📄 যৌথ ঋণ কজা করা (قَبْضُ الدَّيْنِ الْمُشْتَرَكِ)
প্রথম: ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে তাগাদাকৃত ঋণ যদি যৌথ না হয়, তাহলে প্রত্যেক পাওনাদারে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে নিজ নিজ পাওনা আলাদা করে উসুল করে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। নিজ পাওনা হিসেবে প্রত্যেকে যে অর্থ কজা করবে তাতে অন্য পাওনাদার শরীক হতে পারবে না।৮০ যদি এ পাওনা দুই বা ততোধিক জনের মাঝে যৌথ হয়, তাহলে প্রত্যেক শরীকের অধিকার রয়েছে কব্জাকারীর নিকট থেকে নিজ অংশ আদায় করার। যে শরীক কব্জা করবে কজাকৃত পূর্ণ অর্থ তার এককভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং কজাকৃত অর্থ শরীকদের যৌথ মালিকানাধীন হবে। নিজ অংশ অনুপাতে প্রত্যেকে সে অর্থ থেকে নিজ নিজ হক পাবে। ৮১
দ্বিতীয়: কোনো শরীক যদি যৌথ ঋণে থাকা তার অংশ কব্জা করে, এরপর হিবা, নিজ দেনা পরিশোধ বা ভোগ করা ইত্যাদি কোনো এক পন্থায় নিজ কর্তৃত্বের আওতামুক্ত করে, তাহলে ঋণের অংশ অনুপাতে তার নিকট থেকে অপর শরীকদের নিজ নিজ প্রাপ্য আদায়ের সুযোগ আছে। সুতরাং দু'জনের যৌথ পাওনা যদি হয় এক হাজার দীনার, তাদের অংশ হয় অর্ধেক অর্ধেক হিসেবে, তাদের একজন ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে পাঁচশ দীনার কজা করে ভোগ করে, তাহলে অপর পাওনাদারের তার নিকট নিজের অংশ আড়াইশ দীনার ক্ষতিপূরণ আদায়ের অধিকার আছে। ঋণের অবশিষ্ট পাঁচশ দীনার উভয়ের যৌথ পাওনা হিসেবে বাকি থাকবে। ৮২
তৃতীয়: যৌথ ঋণ থেকে এক শরীক যদি নিজ অংশ কজা করে, এরপর কোনো অবহেলা বা ত্রুটি ছাড়া সে অংশ নষ্ট হয়, তাহলে কজাকৃত সম্পদে অপর শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ সে দেবে না। তবে সে নিজ অংশ উসুল করেছে বলে ধরা হবে। ঋণগ্রহীতার দায়িত্বে যে পাওনা অবশিষ্ট আছে তা অপর শরীকের প্রাপ্য হয়ে যাবে। ৮৩
চতুর্থ: কোনো শরীক যদি কাউকে যৌথ ঋণে নিজ অংশের কাফীল বানায়, অথবা ঋণগ্রহীতা তাকে তৃতীয় কারো হাওয়ালা করে, তাহলে অপর পাওনাদারের অধিকার রয়েছে তার সাথে ঐ পরিমাণ ঋণে শরীক হওয়ার, যা সে কাফীল বা হাওয়ালা করা ব্যক্তির নিকট থেকে কজা করবে। ৮৪
টিকাঃ
৮০. মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭২; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা ১০৯৯; আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৬২
৮১. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৬, (প্রকাশ, বুলাক, ১৩১০ হি.); দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৬৩; মাজাল্লাতুল আহকামিল, আদলিয়্যা, ধারা ১১০০, ১১০১; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭৩
৮২. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৬৬; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১১০২, ১১০৩; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭৫
৮৩. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৭৩; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১১০৬; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭৬
৮৪. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৪; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৭৫; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১১০৯; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৮১
হানাফীগণ, শাফেয়ীগণ, এক বর্ণনা অনুযায়ী হাম্বলীগণ এবং মালেকীদের মাযহাবমতে, দুইজন ব্যক্তির যৌথ পাওনা ঋণের কোনো অংশ যদি একজন কজা করে, ঋণ কজাকারী ঋণগ্রহীতার কাফীল বা তার পক্ষ থেকে হাওয়ালা করা ব্যক্তি হোক না কেন, এই কজাকৃত অর্থ যৌথ ঋণের অংশ বলে বিবেচিত হবে। তাই এ কজাকৃত অর্থ যৌথ মালিকানার হবে। যে শরীক কজা করেনি ফকীহদের মতে তার নাম الشريك الساكت তার অধিকার রয়েছে মূল ঋণে তার অংশ অনুপাতে পরিশোধকৃত ঋণের অংশ সে কব্জাকারী শরীকের নিকট থেকে আদায় করতে পারবে। যেমন তার অধিকার রয়েছে কব্জাকারী শরীককে তার কজাকৃত অংশের মালিক হওয়ার সুযোগ দিতে দাবি ছেড়ে দেওয়া এবং তার অধিকার গচ্ছা না যাওয়ায় ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে নিজ অংশ আদায় করা। এমনকি যদি ঋণগ্রহীতার কাছে তার অংশ গচ্ছা যায়, যেমন ঋণগ্রহীতা দেউলিয়া হয়ে মারা গেল তাহলে সে কজাকারী শরীকের নিকট থেকে তার অংশ আদায় করবে, যেহেতু সে যা নিরাপদ থাকার আশা করেছিল (অর্থাৎ তার অংশ) তা নিরাপদ নেই। এ জাতীয় ক্ষেত্রে নিরাপদ থাকার শর্ত প্রচলনগতভাবে বোঝা যায়।
এ সকল ক্ষেত্রে বিধান একই। ঋণ কোনো বস্তুর বিনিময়ে হোক, যেমন: দুই শরীকের যৌথ মালিকানাধীন একটি বাড়ির মূল্য হিসেবে এক হাজার মুদ্রা, অথবা ক্ষতির বিনিময়ে হোক; যেমন দুজনের মালিকানাধীন ফসলের বাজারমূল্য স্বরূপ এক হাজার মুদ্রা, এ ফসলের উপড়ে ফেলা বা পুড়িয়ে ফেলা ইত্যাদির জরিমানা হিসেবে যা আদায় করে। যেমন দুজন ব্যক্তি মীরাছ হিসেবে এক ওয়ারিসদাতার নিকট থেকে একটি বস্তু পেয়েছে বা কোনো কর্জের বিনিময় হিসেবে যা তারা যৌথ মালিকানাধীন সম্পদ থেকে কর্জ দিয়েছে।
এক শরীক কজা করলে যৌথ পাওনার কজা ধরা হবে। এর কারণ, এ অংশ শুধু কজাকারী শরীকের অংশ, এ বিবেচনা করা সম্ভব নয়। তবে যদি ঋণদাতাদের মাঝে ঋণ ভাগ করে দেওয়া থাকে তাহলে ভিন্ন বিষয়। আর এটি হয়নি, হওয়া সম্ভবও নয় দুটি কারণে:
প্রথম কারণ, কারো দায়কে অংশ অংশ করে ভাগ করা যায় না। অথচ এটিই ভাগ করার মূল বিষয়। সুতরাং ঋণের ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্যতা অবাস্তব।
দ্বিতীয় কারণ: ভাগ করা হলে তাতে বিনিময় প্রদানের অর্থ যুক্ত হয়। এর কারণ, যৌথ সম্পদের যতগুলো অংশ- তা যত ছোট হোক না কেন- আমরা নির্ধারণ করতে পারি, তার প্রতিটি অংশ দুই শরীকের যৌথ হক। যদি আমরা দায়িত্বে থাকা ঋণের ক্ষেত্রে ভাগ হওয়া সঠিক বলি, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, দু'জন শরীকের প্রত্যেকে ঋণে তার শরীকের মালিকানা থেকে যে অংশ তার ভাগে পড়েছে তা সে নিজ মালিকানা থেকে শরীকের জন্য যে অংশ ছেড়ে দিয়েছে তার বিনিময়ে কিনল। অথচ এমন করা যায় না, এর কারণ এ কারবার হয়ে যায় দেনাদার ছাড়া অন্য কারো কাছে ঋণ বিক্রির পর্যায়ভুক্ত। (الشريك الساكت) কব্জা না করা শরীকের ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে উসুল করার অধিকার আছে। এর কারণ, তার পাওনা ঋণ এই ঋণগ্রহীতার দায়ে রয়েছে। আর ঋণগ্রহীতার সে অংশ অন্য কারো কাছে আদায় করার অধিকার নেই। সুতরাং এই আদায়ের (এক শরীককে শোধ করা) মাধ্যমে তার পাওনা রহিত হবে না। ২১
তবে এই শরীক যদি প্রথমে কব্জাকারী শরীকের নিকট থেকে আদায় করে তাহলে সে যা কজা করেছে তা তার মূল হক হিসেবে সাব্যস্ত হবে। কেননা ঋণ কজা করা ছাড়া নির্ধারিত হয় না। তাই কব্জাকারীর জন্য এই শরীককে কজা করতে বাধা দেওয়া বা শোধকৃত সম্পদ ছাড়া অন্য সম্পদ থেকে দেওয়ার অধিকার নেই। কজাকৃত সম্পদ মূল ঋণের অনুরূপ হোক বা তা থেকে ভালো অথবা তা থেকে খারাপ যাই হোক না কেন, বিধান অভিন্ন। কেননা (মূল ঋণ ও শোধকৃত অর্থের) শ্রেণী যদি এক হয়, তাহলে উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট হওয়ার ব্যবধান কজাকৃত সম্পদ দ্বারা ঋণ পরিশোধ হওয়ায় বাধা হবে না। এ জন্য ঋণদাতাকে উৎকৃষ্ট মান গ্রহণ করতে বাধ্য করা যাবে।
নষ্ট হওয়া, খোয়া যাওয়া ইত্যাদি যে কোনো কারণে অথবা কোনো বিনিময় প্রদান, স্বেচ্ছাদান বা জরিমানা আদায় ইত্যাদি নানা ভাবে কব্জাকারী শরীকের সীমালঙ্ঘন ব্যতীত হাত থেকে কজাকৃত সম্পদ ছুটে গেলে এর অর্থ হবে, সে তার শরীককে ঋণে থাকা তার অংশ থেকে বঞ্চিত করল। তাই অন্য শরীকের এই অধিকার হবে তাকে জরিমানা আদায় করতে বলা। তার বাড়াবাড়ি না হলে জরিমানা আসবে না। তবে হারিয়ে যাওয়া সমুদয় সম্পদ কজাকারীর মালিকানা থেকে হারিয়েছে বলে ধর্তব্য হবে। অবশ্য যে শরীক ঋণ কজা করেনি তার পূর্ণ অংশ ঋণগ্রহীতার দায়ে থাকবে।
তবে ঋণগ্রহীতার কাছে কব্জাকারী শরীকের প্রাপ্য গচ্ছা যাওয়ার পর অপর শরীক যদি এই শরীকের কাছে ঋণ আদায় করতে আসে, তাহলে অন্য সকল ঋণের মতো এই শরীকের হকও কব্জাকারীর জিম্মায় আবশ্যক হবে। কেননা কজাকৃত সম্পদে তার অংশের ঝুলে থাকাকে সে রহিত করেছে, যেহেতু সে কজাকারী শরীককে কজাকৃত অংশের মালিক হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এবং তাতে ঋণগ্রহীতার নিকট তলব করার সুযোগ প্রদান করেছে। ২২
কজাকারী শরীকের কজাকৃত ঋণ থেকে এই শরীক তার অংশ কজা করার পর ঋণগ্রহীতার দায়ে থাকা অবশিষ্ট ঋণ প্রত্যেকের নিজ নিজ অবশিষ্ট অংশ অনুপাতে ভাগ হবে। আর এটিই মূল ঋণে তাদের প্রাপ্য থাকার মূল সম্পর্কসূত্র। এই বিধান অর্থাৎ দুই শরীকের একজন ঋণের যা কজা করবে তা উভয়ের যৌথ প্রাপ্য হওয়ার বিধানটিকে আবু হানীফা রহ. শর্তহীন বলেছেন। এক শরীক তার অংশকে মেয়াদী করুক না করুক, বিধান অভিন্ন। কেননা তার মতে মেয়াদী বানানো অনর্থক। যেহেতু মেয়াদী বানানো হলে ঋণে ভাগ হওয়া প্রকাশ্য। এর দলিল, বর্তমান সম্পদ গুণগত বিচারে মেয়াদী নয়, যা স্পষ্ট। আর বিধানগত বিচারেও নয়, যেহেতু বর্তমান সম্পদ ছাড়া মেয়াদে পরিশোধযোগ্য সম্পদের দাবি করা অসম্ভব।
আবু ইউসুফ রহ.-এর মতে যা ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর একটি বর্ণনা, ঋণকে মেয়াদে পরিশোধযোগ্য বানানো হলে তা তলব করার প্রতিবন্ধক। দু'শরীকের একজন যদি নিজ অংশ মেয়াদে পরিশোধযোগ্য বানায়, তাহলে মেয়াদ হওয়ার আগে কব্জাকারী শরীক যা কজা করে সে একা তার মালিক হবে। কেননা ঋণে মেয়াদ থাকা তা তলব করার পরিপন্থী। তাদের ভিন্নমতের কারণ, ঋণকে মেয়াদী বানানো তাদের মতে সহীহ। কেননা এটি নিজ সম্পদে মালিকের হস্ত ক্ষেপ। তাই কাউকে ঋণ থেকে দায়মুক্তি প্রদান করার ন্যায় এটিও প্রযোজ্য হবে। বরং মেয়াদী বানানো তো নির্ধারিত সময় পর্যন্ত দায়মুক্তি। তাই তা নিছক দায়মুক্তির ন্যায় বিবেচনা করা হবে। এরপর যখন মেয়াদ উপস্থিত হবে তখন ধরে নেওয়া হবে যেন মেয়াদের শর্ত ছিল না। অন্য শরীক যদি ঋণের কোনো অংশ কজা করে, আর এ শরীকের পাওনা অংশ বাকি থাকে, তাহলে সে এই শরীক থেকে ঋণে তার অংশ পরিমাণ উসুল করবে। আর পাওনা বাকি না থাকলে অন্য শরীক তাকে ক্ষতিপূরণ দেবে।
হাম্বলীদের মতে, যে বর্তমান ঋণে তার অংশ বিলম্বে আদায়যোগ্য করে, তার অধিকার রয়েছে যে বিলম্ব না করে নগদ গ্রহণ করেছে তার অংশে শরীক হওয়ার। তবে যদি এ শরীকের ঋণ কজা হয়ে থাকে তার অনুমতিক্রমে আর কজাকৃত সম্পদ নষ্ট হয়, এদিকে ঋণ আদায়ের সময় তখনও হয়নি তাহলে বিধান ভিন্ন, এই শরীক অপর শরীকের অংশে অংশ নিতে পারবে না। ২৩
হাম্বলী মাযহাবের মূলনীতি সম্পর্কিত ইবনে রজব রহ.-এর বক্তব্য থেকে যা বোঝা যায় তা হচ্ছে, হাম্বলীগণ এক শরীক যা কজা করে তা বিশেষভাবে তার মালিকানাধীন গণ্য করেন। ইবনে তাইমিয়া রহ. এ মতটি গ্রহণ করেছেন এবং তাদের কেউ কেউ স্পষ্টবক্তব্যে এ মত ব্যক্ত করেছেন, যেমন কাজী ইয়ায। ২৪
টিকাঃ
২১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৫; তাবয়ীনুল হাকাক, খ. ৫, পৃ. ৪৬; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৪০; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১৪; আল-খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ৪০৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪২৬; আশ-শারহুল কাবীর, আল- মুগনীসহ, খ. ৫, পৃ. ১২৪
২২. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; আল-আতাসী, আলাল মাজাল্লা, খ. ৪, পৃ. ৪২; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৫-৬৬
২৩. প্রাগুক্ত; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৪৭-৪৮; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৭
২৪. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৯
📄 কজা করার স্থলবর্তী (مَا يَقُومُ مَقَامَ الْقَبْضِ مَا يُعَادِلُ الْوَفَاءَ)
যে বস্তুটি চুক্তির পর কব্জা করার উপযোগী হবে তাতে দু অবস্থা। চুক্তি করার আগেই হয়তো তা সে লোকের হাতে রয়েছে যে তা কজা করবে অথবা তার হাতে নেই, চুক্তির অপরপক্ষের হাতে রয়েছে।
প্রথম অবস্থা: চুক্তির পর কজা করলে যা চুক্তির একপক্ষের হাতে আসবে, চুক্তির পূর্বেই তা যদি তার হাতে থাকে, যেমন- কোনো কিছু কেউ বিক্রি করল বা দান করল বা বন্ধক রাখল ছিনতাইকারীর নিকট বা যে ধার নিয়েছে তার নিকট বা যার কাছে আমানত রাখা আছে তার নিকট বা যে ভাড়া নিয়েছে তার নিকট, তাহলে পূর্ব থেকে বিদ্যমান কজাই কি চুক্তির কজার স্থলবর্তী হবে, না-কি হবে না? তা নিয়ে ফকীহগণ মতবিরোধ করে তিনটি মত বর্ণনা করেছেন।
প্রথম মত: মালেকী ও হাম্বলী ফকীহদের মত: পূর্ববর্তী কজাই চুক্তির ফলশ্রুতিতে কজা করার স্থলবর্তী হবে শর্তহীনভাবে। অর্থাৎ পূর্ববর্তী দখল আমানতের দখল হোক বা ক্ষতিপূরণ ও জরিমানার দখল হোক, এখন যে কজা করার উপযোগী হয়েছে তা আমানতের কব্জা হোক বা ক্ষতিপূরণের কজা হোক; এখানে অনুমতিরও শর্ত নেই, পূর্ববর্তী কজার পর দীর্ঘসময় অতিবাহিত হওয়াও শর্ত নয়। ১০৪
সকল ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী দখলই চুক্তির প্রেক্ষিতে কজা করার স্থলবর্তী বলে গণ্য হবে। কেননা অব্যাহত কজাই সত্যিকার কজা, যেহেতু তাতে কজাকারীর যে কোনো কাজ করার সুযোগ ও অধিকার ছিল, সে অবস্থাতেই কব্জা করার উপযোগী চুক্তি সম্পাদন হয়েছে, ফলে তার সে সুযোগ ও অধিকার অব্যাহত থেকেছে। এক্ষেত্রে এ মর্মে কোনো দলিল নেই যে, চুক্তির পরই কব্জা বাস্তবায়িত হতে হবে, এর পূর্বের কজা গণ্য হবে না।
টিকাঃ
১০৪. শারহু মিয়ারা আলাত তুহফা, খ. ১, পৃ. ১১১; মাজদুদ্দীন ইবনে তাইমিয়া রচিত আল-মুহাররার, খ. ১, পৃ. ৩৭৪; ইবনে তাইমিয়া কৃত নাযারিয়্যাতুল আকদ, পৃ. ২৩৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৪৯ ও ২৭৩ এবং খ. ৪, পৃ. ২৫৩, মুদ্রণ আনসারুস সুন্নাহ আল মুহাম্মাদিয়্যা; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৪ এবং খ. ৫, পৃ. ৫৯৪, মুদ্রণ: দারুল মানার
এক্ষেত্রে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা পূর্ণ বা আংশিক ঋণ পরিশোধের সমার্থক। তবে এগুলোর কোনো কোনোটি মূল ঋণদাতার নিকট থেকে কজা করার স্থলবর্তী। কেননা এগুলো প্রকারান্তরে ঋণের দাবি করা। যেমন ঋণদাতার কোনো নিকট পাওনা ঋণগ্রহীতার থাকার মাধ্যমে তার দায় থেকে দেনা ও ঋণ রহিত হয়ে যায়, ঋণ দ্বারা ঋণ শোধ করার বদলাবদলি তরীকা হিসেবে। যেমন ঋণগ্রহীতা ঋণদাতার কাছে কোনো বস্তু বিক্রি করল, বা তাকে ভাড়া দিল বা কর্জ হিসেবে দিল, অথবা তার দেনা ঋণের বিপরীতে কোনো বস্তু দ্বারা সন্ধি করল, বা ঋণের বিপরীতে কোনো কিছু বন্ধক রাখল আর বন্ধক রাখা বস্তুটি নষ্ট হয়ে গেল, অথবা ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কোনো বস্তু নষ্ট বা জবরদখল করল এর পর তা ঋণদাতার কাছে নষ্ট হলো, অথবা ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কোনো বস্তু ফাসিদ চুক্তিতে ক্রয় করেছিল। তার পর তা খোয়া যাওয়া বা তার মালিকানার বাইরে চলে যাওয়ায় ঋণগ্রহীতার হাতছাড়া হলো।
এমনিভাবে এগুলোর কোনো কোনোটি কজা করতে দেওয়া এবং আদায় করার স্থলবর্তী; কজা করা ও দাবি করার স্থলবর্তী নয়। যেমন ঋণদাতার পূর্ব পাওনা ঋণগ্রহীতার নিকট সদ্যকৃত ঋণের মাধ্যমে রহিত হবে। যেহেতু মূলনীতি হচ্ছে, দুটি ঋণ পরস্পর মুখোমুখি পরিশোধযোগ্য হলে দ্বিতীয়টি প্রথমটির পরিশোধ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা প্রথম পরিশোধযোগ্য ঋণটি দ্বিতীয় ঋণ নেওয়ার পূর্বেই আদায় করা আবশ্যক ছিল। যেমন তুমি তার কাছ থেকে কোনো কিছু কিনলে এবং কজা করলে। তারপর বস্তুটির মূল্য সে পুরোপুরি নেওয়ার আগেই তোমার কজায় থাকা বস্তুটি তুমি নষ্ট করলে। (তাহলে মূল্য পরিমাণ ঋণ পরিশোধ বলে গণ্য হবে।)
এ বিষয়গুলোর কোনোটি এমন, যেগুলোতে মূলত ঋণ দ্বারা ঋণ পরিশোধ করা হয় না। বরং তা দ্বারা ধ্বংস ও বিলুপ্ত করা হয়। যেমন কারো ঋণ হেবা করে তাকে ঋণ থেকে দায়মুক্ত করা। অথবা তা দ্বারা ধ্বংস ও বিলুপ্ত করা নয়; তবে তার পরিশোধে কারো অংশীদার হওয়ার সুযোগ থাকে না। যেমন মহিলার দায়ে থাকা ঋণকে তার মহর নির্ধারণ করার দরুন তার ঋণ রহিত হওয়া। অথবা কিসাসের দাবিদার ব্যক্তির দায়ে থাকা ঋণ জিনায়াতুল আমদ (ইচ্ছাকৃত অপরাধ)-এর সন্ধির বিনিময়ের বদল হওয়ার মাধ্যমে রহিত হওয়া। (যেমন হত্যা করা বা ঋণগ্রহীতার মাথায় হাড় পর্যন্ত পৌঁছে এমন আঘাত করা)। উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রে চুক্তি স্বয়ং ঋণের ওপর সংঘটিত হয়েছে। ফলে এ চুক্তিটি স্বয়ং এর অধিকার লাভ করেছে। তারপর স্বামী বা আঘাতকারী কারো দায়ে কোনো কিছুর বিনিময় না রেখে তা রহিত হয়েছে। এভাবে ঋণের বিনিময়ে ঋণ শোধ হয়েছে। আর বাস্তবে কারো অংশীদার হওয়ার সুযোগ থেকে শংকামুক্ত হয়েছে তা যা তারা তাদের দায়ে আবশ্যক করে নিয়েছে। সুস্পষ্ট যে, মহিলার সম্ভোগ এবং অপরাধীর কিসাস রহিত হওয়া এমন বিষয়, যেখানে যৌথ মালিকানা চলে না।
ইমাম মুহাম্মদ-এর পক্ষ থেকে ইজারার ক্ষেত্রে অনুরূপ মত বর্ণিত রয়েছে, যদি ইজারাকে ঋণের সাথে যুক্ত করা হয়। কেননা উপকার লাভ শর্তহীন সম্পদের শ্রেণীভুক্ত নয়। ২৫
হানাফীদের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, যৌথ ঋণের ক্ষেত্রে দুই শরীকের একজন যদি উল্লিখিত কোনো পন্থায় নিজ অংশ পূর্ণ আদায় করে তাহলে তার শরীক তার কাছ থেকে তা আদায়ের অধিকার রাখে না। অধিকার না রাখার অর্থ হলো, এই শরীক তার শরীকের কাছ থেকে অথবা ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায়ের ইচ্ছাধিকার পাবে। তবে যেক্ষেত্রে সে দাবি করে এবং কোনো ভাবে তা কজা করে সেক্ষেত্রে তার খিয়ার থাকবে না। সে সময় অংশীদারীর যোগ্য বস্তু কজাকারীর জন্য নিরাপদ। তবে এটি পরিশোধ করা বা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে নয়।
সন্ধির মাধ্যমে- যার ভিত্তি উদারতা ও ভ্রুক্ষেপ না করা- শোধকৃত ঋণ উসূলের অবস্থা অন্য পন্থায়-যার বৈশিষ্ট্য কষাকষি ও কৃপণতা যেমন বিক্রি ও ইজারার পন্থায়-শোধকৃত ঋণের প্রকৃতি থেকে ভিন্ন। উদাহরণ স্বরূপ, বিক্রির মাধ্যমে শোধের ক্ষেত্রে অর্ধেক পুঁজির শরীক, তার শরীকের নিকট থেকে যে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে নিজ অংশের বিনিময়ে কোনো কিছু কিনেছে, এক চতুর্থাংশ উসুল করা এবং এটা উসুল করতে বাধ্য করা সঙ্গত। সেক্ষেত্রে এটিই প্রকাশ্য, শরীক ক্রেতা নিজ অংশ পুরোপুরি আদায় করতে পারবে তাই, এই উসুলে ক্রেতার কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা ক্রেতার অবস্থা এমন নয় যে, শরীক তাকে যে মূল্য পরিশোধ করছে তার চেয়ে বেশি বা তার বরাবর নেওয়ার সামর্থ্য তার আছে। যে শরীক বস্তুটি কিনেছে তারও এই ক্ষমতা নেই যে, সে যা কিনেছে তা অপর শরীককে দিয়ে দেবে। কেননা, এটি সে কিনেছে তার দায়িত্বে মূল্য বাকি রেখে। এরপর সে মূল্য এবং ঋণগ্রহীতা বিক্রেতার দায়িত্বে থাকা ঋণে বদলা বদলি হয়েছে।
তবে হ্যাঁ, যদি তারা রাজি হয় যে কেনা বস্তুটি তাদের যৌথ, তবে তা তাদের যৌথ মালিকানাধীন হবে। এটি হবে আলাদা চুক্তি। যেন ক্রেতা বিন্ন অন্য শরীক, বস্তুটির অর্ধেক ঋণের এক চতুর্থাংশ দিয়ে কিনল, যা সে ক্রেতা থেকে উসুলের হকদার। সন্ধির মাধ্যমে উসূলের ক্ষেত্রে, যে বস্তুর বিনিময়ে এক শরীক তার অংশের ক্ষেত্রে সন্ধি করেছে তার নিকট থেকে যদি অপর শরীক উসুল করে তাহলে সে ঋণের এক চতুর্থাংশ উসুলে বাধ্য করার অধিকার পাবে না। এর কারণ, হতে পারে সন্ধির মাধ্যমে সে যা উসুল করেছে তা বেশি হবে, যেহেতু সন্ধির ভিত্তি হলো উদারতা। তাই এক্ষেত্রে সন্ধিকারী শরীকের ইচ্ছাধিকার থাকবে। সে ঋণের এক চতুর্থাংশ দিতে পারে অথবা সন্ধিকৃত বস্তুর অর্ধেক দেবে। ২৬
যৌথ ঋণের কোনো পাওনাদার যদি তার ঋণগ্রহীতাকে নিজ পাওনার আংশিক ঋণ থেকে দায়মুক্ত করে, তাহলে এই পাওনাদারের অবশিষ্ট অংশ এবং অন্য শরীকের পূর্ণ অংশ ঋণগ্রহীতার দায়ে আবশ্যক থাকবে।
ঋণের কোনো অংশ তারা কজা করলে সে অংশের ভাগ হবে এই অনুপাতে- দায়মুক্তকারীর অবশিষ্ট অংশ আর অন্য পাওনাদারের পূর্ণ অংশ- যদি এই ভাগ দায়মুক্তি থেকে বিলম্বিত হয়। অথবা তাদের ভাষ্য অনুযায়ী ঋণের ভাগ হবে অবশিষ্ট অংশ অনুপাতে। কজার পর দায়মুক্তি সহীহ হওয়ার কারণে কজার আগে দায়মুক্তি হোক বা পরে, বিধান অভিন্ন। সুতরাং ঋণ যদি হয় এক হাজার প্রত্যেকের পাওনা পাঁচশ করে, এরপর এক পাওনাদার তার পাওনা একশ দায়মুক্ত করল। এখন দায়মুক্তিকারীর জন্য অবশিষ্ট থাকবে অন্য শরীকের পাঁচ ভাগের চার ভাগ। এখন যা কিছু কজা করা হবে তা এই অনুপাতে বণ্টিত হবে। যদি সমানভাবে বণ্টন করার পর দায়মুক্তি হয়, তাহলে বণ্টন সহীহ ভাবে সম্পাদিত হয়েছে বলে ধরা হবে। কারণ, বণ্টনের সময় উভয়ের হক ছিল সমান। এরপর ঋণগ্রহীতা তাকে দায়মুক্তকারী পাওনাদারের কাছ থেকে সে একশ নিয়ে আসবে, যা সে পাওনাদার মাফ করে দিয়েছে। এটি সর্বসম্মত মত, তবে কজা করার পর ঋণ মাফ করা হানাফীদের স্বতন্ত্র মত। ২৭
টিকাঃ
২৫. তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৪৭
২৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৫৫-৬৮; মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৩১৭; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৪৫-৪৮
২৭. প্রাগুক্ত
📄 যৌথ চুক্তি (شَرِكَةُ الْعَقْدِ)
সংজ্ঞা : ১. হানাফী মাযহাবের ফকীহদের মতে শারিকাতুল আকদ -এর সংজ্ঞা হলো : عَقْدٌ بَيْنَ الْمُتَشَارِكِينَ فِي الأصل والربح ‘পুঁজি ও লাভের মধ্যে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দুই শরীকের যৌথ চুক্তি।’ আল-জাওহারা-এর গ্রন্থকার থেকে এমনটাই তারা উদ্ধৃত করেছেন। 'পুঁজির ক্ষেত্রে দুই শরীকের অংশগ্রহণ' শর্ত করা দ্বারা বোঝা যায়, এটি মুদারাবা থেকে ভিন্ন। কেননা মুদারাবার মধ্যে শ্রমিক ও পুঁজিদাতার অংশগ্রহণ শুধু লাভের মধ্যে হয়ে থাকে, মূল পুঁজিতে নয়। সেক্ষেত্রে পুঁজি একজনই দেবে; বিষয়টি স্পষ্ট। ২৮
হাম্বলী ফকীহদের মতে শারিকাতুল আকদ-এর সংজ্ঞা : اجْتِمَاعٌ فِي تَصَرُّف ‘সম্মিলিতভাবে কার্যপরিচালনায় অংশগ্রহণ।' তাদের এ সংজ্ঞা ও মুদারাবাকে অন্তর্ভুক্ত করে না, যদিও তাদের মতে মুদারাবা যৌথ কারবারের একটি প্রকার। কতক শাফেয়ীর সংজ্ঞা অবশ্য উল্লিখিত সংজ্ঞার কাছাকাছি। তাদের মতে শারিকাতুল আকদ হচ্ছে: عَقْدٌ يَثْبُتُ به حَقٌّ شَائِع في شَيْء المُتَعَدِّد : 'এমন চুক্তি যা দ্বারা একটি বস্তুতে একাধিক ব্যক্তির যৌথ অধিকার সাব্যস্ত হয়।' ইবনে আরাফা এর সংজ্ঞায় বলেন : بَيْعُ مَالِكَ كُلِّ بَعْضَهُ بِبَعْضٍ كُل الآخرِ ، مُوجِبُ صِحَّةِ تَصَرُّفَهُمَا فِي الْجَمِيعِ ' সমুদয় অংশের মালিক তার এক অংশকে অপরের সমুদয় অংশের এক অংশের বিনিময়ে বিক্রি করা যা পুরো অংশে উভয়ের কার্য সম্পাদন বৈধ হওয়ার মাধ্যম। ২৯
শারিকাতুল আকদ-এর (যৌথ চুক্তি) তিনও প্রকার (أَمْوَالٌ-পুঁজিভিত্তিক, أَعْمَالُ -কর্মভিত্তিক وُجُوهٌ-সম্মানভিত্তিক) বৈধ। তা আনান বা মুফাওয়াযা যাই হোক না কেন।
টিকাঃ
২৮. রদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ৩০১; খ. ৩. পৃ. ৩৪৩.
২৯. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৪; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১০৯; আশ-শারকাভী আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ১০৯; আল-খিরাশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ২৫৪ ও ২৭১; আল- ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ২৭১; আল-হাওয়াশী আলা তুহফাতি ইবনি আযিম।
📄 যৌথ চুক্তি শরীয়তসম্মত হওয়ার দলিল
শারিকাতুল আনান (সমান পুঁজির ভিত্তিতে যৌথ কারবার) কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত।
ক. কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَإِنْ كَثِيرًا مِنَ الْخُلَطَاءِ لَيَبْغِي بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَقَلِيلٌ مَا هُمْ 'শরীকদের অনেকে তো একে অন্যের ওপর অবিচার করে; পক্ষান্তরে কেবল মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিগণ অবিচার করে না এবং তারা সংখ্যায় স্বল্প। ৩০
আয়াতে উল্লিখিত الْخُلَطَاءِ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য যৌথ কারবার সম্পাদনকারী ব্যক্তিবর্গ। তবে এটি যৌথ মালিকানাধারী অর্থের অধিক নিকটবর্তী। উপরন্তু আয়াতটি দাউদ আ.-এর জবানে বিধৃত তৎকালীন শরীয়তের বিধান, যা অব্যাহত ও কার্যকর থাকা আবশ্যক নয়। ইবনুল হুমাম রহ. এমনটি বলেছেন। এক্ষেত্রে লক্ষণীয়, 'পূর্ববর্তী শরীয়তের বিধান বর্তমান শরীয়তে গ্রহণযোগ্য হবে কি-না' বিষয়টিতে ফকীহদের মতানৈক্য বিদ্যমান। সম্ভবত ইবনে হুমাম বিষয়টিতে উদারতা অবলম্বন করেছেন, নয়তো তিনি এর বিপরীতে কঠোর।
খ. সুন্নাহ: হযরত আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসে কুদসী। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: إِنَّ اللَّهَ يَقُول : أَنَا ثَالِثُ الشَّرِيكَيْنِ ، مَا لَمْ يَخُنْ أَحَدُهُمَا صَاحِبَهُ ، فَإِذَا خَانَهُ خَرَجْتُ مِنْ بَيْنِهِمَا
'আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি দুই শরীকের মাঝে যৌথ কারবারকারী তৃতীয় ব্যক্তি, যতক্ষণ না একজন তার সঙ্গীর সাথে খেয়ানত করে। যখন খেয়ানত করে তখন আমি তাদের মাঝ থেকে বেরিয়ে যাই।' ৩১
২. হযরত সায়েব ইবনে আবী সায়েব আল-মাখযুমী রা.-এর হাদীস। ইসলামের প্রথমযুগে তিনি নবীজীর সাথে ব্যবসায়ে অংশীদার ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : مَرْحَبًا بِأَخِي وَشَرِيكِي ، لاَ يُدَارِي وَلا يُمَارِي 'আমার ভাই ও আমার অংশীদারকে মোবারকবাদ। সে বাদানুবাদও করে না, প্রতারণাও করে না।' ৩২
ইমাম আহমদের উদ্ধৃত আবুল মিনহাল রা.-এর হাদীস: যায়েদ ইবনে আরকাম ও বারা ইবনে আযিব রা. যৌথ কারবার করতেন। তারা নগদ ও বাকি মূল্য দিয়ে রূপা কিনলেন। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলে তিনি তাদেরকে আদেশ দিলেন, যে রৌপ্য অংশ নগদ মূল্য দিয়ে কেনা হয়েছে তা বহাল রাখো। আর যে অংশ বাকি মূল্য দিয়ে কেনা হয়েছে তা ফেরত দাও। হাদীসটি এ অর্থে সহীহ বুখারীতে রয়েছে। বুখারীতে হাদীসের ভাষ্য হচ্ছে : مَا كَانَ يَدًا بَيَدَ فَخُذُوهُ وَمَا كَانَ نَسِيِّئَةً فَرُدُّوهُ 'যা হাতে হাতে (নগদ) কেনা হয়েছে তা রাখো। আর যা বাকিতে কেনা হয়েছে তা ফেরত দাও।' ৩৩
এ হাদীসে নবীজীর স্পষ্ট অনুমোদন রয়েছে। এটি যৌথ কারবার অনুমোদনমূলক অসংখ্য হাদীসের একটি, যেগুলো মৌলিকভাবে এ কারবার অনুমোদনে সন্দেহ দূর করে। কেননা ইসলামের প্রাথমিক যুগে অধিকাংশ মানুষের কর্ম ছিল ব্যবসা ও অংশীদারি ব্যবসা। এজন্য ইবনুল হুমাম রহ. বলেন, যৌথ কারবারের লেনদেন নবীজীর সময়ে প্রচলিত ছিল। নিরবচ্ছিন্নভাবে তা চলে আসছে। কোনো নির্দিষ্ট হাদীস দ্বারা তা প্রমাণের প্রয়োজন নেই। হেদায়া গ্রন্থকার বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হয়েছিলেন যখন লোকেরা যৌথ কারবার করত। তিনি তাদের এ কারবার বহাল রেখেছেন। ৩৪
গ. ইজমা: লোকেরা বরাবরই সর্বযুগে সর্বস্থানে এ লেনদেন করে আসছে। প্রত্যেক যুগেই বড় বড় ফকীহ ছিলেন। তারপরও এ লেনদেন অপছন্দনীয় হওয়ার কোনো মত শোনা যায়নি।
ঘ. যুক্তি: শারিকাতুল আনান (সমপুঁজির যৌথ কারবার) হচ্ছে সম্পদ বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির একটি পন্থা। সম্পদ কম হোক বা বেশি, এমন লেনদেনের প্রয়োজন রয়েছে; মানুষের প্রচলনই এর বড় প্রমাণ। এমনকি যৌথ বিশাল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যা সাধারণত একজন ব্যক্তির পক্ষে গড়ে তোলা সম্ভব নয় তা বর্তমান সময়ে লেনদেনের বড় এক ধারা হতে চলেছে। এটা হলো একদিক; অন্যদিকে শারিকাতুল আনানের বিধান ও প্রয়োগে এমন কোনো বিষয় নেই যা শরীয়তের বিপরীত। মূলত শারিকাতুল আনান এক প্রকার ওকালাত (প্রতিনিধি নিয়োগকরণ), কারণ এই শারিকায় প্রত্যেক শরীক অপর শরীকের উকীল। এককভাবে কোনো ব্যক্তি কারো উকীল হলে তা শরীয়তসম্মত হওয়ার বিষয়ে কোনো বিবাদ নেই। সুতরাং দুজনের প্রত্যেকে অপরজনের পক্ষে উকীল হলে তার বিধানও অনুরূপ হবে। তখন একাধিক ওকালাত সংঘটিত হবে। এভাবে এখানে ওকালাত বৈধ হওয়ার দাবি বর্তমান এবং এর বিপরীতে কোনো প্রতিবন্ধক নেই। যেমনটা ফকীহগণ বলেন। শারিকাতে যদিও অজ্ঞাত বিষয়ের ওকালাত অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে শারিকার আওতায় এমন অজ্ঞাত চুক্তি বৈধ। কেননা অজ্ঞাত বিষয়ের ওকালাত শিরকাতে মূল বিষয় না হওয়ায় তা হয় ক্ষমার্হ। আর কোনো বিষয় যা ক্ষমার্হ তা এড়িয়ে যাওয়া হয়; মৌল বিষয় হলে ঐ বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়া হয় না। ৩৫
শারিকাতুল আমওয়ালে (যৌথপুঁজির কারবার) মুফাওয়াযা চুক্তি (সকল বিষয়ে সমতার পর সমান যৌথ পুঁজির কারবার) বৈধতার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। হানাফীগণ এটিকে বৈধ বলেছেন এবং আগত হাদীস দিয়ে দলিল দিয়েছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: فَاوِضُوا ، فَإِنَّهُ أَعْظَمُ الْبَرَكَة 'তোমরা মুফাওয়াযা করো তা অধিক বরকতসম্পন্ন।' হাদীসের কিতাবে এ হাদীসটি অপরিচিত (পাওয়া যায় না)। তবে এ চুক্তি জায়েয হওয়ার পক্ষে দলিল দেওয়া হয় মৌলিক বৈধতা দিয়ে। যেহেতু চুক্তির মূল অবস্থা হলো বৈধতা- যতক্ষণ না অবৈধতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, এক্ষেত্রে অবৈধতার কোনো প্রমাণ নেই। ৩৬ ৩৭
অজ্ঞাত বস্তুতে ওকালাত এবং অজ্ঞাত বস্তুর জন্য অজ্ঞাত ব্যক্তির পক্ষে কাফালাত অন্তর্ভুক্ত করার কারণে শাফেয়ীগণ এই কারবারকে অবৈধ বলেন। কারণ উল্লিখিত উভয় কারবার স্বতন্ত্রভাবে অবৈধ। সুতরাং যে কারবার উভয় বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে তা অবশ্যই অবৈধতর গণ্য হবে।
শারিকাতুল আমাল ও শারিকাতুল ওজুহ হানাফী ও হাম্বলী ফকীহদের মতে বৈধ। শাফেয়ীগণ ভিন্ন মত পোষণ করেন। শারিকাতুল ওজুহের ক্ষেত্রে মালেকীদের মতও অনুরূপ, তারা অবৈধতার মত প্রদান করেন। এ কারবার বৈধ হওয়ার পক্ষে নিম্নোক্ত দলিল প্রমাণ দেওয়া হয়: প্রথম: মৌলিকভাবে সকল চুক্তি বৈধ, যতক্ষণ না অবৈধ হওয়ার দলিল পাওয়া যায়। এমন কোনো দলিল নেই যা এ কারবার অবৈধ হওয়া সাব্যস্ত করে। দ্বিতীয়: এ দুটি কারবার করার প্রয়োজন আছে। প্রত্যেক শরীককে অপর শরীকের পক্ষ থেকে অন্তর্নিহিত উকীল বানানোর মাধ্যমে কারবারদ্বয় সহীহ হওয়া সম্ভব, যেন প্রত্যেকের কার্যক্রম ও অর্জিত লাভ সবার জন্য বৈধ হয়। সুতরাং কারবারদ্বয় বাতিল হওয়ার বিধান দেওয়া মোটে যথার্থ নয়।
শাফেয়ীদের মতে শারিকাতুল আমাল ও শারিকাতুল ওজুহ যৌথ পুঁজি না থাকার কারণে বাতিল। উপরন্তু শারিকাতুল আমালে ধোঁকা রয়েছে। মালেকী ফকীহদের মতে শারিকাতুল ওজুহ বাতিল। কেননা এটি পরিশ্রমিকের বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং এমন ঋণের পর্যায়ভুক্ত যা উপকার টেনে আনে। তারা এই শারিকার নাম দিয়েছেন শারিকাতুল যিমাম (شركة الدِّسَمِ)। ৩৮
টিকাঃ
৩০. সূরা সোয়াদ: ২৪; দ্রষ্টব্য: ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩০; নাইলুল আওতার, খ. ৫, পৃ. ২৬৪; আত তালখীসুল হাবীর, খ. ৩, পৃ. ৪৯
৩১. হাদীছে কুদসীটি ইমাম আবু দাউদ রহ. উদ্ধৃত করেছেন, খ. ৩, পৃ. ৬৭৭, أَنَا ثَالِثُ الشَّرِيكَيْنِ (তাহকীক: ইযযত উবায়দ); ইবনে হাজার ইবনুল কাত্তানের সূত্রে উল্লেখ করেন, তিনি সনদের এক বর্ণনাকারী মাজহুল (অজ্ঞাত) হওয়ার কারণে এটিকে মা'লল (দোষমুক্ত) বলেছেন। সেই সাথে তিনি দারাকুতনীর সূত্রে বলেন, তিনি সনদটি মুরসাল হওয়ার কারণে এটিকে মালুল (দোষমুক্ত) বলেছেন। আত তালখীসুল হাবীর, খ. ৩, পৃ. ৪৯; (ছাপা শারিকাতুল তিবাআতিল ফান্নিয়্যা)।
৩২. হাকিম হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন, খ. ২, পৃ. ৬১; মুদ্রণ : দায়েরা তুল মাআরিফিল উসমানিয়া। হাকীম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। যাহাবী তা সমর্থন করেছেন।
৩৩. আবুল মিমহাল বর্ণিত হাদীসটি ইমাম আহমদ উল্লেখ করেছেন, খ. ৪, পৃ. ৩৭১; ছাপা, মায়মানিইয়া। মূল অর্থের হাদীস বুখারীতে রয়েছে। ফাতহুল বারী, খ. ৫, পৃ. ১৪৩; ছাপা সালাফিয়া।
৩৪. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩
৩৫. বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৫; ফুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১১; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৪
৩৬. যায়লায়ী নাসবুর রায়া গ্রন্থে বলেন, গরীব খ. ৩, পৃ. ৪৭৫। ইবনে হাজার বলেন, গরীব অর্থ হলো لم أجده আমি এ হাদীসটি পাইনি। আদ-দিরায়া ফী তাখরীজি আহাদীছিল হিদায়া, খ. ২, পৃ. ১৪৪; ছাপা আল ফুজালা।
৩৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৫৮; আদ-দিরায়া ফী তাখরীজি আহাদীছিল হিদায়া, খ. ২, পৃ. ১৪৪; নাইলুল আওতার, খ. ৫, পৃ. ২৬৫
৩৮. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৭, ২৪, ২৮, ৩০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১২; আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ৩৭১; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৫৮