📄 ক্ষতির অবস্থা
ভবন বা গাছ, ফল বা ফসলের যৌথ অংশের বিক্রি জায়েয নেই। এক্ষেত্রে যৌথ অংশ বিক্রি দ্বারা উদ্দেশ্য যে জমিতে এগুলো আছে সে জমি থেকে আলাদা করে এগুলো বিক্রি করা।
যদি ভবন ভেঙ্গে ফেলা ও গাছ অপসারণের শর্ত করা হয় তাহলে যে শরীক বিক্রি করেনি তার অংশের ভবন ভেঙ্গে ফেলা ও গাছ অপসারণ ছাড়া উপরিউক্ত শর্ত পূরণ করা সম্ভব হবে না, যেহেতু এই জমি যৌথ মালিকানাধীন। আর এই ভেঙ্গে ফেলা ও অপসারণ করা প্রকাশ্য ক্ষতি, যা জায়েয নেই। তা ছাড়া ভবন ও গাছ অবশিষ্ট রাখার শর্ত চুক্তির মূলদাবির অতিরিক্ত, দুই চুক্তিকারীর একজনের জন্য উপকারের শর্ত। সুতরাং এ শর্ত সত্তাগতভাবে বাতিল এবং চুক্তি বাতিলকারীও বটে। কেননা এতে সুদ রয়েছে, কারণ এ উপকার বিনিময়মুক্ত অতিরিক্ত উপকার। ১২
ফল বা ফসল যদি কাটার সময়ে উপনীত না হয়, তাহলে শরীক ভিন্ন কারো কাছে শরীকের অনুমতি ছাড়া এগুলোর কোনো অংশের বিক্রি জায়েয নেই। যেহেতু তখন ক্ষতির আশংকা রয়েছে। কারণ ক্রেতা তার ক্রয়কৃত অংশ থেকে কেটে নেওয়ার দাবি জানাবে। আর এই শরীকের অংশ কাটা ছাড়া ক্রয়কৃত অংশ অর্পণ করা সম্ভব নয়। ১৩
ফকীহদের মতে, শরীক উপস্থিত থাকলে তার অনুমতি ছাড়া যৌথ মালিকানার বস্তু দিয়ে উপকৃত হওয়া জায়েয নেই। এর কারণ, অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে সে হবে জবর দখলকারী। অনুমতি প্রদানে স্বাভাবিক প্রচলনের অনুমতিও অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং যৌথ মালিকানাধীন জানোয়ারের পিঠে যদি অন্য শরীকের অনুমতি ছাড়া কোনো শরীক আরোহণ করে বা বোঝা বহন করে, তাতে পশু ধ্বংস হয় বা দুর্বল হয় আর তার মূল্য কমে যায়, তাহলে পশু ধ্বংস হওয়ার অবস্থায় সে তার শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ দেবে আর পশু দুর্বল হলে তার মূল্য হ্রাসের ক্ষতি পূরণ দেবে।
এক শরীক অপর শরীকের উপস্থিতি সত্ত্বেও তার অনুমতি ছাড়া যৌথ মালিকানার জমিতে চাষ করলে বা ভবন নির্মাণ করলে, সেক্ষেত্রে গসবের (জবরদখলের) বিধানাদি প্রয়োগ করা হবে। জমি দুজনের মাঝে ভাগ করা হবে। প্রথম শরীকের জন্য তার শরীকের জমি-অংশে যে ফসল বা ভবন আছে তা উপড়ে ফেলা এবং তার জমির ক্ষতিপূরণ দেওয়া আবশ্যক হবে। তবে ফসল পেকে গেলে বা পেকে যাওয়ার উপক্রম হলে শুধু জমির ক্ষতিপূরণ দিতে হবে; ফসল উপড়ে ফেলা আবশ্যক নয়। অপর শরীকের জন্য বৈধ নয় যৌথ মালিকানার জমিতে চাষকারী শরীককে অর্ধেক বীজ দেওয়া এই শর্তে যে, ফসল উভয়ের মাঝে ভাগ হবে।
এর কারণ, ফসল উদগত না হলে এই কারবার হবে অজ্ঞাত বস্তুর বিক্রি। তবে ফসল উদগত হলে এই কারবার করতে সমস্যা নাই। যেমন শরীকের অধিকার নাই ফসল না কেটে জমি ভাগ করা সম্ভব হলে ফসল তুলে ফেলার জন্য জোরাজুরি করার।
এক্ষেত্রে শাফেয়ীদের একটি সুন্দর মূলনীতি রয়েছে। শরীক যদি যৌথ মালিকানার বস্তু ব্যবহার না করে বা পালাক্রমে ব্যবহার করে তাহলে সে হবে তার আমানতদার। পালাক্রমে ব্যবহার করা হবে ফাসিদ ইজারা। আর যদি শরীকের অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করে তাহলে হবে আরিয়া (ধারকৃত সম্পদ নেওয়া)। আর অনুমতি ছাড়া করলে হবে গসব (জবরদখল)। দুগ্ধবতী গাভীর দুধ দোহন করাও ব্যবহার করার মাঝে অন্তর্ভুক্ত। ১৪
এক শরীকের অনুপস্থিতিতে বা মৃত্যুতে, উপস্থিত অন্য শরীকের জন্য যৌথ মালিকানার বস্তু হতে এমনভাবে উপকৃত হওয়া বৈধ, যেভাবে বস্তুটির ক্ষতি না হয়। ১৫
যৌথ মালিকানার বস্তুর পেছনে যদি খরচের প্রয়োজন হয়, নির্মাণের প্রয়োজনে বা অন্য কারণে, যেমন ধসে যাওয়া অংশের পুনর্নির্মাণ বা দুর্বল অংশের সংস্কার অথবা পশুকে খাবারদান, আর শরীকদের মাঝে এ বিষয়ে মতভেদ হলে, কতক শরীক খরচ করতে ইচ্ছুক আর কতক অনিচ্ছুক, তাহলে হানাফীদের মতে এসংক্রান্ত বিধানে বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। কারণ, যৌথ সম্পদটি হয়তো বিভাজনযোগ্য হবে অথবা বিভাজনযোগ্য নয়।
ক. বিভাজনযোগ্য সম্পদ, যেমন প্রশস্ত বাড়ি, বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুতকৃত দোকানপাট বা একাধিক গবাদিপশু। এসব ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক শরীককে খরচ করতে বাধ্য করা যাবে না। তবে নিজ সম্পদের সংস্কার ও সেজন্য খরচে যে ইচ্ছুক তার জন্য যৌথ সম্পদটি ভাগ করা হবে। তবে অনিচ্ছুক ব্যক্তির অবস্থান মঙ্গল ও সুবিধার বিপরীত হলে সে যদি দেখভাল করার দায়িত্বপ্রাপ্ত বা ওয়াকফের তত্ত্বাবধায়ক হয় (এবং ওয়াকফের দুটি যৌথ বাড়ি) তাহলে তাকে বাধ্য করা হবে খরচ প্রদানে। কেননা তার হস্তক্ষেপ ওয়াকফ সম্পত্তির জন্য সুবিধাকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। (তাই সে সুবিধার বিপরীত অবস্থান নিলে তাকে বাধ্য করা হবে।)
খ. যৌথ মালিকানার সম্পদ যদি ভাগযোগ্য না হয় তাহলে অনিচ্ছুক শরীককে খরচ প্রদানে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হবে। কেননা তার অনিচ্ছা নিজ সম্পদ দ্বারা তার শরীকের উপকার গ্রহণে প্রতিবন্ধক। এর নমুনা হলো একটি গবাদিপশুর খরচ, নহর ভাড়া নেওয়া, হ্রদ বা কূপ সংস্কার করা অথবা সেচযন্ত্র, জাহাজ বা ভাগযোগ্য নয় এমন দেয়াল স্থান সংকীর্ণতার কারণে বা তাতে বোঝা রেখে দেওয়ার কারণে সংস্কারের খরচ। তবে দেয়ালে রেখে দেওয়া বোঝা যদি সংস্কারে বা নির্মাণে অনিচ্ছুক শরীকের হয় তবে ভিন্ন কথা। পরবর্তী হানাফী ফকীহগণ এ মতের দিকে ঝুঁকেছেন যে, এ বিধানের ক্ষেত্রে প্রশস্ত দেয়ালও অবিভাজনযোগ্য বস্তুর পর্যায়ভুক্ত। যেহেতু এর সংস্কার ও নির্মাণে এক শরীক অংশগ্রহণ না করলে অন্য শরীকের ক্ষতির আশংকা রয়েছে।
মালেকীদের মত হানাফীদের মতের সাথে প্রায় মিলে যায়। তারা এতটুকু যোগ করেন, খরচে অনিচ্ছুক শরীক যদি অনিচ্ছায় অটল থাকে তাহলে বিচারক সে শরীকের পক্ষ থেকে আবশ্যক খরচ বহনে সক্ষম ব্যক্তির কাছে তার পূর্ণ অংশ বিক্রি করবেন। শরীকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ক্ষতি রোধ করার জন্যে তারা খরচ পরিমাণ অংশ কারো নিকট বিক্রির মত দেন না। এমনিভাবে বিক্রি না করে খরচ বহনে একাই সক্ষম হলেও কোনো শরীককে পুরো খরচ বহনে বাধ্য করার মতও তারা দেন না। যেমন যে অংশ ওয়াকফকৃত সে অংশ বিক্রি করার মত তারা দেননি। তারা বিক্রি নিষেধ করেছেন যখন সেখানে এমন কিছু থাকে যা খরচের জন্য যথেষ্ট, যেমন: সঞ্চিত ফসল, নগদ পারিশ্রমিকে ভাড়া নিতে আগ্রহী লোক থাকার দরুন প্রাপ্ত পারিশ্রমিক। যদিও তাদের পক্ষ হতে অন্য আরো মত বর্ণিত হয়েছে।
যদি যে অংশ ওয়াকফ করা হয়েছে তা বিক্রি করা ব্যতীত খরচ যোগানোর মতো কোনো সম্পদ না থাকে তাহলে পুরো জমিটাই বিক্রি করে ফেলতে হবে। যে জমি ওয়াকফ করা হয়ীন তা যেমন বিক্রি করা হয়। তাহলে তাতে শরীক সংখ্যা বাড়বে না। খলীলের গ্রন্থের কতক ব্যাখ্যাকার এ সম্পর্কে কিছু না বলায় নাফরাভী তা আলোচনা করেছেন।
তারা ওয়াকফকে বিক্রির জন্য প্রতিবন্ধক মনে করেন না। তবে যৌথ সম্পদ পুরোটাই যদি ওয়াকফকৃত হয় তাহলে খরচে ইচ্ছুক ব্যক্তি আবশ্যক খরচ বহন করবে। তারপর অপর শরীকের অংশে কৃত খরচ তার জমির ফসল থেকে উসুল করবে।
উপরন্তু মালেকীগণ নিশ্চিত উপকার না হলে সংস্কার করতে অনিচ্ছুক শরীককে জোর করার মত দেন না। এর উদাহরণ দিয়েছেন তারা ঝরণা ও কূপের সংস্কার। এমনকি তাদেরই এক দলের ঐ মত তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, এ সকল ঝরণা ও কূপের পাশে ফসল বা ফল থাকে তাহলে খরচ দিতে বাধ্য করা যাবে। তাদের মতে সংস্কার ইচ্ছুক-শরীক সংস্কার করবে। এরপর সে অনিচ্ছুক শরীককে বাড়তি পানি প্রদানে বাধা প্রদান করবে। যে অতিরিক্ত পানি সংস্কারকাজে প্রয়োজন। এভাবে সে নিতে থাকবে পূর্ণ খরচ উসুল না হওয়া পর্যন্ত। এমনকি যদি সদাসর্বদা এই অবস্থাই থাকে তাহলেও এভাবেই সে উসুল করবে।
তবে এ সংক্রান্ত মালেকীদের বক্তব্য পশুর ক্ষেত্রে নয়। (তবে যথাস্থানে তাদের স্পষ্ট বক্তব্যে বোঝা যায়, পশুর বিধান উল্লিখিত বিধানের ব্যতিক্রম নয়।) সে বক্তব্য হচ্ছে, তারা সালিশ/বিচারককে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার মত দেন যদি গবাদিপশু ব্যক্তি মালিকানাধীন হয় আর মালিক তার জন্য খরচ করা থেকে বিরত থাকে। মোটকথা, অতিরিক্ত তারা মালিককে যবেহযোগ্য পশু যবেহ করার অধিকার দিয়েছেন। যদি সে যবেহ করা বা খরচ প্রদান উভয়টি করতে অনিচ্ছুক হয় তাহলে বিচারক তার স্থলাভিষিক্ত হবেন। ১৬
যৌথ পশুর খরচ প্রদানের ক্ষেত্রে শাফেয়ীগণ ও হাম্বলীগণের মত উপরিউক্ত হানাফী ও মালেকী ফকীহদের মতের অনুরূপ। পশু ছাড়া অন্য বস্তুর ক্ষেত্রে শাফেয়ী ও আহমদ রহ. উভয়ের দুটি মত রয়েছে। ক্ষতি দূর করার স্বার্থে এবং মালিকানাধীন বস্তু পরিত্যক্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে অনিচ্ছুক শরীককে অন্য শরীকের সাথে নির্মাণ ও খরচ প্রদানে বাধ্য করা হচ্ছে একটি মত। হাম্বলীগণ ও অধিকাংশ শাফেয়ী ফকীহ যেমন গাযালী রহ. ও ইবনুস সালাহ রহ. এ মতটিকে নির্ভরযোগ্য মত বলেছেন।
অপর মত হলো বাধ্য না করার। কেননা অনিচ্ছুক ব্যক্তি খরচ প্রদান করে ক্ষতিগ্রস্তও হবে। আর ক্ষতি দ্বারা ক্ষতি দূর করা যায় না। তা ছাড়া অনিচ্ছুক ব্যক্তির খরচ না করার ওযর বা ভিন্ন চিন্তা থাকতে পারে। উপরন্তু যে বস্তু প্রাণশূন্য, তার সত্তাগত এমন কোনো সম্মানও নেই, যার কারণে তার পিছনে খরচ করা যথাযথ বলে বিবেচিত হবে। তাই তা পরিত্যক্ত হলে শরয়ীভাবে মর্যাদাবান কোনো বস্তু নষ্ট করা হবে না। যেহেতু কোনো কাজ না করাকে তারা নষ্ট করার অন্তর্ভুক্ত গণ্য করেন না। বরং এক্ষেত্রে নষ্ট করার বিষয়টি কোনো কাজ হতে হবে। যেমন কোনো ব্যক্তি নিজ সামানা সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে তা বিনষ্ট বলে গণ্য হবে।
এ মতটি শাফেয়ীদের কাছে নির্ভরযোগ্য। ইবনে কুদামা বলেন, দলিলের বিচারে এটি মজবুত। যদিও শাফেয়ীদের জাওযী উদ্ভিদকে এ বিধানের ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করে তা পশুর বিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। শাফেয়ীদের কোনো কোনো ফকীহ উভয় মতের মাঝে সমন্বয় করেন এভাবে যে, খরচে বাধ্য করার বিষয় বিচারকের কাছে ন্যস্ত করা হবে। যদি তিনি অনিচ্ছুক শরীকের পক্ষ থেকে শুধু গোয়ার্তুমি পান তাহলে তাকে বাধ্য করবেন। যদি তেমন না হয় তাহলে বাধ্য করবেন না। ১৭
টিকাঃ
১২. রদ্দুল মুহতারসহ আদ দুররুল মুখতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৫
১৩. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৮৯; আল-বাহজা আলাত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২০৯, ২১৬
১৪. প্রাগুক্ত; আশ শারকাভী আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ১১৩
১৫. মোল্লা মিসকীন আলাল কানয, খ. ২, পৃ. ২০৮; আল-ঈনায়া আলাল হিদায়া, খ. ৮, পৃ. ৩৮০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৮৯; আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ২৭৮; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩৬
১৬. ইবনে আবিদীন, খ. ৩, পৃ. ৩৬৬; আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ৩৭২; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৭৩-১৭৪; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১০৮-১০৯
১৭. 'আশ-শারকাভী, আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ৩৪৭-৩৪৮; দালীলুত তালিব, পৃ. ২৫০-২৫১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৯০; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪৫, ৪৯, ৫০
📄 এক শরীক অপর শরীকের নিকট থেকে খরচকৃত অর্থ ফেরত নেওয়া
বিভাজনযোগ্য যৌথ মালিকানার বস্তুতে এক শরীক অপর শরীকের অনুমতি ছাড়া পুরো খরচ একা বহন করলে, হানাফীদের মতে সে হবে স্বেচ্ছাদানকারী। সদৃশ বস্তু বা মূল্যজাতীয় বস্তু কোনোটির দ্বারা তার শরীকের নিকট থেকে সে খরচকৃত অর্থ আদায় করতে পারবে না। যেহেতু ভাগ করে খরচ করলে স্বেচ্ছাদান থেকে বাঁচার এবং না করার সুযোগ ছিল, কিন্তু সে তা করেনি।
তবে তারা উল্লেখ করেন, যৌথ সম্পদ স্থানান্তর করার জন্য খরচ না করলে যদি সম্পদ খোয়া যাওয়া বা কমে যাওয়ার আশংকা করে শরীক, যেমন মরুভূমির মত ভয়ংকর জায়গায় মালবোঝাই যান নষ্ট হলো, তাহলে সে স্থানান্তর করার জন্য খরচ করবে। আর যা খরচ করবে তা থেকে শরীকের অংশ পরিমাণ তার নিকট থেকে আদায় করবে।
বিভাজনযোগ্য নয় এমন বস্তুর ক্ষেত্রে ইবনে নুজাইম আল আশবাহ গ্রন্থে মত দিয়েছেন, শর্তহীনভাবে শরীক অন্য শরীকের নিকট থেকে তার অংশ পরিমাণ আদায় করবে। সম্ভব হলে বস্তুটি ভাড়া দেবে এবং তা থেকে তার খরচ তুলে নেবে। খরচ যদি বিচারকের আদেশে করে থাকে তাহলে বস্তুর ভাড়া থেকে খরচ পরিমাণ অর্থ উসুল করবে। আর বিচারকের আদেশ ছাড়া হলে সংস্কারের বিভিন্ন খাতে ব্যয়কৃত অর্থের বাজারমূল্য উসুল করবে। ১৮
যে শরীক যৌথ সম্পদে ব্যয়কৃত অর্থ একা বহন করে, বিচারকের আদেশ বা শরীকের অনুমতি ব্যতীত, সে খরচকৃত অর্থের কোনো অংশ তার শরীকের নিকট থেকে আদায় করতে পারবে না। শাফেয়ীদের মতে এর কারণ, এক্ষেত্রে সে স্বেচ্ছাদানকারী। এমনকি যাকে খরচে অংশগ্রহণ করার জন্য বাধ্য করা হবে তার ক্ষেত্রেও অপরকে স্বেচ্ছাদাতা বিবেচনা করা হবে। এই শরীকের বিষয়টিকে তুলনা করা হয়েছে ঐ লোকের সাথে যে অপরের ঋণ তার অনুমতি ছাড়া শোধ করে, এ ব্যক্তির বিধান হাম্বলীদের মতে অনুরূপ। তবে তাদের মতে খরচে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করার বিষয়টি ভিন্ন, যদি শরীক তার অপর শরীক থেকে উসুলের উদ্দেশ্যে খরচ করে থাকে। এর ভিত্তি হলো এক ব্যক্তির ঋণ তার অনুমতি ছাড়া শোধ করার ক্ষেত্রে হাম্বলীদের দুই মতের একটি। তা হলো, এ ব্যক্তি মূল ঋণগ্রহীতা থেকে সমুদয় ঋণ আদায়ের হকদার।
মালেকীগণ বলেন, এক শরীক যদি যৌথ জাঁতাকল মেরামত করে অন্য শরীকদের অনুমতি বা তাদের নীরবতাসহ, তাহলে সে প্রত্যেকের দায়ে আবশ্যক অংশ অনুপাতে তার খরচকৃত অর্থ তাদের নিকট থেকে আদায়ের হকদার। আর যদি তাদের প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও করে, তাহলে সে তাদের দায়ে আবশ্যক কোনো অর্থ আদায়ের অধিকার পাবে না। তবে সে তার খরচকৃত অর্থ ফসল থেকে উসুল করবে। তার উসুল করার পর যা উদ্ধৃত্ত হবে তাতে সকলেই অংশীদার হবে। ১৯
টিকাঃ
১৮. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৬৪, ৩৬৬. ৩৬৭
১৯. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৬৭-৩৬৮; আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ২৭৩-৭৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১০; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪৭, ৮৮
📄 যৌথ ঋণ (الدَّيْنُ الْمُشْتَرَكُ)
যৌথ হওয়া বা না হওয়ার বিচারে ঋণ দুই প্রকার: ঋণ যৌথ হওয়া বা না হওয়া হিসাবে দু প্রকার: যৌথ ও একক। ৭৯
ক. যৌথ ঋণ (الدَّيْنُ الْمُشْتَرَকُ) : যে ঋণ সাব্যস্ত হওয়ার কারণ এক। তা এক চুক্তিতে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির যৌথ মালিকানাধীন বিক্রীত পণ্যের মূল্য হতে পারে, যা বিক্রির সময় প্রত্যেকের মূল্যের অংশ আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি, মীরাহসূত্রে একাধিক ওয়ারিসের দায়ে সাব্যস্ত পাওনা হতে পারে, যৌথ ভোগকৃত বস্তুর বাজারমূল্য হতে পারে, দুই বা ততোধিক ব্যক্তির যৌথ সম্পদ থেকে নেওয়া কর্জের দেনা হতে পারে।
খ. একক বা গায়রে মুশতারাক ঋণ (الدَّيْنُ غَيْرُ الْمُشْرَكَ) : যে ঋণ সাব্যস্ত হওয়ার কারণ ভিন্ন। যেমন: একব্যক্তি থেকে দু'জন আলাদাভাবে কিছু অর্থ ঋণ নিল অথবা একব্যক্তির কাছে দু'জন তাদের যৌথ মালিকানাধীন সম্পদ বিক্রি করল আর বিক্রির সময় প্রত্যেকে নিজ অংশের মূল্য আলাদা করে উল্লেখ করল। এই প্রকারভেদের ফলাফল প্রকাশিত হয় নিম্নের মাসআলাগুলোতে:
টিকাঃ
৭৯. আদ-দুররুল মুখতার, রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৪৮০; দুরারুল হক্কাম, শরহু মাজাল্লাতিল আহকাম, খ. ৩, পৃ. ৫৩; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৬৯, ১৭০; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১০৯১; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৬
এটি এমন ঋণ, যা দুই বা ততোধিক শরীকের দায়ে এক কারণে আবশ্যক হয়। যেমন দুই শরীক তাদের যৌথ মালিকানাধীন একটি বাড়ি এক চুক্তিতে বিক্রি করল, প্রত্যেকের অংশের মূল্য আলাদা করে নির্ধারণ না করে। যদি মৌলিকভাবে বা বিধানগত বিচারে ঋণ আবশ্যক করে, এধরনের চুক্তি ভিন্ন ভিন্ন হয় তাহলে ঋণ আবশ্যক হওয়ার কারণও ভিন্ন ভিন্ন হবে। আর ঋণে অংশীদারী বাদ হবে। এর নমুনা হলো, এমন ঋণ, যা এক বস্তু যেমন এক বাড়ি বা একখণ্ড জমি যা দুজনের মালিকানাধীন, এমন একক বস্তুর মূল্য হিসাবে একজন ক্রেতার ওপর সাব্যস্ত হবে যদি তাদের প্রত্যেকে নিজ অংশ স্বতন্ত্র চুক্তিতে বিক্রি করে। এরপর যদি তারা ক্রেতার কাছ থেকে সমুদয় ঋণের একটি চুক্তিনামাও গ্রহণ করে তবুও এ ঋণ যৌথ হবে না। যেহেতু এটি দুকারণে আবশ্যক হয়েছে। মৌলিকভাবে ও বিধানগত এক কারণে নয়। যদিও বিক্রিত পণ্য, ক্রেতা ও চুক্তিনামা বিধানগত বিচারে এক। সুতরাং দু'বিক্রেতার কারো অপরের নিকট থেকে আদায়ের সুযোগ নেই, যদি তারা ঋণের কোনো অংশ লাভ করে।
যৌথ ঋণের একটি প্রকার হলো দুই বা ততোধিক শরীকের দায়ে এক কারণে আবশ্যক প্রতিটি ঋণ। তা এমন যা দুটো অযৌথ সম্পদের বিনিময়ে হয়ে থাকে। কিন্তু এক চুক্তির মাধ্যমে উভয়ের নিকট দাবি করা হয়। যেমন এই ব্যক্তির একটি বাড়ি এবং ঐ ব্যক্তির একটি বাড়ি। বাড়ি দুটোর সামগ্রিক মূল্য ধার্য করে তারা উভয়ে একসাথে এক চুক্তিতে এ দুটোকে বিক্রি করল। সমুদয় মূল্যের আলাদা পরিমাণ উল্লেখ করা হলো না, যেমন ছয়শ মুদ্রা এ বাড়ীর মূল্য আর চারশ মুদ্রা সে বাড়ির মূল্য এভাবে বলা হলো না। এমনিভাবে মুদ্রার গুণ দিয়ে নির্ধারণ করা হলো না। যেমন বলল, স্বর্ণমুদ্রা এই বাড়ির মূল্য আর রৌপ্যমুদ্রা ঐ বাড়ির মূল্য, এভাবে বিক্রি করল না। মূল্যের আলাদা করে বিবরণ দেওয়া হলে বা মুদ্রার গুণ নির্ধারণ করা হলে তা এক চুক্তিতে বিক্রির পরিপন্থী। এর কারণ, ক্রেতা তখন একজনের অংশে বিক্রিচুক্তি গ্রহণ করে অপরের অংশে বিক্রিচুক্তি রদ করার সুযোগ পায়। এই কারণ দর্শিয়ে যে, এই বাড়ির মূল্য বা মুদ্রাগুণ তার মিলমতো নয়।
তাহলে চুক্তির ভিন্নতাহেতু ঋণটি যৌথ হবে না। তবে উভয়ের প্রাপ্যের কমবেশ বলে দেওয়া হলে অতিরিক্ত অংশ আদায় করে দেওয়ার মাধ্যমে প্রাপ্যের কমবেশ দূর করা হলে ঋণটি পুনরায় যৌথ হয়ে যাবে। আননিহায়া গ্রন্থকার যোগ করেন, মৌলিকভাবে গুণে বা পরিমাণে পার্থক্য করা হবে না, এশর্ত হওয়া উচিত চুক্তির সময় এ বিষয়ে আলোচনা না হোক। ২০
টিকাঃ
২০. তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৪৫; ফাতহুল কাদীরসহ আল ঈনায়া আলাল হিদায়া, খ. ৭, পৃ. ৪৭
📄 যৌথ ঋণ কজা করা (قَبْضُ الدَّيْنِ الْمُشْتَرَكِ)
প্রথম: ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে তাগাদাকৃত ঋণ যদি যৌথ না হয়, তাহলে প্রত্যেক পাওনাদারে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে নিজ নিজ পাওনা আলাদা করে উসুল করে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। নিজ পাওনা হিসেবে প্রত্যেকে যে অর্থ কজা করবে তাতে অন্য পাওনাদার শরীক হতে পারবে না।৮০ যদি এ পাওনা দুই বা ততোধিক জনের মাঝে যৌথ হয়, তাহলে প্রত্যেক শরীকের অধিকার রয়েছে কব্জাকারীর নিকট থেকে নিজ অংশ আদায় করার। যে শরীক কব্জা করবে কজাকৃত পূর্ণ অর্থ তার এককভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং কজাকৃত অর্থ শরীকদের যৌথ মালিকানাধীন হবে। নিজ অংশ অনুপাতে প্রত্যেকে সে অর্থ থেকে নিজ নিজ হক পাবে। ৮১
দ্বিতীয়: কোনো শরীক যদি যৌথ ঋণে থাকা তার অংশ কব্জা করে, এরপর হিবা, নিজ দেনা পরিশোধ বা ভোগ করা ইত্যাদি কোনো এক পন্থায় নিজ কর্তৃত্বের আওতামুক্ত করে, তাহলে ঋণের অংশ অনুপাতে তার নিকট থেকে অপর শরীকদের নিজ নিজ প্রাপ্য আদায়ের সুযোগ আছে। সুতরাং দু'জনের যৌথ পাওনা যদি হয় এক হাজার দীনার, তাদের অংশ হয় অর্ধেক অর্ধেক হিসেবে, তাদের একজন ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে পাঁচশ দীনার কজা করে ভোগ করে, তাহলে অপর পাওনাদারের তার নিকট নিজের অংশ আড়াইশ দীনার ক্ষতিপূরণ আদায়ের অধিকার আছে। ঋণের অবশিষ্ট পাঁচশ দীনার উভয়ের যৌথ পাওনা হিসেবে বাকি থাকবে। ৮২
তৃতীয়: যৌথ ঋণ থেকে এক শরীক যদি নিজ অংশ কজা করে, এরপর কোনো অবহেলা বা ত্রুটি ছাড়া সে অংশ নষ্ট হয়, তাহলে কজাকৃত সম্পদে অপর শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ সে দেবে না। তবে সে নিজ অংশ উসুল করেছে বলে ধরা হবে। ঋণগ্রহীতার দায়িত্বে যে পাওনা অবশিষ্ট আছে তা অপর শরীকের প্রাপ্য হয়ে যাবে। ৮৩
চতুর্থ: কোনো শরীক যদি কাউকে যৌথ ঋণে নিজ অংশের কাফীল বানায়, অথবা ঋণগ্রহীতা তাকে তৃতীয় কারো হাওয়ালা করে, তাহলে অপর পাওনাদারের অধিকার রয়েছে তার সাথে ঐ পরিমাণ ঋণে শরীক হওয়ার, যা সে কাফীল বা হাওয়ালা করা ব্যক্তির নিকট থেকে কজা করবে। ৮৪
টিকাঃ
৮০. মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭২; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা ১০৯৯; আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৬২
৮১. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৬, (প্রকাশ, বুলাক, ১৩১০ হি.); দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৬৩; মাজাল্লাতুল আহকামিল, আদলিয়্যা, ধারা ১১০০, ১১০১; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭৩
৮২. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৬৬; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১১০২, ১১০৩; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭৫
৮৩. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৭৩; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১১০৬; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৭৬
৮৪. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৪; দুরারুল হুক্কাম, খ. ৩, পৃ. ৭৫; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১১০৯; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ১৮১
হানাফীগণ, শাফেয়ীগণ, এক বর্ণনা অনুযায়ী হাম্বলীগণ এবং মালেকীদের মাযহাবমতে, দুইজন ব্যক্তির যৌথ পাওনা ঋণের কোনো অংশ যদি একজন কজা করে, ঋণ কজাকারী ঋণগ্রহীতার কাফীল বা তার পক্ষ থেকে হাওয়ালা করা ব্যক্তি হোক না কেন, এই কজাকৃত অর্থ যৌথ ঋণের অংশ বলে বিবেচিত হবে। তাই এ কজাকৃত অর্থ যৌথ মালিকানার হবে। যে শরীক কজা করেনি ফকীহদের মতে তার নাম الشريك الساكت তার অধিকার রয়েছে মূল ঋণে তার অংশ অনুপাতে পরিশোধকৃত ঋণের অংশ সে কব্জাকারী শরীকের নিকট থেকে আদায় করতে পারবে। যেমন তার অধিকার রয়েছে কব্জাকারী শরীককে তার কজাকৃত অংশের মালিক হওয়ার সুযোগ দিতে দাবি ছেড়ে দেওয়া এবং তার অধিকার গচ্ছা না যাওয়ায় ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে নিজ অংশ আদায় করা। এমনকি যদি ঋণগ্রহীতার কাছে তার অংশ গচ্ছা যায়, যেমন ঋণগ্রহীতা দেউলিয়া হয়ে মারা গেল তাহলে সে কজাকারী শরীকের নিকট থেকে তার অংশ আদায় করবে, যেহেতু সে যা নিরাপদ থাকার আশা করেছিল (অর্থাৎ তার অংশ) তা নিরাপদ নেই। এ জাতীয় ক্ষেত্রে নিরাপদ থাকার শর্ত প্রচলনগতভাবে বোঝা যায়।
এ সকল ক্ষেত্রে বিধান একই। ঋণ কোনো বস্তুর বিনিময়ে হোক, যেমন: দুই শরীকের যৌথ মালিকানাধীন একটি বাড়ির মূল্য হিসেবে এক হাজার মুদ্রা, অথবা ক্ষতির বিনিময়ে হোক; যেমন দুজনের মালিকানাধীন ফসলের বাজারমূল্য স্বরূপ এক হাজার মুদ্রা, এ ফসলের উপড়ে ফেলা বা পুড়িয়ে ফেলা ইত্যাদির জরিমানা হিসেবে যা আদায় করে। যেমন দুজন ব্যক্তি মীরাছ হিসেবে এক ওয়ারিসদাতার নিকট থেকে একটি বস্তু পেয়েছে বা কোনো কর্জের বিনিময় হিসেবে যা তারা যৌথ মালিকানাধীন সম্পদ থেকে কর্জ দিয়েছে।
এক শরীক কজা করলে যৌথ পাওনার কজা ধরা হবে। এর কারণ, এ অংশ শুধু কজাকারী শরীকের অংশ, এ বিবেচনা করা সম্ভব নয়। তবে যদি ঋণদাতাদের মাঝে ঋণ ভাগ করে দেওয়া থাকে তাহলে ভিন্ন বিষয়। আর এটি হয়নি, হওয়া সম্ভবও নয় দুটি কারণে:
প্রথম কারণ, কারো দায়কে অংশ অংশ করে ভাগ করা যায় না। অথচ এটিই ভাগ করার মূল বিষয়। সুতরাং ঋণের ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্যতা অবাস্তব।
দ্বিতীয় কারণ: ভাগ করা হলে তাতে বিনিময় প্রদানের অর্থ যুক্ত হয়। এর কারণ, যৌথ সম্পদের যতগুলো অংশ- তা যত ছোট হোক না কেন- আমরা নির্ধারণ করতে পারি, তার প্রতিটি অংশ দুই শরীকের যৌথ হক। যদি আমরা দায়িত্বে থাকা ঋণের ক্ষেত্রে ভাগ হওয়া সঠিক বলি, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, দু'জন শরীকের প্রত্যেকে ঋণে তার শরীকের মালিকানা থেকে যে অংশ তার ভাগে পড়েছে তা সে নিজ মালিকানা থেকে শরীকের জন্য যে অংশ ছেড়ে দিয়েছে তার বিনিময়ে কিনল। অথচ এমন করা যায় না, এর কারণ এ কারবার হয়ে যায় দেনাদার ছাড়া অন্য কারো কাছে ঋণ বিক্রির পর্যায়ভুক্ত। (الشريك الساكت) কব্জা না করা শরীকের ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে উসুল করার অধিকার আছে। এর কারণ, তার পাওনা ঋণ এই ঋণগ্রহীতার দায়ে রয়েছে। আর ঋণগ্রহীতার সে অংশ অন্য কারো কাছে আদায় করার অধিকার নেই। সুতরাং এই আদায়ের (এক শরীককে শোধ করা) মাধ্যমে তার পাওনা রহিত হবে না। ২১
তবে এই শরীক যদি প্রথমে কব্জাকারী শরীকের নিকট থেকে আদায় করে তাহলে সে যা কজা করেছে তা তার মূল হক হিসেবে সাব্যস্ত হবে। কেননা ঋণ কজা করা ছাড়া নির্ধারিত হয় না। তাই কব্জাকারীর জন্য এই শরীককে কজা করতে বাধা দেওয়া বা শোধকৃত সম্পদ ছাড়া অন্য সম্পদ থেকে দেওয়ার অধিকার নেই। কজাকৃত সম্পদ মূল ঋণের অনুরূপ হোক বা তা থেকে ভালো অথবা তা থেকে খারাপ যাই হোক না কেন, বিধান অভিন্ন। কেননা (মূল ঋণ ও শোধকৃত অর্থের) শ্রেণী যদি এক হয়, তাহলে উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট হওয়ার ব্যবধান কজাকৃত সম্পদ দ্বারা ঋণ পরিশোধ হওয়ায় বাধা হবে না। এ জন্য ঋণদাতাকে উৎকৃষ্ট মান গ্রহণ করতে বাধ্য করা যাবে।
নষ্ট হওয়া, খোয়া যাওয়া ইত্যাদি যে কোনো কারণে অথবা কোনো বিনিময় প্রদান, স্বেচ্ছাদান বা জরিমানা আদায় ইত্যাদি নানা ভাবে কব্জাকারী শরীকের সীমালঙ্ঘন ব্যতীত হাত থেকে কজাকৃত সম্পদ ছুটে গেলে এর অর্থ হবে, সে তার শরীককে ঋণে থাকা তার অংশ থেকে বঞ্চিত করল। তাই অন্য শরীকের এই অধিকার হবে তাকে জরিমানা আদায় করতে বলা। তার বাড়াবাড়ি না হলে জরিমানা আসবে না। তবে হারিয়ে যাওয়া সমুদয় সম্পদ কজাকারীর মালিকানা থেকে হারিয়েছে বলে ধর্তব্য হবে। অবশ্য যে শরীক ঋণ কজা করেনি তার পূর্ণ অংশ ঋণগ্রহীতার দায়ে থাকবে।
তবে ঋণগ্রহীতার কাছে কব্জাকারী শরীকের প্রাপ্য গচ্ছা যাওয়ার পর অপর শরীক যদি এই শরীকের কাছে ঋণ আদায় করতে আসে, তাহলে অন্য সকল ঋণের মতো এই শরীকের হকও কব্জাকারীর জিম্মায় আবশ্যক হবে। কেননা কজাকৃত সম্পদে তার অংশের ঝুলে থাকাকে সে রহিত করেছে, যেহেতু সে কজাকারী শরীককে কজাকৃত অংশের মালিক হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এবং তাতে ঋণগ্রহীতার নিকট তলব করার সুযোগ প্রদান করেছে। ২২
কজাকারী শরীকের কজাকৃত ঋণ থেকে এই শরীক তার অংশ কজা করার পর ঋণগ্রহীতার দায়ে থাকা অবশিষ্ট ঋণ প্রত্যেকের নিজ নিজ অবশিষ্ট অংশ অনুপাতে ভাগ হবে। আর এটিই মূল ঋণে তাদের প্রাপ্য থাকার মূল সম্পর্কসূত্র। এই বিধান অর্থাৎ দুই শরীকের একজন ঋণের যা কজা করবে তা উভয়ের যৌথ প্রাপ্য হওয়ার বিধানটিকে আবু হানীফা রহ. শর্তহীন বলেছেন। এক শরীক তার অংশকে মেয়াদী করুক না করুক, বিধান অভিন্ন। কেননা তার মতে মেয়াদী বানানো অনর্থক। যেহেতু মেয়াদী বানানো হলে ঋণে ভাগ হওয়া প্রকাশ্য। এর দলিল, বর্তমান সম্পদ গুণগত বিচারে মেয়াদী নয়, যা স্পষ্ট। আর বিধানগত বিচারেও নয়, যেহেতু বর্তমান সম্পদ ছাড়া মেয়াদে পরিশোধযোগ্য সম্পদের দাবি করা অসম্ভব।
আবু ইউসুফ রহ.-এর মতে যা ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর একটি বর্ণনা, ঋণকে মেয়াদে পরিশোধযোগ্য বানানো হলে তা তলব করার প্রতিবন্ধক। দু'শরীকের একজন যদি নিজ অংশ মেয়াদে পরিশোধযোগ্য বানায়, তাহলে মেয়াদ হওয়ার আগে কব্জাকারী শরীক যা কজা করে সে একা তার মালিক হবে। কেননা ঋণে মেয়াদ থাকা তা তলব করার পরিপন্থী। তাদের ভিন্নমতের কারণ, ঋণকে মেয়াদী বানানো তাদের মতে সহীহ। কেননা এটি নিজ সম্পদে মালিকের হস্ত ক্ষেপ। তাই কাউকে ঋণ থেকে দায়মুক্তি প্রদান করার ন্যায় এটিও প্রযোজ্য হবে। বরং মেয়াদী বানানো তো নির্ধারিত সময় পর্যন্ত দায়মুক্তি। তাই তা নিছক দায়মুক্তির ন্যায় বিবেচনা করা হবে। এরপর যখন মেয়াদ উপস্থিত হবে তখন ধরে নেওয়া হবে যেন মেয়াদের শর্ত ছিল না। অন্য শরীক যদি ঋণের কোনো অংশ কজা করে, আর এ শরীকের পাওনা অংশ বাকি থাকে, তাহলে সে এই শরীক থেকে ঋণে তার অংশ পরিমাণ উসুল করবে। আর পাওনা বাকি না থাকলে অন্য শরীক তাকে ক্ষতিপূরণ দেবে।
হাম্বলীদের মতে, যে বর্তমান ঋণে তার অংশ বিলম্বে আদায়যোগ্য করে, তার অধিকার রয়েছে যে বিলম্ব না করে নগদ গ্রহণ করেছে তার অংশে শরীক হওয়ার। তবে যদি এ শরীকের ঋণ কজা হয়ে থাকে তার অনুমতিক্রমে আর কজাকৃত সম্পদ নষ্ট হয়, এদিকে ঋণ আদায়ের সময় তখনও হয়নি তাহলে বিধান ভিন্ন, এই শরীক অপর শরীকের অংশে অংশ নিতে পারবে না। ২৩
হাম্বলী মাযহাবের মূলনীতি সম্পর্কিত ইবনে রজব রহ.-এর বক্তব্য থেকে যা বোঝা যায় তা হচ্ছে, হাম্বলীগণ এক শরীক যা কজা করে তা বিশেষভাবে তার মালিকানাধীন গণ্য করেন। ইবনে তাইমিয়া রহ. এ মতটি গ্রহণ করেছেন এবং তাদের কেউ কেউ স্পষ্টবক্তব্যে এ মত ব্যক্ত করেছেন, যেমন কাজী ইয়ায। ২৪
টিকাঃ
২১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৫; তাবয়ীনুল হাকাক, খ. ৫, পৃ. ৪৬; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৪০; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১৪; আল-খিরশী আলা খলীল, খ. ৪, পৃ. ৪০৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪২৬; আশ-শারহুল কাবীর, আল- মুগনীসহ, খ. ৫, পৃ. ১২৪
২২. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৩৭; আল-আতাসী, আলাল মাজাল্লা, খ. ৪, পৃ. ৪২; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৫-৬৬
২৩. প্রাগুক্ত; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৪৭-৪৮; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৭
২৪. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৯