📄 শারিকা (الشَّرِكَةُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
শব্দটির উচ্চারণ । الشركةُ বা الشركة শব্দটি علم ওজনে এও ক্রিয়ার মাসদার বা ক্রিয়ামূল। الشركةُ ও ব্যবহৃত হয়। এ। হচ্ছে এ ক্ষেত্রে মাসদার থেকে নির্গত শব্দ। বলা হয় : شَرِكَ الرَّجُلُ الرَّجُلَ فِي الْبَيْعِ وَالْمِيرَاثِ يَشْرَكُهُ شِرْكًا وَشَرِكَةُ অর্থ : লোকটি ব্যবসা বা মীরাছে তার অংশ অপরের অংশের সাথে মিশ্রিত করল অথবা তাদের অংশ মিশ্রিত হলো। সুতরাং الشركةُ অর্থ : দুটি অংশ মিশ্রিত হওয়া বা মিশ্রণ ঘটানো। যে চুক্তির মাধ্যমে প্রকৃত বা পরোক্ষভাবে দুজনের সম্পদে মিশ্রণ ঘটানো পূর্ণ হয় তাকে রূপকার্থে শারিকা (যৌথ কারবার) বলা হয়। (যেন প্রত্যেক শরীকের অপরের সম্পদে হস্তক্ষেপ বৈধ হয়।)
ফিকহী পরিভাষায় শারিকা (যৌথ কারবার) দু'প্রকার : شركة ملك বা যৌথ মালিকানা। شركة عقد বা যৌথ চুক্তি। ১ শারিকাতুল আকদের আলোচনা এ সংক্রান্ত পৃথক অধ্যায়ে আসবে।
শারিকাতুল মিলক হলো দুজন বা ততোধিক ব্যক্তি একটি বস্তু বা তার স্থলবর্তী কোনো কিছুতে বিশেষভাবে মালিক হওয়া। কোনো বস্তুর বিধানগত স্থলবর্তী বস্তু হচ্ছে এমন মিশ্রিত একাধিক বস্তু, যার অংশগুলো বিভিন্ন হওয়ার কারণে তা ভাগ করা অসম্ভব বা কষ্টকর। তা নগদ বস্তু, ঋণ বা অন্য কিছু যাই হোক না কেন।
যেমন একটি বাড়ী বা একটি জমিতে দুজনের যৌথ মালিকানা সাব্যস্ত হবে যদি তারা দুজনে মিলে তা কেনে, বা মীরাছ হিসেবে পায় অথবা হেবা, অসিয়্যত বা দান বা এ জাতীয় মালিকানা সাব্যস্ত হওয়ার কোনো কারণে সেটি তাদের মালিকানাধীন হয়। অনুরূপভাবে দুই আরদিব (একটি বিশেষ মাপ) গম বা এক আরদিব গম ও এক আরদিব যব অথবা এক ছাঁচে তৈরি দুই ব্যাগ দীনার, স্বাভাবিকভাবে বা অপারগতাবশত যেগুলোকে একসাথে করা হয়। (অপারগতার উদাহরণ হলো পাশাপাশি রাখা দুটি থলে ছিদ্র হয়ে যাওয়া।) (এ অবস্থায় থলে দুটির বস্তুগুলো একত্র হয়ে যাওয়ার পর এগুলোকে আলাদা করা কষ্টকর বা অসম্ভব। তাই এগুলো পৃথক পৃথক বস্তু হওয়ার পরও এগুলো বিধানগত বিচারে এক।)
কতক ফকীহ ঋণে যৌথ মালিকানা সাব্যস্ত হওয়াকে নাকচ করেন। এর কারণ, ঋণ ব্যক্তিদায়িত্বে আবশ্যক একটি শরয়ী বৈশিষ্ট্য। সুতরাং এতে মালিকানা সাব্যস্ত হতে পারে না। তাই যার দায়িত্বে ঋণ আবশ্যক তার পক্ষ থেকে কাউকে ঋণের মালিক বানানো হলে তা হবে মূলত ঋণ মাফ করে দেওয়া; ঋণের মালিক বানানো নয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, যাকে মালিক বানানো হবে তার মালিকানা সাব্যস্ত হবে। তারা বলেন, এর কারণ হলো, যৌথ ঋণের কোনো অংশ যদি দুজন পাওনাদারের মধ্য হতে একজন কজা করে তাহলে সে ঋণে অন্য পাওনাদারও শরীক হয়ে যায়। এমনকি হীলা ছাড়া এই যৌথ পাওনাদারিত্ব থেকে কোনো ব্যক্তির মুক্ত হওয়া অসম্ভব। হীলা হলো, ঋণগ্রহীতা এই পাওনাদারকে তার কব্জাকৃত সম্পদ হেবা করবে, আর পাওনাদার তাকে নিজ অংশ থেকে দায়মুক্ত করবে।
নগদ বা ঋণ ছাড়া কোনো বস্তু যেমন বাতাসে উড়ে আসা কাপড় সংরক্ষণে কোনো বাড়ির দুই মালিকের অধিকার। এক্ষেত্রে এটির সংরক্ষণে উভয়ে সমঅংশীদার এবং তা যৌথ মালিকানাধীন হবে। যেহেতু বস্তুটির মালিক হবে উভয়েই।
হানাফীদের উল্লিখিত পন্থায় যৌথ মালিকানা সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টিতে ফকীহদের মাঝে উল্লেখযোগ্য কোনো মতভেদ নেই। যদিও তাদের কতক এটির আলাদা নাম স্পষ্ট করে বলেননি; বরং তাদের অধিকাংশ ফকীহ এটিকে যৌথচুক্তির সংজ্ঞার অধীনে এক করতে চেয়েছেন, যা কতক শাফেয়ী ফকীহর কর্মপন্থা। তারা ব্যাপকভাবে শারিকার সংজ্ঞা দিয়েছেন, শারিকা হলো ব্যাপকভাবে একটি বস্তুতে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির অধিকার সাব্যস্ত হওয়া। কতক মালেকী ফকীহও এমনটি করেছেন। তারা শারিকার সংজ্ঞা দিয়েছেন, দুজন বা ততোধিক মালিকের মাঝে মূল্য সম্পর্কিত একটি সিদ্ধান্ত।
টিকাঃ
১. রদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ৩৪৩; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩
📄 شَرِكَةُ مُلْك বা যৌথ মালিকানার প্রকারভেদ
যৌথ মালিকানা প্রথমত দুই প্রকার: شركة الدين বা যৌথ ঋণ কিংবা অন্য কিছুতে যৌথ মালিকানা।
ক. شركة الدين বা যৌথ ঋণ: شركة الدين হলো দুজন বা ততোধিক ব্যক্তি একটি ঋণের হকদার হওয়া। যেমন একজন ব্যবসায়ীর দায়ে একশ দীনার ঋণ থাকা, কোনো যৌথ কারবারের অংশীদাররা তাদের ভাগ হিসাবে সে দীনারগুলোর প্রাপক হবে।
খ. ঋণ ছাড়া অন্যকিছুর যৌথ মালিকানা/অধিকার (شَرِكَةُ غَيْرِ الدَّيْنِ) : কোনো নগদ বস্তু বা প্রাপ্য বা উপকারে যৌথ অধিকার। যেমন অধিকার বিভিন্ন যানবাহনে, যৌথ মালিকানার দোকানে বিভিন্ন কাপড় বা বিভিন্ন খাবারে অধিকার। যেমন শুফআর অধিকার দুই শরীকের, তৃতীয় শরীক বিক্রি করার ক্ষেত্রে। ব্যাপকভাবে ঘরে বসবাসের অধিকার বা জমি চাষের অধিকার জমি ভাড়া নেওয়া ব্যক্তির জন্য। বিভিন্ন মাযহাবের ফকীহদের মাঝে এই ভাগের ক্ষেত্রে কোনো মতপার্থক্য নেই। ২
টিকাঃ
২. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৩; আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ২৫৪; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১০৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১১; হাওয়াশিত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২০৯; হাওয়াশিল ইরাকী, আলা তুহফাতি ইবনি আসীম, খ. ২, পৃ. ২১০
📄 ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত বা বাধ্যতামূলক যৌথ মালিকানা
ক. ইচ্ছাকৃত যৌথ মালিকানা (الاختيارية) হলো যা দুই বা ততোধিক শরীকের ইচ্ছায় সংঘটিত হয়ে থাকে। যা চুক্তির মাধ্যমে হতে পারে বা চুক্তি ছাড়া। শুরু থেকে চুক্তি যৌথ হোক বা যৌথ চুক্তি হঠাৎ হোক অথবা চুক্তির পর সম্পদে অংশীদারি হোক।
শুরু থেকে চুক্তি যৌথভাবে সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে যৌথ মালিকানার উদাহরণ হলো দুজন হাল চাষ বা আরোহণের জন্য কোনো জন্তু কিনল অথবা পুঁজি বিনিয়োগ করে ব্যবসায় শুরু করল। এমনিভাবে এ ধরনের বা অন্য কোনো ধরনের কোনো পণ্য কিনল বা হেবা কবুল করল বা অসিয়্যত বা সদকা কবুল করল।
নতুন ভাবে যৌথ চুক্তি হওয়া বা চুক্তি সংঘটনের পর সম্পদে যৌথ মালিকানার নমুনা হলো, এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে কেনাবেচা অথবা হেবা বা অসিয়ত গ্রহণ সংঘটিত হলো। তারপর তার সাথে এক ব্যক্তি শরীক হলে সে ব্যক্তি বিনিময়সহ বা বিনিময় ছাড়া তার অংশীদারী গ্রহণ করল।
চুক্তি ছাড়া যৌথ কারবার সংঘটনের নমুনা হলো দুজন ব্যক্তি তাদের সম্পদ একসাথে মিশিয়ে ফেলল বা উভয়ের পাতানো জাল দিয়ে উভয়ে এক শিকার ধরল অথবা উভয়ে মিলে একটি পতিত ভূমি আবাদ করল। ৩
খ. অনিচ্ছাকৃত বা জবরদস্তিমূলক মালিকানা হচ্ছে, যা দুই বা ততোধিক শরীকের অনিচ্ছাসত্ত্বেও সংঘটিত হয়। যেমন একসাথে রাখা বিভিন্ন থলে ছিদ্র হয়ে গেল আর থলের বস্তু মিশে গেল। ফলে অসম্ভব না হলেও, একত্র হয়ে যাওয়ার কারণে এগুলোকে আলাদা আলাদা করা কষ্টকর। তবে যদি এক শরীক বাকীদের অনুমতি ছাড়া মেশায় তাহলে ইবনে আবেদীন বলেন, এই শরীক নিজ সম্পদের সাথে যা কিছু মিশিয়েছে সেগুলোর সে মালিক হবে। আর বাড়াবাড়ির কারণে সে অনুরূপ বস্তু দিয়ে ক্ষতিপূরণ আদায়ে দায়বদ্ধ থাকবে। ফলে এখানে কোনো যৌথ মালিকানা থাকবে না। ৪
উল্লিখিত মাসআলায় কোনো মতভেদ নেই। তবে এর সদৃশ একটি মাসআলায় মতভেদ রয়েছে। তা হলো, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিজ সম্পদের সাথে অন্যের সম্পদ মেশানোর কারণে কোনো ব্যক্তি অন্যের সম্পদের মালিক হওয়া। আর সম্পদ মেশানোটা এমনভাবে হবে যে, দুজনের সম্পদ আলাদা করা সম্ভব হয় না বা আলাদা করা কষ্টকর। হানাফীগণ বলেন, এর মাধ্যমে সে মালিক হবে। তবে তার দায়িত্বে অন্যকে পরিবর্ত প্রদানের দায় সাব্যস্ত হবে। ইবনুল কাসিম, তার সাথে অধিকাংশ মালেকী ফকীহ, হাম্বলীদের মধ্যে কাজী ইয়ায রহ.-এ মত পোষণ করেন। কাজী ইয়ায বলেন, এটি মাযহাবের কিয়াসসম্মত মত। এটি শাফেয়ী রহ.-এর একটি মত। অধিকাংশ পরবর্তী শাফেয়ী ফকীহ এটিকে নির্ভরযোগ্য মত বলেছেন। তবে তাদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মতটিতে তারা শর্ত আরোপ করেছেন, পরিবর্ত প্রদান না করা পর্যন্ত মিশ্রণের কারণে যে অংশের মালিক সে হয়েছে তাতে সে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এর কারণ, এভাবে সে যে বস্তুর মালিক হয়েছে যদি সে তার সন্তোষমূলক বিনিময় প্রদানের মাধ্যমে মালিক হতো তাহলে নিজ জিম্মায় মালিককে সন্তুষ্ট না করা পর্যন্ত সে তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারতো না। সুতরাং সন্তোষ ছাড়া মালিকানা সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ না করার বিধান অধিক আমলযোগ্য।
তিন মাযহাবের কতক ফকীহ এই বলপূর্বক মালিকানা সাব্যস্ত হওয়াকে নাকচ করেন। তারা বলেন, এ সম্পদ যৌথ মালিকানাধীন হবে। এটি শাফেয়ী রহ.-এর একটি মত। তাকী আসুবকী রহ. এ মতটি গ্রহণ করেছেন এবং এর সমর্থনে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। মালেকী ফকীহদের মধ্যে আশহাব রহ. এবং অধিকাংশ পরবর্তী হাম্বলী ফকীহদের মত এটিই। ৫
টিকাঃ
৩. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৩; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১২-১৪; তানভীরুল আবছার, ব্যাখ্যাগ্রন্থসহ, খ. ৩, পৃ. ৩৬২; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৭১; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১৪; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫০৯
৪. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪৪; আল-ইতহাফ বি আশবাহি ইবনি নুজাইম, পৃ. ৪৪৮
৫. ব্যাখ্যাগ্রন্থসহ নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১৪, ১৮৪ ও ১৮৭; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ১৬৫ ও ২১৩, ৩১৯-৩২০; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ৩১৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৯২; আশ শারকাভী, আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ১০৯; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪১০; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৪
📄 যৌথ মালিকানার বিধানাবলি
যৌথ মালিকানায় দুই বা ততোধিক শরীকের প্রত্যেকে অপরের অংশের বিবেচনায় অপরিচিত ব্যক্তি। কেননা এই যৌথ কারবার কেউ কারো প্রতিনিধিত্ব করে না। এবং কোনো শরীকের অপর শরীকের সম্পদে কোনো মালিকানাও সাব্যস্ত হয় না। তা ছাড়া অন্য কোনোভাবে এক শরীকের ওপর অন্যের কোনো কর্তৃত্বও নেই। অথচ সম্পদে কর্তৃত্ব করার বৈধতার পন্থা হলো মালিকানা বা কর্তৃত্ব, এ বিষয়টিতে মতভেদের কোনোই সম্ভাবনা নেই।