📄 এক শরীক অপর শরীকের নিকট থেকে খরচকৃত অর্থ ফেরত নেওয়া
বিভাজনযোগ্য যৌথ মালিকানার বস্তুতে এক শরীক অপর শরীকের অনুমতি ছাড়া পুরো খরচ একা বহন করলে, হানাফীদের মতে সে হবে স্বেচ্ছাদানকারী। সদৃশ বস্তু বা মূল্যজাতীয় বস্তু কোনোটির দ্বারা তার শরীকের নিকট থেকে সে খরচকৃত অর্থ আদায় করতে পারবে না। যেহেতু ভাগ করে খরচ করলে স্বেচ্ছাদান থেকে বাঁচার এবং না করার সুযোগ ছিল, কিন্তু সে তা করেনি।
তবে তারা উল্লেখ করেন, যৌথ সম্পদ স্থানান্তর করার জন্য খরচ না করলে যদি সম্পদ খোয়া যাওয়া বা কমে যাওয়ার আশংকা করে শরীক, যেমন মরুভূমির মত ভয়ংকর জায়গায় মালবোঝাই যান নষ্ট হলো, তাহলে সে স্থানান্তর করার জন্য খরচ করবে। আর যা খরচ করবে তা থেকে শরীকের অংশ পরিমাণ তার নিকট থেকে আদায় করবে।
বিভাজনযোগ্য নয় এমন বস্তুর ক্ষেত্রে ইবনে নুজাইম আল আশবাহ গ্রন্থে মত দিয়েছেন, শর্তহীনভাবে শরীক অন্য শরীকের নিকট থেকে তার অংশ পরিমাণ আদায় করবে। সম্ভব হলে বস্তুটি ভাড়া দেবে এবং তা থেকে তার খরচ তুলে নেবে। খরচ যদি বিচারকের আদেশে করে থাকে তাহলে বস্তুর ভাড়া থেকে খরচ পরিমাণ অর্থ উসুল করবে। আর বিচারকের আদেশ ছাড়া হলে সংস্কারের বিভিন্ন খাতে ব্যয়কৃত অর্থের বাজারমূল্য উসুল করবে। ১৮
যে শরীক যৌথ সম্পদে ব্যয়কৃত অর্থ একা বহন করে, বিচারকের আদেশ বা শরীকের অনুমতি ব্যতীত, সে খরচকৃত অর্থের কোনো অংশ তার শরীকের নিকট থেকে আদায় করতে পারবে না। শাফেয়ীদের মতে এর কারণ, এক্ষেত্রে সে স্বেচ্ছাদানকারী। এমনকি যাকে খরচে অংশগ্রহণ করার জন্য বাধ্য করা হবে তার ক্ষেত্রেও অপরকে স্বেচ্ছাদাতা বিবেচনা করা হবে। এই শরীকের বিষয়টিকে তুলনা করা হয়েছে ঐ লোকের সাথে যে অপরের ঋণ তার অনুমতি ছাড়া শোধ করে, এ ব্যক্তির বিধান হাম্বলীদের মতে অনুরূপ। তবে তাদের মতে খরচে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করার বিষয়টি ভিন্ন, যদি শরীক তার অপর শরীক থেকে উসুলের উদ্দেশ্যে খরচ করে থাকে। এর ভিত্তি হলো এক ব্যক্তির ঋণ তার অনুমতি ছাড়া শোধ করার ক্ষেত্রে হাম্বলীদের দুই মতের একটি। তা হলো, এ ব্যক্তি মূল ঋণগ্রহীতা থেকে সমুদয় ঋণ আদায়ের হকদার।
মালেকীগণ বলেন, এক শরীক যদি যৌথ জাঁতাকল মেরামত করে অন্য শরীকদের অনুমতি বা তাদের নীরবতাসহ, তাহলে সে প্রত্যেকের দায়ে আবশ্যক অংশ অনুপাতে তার খরচকৃত অর্থ তাদের নিকট থেকে আদায়ের হকদার। আর যদি তাদের প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও করে, তাহলে সে তাদের দায়ে আবশ্যক কোনো অর্থ আদায়ের অধিকার পাবে না। তবে সে তার খরচকৃত অর্থ ফসল থেকে উসুল করবে। তার উসুল করার পর যা উদ্ধৃত্ত হবে তাতে সকলেই অংশীদার হবে। ১৯
টিকাঃ
১৮. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৬৪, ৩৬৬. ৩৬৭
১৯. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৬৭-৩৬৮; আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ২৭৩-৭৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১০; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪৭, ৮৮
📄 যৌথ ঋণ (الدَّيْنُ الْمُشْتَرَكُ)
যৌথ হওয়া বা না হওয়ার বিচারে ঋণ দুই প্রকার: ঋণ যৌথ হওয়া বা না হওয়া হিসাবে দু প্রকার: যৌথ ও একক। ৭৯
ক. যৌথ ঋণ (الدَّيْنُ الْمُشْتَرَকُ) : যে ঋণ সাব্যস্ত হওয়ার কারণ এক। তা এক চুক্তিতে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির যৌথ মালিকানাধীন বিক্রীত পণ্যের মূল্য হতে পারে, যা বিক্রির সময় প্রত্যেকের মূল্যের অংশ আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি, মীরাহসূত্রে একাধিক ওয়ারিসের দায়ে সাব্যস্ত পাওনা হতে পারে, যৌথ ভোগকৃত বস্তুর বাজারমূল্য হতে পারে, দুই বা ততোধিক ব্যক্তির যৌথ সম্পদ থেকে নেওয়া কর্জের দেনা হতে পারে।
খ. একক বা গায়রে মুশতারাক ঋণ (الدَّيْنُ غَيْرُ الْمُشْرَكَ) : যে ঋণ সাব্যস্ত হওয়ার কারণ ভিন্ন। যেমন: একব্যক্তি থেকে দু'জন আলাদাভাবে কিছু অর্থ ঋণ নিল অথবা একব্যক্তির কাছে দু'জন তাদের যৌথ মালিকানাধীন সম্পদ বিক্রি করল আর বিক্রির সময় প্রত্যেকে নিজ অংশের মূল্য আলাদা করে উল্লেখ করল। এই প্রকারভেদের ফলাফল প্রকাশিত হয় নিম্নের মাসআলাগুলোতে:
টিকাঃ
৭৯. আদ-দুররুল মুখতার, রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৪৮০; দুরারুল হক্কাম, শরহু মাজাল্লাতিল আহকাম, খ. ৩, পৃ. ৫৩; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৬৯, ১৭০; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১০৯১; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৬
এটি এমন ঋণ, যা দুই বা ততোধিক শরীকের দায়ে এক কারণে আবশ্যক হয়। যেমন দুই শরীক তাদের যৌথ মালিকানাধীন একটি বাড়ি এক চুক্তিতে বিক্রি করল, প্রত্যেকের অংশের মূল্য আলাদা করে নির্ধারণ না করে। যদি মৌলিকভাবে বা বিধানগত বিচারে ঋণ আবশ্যক করে, এধরনের চুক্তি ভিন্ন ভিন্ন হয় তাহলে ঋণ আবশ্যক হওয়ার কারণও ভিন্ন ভিন্ন হবে। আর ঋণে অংশীদারী বাদ হবে। এর নমুনা হলো, এমন ঋণ, যা এক বস্তু যেমন এক বাড়ি বা একখণ্ড জমি যা দুজনের মালিকানাধীন, এমন একক বস্তুর মূল্য হিসাবে একজন ক্রেতার ওপর সাব্যস্ত হবে যদি তাদের প্রত্যেকে নিজ অংশ স্বতন্ত্র চুক্তিতে বিক্রি করে। এরপর যদি তারা ক্রেতার কাছ থেকে সমুদয় ঋণের একটি চুক্তিনামাও গ্রহণ করে তবুও এ ঋণ যৌথ হবে না। যেহেতু এটি দুকারণে আবশ্যক হয়েছে। মৌলিকভাবে ও বিধানগত এক কারণে নয়। যদিও বিক্রিত পণ্য, ক্রেতা ও চুক্তিনামা বিধানগত বিচারে এক। সুতরাং দু'বিক্রেতার কারো অপরের নিকট থেকে আদায়ের সুযোগ নেই, যদি তারা ঋণের কোনো অংশ লাভ করে।
যৌথ ঋণের একটি প্রকার হলো দুই বা ততোধিক শরীকের দায়ে এক কারণে আবশ্যক প্রতিটি ঋণ। তা এমন যা দুটো অযৌথ সম্পদের বিনিময়ে হয়ে থাকে। কিন্তু এক চুক্তির মাধ্যমে উভয়ের নিকট দাবি করা হয়। যেমন এই ব্যক্তির একটি বাড়ি এবং ঐ ব্যক্তির একটি বাড়ি। বাড়ি দুটোর সামগ্রিক মূল্য ধার্য করে তারা উভয়ে একসাথে এক চুক্তিতে এ দুটোকে বিক্রি করল। সমুদয় মূল্যের আলাদা পরিমাণ উল্লেখ করা হলো না, যেমন ছয়শ মুদ্রা এ বাড়ীর মূল্য আর চারশ মুদ্রা সে বাড়ির মূল্য এভাবে বলা হলো না। এমনিভাবে মুদ্রার গুণ দিয়ে নির্ধারণ করা হলো না। যেমন বলল, স্বর্ণমুদ্রা এই বাড়ির মূল্য আর রৌপ্যমুদ্রা ঐ বাড়ির মূল্য, এভাবে বিক্রি করল না। মূল্যের আলাদা করে বিবরণ দেওয়া হলে বা মুদ্রার গুণ নির্ধারণ করা হলে তা এক চুক্তিতে বিক্রির পরিপন্থী। এর কারণ, ক্রেতা তখন একজনের অংশে বিক্রিচুক্তি গ্রহণ করে অপরের অংশে বিক্রিচুক্তি রদ করার সুযোগ পায়। এই কারণ দর্শিয়ে যে, এই বাড়ির মূল্য বা মুদ্রাগুণ তার মিলমতো নয়।
তাহলে চুক্তির ভিন্নতাহেতু ঋণটি যৌথ হবে না। তবে উভয়ের প্রাপ্যের কমবেশ বলে দেওয়া হলে অতিরিক্ত অংশ আদায় করে দেওয়ার মাধ্যমে প্রাপ্যের কমবেশ দূর করা হলে ঋণটি পুনরায় যৌথ হয়ে যাবে। আননিহায়া গ্রন্থকার যোগ করেন, মৌলিকভাবে গুণে বা পরিমাণে পার্থক্য করা হবে না, এশর্ত হওয়া উচিত চুক্তির সময় এ বিষয়ে আলোচনা না হোক। ২০
টিকাঃ
২০. তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৪৫; ফাতহুল কাদীরসহ আল ঈনায়া আলাল হিদায়া, খ. ৭, পৃ. ৪৭
📄 যৌথ ঋণ কজা করা (قَبْضُ الدَّيْنِ الْمُشْتَرَكِ)
প্রথম: ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে তাগাদাকৃত ঋণ যদি যৌথ না হয়, তাহলে প্রত্যেক পাওনাদারে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে নিজ নিজ পাওনা আলাদা করে উসুল করে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। নিজ পাওনা হিসেবে প্রত্যেকে যে অর্থ কজা করবে তাতে অন্য পাওনাদার শরীক হতে পারবে না।৮০ যদি এ পাওনা দুই বা ততোধিক জনের মাঝে যৌথ হয়, তাহলে প্রত্যেক শরীকের অধিকার রয়েছে কব্জাকারীর নিকট থেকে নিজ অংশ আদায় করার। যে শরীক কব্জা করবে কজাকৃত পূর্ণ অর্থ তার এককভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং কজাকৃত অর্থ শরীকদের যৌথ মালিকানাধীন হবে। নিজ অংশ অনুপাতে প্রত্যেকে সে অর্থ থেকে নিজ নিজ হক পাবে। ৮১
দ্বিতীয়: কোনো শরীক যদি যৌথ ঋণে থাকা তার অংশ কব্জা করে, এরপর হিবা, নিজ দেনা পরিশোধ বা ভোগ করা ইত্যাদি কোনো এক পন্থায় নিজ কর্তৃত্বের আওতামুক্ত করে, তাহলে ঋণের অংশ অনুপাতে তার নিকট থেকে অপর শরীকদের নিজ নিজ প্রাপ্য আদায়ের সুযোগ আছে। সুতরাং দু'জনের যৌথ পাওনা যদি হয় এক হাজার দীনার, তাদের অংশ হয় অর্ধেক অর্ধেক হিসেবে, তাদের একজন ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে পাঁচশ দীনার কজা করে ভোগ করে, তাহলে অপর পাওনাদারের তার নিকট নিজের অংশ আড়াইশ দীনার ক্ষতিপূরণ আদায়ের অধিকার আছে। ঋণের অবশিষ্ট পাঁচশ দীনার উভয়ের যৌথ পাওনা হিসেবে বাকি থাকবে। ৮২
তৃতীয়: যৌথ ঋণ থেকে এক শরীক যদি নিজ অংশ কজা করে, এরপর কোনো অবহেলা বা ত্রুটি ছাড়া সে অংশ নষ্ট হয়, তাহলে কজাকৃত সম্পদে অপর শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ সে দেবে না। তবে সে নিজ অংশ উসুল করেছে বলে ধরা হবে। ঋণগ্রহীতার দায়িত্বে যে পাওনা অবশিষ্ট আছে তা অপর শরীকের প্রাপ্য হয়ে যাবে। ৮৩
চতুর্থ: কোনো শরীক যদি কাউকে যৌথ ঋণে নিজ অংশের কাফীল বানায়, অথবা ঋণগ্রহীতা তাকে তৃতীয় কারো হাওয়ালা করে, তাহলে অপর পাওনাদারের অধিকার রয়েছে তার সাথে ঐ পরিমাণ ঋণে শরীক হওয়ার, যা সে কাফীল বা হাওয়ালা করা ব্যক্তির নিকট থেকে কজা করবে। ৮৪
টিকাঃ
৮০. মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭২; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা ১০৯৯; আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৬২
৮১. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৬, (প্রকাশ, বুলাক, ১৩১০ হি.); দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৬৩; মাজাল্লাতুল আহকামিল, আদলিয়্যা, ধারা ১১০০, ১১০১; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭৩
৮২. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৬৬; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১১০২, ১১০৩; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭৫
৮৩. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৭৩; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১১০৬; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭৬
৮৪. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৪; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৭৫; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১১০৯; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৮১
হানাফীগণ, শাফেয়ীগণ, এক বর্ণনা অনুযায়ী হাম্বলীগণ এবং মালেকীদের মাযহাবমতে, দুইজন ব্যক্তির যৌথ পাওনা ঋণের কোনো অংশ যদি একজন কজা করে, ঋণ কজাকারী ঋণগ্রহীতার কাফীল বা তার পক্ষ থেকে হাওয়ালা করা ব্যক্তি হোক না কেন, এই কজাকৃত অর্থ যৌথ ঋণের অংশ বলে বিবেচিত হবে। তাই এ কজাকৃত অর্থ যৌথ মালিকানার হবে। যে শরীক কজা করেনি ফকীহদের মতে তার নাম الشريك الساكت তার অধিকার রয়েছে মূল ঋণে তার অংশ অনুপাতে পরিশোধকৃত ঋণের অংশ সে কব্জাকারী শরীকের নিকট থেকে আদায় করতে পারবে। যেমন তার অধিকার রয়েছে কব্জাকারী শরীককে তার কজাকৃত অংশের মালিক হওয়ার সুযোগ দিতে দাবি ছেড়ে দেওয়া এবং তার অধিকার গচ্ছা না যাওয়ায় ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে নিজ অংশ আদায় করা। এমনকি যদি ঋণগ্রহীতার কাছে তার অংশ গচ্ছা যায়, যেমন ঋণগ্রহীতা দেউলিয়া হয়ে মারা গেল তাহলে সে কজাকারী শরীকের নিকট থেকে তার অংশ আদায় করবে, যেহেতু সে যা নিরাপদ থাকার আশা করেছিল (অর্থাৎ তার অংশ) তা নিরাপদ নেই। এ জাতীয় ক্ষেত্রে নিরাপদ থাকার শর্ত প্রচলনগতভাবে বোঝা যায়।
এ সকল ক্ষেত্রে বিধান একই। ঋণ কোনো বস্তুর বিনিময়ে হোক, যেমন: দুই শরীকের যৌথ মালিকানাধীন একটি বাড়ির মূল্য হিসেবে এক হাজার মুদ্রা, অথবা ক্ষতির বিনিময়ে হোক; যেমন দুজনের মালিকানাধীন ফসলের বাজারমূল্য স্বরূপ এক হাজার মুদ্রা, এ ফসলের উপড়ে ফেলা বা পুড়িয়ে ফেলা ইত্যাদির জরিমানা হিসেবে যা আদায় করে। যেমন দুজন ব্যক্তি মীরাছ হিসেবে এক ওয়ারিসদাতার নিকট থেকে একটি বস্তু পেয়েছে বা কোনো কর্জের বিনিময় হিসেবে যা তারা যৌথ মালিকানাধীন সম্পদ থেকে কর্জ দিয়েছে।
এক শরীক কজা করলে যৌথ পাওনার কজা ধরা হবে। এর কারণ, এ অংশ শুধু কজাকারী শরীকের অংশ, এ বিবেচনা করা সম্ভব নয়। তবে যদি ঋণদাতাদের মাঝে ঋণ ভাগ করে দেওয়া থাকে তাহলে ভিন্ন বিষয়। আর এটি হয়নি, হওয়া সম্ভবও নয় দুটি কারণে:
প্রথম কারণ, কারো দায়কে অংশ অংশ করে ভাগ করা যায় না। অথচ এটিই ভাগ করার মূল বিষয়। সুতরাং ঋণের ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্যতা অবাস্তব।
দ্বিতীয় কারণ: ভাগ করা হলে তাতে বিনিময় প্রদানের অর্থ যুক্ত হয়। এর কারণ, যৌথ সম্পদের যতগুলো অংশ- তা যত ছোট হোক না কেন- আমরা নির্ধারণ করতে পারি, তার প্রতিটি অংশ দুই শরীকের যৌথ হক। যদি আমরা দায়িত্বে থাকা ঋণের ক্ষেত্রে ভাগ হওয়া সঠিক বলি, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, দু'জন শরীকের প্রত্যেকে ঋণে তার শরীকের মালিকানা থেকে যে অংশ তার ভাগে পড়েছে তা সে নিজ মালিকানা থেকে শরীকের জন্য যে অংশ ছেড়ে দিয়েছে তার বিনিময়ে কিনল। অথচ এমন করা যায় না, এর কারণ এ কারবার হয়ে যায় দেনাদার ছাড়া অন্য কারো কাছে ঋণ বিক্রির পর্যায়ভুক্ত। (الشريك الساكت) কব্জা না করা শরীকের ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে উসুল করার অধিকার আছে। এর কারণ, তার পাওনা ঋণ এই ঋণগ্রহীতার দায়ে রয়েছে। আর ঋণগ্রহীতার সে অংশ অন্য কারো কাছে আদায় করার অধিকার নেই। সুতরাং এই আদায়ের (এক শরীককে শোধ করা) মাধ্যমে তার পাওনা রহিত হবে না। ২১
তবে এই শরীক যদি প্রথমে কব্জাকারী শরীকের নিকট থেকে আদায় করে তাহলে সে যা কজা করেছে তা তার মূল হক হিসেবে সাব্যস্ত হবে। কেননা ঋণ কজা করা ছাড়া নির্ধারিত হয় না। তাই কব্জাকারীর জন্য এই শরীককে কজা করতে বাধা দেওয়া বা শোধকৃত সম্পদ ছাড়া অন্য সম্পদ থেকে দেওয়ার অধিকার নেই। কজাকৃত সম্পদ মূল ঋণের অনুরূপ হোক বা তা থেকে ভালো অথবা তা থেকে খারাপ যাই হোক না কেন, বিধান অভিন্ন। কেননা (মূল ঋণ ও শোধকৃত অর্থের) শ্রেণী যদি এক হয়, তাহলে উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট হওয়ার ব্যবধান কজাকৃত সম্পদ দ্বারা ঋণ পরিশোধ হওয়ায় বাধা হবে না। এ জন্য ঋণদাতাকে উৎকৃষ্ট মান গ্রহণ করতে বাধ্য করা যাবে।
নষ্ট হওয়া, খোয়া যাওয়া ইত্যাদি যে কোনো কারণে অথবা কোনো বিনিময় প্রদান, স্বেচ্ছাদান বা জরিমানা আদায় ইত্যাদি নানা ভাবে কব্জাকারী শরীকের সীমালঙ্ঘন ব্যতীত হাত থেকে কজাকৃত সম্পদ ছুটে গেলে এর অর্থ হবে, সে তার শরীককে ঋণে থাকা তার অংশ থেকে বঞ্চিত করল। তাই অন্য শরীকের এই অধিকার হবে তাকে জরিমানা আদায় করতে বলা। তার বাড়াবাড়ি না হলে জরিমানা আসবে না। তবে হারিয়ে যাওয়া সমুদয় সম্পদ কজাকারীর মালিকানা থেকে হারিয়েছে বলে ধর্তব্য হবে। অবশ্য যে শরীক ঋণ কজা করেনি তার পূর্ণ অংশ ঋণগ্রহীতার দায়ে থাকবে।
তবে ঋণগ্রহীতার কাছে কব্জাকারী শরীকের প্রাপ্য গচ্ছা যাওয়ার পর অপর শরীক যদি এই শরীকের কাছে ঋণ আদায় করতে আসে, তাহলে অন্য সকল ঋণের মতো এই শরীকের হকও কব্জাকারীর জিম্মায় আবশ্যক হবে। কেননা কজাকৃত সম্পদে তার অংশের ঝুলে থাকাকে সে রহিত করেছে, যেহেতু সে কজাকারী শরীককে কজাকৃত অংশের মালিক হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এবং তাতে ঋণগ্রহীতার নিকট তলব করার সুযোগ প্রদান করেছে। ২২
কজাকারী শরীকের কজাকৃত ঋণ থেকে এই শরীক তার অংশ কজা করার পর ঋণগ্রহীতার দায়ে থাকা অবশিষ্ট ঋণ প্রত্যেকের নিজ নিজ অবশিষ্ট অংশ অনুপাতে ভাগ হবে। আর এটিই মূল ঋণে তাদের প্রাপ্য থাকার মূল সম্পর্কসূত্র। এই বিধান অর্থাৎ দুই শরীকের একজন ঋণের যা কজা করবে তা উভয়ের যৌথ প্রাপ্য হওয়ার বিধানটিকে আবু হানীফা রহ. শর্তহীন বলেছেন। এক শরীক তার অংশকে মেয়াদী করুক না করুক, বিধান অভিন্ন। কেননা তার মতে মেয়াদী বানানো অনর্থক। যেহেতু মেয়াদী বানানো হলে ঋণে ভাগ হওয়া প্রকাশ্য। এর দলিল, বর্তমান সম্পদ গুণগত বিচারে মেয়াদী নয়, যা স্পষ্ট। আর বিধানগত বিচারেও নয়, যেহেতু বর্তমান সম্পদ ছাড়া মেয়াদে পরিশোধযোগ্য সম্পদের দাবি করা অসম্ভব।
আবু ইউসুফ রহ.-এর মতে যা ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর একটি বর্ণনা, ঋণকে মেয়াদে পরিশোধযোগ্য বানানো হলে তা তলব করার প্রতিবন্ধক। দু'শরীকের একজন যদি নিজ অংশ মেয়াদে পরিশোধযোগ্য বানায়, তাহলে মেয়াদ হওয়ার আগে কব্জাকারী শরীক যা কজা করে সে একা তার মালিক হবে। কেননা ঋণে মেয়াদ থাকা তা তলব করার পরিপন্থী। তাদের ভিন্নমতের কারণ, ঋণকে মেয়াদী বানানো তাদের মতে সহীহ। কেননা এটি নিজ সম্পদে মালিকের হস্ত ক্ষেপ। তাই কাউকে ঋণ থেকে দায়মুক্তি প্রদান করার ন্যায় এটিও প্রযোজ্য হবে। বরং মেয়াদী বানানো তো নির্ধারিত সময় পর্যন্ত দায়মুক্তি। তাই তা নিছক দায়মুক্তির ন্যায় বিবেচনা করা হবে। এরপর যখন মেয়াদ উপস্থিত হবে তখন ধরে নেওয়া হবে যেন মেয়াদের শর্ত ছিল না। অন্য শরীক যদি ঋণের কোনো অংশ কজা করে, আর এ শরীকের পাওনা অংশ বাকি থাকে, তাহলে সে এই শরীক থেকে ঋণে তার অংশ পরিমাণ উসুল করবে। আর পাওনা বাকি না থাকলে অন্য শরীক তাকে ক্ষতিপূরণ দেবে।
হাম্বলীদের মতে, যে বর্তমান ঋণে তার অংশ বিলম্বে আদায়যোগ্য করে, তার অধিকার রয়েছে যে বিলম্ব না করে নগদ গ্রহণ করেছে তার অংশে শরীক হওয়ার। তবে যদি এ শরীকের ঋণ কজা হয়ে থাকে তার অনুমতিক্রমে আর কজাকৃত সম্পদ নষ্ট হয়, এদিকে ঋণ আদায়ের সময় তখনও হয়নি তাহলে বিধান ভিন্ন, এই শরীক অপর শরীকের অংশে অংশ নিতে পারবে না। ২৩
হাম্বলী মাযহাবের মূলনীতি সম্পর্কিত ইবনে রজব রহ.-এর বক্তব্য থেকে যা বোঝা যায় তা হচ্ছে, হাম্বলীগণ এক শরীক যা কজা করে তা বিশেষভাবে তার মালিকানাধীন গণ্য করেন। ইবনে তাইমিয়া রহ. এ মতটি গ্রহণ করেছেন এবং তাদের কেউ কেউ স্পষ্টবক্তব্যে এ মত ব্যক্ত করেছেন, যেমন কাজী ইয়ায। ২৪
টিকাঃ
২১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৫; তাবয়ীনুল হাকাক, খ. ৫, পৃ. ৪৬; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৪০; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১৪; আল-খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ৪০৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪২৬; আশ-শারহুল কাবীর, আল- মুগনীসহ, খ. ৫, পৃ. ১২৪
২২. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; আল-আতাসী, আলাল মাজাল্লা, খ. ৪, পৃ. ৪২; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৫-৬৬
২৩. প্রাগুক্ত; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৪৭-৪৮; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৭
২৪. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৯
📄 কজা করার স্থলবর্তী (مَا يَقُومُ مَقَامَ الْقَبْضِ مَا يُعَادِلُ الْوَفَاءَ)
যে বস্তুটি চুক্তির পর কব্জা করার উপযোগী হবে তাতে দু অবস্থা। চুক্তি করার আগেই হয়তো তা সে লোকের হাতে রয়েছে যে তা কজা করবে অথবা তার হাতে নেই, চুক্তির অপরপক্ষের হাতে রয়েছে।
প্রথম অবস্থা: চুক্তির পর কজা করলে যা চুক্তির একপক্ষের হাতে আসবে, চুক্তির পূর্বেই তা যদি তার হাতে থাকে, যেমন- কোনো কিছু কেউ বিক্রি করল বা দান করল বা বন্ধক রাখল ছিনতাইকারীর নিকট বা যে ধার নিয়েছে তার নিকট বা যার কাছে আমানত রাখা আছে তার নিকট বা যে ভাড়া নিয়েছে তার নিকট, তাহলে পূর্ব থেকে বিদ্যমান কজাই কি চুক্তির কজার স্থলবর্তী হবে, না-কি হবে না? তা নিয়ে ফকীহগণ মতবিরোধ করে তিনটি মত বর্ণনা করেছেন।
প্রথম মত: মালেকী ও হাম্বলী ফকীহদের মত: পূর্ববর্তী কজাই চুক্তির ফলশ্রুতিতে কজা করার স্থলবর্তী হবে শর্তহীনভাবে। অর্থাৎ পূর্ববর্তী দখল আমানতের দখল হোক বা ক্ষতিপূরণ ও জরিমানার দখল হোক, এখন যে কজা করার উপযোগী হয়েছে তা আমানতের কব্জা হোক বা ক্ষতিপূরণের কজা হোক; এখানে অনুমতিরও শর্ত নেই, পূর্ববর্তী কজার পর দীর্ঘসময় অতিবাহিত হওয়াও শর্ত নয়। ১০৪
সকল ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী দখলই চুক্তির প্রেক্ষিতে কজা করার স্থলবর্তী বলে গণ্য হবে। কেননা অব্যাহত কজাই সত্যিকার কজা, যেহেতু তাতে কজাকারীর যে কোনো কাজ করার সুযোগ ও অধিকার ছিল, সে অবস্থাতেই কব্জা করার উপযোগী চুক্তি সম্পাদন হয়েছে, ফলে তার সে সুযোগ ও অধিকার অব্যাহত থেকেছে। এক্ষেত্রে এ মর্মে কোনো দলিল নেই যে, চুক্তির পরই কব্জা বাস্তবায়িত হতে হবে, এর পূর্বের কজা গণ্য হবে না।
টিকাঃ
১০৪. শারহু মিয়ারা আলাত তুহফা, খ. ১, পৃ. ১১১; মাজদুদ্দীন ইবনে তাইমিয়া রচিত আল-মুহাররার, খ. ১, পৃ. ৩৭৪; ইবনে তাইমিয়া কৃত নাযারিয়্যাতুল আকদ, পৃ. ২৩৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৪৯ ও ২৭৩ এবং খ. ৪, পৃ. ২৫৩, মুদ্রণ আনসারুস সুন্নাহ আল মুহাম্মাদিয়্যা; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৪ এবং খ. ৫, পৃ. ৫৯৪, মুদ্রণ: দারুল মানার
এক্ষেত্রে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা পূর্ণ বা আংশিক ঋণ পরিশোধের সমার্থক। তবে এগুলোর কোনো কোনোটি মূল ঋণদাতার নিকট থেকে কজা করার স্থলবর্তী। কেননা এগুলো প্রকারান্তরে ঋণের দাবি করা। যেমন ঋণদাতার কোনো নিকট পাওনা ঋণগ্রহীতার থাকার মাধ্যমে তার দায় থেকে দেনা ও ঋণ রহিত হয়ে যায়, ঋণ দ্বারা ঋণ শোধ করার বদলাবদলি তরীকা হিসেবে। যেমন ঋণগ্রহীতা ঋণদাতার কাছে কোনো বস্তু বিক্রি করল, বা তাকে ভাড়া দিল বা কর্জ হিসেবে দিল, অথবা তার দেনা ঋণের বিপরীতে কোনো বস্তু দ্বারা সন্ধি করল, বা ঋণের বিপরীতে কোনো কিছু বন্ধক রাখল আর বন্ধক রাখা বস্তুটি নষ্ট হয়ে গেল, অথবা ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কোনো বস্তু নষ্ট বা জবরদখল করল এর পর তা ঋণদাতার কাছে নষ্ট হলো, অথবা ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কোনো বস্তু ফাসিদ চুক্তিতে ক্রয় করেছিল। তার পর তা খোয়া যাওয়া বা তার মালিকানার বাইরে চলে যাওয়ায় ঋণগ্রহীতার হাতছাড়া হলো।
এমনিভাবে এগুলোর কোনো কোনোটি কজা করতে দেওয়া এবং আদায় করার স্থলবর্তী; কজা করা ও দাবি করার স্থলবর্তী নয়। যেমন ঋণদাতার পূর্ব পাওনা ঋণগ্রহীতার নিকট সদ্যকৃত ঋণের মাধ্যমে রহিত হবে। যেহেতু মূলনীতি হচ্ছে, দুটি ঋণ পরস্পর মুখোমুখি পরিশোধযোগ্য হলে দ্বিতীয়টি প্রথমটির পরিশোধ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা প্রথম পরিশোধযোগ্য ঋণটি দ্বিতীয় ঋণ নেওয়ার পূর্বেই আদায় করা আবশ্যক ছিল। যেমন তুমি তার কাছ থেকে কোনো কিছু কিনলে এবং কজা করলে। তারপর বস্তুটির মূল্য সে পুরোপুরি নেওয়ার আগেই তোমার কজায় থাকা বস্তুটি তুমি নষ্ট করলে। (তাহলে মূল্য পরিমাণ ঋণ পরিশোধ বলে গণ্য হবে।)
এ বিষয়গুলোর কোনোটি এমন, যেগুলোতে মূলত ঋণ দ্বারা ঋণ পরিশোধ করা হয় না। বরং তা দ্বারা ধ্বংস ও বিলুপ্ত করা হয়। যেমন কারো ঋণ হেবা করে তাকে ঋণ থেকে দায়মুক্ত করা। অথবা তা দ্বারা ধ্বংস ও বিলুপ্ত করা নয়; তবে তার পরিশোধে কারো অংশীদার হওয়ার সুযোগ থাকে না। যেমন মহিলার দায়ে থাকা ঋণকে তার মহর নির্ধারণ করার দরুন তার ঋণ রহিত হওয়া। অথবা কিসাসের দাবিদার ব্যক্তির দায়ে থাকা ঋণ জিনায়াতুল আমদ (ইচ্ছাকৃত অপরাধ)-এর সন্ধির বিনিময়ের বদল হওয়ার মাধ্যমে রহিত হওয়া। (যেমন হত্যা করা বা ঋণগ্রহীতার মাথায় হাড় পর্যন্ত পৌঁছে এমন আঘাত করা)। উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রে চুক্তি স্বয়ং ঋণের ওপর সংঘটিত হয়েছে। ফলে এ চুক্তিটি স্বয়ং এর অধিকার লাভ করেছে। তারপর স্বামী বা আঘাতকারী কারো দায়ে কোনো কিছুর বিনিময় না রেখে তা রহিত হয়েছে। এভাবে ঋণের বিনিময়ে ঋণ শোধ হয়েছে। আর বাস্তবে কারো অংশীদার হওয়ার সুযোগ থেকে শংকামুক্ত হয়েছে তা যা তারা তাদের দায়ে আবশ্যক করে নিয়েছে। সুস্পষ্ট যে, মহিলার সম্ভোগ এবং অপরাধীর কিসাস রহিত হওয়া এমন বিষয়, যেখানে যৌথ মালিকানা চলে না।
ইমাম মুহাম্মদ-এর পক্ষ থেকে ইজারার ক্ষেত্রে অনুরূপ মত বর্ণিত রয়েছে, যদি ইজারাকে ঋণের সাথে যুক্ত করা হয়। কেননা উপকার লাভ শর্তহীন সম্পদের শ্রেণীভুক্ত নয়। ২৫
হানাফীদের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, যৌথ ঋণের ক্ষেত্রে দুই শরীকের একজন যদি উল্লিখিত কোনো পন্থায় নিজ অংশ পূর্ণ আদায় করে তাহলে তার শরীক তার কাছ থেকে তা আদায়ের অধিকার রাখে না। অধিকার না রাখার অর্থ হলো, এই শরীক তার শরীকের কাছ থেকে অথবা ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায়ের ইচ্ছাধিকার পাবে। তবে যেক্ষেত্রে সে দাবি করে এবং কোনো ভাবে তা কজা করে সেক্ষেত্রে তার খিয়ার থাকবে না। সে সময় অংশীদারীর যোগ্য বস্তু কজাকারীর জন্য নিরাপদ। তবে এটি পরিশোধ করা বা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে নয়।
সন্ধির মাধ্যমে- যার ভিত্তি উদারতা ও ভ্রুক্ষেপ না করা- শোধকৃত ঋণ উসূলের অবস্থা অন্য পন্থায়-যার বৈশিষ্ট্য কষাকষি ও কৃপণতা যেমন বিক্রি ও ইজারার পন্থায়-শোধকৃত ঋণের প্রকৃতি থেকে ভিন্ন। উদাহরণ স্বরূপ, বিক্রির মাধ্যমে শোধের ক্ষেত্রে অর্ধেক পুঁজির শরীক, তার শরীকের নিকট থেকে যে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে নিজ অংশের বিনিময়ে কোনো কিছু কিনেছে, এক চতুর্থাংশ উসুল করা এবং এটা উসুল করতে বাধ্য করা সঙ্গত। সেক্ষেত্রে এটিই প্রকাশ্য, শরীক ক্রেতা নিজ অংশ পুরোপুরি আদায় করতে পারবে তাই, এই উসুলে ক্রেতার কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা ক্রেতার অবস্থা এমন নয় যে, শরীক তাকে যে মূল্য পরিশোধ করছে তার চেয়ে বেশি বা তার বরাবর নেওয়ার সামর্থ্য তার আছে। যে শরীক বস্তুটি কিনেছে তারও এই ক্ষমতা নেই যে, সে যা কিনেছে তা অপর শরীককে দিয়ে দেবে। কেননা, এটি সে কিনেছে তার দায়িত্বে মূল্য বাকি রেখে। এরপর সে মূল্য এবং ঋণগ্রহীতা বিক্রেতার দায়িত্বে থাকা ঋণে বদলা বদলি হয়েছে।
তবে হ্যাঁ, যদি তারা রাজি হয় যে কেনা বস্তুটি তাদের যৌথ, তবে তা তাদের যৌথ মালিকানাধীন হবে। এটি হবে আলাদা চুক্তি। যেন ক্রেতা বিন্ন অন্য শরীক, বস্তুটির অর্ধেক ঋণের এক চতুর্থাংশ দিয়ে কিনল, যা সে ক্রেতা থেকে উসুলের হকদার। সন্ধির মাধ্যমে উসূলের ক্ষেত্রে, যে বস্তুর বিনিময়ে এক শরীক তার অংশের ক্ষেত্রে সন্ধি করেছে তার নিকট থেকে যদি অপর শরীক উসুল করে তাহলে সে ঋণের এক চতুর্থাংশ উসুলে বাধ্য করার অধিকার পাবে না। এর কারণ, হতে পারে সন্ধির মাধ্যমে সে যা উসুল করেছে তা বেশি হবে, যেহেতু সন্ধির ভিত্তি হলো উদারতা। তাই এক্ষেত্রে সন্ধিকারী শরীকের ইচ্ছাধিকার থাকবে। সে ঋণের এক চতুর্থাংশ দিতে পারে অথবা সন্ধিকৃত বস্তুর অর্ধেক দেবে। ২৬
যৌথ ঋণের কোনো পাওনাদার যদি তার ঋণগ্রহীতাকে নিজ পাওনার আংশিক ঋণ থেকে দায়মুক্ত করে, তাহলে এই পাওনাদারের অবশিষ্ট অংশ এবং অন্য শরীকের পূর্ণ অংশ ঋণগ্রহীতার দায়ে আবশ্যক থাকবে।
ঋণের কোনো অংশ তারা কজা করলে সে অংশের ভাগ হবে এই অনুপাতে- দায়মুক্তকারীর অবশিষ্ট অংশ আর অন্য পাওনাদারের পূর্ণ অংশ- যদি এই ভাগ দায়মুক্তি থেকে বিলম্বিত হয়। অথবা তাদের ভাষ্য অনুযায়ী ঋণের ভাগ হবে অবশিষ্ট অংশ অনুপাতে। কজার পর দায়মুক্তি সহীহ হওয়ার কারণে কজার আগে দায়মুক্তি হোক বা পরে, বিধান অভিন্ন। সুতরাং ঋণ যদি হয় এক হাজার প্রত্যেকের পাওনা পাঁচশ করে, এরপর এক পাওনাদার তার পাওনা একশ দায়মুক্ত করল। এখন দায়মুক্তিকারীর জন্য অবশিষ্ট থাকবে অন্য শরীকের পাঁচ ভাগের চার ভাগ। এখন যা কিছু কজা করা হবে তা এই অনুপাতে বণ্টিত হবে। যদি সমানভাবে বণ্টন করার পর দায়মুক্তি হয়, তাহলে বণ্টন সহীহ ভাবে সম্পাদিত হয়েছে বলে ধরা হবে। কারণ, বণ্টনের সময় উভয়ের হক ছিল সমান। এরপর ঋণগ্রহীতা তাকে দায়মুক্তকারী পাওনাদারের কাছ থেকে সে একশ নিয়ে আসবে, যা সে পাওনাদার মাফ করে দিয়েছে। এটি সর্বসম্মত মত, তবে কজা করার পর ঋণ মাফ করা হানাফীদের স্বতন্ত্র মত। ২৭
টিকাঃ
২৫. তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৪৭
২৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৫৫-৬৮; মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৩১৭; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৪৫-৪৮
২৭. প্রাগুক্ত