📄 ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত বা বাধ্যতামূলক যৌথ মালিকানা
ক. ইচ্ছাকৃত যৌথ মালিকানা (الاختيارية) হলো যা দুই বা ততোধিক শরীকের ইচ্ছায় সংঘটিত হয়ে থাকে। যা চুক্তির মাধ্যমে হতে পারে বা চুক্তি ছাড়া। শুরু থেকে চুক্তি যৌথ হোক বা যৌথ চুক্তি হঠাৎ হোক অথবা চুক্তির পর সম্পদে অংশীদারি হোক।
শুরু থেকে চুক্তি যৌথভাবে সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে যৌথ মালিকানার উদাহরণ হলো দুজন হাল চাষ বা আরোহণের জন্য কোনো জন্তু কিনল অথবা পুঁজি বিনিয়োগ করে ব্যবসায় শুরু করল। এমনিভাবে এ ধরনের বা অন্য কোনো ধরনের কোনো পণ্য কিনল বা হেবা কবুল করল বা অসিয়্যত বা সদকা কবুল করল।
নতুন ভাবে যৌথ চুক্তি হওয়া বা চুক্তি সংঘটনের পর সম্পদে যৌথ মালিকানার নমুনা হলো, এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে কেনাবেচা অথবা হেবা বা অসিয়ত গ্রহণ সংঘটিত হলো। তারপর তার সাথে এক ব্যক্তি শরীক হলে সে ব্যক্তি বিনিময়সহ বা বিনিময় ছাড়া তার অংশীদারী গ্রহণ করল।
চুক্তি ছাড়া যৌথ কারবার সংঘটনের নমুনা হলো দুজন ব্যক্তি তাদের সম্পদ একসাথে মিশিয়ে ফেলল বা উভয়ের পাতানো জাল দিয়ে উভয়ে এক শিকার ধরল অথবা উভয়ে মিলে একটি পতিত ভূমি আবাদ করল। ৩
খ. অনিচ্ছাকৃত বা জবরদস্তিমূলক মালিকানা হচ্ছে, যা দুই বা ততোধিক শরীকের অনিচ্ছাসত্ত্বেও সংঘটিত হয়। যেমন একসাথে রাখা বিভিন্ন থলে ছিদ্র হয়ে গেল আর থলের বস্তু মিশে গেল। ফলে অসম্ভব না হলেও, একত্র হয়ে যাওয়ার কারণে এগুলোকে আলাদা আলাদা করা কষ্টকর। তবে যদি এক শরীক বাকীদের অনুমতি ছাড়া মেশায় তাহলে ইবনে আবেদীন বলেন, এই শরীক নিজ সম্পদের সাথে যা কিছু মিশিয়েছে সেগুলোর সে মালিক হবে। আর বাড়াবাড়ির কারণে সে অনুরূপ বস্তু দিয়ে ক্ষতিপূরণ আদায়ে দায়বদ্ধ থাকবে। ফলে এখানে কোনো যৌথ মালিকানা থাকবে না। ৪
উল্লিখিত মাসআলায় কোনো মতভেদ নেই। তবে এর সদৃশ একটি মাসআলায় মতভেদ রয়েছে। তা হলো, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিজ সম্পদের সাথে অন্যের সম্পদ মেশানোর কারণে কোনো ব্যক্তি অন্যের সম্পদের মালিক হওয়া। আর সম্পদ মেশানোটা এমনভাবে হবে যে, দুজনের সম্পদ আলাদা করা সম্ভব হয় না বা আলাদা করা কষ্টকর। হানাফীগণ বলেন, এর মাধ্যমে সে মালিক হবে। তবে তার দায়িত্বে অন্যকে পরিবর্ত প্রদানের দায় সাব্যস্ত হবে। ইবনুল কাসিম, তার সাথে অধিকাংশ মালেকী ফকীহ, হাম্বলীদের মধ্যে কাজী ইয়ায রহ.-এ মত পোষণ করেন। কাজী ইয়ায বলেন, এটি মাযহাবের কিয়াসসম্মত মত। এটি শাফেয়ী রহ.-এর একটি মত। অধিকাংশ পরবর্তী শাফেয়ী ফকীহ এটিকে নির্ভরযোগ্য মত বলেছেন। তবে তাদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মতটিতে তারা শর্ত আরোপ করেছেন, পরিবর্ত প্রদান না করা পর্যন্ত মিশ্রণের কারণে যে অংশের মালিক সে হয়েছে তাতে সে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এর কারণ, এভাবে সে যে বস্তুর মালিক হয়েছে যদি সে তার সন্তোষমূলক বিনিময় প্রদানের মাধ্যমে মালিক হতো তাহলে নিজ জিম্মায় মালিককে সন্তুষ্ট না করা পর্যন্ত সে তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারতো না। সুতরাং সন্তোষ ছাড়া মালিকানা সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ না করার বিধান অধিক আমলযোগ্য।
তিন মাযহাবের কতক ফকীহ এই বলপূর্বক মালিকানা সাব্যস্ত হওয়াকে নাকচ করেন। তারা বলেন, এ সম্পদ যৌথ মালিকানাধীন হবে। এটি শাফেয়ী রহ.-এর একটি মত। তাকী আসুবকী রহ. এ মতটি গ্রহণ করেছেন এবং এর সমর্থনে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। মালেকী ফকীহদের মধ্যে আশহাব রহ. এবং অধিকাংশ পরবর্তী হাম্বলী ফকীহদের মত এটিই। ৫
টিকাঃ
৩. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৩; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১২-১৪; তানভীরুল আবছার, ব্যাখ্যাগ্রন্থসহ, খ. ৩, পৃ. ৩৬২; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭১; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১৪; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৯
৪. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৪; আল-ইতহাফ বি আশবাহি ইবনি নুজাইম, পৃ. ৪৪৮
৫. ব্যাখ্যাগ্রন্থসহ নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১৪, ১৮৪ ও ১৮৭; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৫ ও ২১৩, ৩১৯-৩২০; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ৩১৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৯২; আশ শারকাভী, আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ১০৯; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪১০; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৪
📄 যৌথ মালিকানার বিধানাবলি
যৌথ মালিকানায় দুই বা ততোধিক শরীকের প্রত্যেকে অপরের অংশের বিবেচনায় অপরিচিত ব্যক্তি। কেননা এই যৌথ কারবার কেউ কারো প্রতিনিধিত্ব করে না। এবং কোনো শরীকের অপর শরীকের সম্পদে কোনো মালিকানাও সাব্যস্ত হয় না। তা ছাড়া অন্য কোনোভাবে এক শরীকের ওপর অন্যের কোনো কর্তৃত্বও নেই। অথচ সম্পদে কর্তৃত্ব করার বৈধতার পন্থা হলো মালিকানা বা কর্তৃত্ব, এ বিষয়টিতে মতভেদের কোনোই সম্ভাবনা নেই।
📄 এই বিধানের ভিত্তিতে আহরিত বিভিন্ন মাসআলা
১. যৌথ মালিকানার কোনো এক শরীকের অপর শরীকের সম্পদে কোনো পারস্পরিক চুক্তি যেমন বিক্রি, ইজারা বা ভাড়া দেওয়া বা ধার দেওয়া ইত্যাদি সংঘটনের অধিকার নেই। তবে তার এই শরীক অনুমতি দিলে সে করতে পারবে। যদি কেউ সীমাতিক্রম করে যেমন যৌথ মালিকানাধীন বস্তু ভাড়া বা ধার দেয়, তারপর ভাড়াগ্রহীতা বা ধারগ্রহীতার হাতে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে এই শরীকের তার শরীককে তার অংশের ক্ষতিপূরণ দেওয়া আবশ্যক; এ মাসআলাতেও কোনো মতভেদ নেই। ৬
২. যৌথ মালিকানায় প্রত্যেক শরীকের অধিকার আছে তার অংশ অন্য শরীকের কাছে বিক্রি করা অথবা অন্য যে কোনোভাবে এমনকি অসীয়তের মাধ্যমে নিজ অংশ মালিকানামুক্ত করে শরীকের দায়িত্বে দিয়ে দেওয়ার। তবে যৌথ মালিকানাধীন বস্তু ভাগ করা ছাড়া হেবা করা যায় না, (ভাগ করার পর) যে পর্যন্ত হেবার বস্তুটি অপর শরীক কবুল না করে। (ততক্ষণ তাতে হেবা সম্পন্ন হবে না।) ক্ষতির অবস্থা এর ব্যতিক্রম, যার আলোচনা সামনে আসছে। ৭
হানাফী ফকীহগণ এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, এটি সামগ্রিকভাবে ঐকমত্যপূর্ণ মত। যৌথ মালিকানার বস্তু হেবা করা সকল আলেমের মতে বৈধ। এমনই মালেকী, হাম্বলী ও শাফেয়ী ফকীহগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। হানাফী ফকীহদের মতে যৌথ মালিকানার বস্তু হেবা করা জায়েয নয়-এর অর্থ হলো : তৎক্ষণাৎ মালিকানা সাব্যস্ত হবে না। তবে হেবা সহীহ হবে, বস্তুটি ভাগ করে অর্পণ করার ওপর মালিকানা স্থগিত থাকবে। ৮
৩. হানাফী ও শাফেয়ী ফকীহদের মতে এক শরীকের নিজ অংশ অন্য শরীক ছাড়া অন্য কারো কাছে সে শরীকের অনুমতি ছাড়া বিক্রি করা জায়েয। তবে ক্ষতির অবস্থা ব্যতিক্রম। হানাফী ফকীহগণ একটি অবস্থাকে এর ব্যতিক্রম বলেছেন। তা হলো, ব্যাপক ও বিস্তৃত করা ছাড়া দু'সম্পদের মিশ্রণ ঘটানো। এক্ষেত্রে শরীকের অনুমতি ছাড়া বিক্রি জায়েয নেই। কারণ এ অবস্থায় প্রতিটি সম্পদ তার মালিকের মালিকানাধীন, যদিও এগুলোকে পৃথক করা কষ্টকর অথবা অসম্ভব। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে মিশ্রণ ঘটানো হোক বা শরীকদের পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃত মিশ্রণের কারণে মিশ্রণ হোক, বিধান অভিন্ন।
এ অবস্থায় অর্থাৎ ব্যাপক বানানো ছাড়া দু'সম্পদের মিশ্রণ ঘটানো হলে এক শরীকে তার শরীকের অনুমতি নিতে হবে, যেন এ শরীক ছাড়া অন্য কারো কাছে তার বিক্রি বৈধ হয়। এ বিধান ততক্ষণ, যতক্ষণ সম্পদ থাকে যৌথ যা ভাগ করা হয়নি। ৯
এই অবস্থা (শরীক ছাড়া অন্য কারো কাছে বিক্রি বৈধ হওয়া শরীকের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল) এবং অন্য অবস্থার মাঝে (যখন বিক্রির বৈধতা শরীকের অনুমতি নির্ভর নয়) বিক্রি বৈধ হওয়ার বিধানে পার্থক্যের কারণ হলো, দুই শরীকের মাঝে সম্পদ যৌথ থাকা অবস্থায় এই যৌথ মালিকানাধীন বস্তুর প্রতিটি অংশ তা যত ছোট ও ক্ষুদ্র হোক না কেন শরীকদের যৌথ মালিকানাধীন হয়ে যায়। দুই শরীকের মাঝে সম্পদ যৌথ হওয়া যে কোনো ভাবে হতে পারে। যেমন দুজন একটি বস্তু মীরাছ হিসেবে পাওয়া বা অন্য কোনো কারণ যা যৌথ মালিকানা দাবি করে যেমন দুজন একসাথে কোনো বস্তু ক্রয় করা বা একজন অপরজনকে সে বস্তুর যৌথ অংশে শরীক করা।
আর যৌথ অংশ শরীকের কাছে বা অন্য কারো কাছে বিক্রি করা জায়েয। যেহেতু এটি অর্পণে ও গ্রহণে কোনো বাধা নেই। যৌথ অংশ আলাদা করা অর্পণ করার জন্য শর্তও নয়। এ কারণে সত্তাগতভাবে যা ভাগ হওয়া কবুল করে না যেমন পশু ও ছোট ঘর ইত্যাদির যৌথ অংশের বিক্রি বৈধ হওয়ার বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই। তবে বিক্রেতা শরীকের অনুমতি ছাড়া যৌথ মালিকানাধীন বস্তু পুরোটা অর্পণ করলে সে হবে লুন্ঠনকারী বা ছিনতাইকারী পর্যায়ভুক্ত। আর তার ক্রেতা হবে ছিনতাইকারী থেকে ছিনতাই করার পর্যায়ভুক্ত; ঐ শরীকের অংশ বিবেচনায় যা সে শরীক বিক্রি করেনি।
এভাবে অর্পণের পর যদি বস্তুটি নষ্ট হয় তাহলে যে শরীক বিক্রি করেনি তার অধিকার রয়েছে ক্রেতা ও বিক্রেতা এ দুইজনের যার কাছ থেকে ইচ্ছা সে নিজ অংশের ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে। যদি সে ক্রেতার নিকট থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে তাহলে ক্রেতা বিক্রেতার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করবে।
যৌথ মালিকানায় থাকা অযৌথ অংশ তার মালিকের অধীনে থাকবে। তবে যদি যৌথ অংশের সাথে মিলে যায় বা সেটাকে পৃথক করা কষ্টকর হয় তাহলে ভিন্ন বিষয়। তবে এই মিলে যাওয়া বা আলাদা করা কষ্টকর হওয়া বস্তুটির অর্পণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হবে না, যদি সে তা বিক্রি করে। তবে যৌথ কারবারের শরীক ভিন্ন অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে শরীকের অনুমতি ছাড়া সে অংশ বিক্রি করলে এ বিক্রি অর্পণ করার পরিপন্থী ও প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। সেক্ষেত্রে অর্পণ করা ও গ্রহণ করা অসম্ভব এই শরীকের অংশের মিশ্রণ ছাড়া, তাই শরীকের অনুমতির ওপর বিক্রি স্থগিত থাকবে। ১০
আয যাখীরা গ্রন্থে আল কারাফী আল মালেকী বলেন, উদাহরণত যদি কোনো পশুর মালিকানায় দুজন শরীক হয় মীরাছ বা অন্য কোনো মাধ্যমে, তাহলে এক শরীকের অপর শরীকের অনুমতি ছাড়া সে পশুতে কোনো হস্তক্ষেপ করা জায়েয হবে না। যদি এক শরীক তার অংশ বিক্রি করে এবং অপর শরীকের অনুমতি ছাড়া সমুদয় বস্তু ক্রেতাকে অর্পণ করে তাহলে নীতিমালা অনুসারে সে জরিমানার দায়বদ্ধ থাকবে। কেননা তার সর্বাধিক সুন্দর অবস্থান হলো এ বস্তু তার হাতে আমানত হিসেবে গচ্ছিত। এ অবস্থায় তা অন্য ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর করা হলে শরীক নিজের বাড়াবাড়ির কারণে দায়বদ্ধ থাকবে। তবে অর্পণ করতে অক্ষমতার কারণে বিক্রি অবৈধ হওয়া আবশ্যক হবে না। যদি তার শরীক উপস্থিত থাকে, তাহলে বিক্রি তার অধীন করা হবে। তখন তার ও ক্রেতার মাঝে কথাবার্তা হয়ে যা ফয়সালা হওয়ার হবে। আর যদি যে অনুপস্থিত থাকে তাহলে এ বিষয় বিচারকের কাছে তোলা হবে। তিনি বিক্রির অনুমতি দেবেন এবং অনুপস্থিত ব্যক্তির সম্পদ নিজ কর্তৃত্বে রাখবেন। ১১
টিকাঃ
৬. বাদায়িউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৬৫; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৩
৭. মাজাল্লা তুল আহকাম আল-আদালিয়্যা, ধারা : ১০৭৫ হাওয়াশী তুহফাতি ইবনি আসিম, খ. ২, পৃ. ২১৬; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২, ১৮৫; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৪
৮. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৬; তাকমিলাতু ফাতহুল কাদীর, খ. ৭, পৃ. ১২৩; আল-ঈনায়া, আলাল হিদায়া, খ. ৭, পৃ. ১২১; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ৩২৯
৯. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৬-৩৬৭; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৩; হাশিয়াতু শিবরুমালাসী, আলা নিহায়াতিল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৮৩
১০. আল বাহজা আলাত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২১৬
১১. টীকাসহ নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৮০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৩; হাওয়াশী তুহফা ইবনি আসিম, খ. ২, পৃ. ২১৬
📄 ক্ষতির অবস্থা
ভবন বা গাছ, ফল বা ফসলের যৌথ অংশের বিক্রি জায়েয নেই। এক্ষেত্রে যৌথ অংশ বিক্রি দ্বারা উদ্দেশ্য যে জমিতে এগুলো আছে সে জমি থেকে আলাদা করে এগুলো বিক্রি করা।
যদি ভবন ভেঙ্গে ফেলা ও গাছ অপসারণের শর্ত করা হয় তাহলে যে শরীক বিক্রি করেনি তার অংশের ভবন ভেঙ্গে ফেলা ও গাছ অপসারণ ছাড়া উপরিউক্ত শর্ত পূরণ করা সম্ভব হবে না, যেহেতু এই জমি যৌথ মালিকানাধীন। আর এই ভেঙ্গে ফেলা ও অপসারণ করা প্রকাশ্য ক্ষতি, যা জায়েয নেই। তা ছাড়া ভবন ও গাছ অবশিষ্ট রাখার শর্ত চুক্তির মূলদাবির অতিরিক্ত, দুই চুক্তিকারীর একজনের জন্য উপকারের শর্ত। সুতরাং এ শর্ত সত্তাগতভাবে বাতিল এবং চুক্তি বাতিলকারীও বটে। কেননা এতে সুদ রয়েছে, কারণ এ উপকার বিনিময়মুক্ত অতিরিক্ত উপকার। ১২
ফল বা ফসল যদি কাটার সময়ে উপনীত না হয়, তাহলে শরীক ভিন্ন কারো কাছে শরীকের অনুমতি ছাড়া এগুলোর কোনো অংশের বিক্রি জায়েয নেই। যেহেতু তখন ক্ষতির আশংকা রয়েছে। কারণ ক্রেতা তার ক্রয়কৃত অংশ থেকে কেটে নেওয়ার দাবি জানাবে। আর এই শরীকের অংশ কাটা ছাড়া ক্রয়কৃত অংশ অর্পণ করা সম্ভব নয়। ১৩
ফকীহদের মতে, শরীক উপস্থিত থাকলে তার অনুমতি ছাড়া যৌথ মালিকানার বস্তু দিয়ে উপকৃত হওয়া জায়েয নেই। এর কারণ, অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে সে হবে জবর দখলকারী। অনুমতি প্রদানে স্বাভাবিক প্রচলনের অনুমতিও অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং যৌথ মালিকানাধীন জানোয়ারের পিঠে যদি অন্য শরীকের অনুমতি ছাড়া কোনো শরীক আরোহণ করে বা বোঝা বহন করে, তাতে পশু ধ্বংস হয় বা দুর্বল হয় আর তার মূল্য কমে যায়, তাহলে পশু ধ্বংস হওয়ার অবস্থায় সে তার শরীকের অংশের ক্ষতিপূরণ দেবে আর পশু দুর্বল হলে তার মূল্য হ্রাসের ক্ষতি পূরণ দেবে।
এক শরীক অপর শরীকের উপস্থিতি সত্ত্বেও তার অনুমতি ছাড়া যৌথ মালিকানার জমিতে চাষ করলে বা ভবন নির্মাণ করলে, সেক্ষেত্রে গসবের (জবরদখলের) বিধানাদি প্রয়োগ করা হবে। জমি দুজনের মাঝে ভাগ করা হবে। প্রথম শরীকের জন্য তার শরীকের জমি-অংশে যে ফসল বা ভবন আছে তা উপড়ে ফেলা এবং তার জমির ক্ষতিপূরণ দেওয়া আবশ্যক হবে। তবে ফসল পেকে গেলে বা পেকে যাওয়ার উপক্রম হলে শুধু জমির ক্ষতিপূরণ দিতে হবে; ফসল উপড়ে ফেলা আবশ্যক নয়। অপর শরীকের জন্য বৈধ নয় যৌথ মালিকানার জমিতে চাষকারী শরীককে অর্ধেক বীজ দেওয়া এই শর্তে যে, ফসল উভয়ের মাঝে ভাগ হবে।
এর কারণ, ফসল উদগত না হলে এই কারবার হবে অজ্ঞাত বস্তুর বিক্রি। তবে ফসল উদগত হলে এই কারবার করতে সমস্যা নাই। যেমন শরীকের অধিকার নাই ফসল না কেটে জমি ভাগ করা সম্ভব হলে ফসল তুলে ফেলার জন্য জোরাজুরি করার।
এক্ষেত্রে শাফেয়ীদের একটি সুন্দর মূলনীতি রয়েছে। শরীক যদি যৌথ মালিকানার বস্তু ব্যবহার না করে বা পালাক্রমে ব্যবহার করে তাহলে সে হবে তার আমানতদার। পালাক্রমে ব্যবহার করা হবে ফাসিদ ইজারা। আর যদি শরীকের অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করে তাহলে হবে আরিয়া (ধারকৃত সম্পদ নেওয়া)। আর অনুমতি ছাড়া করলে হবে গসব (জবরদখল)। দুগ্ধবতী গাভীর দুধ দোহন করাও ব্যবহার করার মাঝে অন্তর্ভুক্ত। ১৪
এক শরীকের অনুপস্থিতিতে বা মৃত্যুতে, উপস্থিত অন্য শরীকের জন্য যৌথ মালিকানার বস্তু হতে এমনভাবে উপকৃত হওয়া বৈধ, যেভাবে বস্তুটির ক্ষতি না হয়। ১৫
যৌথ মালিকানার বস্তুর পেছনে যদি খরচের প্রয়োজন হয়, নির্মাণের প্রয়োজনে বা অন্য কারণে, যেমন ধসে যাওয়া অংশের পুনর্নির্মাণ বা দুর্বল অংশের সংস্কার অথবা পশুকে খাবারদান, আর শরীকদের মাঝে এ বিষয়ে মতভেদ হলে, কতক শরীক খরচ করতে ইচ্ছুক আর কতক অনিচ্ছুক, তাহলে হানাফীদের মতে এসংক্রান্ত বিধানে বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। কারণ, যৌথ সম্পদটি হয়তো বিভাজনযোগ্য হবে অথবা বিভাজনযোগ্য নয়।
ক. বিভাজনযোগ্য সম্পদ, যেমন প্রশস্ত বাড়ি, বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুতকৃত দোকানপাট বা একাধিক গবাদিপশু। এসব ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক শরীককে খরচ করতে বাধ্য করা যাবে না। তবে নিজ সম্পদের সংস্কার ও সেজন্য খরচে যে ইচ্ছুক তার জন্য যৌথ সম্পদটি ভাগ করা হবে। তবে অনিচ্ছুক ব্যক্তির অবস্থান মঙ্গল ও সুবিধার বিপরীত হলে সে যদি দেখভাল করার দায়িত্বপ্রাপ্ত বা ওয়াকফের তত্ত্বাবধায়ক হয় (এবং ওয়াকফের দুটি যৌথ বাড়ি) তাহলে তাকে বাধ্য করা হবে খরচ প্রদানে। কেননা তার হস্তক্ষেপ ওয়াকফ সম্পত্তির জন্য সুবিধাকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। (তাই সে সুবিধার বিপরীত অবস্থান নিলে তাকে বাধ্য করা হবে।)
খ. যৌথ মালিকানার সম্পদ যদি ভাগযোগ্য না হয় তাহলে অনিচ্ছুক শরীককে খরচ প্রদানে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হবে। কেননা তার অনিচ্ছা নিজ সম্পদ দ্বারা তার শরীকের উপকার গ্রহণে প্রতিবন্ধক। এর নমুনা হলো একটি গবাদিপশুর খরচ, নহর ভাড়া নেওয়া, হ্রদ বা কূপ সংস্কার করা অথবা সেচযন্ত্র, জাহাজ বা ভাগযোগ্য নয় এমন দেয়াল স্থান সংকীর্ণতার কারণে বা তাতে বোঝা রেখে দেওয়ার কারণে সংস্কারের খরচ। তবে দেয়ালে রেখে দেওয়া বোঝা যদি সংস্কারে বা নির্মাণে অনিচ্ছুক শরীকের হয় তবে ভিন্ন কথা। পরবর্তী হানাফী ফকীহগণ এ মতের দিকে ঝুঁকেছেন যে, এ বিধানের ক্ষেত্রে প্রশস্ত দেয়ালও অবিভাজনযোগ্য বস্তুর পর্যায়ভুক্ত। যেহেতু এর সংস্কার ও নির্মাণে এক শরীক অংশগ্রহণ না করলে অন্য শরীকের ক্ষতির আশংকা রয়েছে।
মালেকীদের মত হানাফীদের মতের সাথে প্রায় মিলে যায়। তারা এতটুকু যোগ করেন, খরচে অনিচ্ছুক শরীক যদি অনিচ্ছায় অটল থাকে তাহলে বিচারক সে শরীকের পক্ষ থেকে আবশ্যক খরচ বহনে সক্ষম ব্যক্তির কাছে তার পূর্ণ অংশ বিক্রি করবেন। শরীকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ক্ষতি রোধ করার জন্যে তারা খরচ পরিমাণ অংশ কারো নিকট বিক্রির মত দেন না। এমনিভাবে বিক্রি না করে খরচ বহনে একাই সক্ষম হলেও কোনো শরীককে পুরো খরচ বহনে বাধ্য করার মতও তারা দেন না। যেমন যে অংশ ওয়াকফকৃত সে অংশ বিক্রি করার মত তারা দেননি। তারা বিক্রি নিষেধ করেছেন যখন সেখানে এমন কিছু থাকে যা খরচের জন্য যথেষ্ট, যেমন: সঞ্চিত ফসল, নগদ পারিশ্রমিকে ভাড়া নিতে আগ্রহী লোক থাকার দরুন প্রাপ্ত পারিশ্রমিক। যদিও তাদের পক্ষ হতে অন্য আরো মত বর্ণিত হয়েছে।
যদি যে অংশ ওয়াকফ করা হয়েছে তা বিক্রি করা ব্যতীত খরচ যোগানোর মতো কোনো সম্পদ না থাকে তাহলে পুরো জমিটাই বিক্রি করে ফেলতে হবে। যে জমি ওয়াকফ করা হয়ীন তা যেমন বিক্রি করা হয়। তাহলে তাতে শরীক সংখ্যা বাড়বে না। খলীলের গ্রন্থের কতক ব্যাখ্যাকার এ সম্পর্কে কিছু না বলায় নাফরাভী তা আলোচনা করেছেন।
তারা ওয়াকফকে বিক্রির জন্য প্রতিবন্ধক মনে করেন না। তবে যৌথ সম্পদ পুরোটাই যদি ওয়াকফকৃত হয় তাহলে খরচে ইচ্ছুক ব্যক্তি আবশ্যক খরচ বহন করবে। তারপর অপর শরীকের অংশে কৃত খরচ তার জমির ফসল থেকে উসুল করবে।
উপরন্তু মালেকীগণ নিশ্চিত উপকার না হলে সংস্কার করতে অনিচ্ছুক শরীককে জোর করার মত দেন না। এর উদাহরণ দিয়েছেন তারা ঝরণা ও কূপের সংস্কার। এমনকি তাদেরই এক দলের ঐ মত তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, এ সকল ঝরণা ও কূপের পাশে ফসল বা ফল থাকে তাহলে খরচ দিতে বাধ্য করা যাবে। তাদের মতে সংস্কার ইচ্ছুক-শরীক সংস্কার করবে। এরপর সে অনিচ্ছুক শরীককে বাড়তি পানি প্রদানে বাধা প্রদান করবে। যে অতিরিক্ত পানি সংস্কারকাজে প্রয়োজন। এভাবে সে নিতে থাকবে পূর্ণ খরচ উসুল না হওয়া পর্যন্ত। এমনকি যদি সদাসর্বদা এই অবস্থাই থাকে তাহলেও এভাবেই সে উসুল করবে।
তবে এ সংক্রান্ত মালেকীদের বক্তব্য পশুর ক্ষেত্রে নয়। (তবে যথাস্থানে তাদের স্পষ্ট বক্তব্যে বোঝা যায়, পশুর বিধান উল্লিখিত বিধানের ব্যতিক্রম নয়।) সে বক্তব্য হচ্ছে, তারা সালিশ/বিচারককে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার মত দেন যদি গবাদিপশু ব্যক্তি মালিকানাধীন হয় আর মালিক তার জন্য খরচ করা থেকে বিরত থাকে। মোটকথা, অতিরিক্ত তারা মালিককে যবেহযোগ্য পশু যবেহ করার অধিকার দিয়েছেন। যদি সে যবেহ করা বা খরচ প্রদান উভয়টি করতে অনিচ্ছুক হয় তাহলে বিচারক তার স্থলাভিষিক্ত হবেন। ১৬
যৌথ পশুর খরচ প্রদানের ক্ষেত্রে শাফেয়ীগণ ও হাম্বলীগণের মত উপরিউক্ত হানাফী ও মালেকী ফকীহদের মতের অনুরূপ। পশু ছাড়া অন্য বস্তুর ক্ষেত্রে শাফেয়ী ও আহমদ রহ. উভয়ের দুটি মত রয়েছে। ক্ষতি দূর করার স্বার্থে এবং মালিকানাধীন বস্তু পরিত্যক্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে অনিচ্ছুক শরীককে অন্য শরীকের সাথে নির্মাণ ও খরচ প্রদানে বাধ্য করা হচ্ছে একটি মত। হাম্বলীগণ ও অধিকাংশ শাফেয়ী ফকীহ যেমন গাযালী রহ. ও ইবনুস সালাহ রহ. এ মতটিকে নির্ভরযোগ্য মত বলেছেন।
অপর মত হলো বাধ্য না করার। কেননা অনিচ্ছুক ব্যক্তি খরচ প্রদান করে ক্ষতিগ্রস্তও হবে। আর ক্ষতি দ্বারা ক্ষতি দূর করা যায় না। তা ছাড়া অনিচ্ছুক ব্যক্তির খরচ না করার ওযর বা ভিন্ন চিন্তা থাকতে পারে। উপরন্তু যে বস্তু প্রাণশূন্য, তার সত্তাগত এমন কোনো সম্মানও নেই, যার কারণে তার পিছনে খরচ করা যথাযথ বলে বিবেচিত হবে। তাই তা পরিত্যক্ত হলে শরয়ীভাবে মর্যাদাবান কোনো বস্তু নষ্ট করা হবে না। যেহেতু কোনো কাজ না করাকে তারা নষ্ট করার অন্তর্ভুক্ত গণ্য করেন না। বরং এক্ষেত্রে নষ্ট করার বিষয়টি কোনো কাজ হতে হবে। যেমন কোনো ব্যক্তি নিজ সামানা সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে তা বিনষ্ট বলে গণ্য হবে।
এ মতটি শাফেয়ীদের কাছে নির্ভরযোগ্য। ইবনে কুদামা বলেন, দলিলের বিচারে এটি মজবুত। যদিও শাফেয়ীদের জাওযী উদ্ভিদকে এ বিধানের ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করে তা পশুর বিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। শাফেয়ীদের কোনো কোনো ফকীহ উভয় মতের মাঝে সমন্বয় করেন এভাবে যে, খরচে বাধ্য করার বিষয় বিচারকের কাছে ন্যস্ত করা হবে। যদি তিনি অনিচ্ছুক শরীকের পক্ষ থেকে শুধু গোয়ার্তুমি পান তাহলে তাকে বাধ্য করবেন। যদি তেমন না হয় তাহলে বাধ্য করবেন না। ১৭
টিকাঃ
১২. রদ্দুল মুহতারসহ আদ দুররুল মুখতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৫
১৩. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৮৯; আল-বাহজা আলাত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২০৯, ২১৬
১৪. প্রাগুক্ত; আশ শারকাভী আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ১১৩
১৫. মোল্লা মিসকীন আলাল কানয, খ. ২, পৃ. ২০৮; আল-ঈনায়া আলাল হিদায়া, খ. ৮, পৃ. ৩৮০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৮৯; আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ২৭৮; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩৬
১৬. ইবনে আবিদীন, খ. ৩, পৃ. ৩৬৬; আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ৩৭২; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৭৩-১৭৪; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১০৮-১০৯
১৭. 'আশ-শারকাভী, আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ৩৪৭-৩৪৮; দালীলুত তালিব, পৃ. ২৫০-২৫১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৯০; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪৫, ৪৯, ৫০