের মতও অনুরূপ, তারা অবৈধতার মত প্রদান করেন। এ কারবার বৈধ হওয়ার পক্ষে নিম্নোক্ত দলিল প্রমাণ দেওয়া হয়: প্রথম: মৌলিকভাবে সকল চুক্তি বৈধ, যতক্ষণ না অবৈধ হওয়ার দলিল পাওয়া যায়। এমন কোনো দলিল নেই যা এ কারবার অবৈধ হওয়া সাব্যস্ত করে। দ্বিতীয়: এ দুটি কারবার করার প্রয়োজন আছে। প্রত্যেক শরীককে অপর শরীকের পক্ষ থেকে অন্তর্নিহিত উকীল বানানোর মাধ্যমে কারবারদ্বয় সহীহ হওয়া সম্ভব, যেন প্রত্যেকের কার্যক্রম ও অর্জিত লাভ সবার জন্য বৈধ হয়। সুতরাং কারবারদ্বয় বাতিল হওয়ার বিধান দেওয়া মোটে যথার্থ নয়।
শাফেয়ীদের মতে শারিকাতুল আমাল ও শারিকাতুল ওজুহ যৌথ পুঁজি না থাকার কারণে বাতিল। উপরন্তু শারিকাতুল আমালে ধোঁকা রয়েছে। মালেকী ফকীহদের মতে শারিকাতুল ওজুহ বাতিল। কেননা এটি পরিশ্রমিকের বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং এমন ঋণের পর্যায়ভুক্ত যা উপকার টেনে আনে। তারা এই শারিকার নাম দিয়েছেন শারিকাতুল যিমাম (شركة الدِّسَمِ)। ৩৮

টিকাঃ
৩০. সূরা সোয়াদ: ২৪; দ্রষ্টব্য: ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩০; নাইলুল আওতার, খ. ৫, পৃ. ২৬৪; আত তালখীসুল হাবীর, খ. ৩, পৃ. ৪৯
৩১. হাদীছে কুদসীটি ইমাম আবু দাউদ রহ. উদ্ধৃত করেছেন, খ. ৩, পৃ. ৬৭৭, أَنَا ثَالِثُ الشَّرِيكَيْنِ (তাহকীক: ইযযত উবায়দ); ইবনে হাজার ইবনুল কাত্তানের সূত্রে উল্লেখ করেন, তিনি সনদের এক বর্ণনাকারী মাজহুল (অজ্ঞাত) হওয়ার কারণে এটিকে মা'লল (দোষমুক্ত) বলেছেন। সেই সাথে তিনি দারাকুতনীর সূত্রে বলেন, তিনি সনদটি মুরসাল হওয়ার কারণে এটিকে মালুল (দোষমুক্ত) বলেছেন। আত তালখীসুল হাবীর, খ. ৩, পৃ. ৪৯; (ছাপা শারিকাতুল তিবাআতিল ফান্নিয়্যা)।
৩২. হাকিম হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন, খ. ২, পৃ. ৬১; মুদ্রণ : দায়েরা তুল মাআরিফিল উসমানিয়া। হাকীম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। যাহাবী তা সমর্থন করেছেন।
৩৩. আবুল মিমহাল বর্ণিত হাদীসটি ইমাম আহমদ উল্লেখ করেছেন, খ. ৪, পৃ. ৩৭১; ছাপা, মায়মানিইয়া। মূল অর্থের হাদীস বুখারীতে রয়েছে। ফাতহুল বারী, খ. ৫, পৃ. ১৪৩; ছাপা সালাফিয়া।
৩৪. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩
৩৫. বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৫; ফুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১১; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৪
৩৬. যায়লায়ী নাসবুর রায়া গ্রন্থে বলেন, গরীব খ. ৩, পৃ. ৪৭৫। ইবনে হাজার বলেন, গরীব অর্থ হলো لم أجده আমি এ হাদীসটি পাইনি। আদ-দিরায়া ফী তাখরীজি আহাদীছিল হিদায়া, খ. ২, পৃ. ১৪৪; ছাপা আল ফুজালা।
৩৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৫৮; আদ-দিরায়া ফী তাখরীজি আহাদীছিল হিদায়া, খ. ২, পৃ. ১৪৪; নাইলুল আওতার, খ. ৫, পৃ. ২৬৫
৩৮. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৭, ২৪, ২৮, ৩০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১২; আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ৩৭১; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৫৮

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ক্ষেত্র বিবেচনায় শারিকাতুল আকদের প্রকারভেদ

📄 ক্ষেত্র বিবেচনায় শারিকাতুল আকদের প্রকারভেদ


এই বিবেচনায় শারিকাতুল আকদ তিন ভাগে বিভক্ত:
১. শারিকাতুল আমওয়াল : شَرِكَةُ أَمْوَالَ
২. শারিকাতুল আমাল : شَرِكَةُ أَعْمَالِ
৩. শারিকাতুল ওজুহ : شَرِكَةُ وُجُوهِ
এ প্রকারভেদের কারণ হলো, যৌথ কারবারের পুঁজি যদি নগদ অর্থ হয় তাহলে সেটি শারিকাতুল আমওয়াল। আর যদি শ্রম অন্যের হয় তাহলে সেটি শারিকাতুল আমাল। এর আরো দুটি নাম রয়েছে: ১. شركة صَنَائِعَ : শারিকাতু সানায়ে ২. شركة أَبْدَان : শারিকাতু আবদান।
এটিকে شركة التقبل : শারিকাতুত তাকাব্বুলও বলা হয়। কেননা কখনো কখনো তাকাব্বুল (প্রস্তাব গ্রহণ) এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে হয়, যে গ্রহণ ছাড়া অন্য কোনো কাজে সক্ষম হয় না। তা সত্ত্বেও এই শারিকা করা সম্ভব। কেননা সে তার সক্ষম শরীককে বাধ্য করতে সক্ষম। এভাবে তারা তাকাব্বুলের ক্ষেত্রে শরীক। ৩৯
যে শারিকা দুই বা ততোধিক শরীকের মাঝে সম্মান ও অবস্থানের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়, যা বিনিয়োগে লাভের যোগ্য, এই শারিকা হলো শারিকাতুল ওজুহ। সাধারণত এ শরিকায় পুঁজি না থাকা এবং দেউলিয়াদের মাঝে এই শারিকা সংঘটিত হওয়ার কারণে একে শারিকাতুল মাফালীসও : شَرِكَةِ الْمَفَالِيسِ বলা হয় । সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর বিশদ বিবরণ হলো:
শারিকাতুল আমওয়াল (شركةُ أَمْوَال) হলো দুই বা ততোধিক শরীক এই শর্তে চুক্তি করা যে, তারা নিজ পুঁজিতে ব্যবসা করবে এবং জ্ঞাত পরিমাণ অনুপাতে লাভ তাদের মাঝে বণ্টিত হবে। এক্ষেত্রে চুক্তির সময় পুঁজির পরিমাণ জ্ঞাত বা অজ্ঞাত হলেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ, পণ্যক্রয়ের সময় তা জানা যাবে। এবং প্রত্যেক কেনাবেচাতে তাদের সকলের অংশগ্রহণের শর্ত করুক বা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন চুক্তি করার শর্ত করুক, অথবা এ বিষয়টি শর্তমুক্ত রাখুক, বিধান একই। চুক্তি 'ব্যবসায় (তিজারাত), শব্দে সংঘটিত হওয়া আবশ্যক নয়। বরং ব্যবসায় অর্থবোধক যে কোনো শব্দ যথেষ্ট। যেমন উভয় শরীক বলল, আমরা আমাদের এই পুঁজিতে অংশীদার হলাম এই শর্তে যে, আমরা কেনাবেচা করব এবং লাভ আমাদের মাঝে অর্ধেক হিসেবে ভাগ করব।
শারিকাতুল আমাল (شركة أَعْمَال) হলো দুই বা ততোধিক ব্যক্তির চুক্তি করা এই মর্মে যে, তারা নির্দিষ্ট প্রকারের এক বা একাধিক কাজ অথবা অনির্দিষ্ট তবে ব্যাপক কোনো কাজ গ্রহণ করবে। ৪০ পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট জ্ঞাত পরিমাণ অনুপাতে তাদের মাঝে বণ্টিত হবে। এর নমুনা হলো: সেলাই করা, কাপড়ে রং লাগানো, ভবন নির্মাণ, চিকিৎসাসামগ্রী তৈরি ইত্যাদি যে কোনো কাজ। কাজ গ্রহণের পূর্বে তাদের পরস্পরের চুক্তি সংঘটন আবশ্যক। যদি তিনজন কোনো কাজ গ্রহণ করে যৌথ কারবারপূর্ব পারস্পরিক চুক্তি ছাড়া; তাহলে তারা যৌথ কারবারী হবে না। তিন শরীকের প্রত্যেকের ভাগে এক তৃতীয়াংশ কাজ সম্পাদন আবশ্যক হবে। যদি কোনো শরীক নিজে পুরো কাজ সম্পাদন করে তাহলে সে এক তৃতীয়াংশের অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় সেবাদানকারী বিবেচিত হবে। সুতরাং আদালতের বিচার অনুযায়ী সে এক তৃতীয়াংশ পারিশ্রমিকেরই হকদার হবে।
কাজগ্রহণ প্রত্যেক শরীকের হক হওয়া আবশ্যক, যদিও এমন হতে পারে যে, নির্দিষ্ট একজন কাজ গ্রহণ করবে আর অপর শরীক কাজ করবে। এজন্য সারাখসী আলমুহীত গ্রন্থে বলেন, যদি দোকানের মালিক বলে, আমি কাজ গ্রহণ করব, তুমি গ্রহণ করবে না। আমি তোমাকে কাজ দেব, অর্ধেক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তুমি তা করবে, তাহলে এই কারবার জায়েয হবে না। এ সূত্র ধরে ইবনে আবেদীন বলেন, জায়েয হওয়ার শর্ত হলো: কোনো শরীকের কাজ গ্রহণের অধিকার বাদ পড়বে না; উভয়ের কাজ গ্রহণ করা এবং কাজ করার স্পষ্ট বর্ণনা থাকা শর্ত নয়। এর কারণ, যদি উভয়ে এভাবে শরীক হয় যে, একজন কাজ গ্রহণ করবে এবং অন্যজন কাজ করবে তাতে কেউ কোনো আপত্তি না করে, তাহলে প্রত্যেক শরীক কাজ গ্রহণ ও কাজ সম্পাদন করতে পারবে। যেহেতু শারিকাতে ওকালাত অন্তর্ভুক্ত। এটি হানাফী ফকীহদের বক্তব্য যা মৌলিকভাবে হাম্বলীদের মতের তুল্য। তবে তারা মুবাহ বিষয়াদির মালিক হওয়ার ক্ষেত্রে অংশীদারীকে যোগ করেন। ৪১

টিকাঃ
৩৯. সম্ভবত ইবনে আবেদীন একজনের বুদ্ধিভিত্তিক শ্রমকেও শারীরিক বিবেচনা করেছেন। তাই শারিকাতুল আবদান নামকরণের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, এর কারণ হলো, কাজটি উভয় শরীক সাধারণত শারীরিকভাবে করে থাকে। রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৯; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৩
৪০. অর্থাৎ প্রকার ও ক্ষেত্র নির্দিষ্ট, যেমন আসবাবপত্রে গদি লাগানো, কাপড় সেলাই করা। হস্তাক্ষর ও অংক শেখানো, কুরআনের হিফয শিক্ষাদান ইত্যাদি যে সমস্ত কারণে মাদরাসা ইত্যাদি গড়ে উঠে। রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৮; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া, খ. ২, পৃ. ৩৩১
৪১. ফাতহুল কাদীর। ইবনে আবিদীন সহমত ব্যক্ত করেছেন। বাদায়ে'-তে ভিন্নমত রয়েছে। ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৮-৩৩; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৫৮-৩৬১; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৪; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়‍্যা, খ. ৩, পৃ. ২৩১ ও ৩৩৪; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১১৩; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৫, পৃ. ৫৪৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00