📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ঋণের আরকান

📄 ঋণের আরকান


অধিকাংশ ফকীহের মতে, ঋণের আরকান বা মূল অংশ তিনটি: ১. ঈজাব বা প্রস্তাব ও কবুল বা গ্রহণের শব্দ। ২. ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা। ৩. ঋণের ক্ষেত্র বা সম্পদ।

হানাফী ফকীহদের মতে, ঋণের রুকন হচ্ছে, ঈজাব ও কবুলের শব্দদ্বয়, যা এই চুক্তি বাস্তবায়নে উভয়পক্ষের ইচ্ছা ও ঐকমত্যের প্রমাণ বহন করে।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 প্রথম রুকন

📄 প্রথম রুকন


ঈজাব ও কবুল-এর শব্দঃ
ফকীহগণ এ কথায় একমত, ঋণ (الْقَرْضُ), অগ্রিম প্রদান (السَّلَفُ) এবং এ দুটি অর্থের যে কোনোটির দিকে নির্দেশ করে এমন যে-কোনো শব্দ দ্বারা ঋণের ঈজাব (প্রস্তাব) করা শুদ্ধ। যেমন: আমি তোমাকে কর্জ দিলাম, আমি তোমাকে অগ্রিম প্রদান করলাম, আমি তোমাকে ঋণ হিসাবে প্রদান করলাম, তোমাকে আমি এর মালিক বানিয়ে দিলাম এভাবে যে, তুমি আমাকে এর বিনিময় ফেরত দেবে অথবা নাও এটি তোমার প্রয়োজনে খরচ করো, এর বিনিময় আমাকে ফেরত দেবে ইত্যাদি...। অথবা ঋণ প্রদানের ইচ্ছার দিকে ইঙ্গিত করে এমন কোনো কাজ।

তেমনি প্রস্তাব গ্রহণ করা এবং সম্মতি বোঝায় এরূপ যে কোনো শব্দ দ্বারা কবুল বা গ্রহণ শুদ্ধ হবে। যেমন: আমি ঋণ চেয়েছিলাম (আপনি সেই প্রেক্ষিতেই দিচ্ছেন।) বা আমি গ্রহণ করলাম বা আমি এ ব্যাপারে রাজী আছি ইত্যাদি।

শায়খ যাকারিয়া আল-আনসারী বলেন, কাউকে ঋণ প্রদানের আবেদন ঋণদাতার পক্ষ থেকেও আসতে পারে। যেমন: আমার কাছ থেকে ঋণ নাও, যা ঈজাবের স্থলাভিষিক্ত। ঋণগ্রহীতা বলবে, আমাকে ঋণ দাও, যা কবুলের স্থলাভিষিক্ত।

শাফেয়ীদের বিশুদ্ধতম মতে, সকল লেনদেনের মতো ঋণ শুদ্ধ হওয়ার জন্যেও ঈজাব ও কবুল শর্ত। তবে তারা পরোক্ষ ঋণকে এক্ষেত্রে আলাদা করেছেন, সেক্ষেত্রে প্রস্তাব ও গ্রহণের শর্ত আরোপ করেননি। রামলী (الرَّمْلِيُّ) বলেন: পরোক্ষ বা বিধানগত ঋণের ক্ষেত্রে ঈজাব ও কবুলের শর্ত নেই। যেমন: ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দেওয়া, কুড়িয়ে পাওয়া অসহায় শিশুর জন্য খরচ করা।

টিকাঃ
২২. হানাফীগণের মতে ইআরাহ (ধার দেওয়া) শব্দ দ্বারা ঋণ প্রদান বৈধ, যেহেতু মিছলী বস্তু ধার দেওয়া প্রকৃতপক্ষে ঋণ। রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭১; ফাতহুল কাদীর, খ. ৭, পৃ. ৪৭৪; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩৯৪; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৯৯; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩০৯; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৩৭-৩৯; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৪, পৃ. ৩২
২৩. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৪১
২৪. রওজাতুত তালেবীন, খ. ৪, পৃ. ৩২
২৫. তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪০; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৪১
২৬. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২১৮
২৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩৯৪
২৮. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৭, পৃ. ৩৯৪
২৯. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১০

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দ্বিতীয় রুকন

📄 দ্বিতীয় রুকন


চুক্তির দুপক্ষ (ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা): (الْعَاقِدَانِ الْمُقْرِضُ وَالْمُقْتَرِضُ)

ক. ঋণদাতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শর্তসমূহ:
ঋণদাতা স্বেচ্ছাদানের যোগ্য অর্থাৎ স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক ও বোধবুদ্ধি-সম্পন্ন হতে হবে। এ বিষয়ে ফকীহগণ একমত। আল-বাহুতী বলেন, যেহেতু তা অন্যকে উপকার ও সাহায্য করার চুক্তি, তাই দান করার যোগ্যতাসম্পন্ন না হলে তা শুদ্ধ হবে না। শাফেয়ীগণ বলেন, ঋণের মধ্যে অনুগ্রহ ও অনুদানের সাদৃশ্য ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আসনাল মাতালিব গ্রন্থকারও অনুরূপ মতামত দিয়ে বলেন, ঋণের মধ্যে দানের বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

ঋণদাতা অনুদানের যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়ার এ শর্তের ভিত্তিতে হানাফীগণ বলেছেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সম্পদ থেকে পিতা ও অসী ঋণ দিতে পারবে না। হাম্বলীগণ বলেন, ইয়াতীমের অভিভাবক ও ওয়াকফের তত্ত্বাবধায়ক তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা সম্পদ থেকে ঋণ দিতে পারবে না।

খ. ঋণগ্রহীতার সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলি:
শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহদের মতে, ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে শর্ত হলো তার লেনদেনের যোগ্যতা থাকা। হাম্বলীগণের মতে, ঋণগ্রহীতা দায়ভার গ্রহণের উপযুক্ত হতে হবে। হানাফীগণ বলেন, তাকে মৌখিক লেনদেনের উপযুক্ত হতে হবে। অতএব সে হবে স্বাধীন, বয়ঃপ্রাপ্ত ও স্বাভাবিক বোধজ্ঞান সম্পন্ন।

বায়তুল মাল ও ওয়াকফ সম্পত্তির জন্য ঋণ নেওয়াঃ
রাষ্ট্রের নেতার অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জনকল্যাণের জন্য বা দুর্যোগ-দুর্ঘটনার ক্ষতিরোধে কিংবা জরুরি প্রয়োজনের সময় বায়তুল মালের জন্য ঋণ গ্রহণ করা জায়েয। এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই। ইমামুল হারামাইন আল- জুয়াইনী বলেন, জরুরি অবস্থার দাবি ও আসন্ন দুর্যোগের আশঙ্কা দেখা দিলে বায়তুল মালের জন্য ঋণ গ্রহণ বৈধ হবে। তবে ফকীহগণ এক্ষেত্রে তিনটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন: ১. বায়তুল মালের জন্য এরূপ পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব থাকা যা দ্বারা ঋণ পরিশোধ করা যাবে। ২. বায়তুল মালের জন্য আবশ্যিকভাবে করণীয় বিষয় সম্পাদনের উদ্দেশ্যেই ঋণ নেওয়া হবে। ৩. রাষ্ট্রপ্রধান অন্যায়ভাবে যা গ্রহণ করেছেন তা বাইতুল মালে ফেরত দেওয়ার পরও ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন বহাল থাকা।

টিকাঃ
৩০. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ২০৬; ফাতহুল আযীয, খ. ৯, পৃ. ৩৫১; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২১৯; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২২৫
৩১. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩০০
৩২. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৭, পৃ. ৩৯৪
৩৩. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৪০; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪১; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২১৯
৩৪. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৭, পৃ. ৩৯৪; জামেউ আহকামিস সিগার, খ. ৪, পৃ. ১০৪; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ৮০১; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৩৪০
৩৫. শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২২৫
৩৬. আশ-শিরওয়ানী আলা তুহফাতিল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪১
৩৭. নিহায়াতুল মুহতাজ ও হাশিয়া শাবরামাল্লিসী, খ. ৪, পৃ. ২১৯; তুহফাতুল মুহতাজ ও হাশিয়া শিরওয়ানী, খ. ৫, পৃ. ৪১
৩৮. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৪০; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২২০
৪০. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩০০; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২২৫
৪১. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭৪, মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ৮০৯
৪২. জামেউ আহকামিস সিগার, খ. ৪, পৃ. ১০৪, বাগদাদ, ১৯৮৩

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ঋণের বিধান

📄 ঋণের বিধান


ক. ঋণের মালিকানায় প্রভাব
ঋণ সাব্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর তার মালিকানা পরিবর্তন নিয়ে ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন। এ মালিকানা পরিবর্তন, ঋণচুক্তি সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথেই হবে না হস্তগত হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে অথবা ঋণগ্রহীতার তাতে কর্তৃত্ব প্রকাশিত হওয়া বা তা ব্যবহার করা পর্যন্ত তা সাব্যস্ত হবে না। এ ভাবে ফকীহদের এ বিষয়ে চারটি মত হয়েছে।

এক. এটি হাম্বলী ফকীহদের মত, হানাফী মাযহাবের প্রচলিত মত এবং শাফেয়ী মাযহাবের বিশুদ্ধতর মত: কব্জা করার সাথে সাথে ঋণগ্রহীতা ঋণের সম্পদের মালিকানা লাভ করবে। শাফেয়ীগণ বলেন, তবে এই মালিকানা অপরিপূর্ণ। কারণ দুজনের যে-কোনো জন তা এককভাবে বাতিল করে দিতে পারে। এ ব্যাপারে তাদের দলিল হচ্ছে:
ক. স্বয়ং নামের মধ্যে উপরিউক্ত বক্তব্যের প্রমাণ রয়েছে। কারণ কর্জ (القرض)-এর (ঋণ)-এর আভিধানিক অর্থ কর্তন করা। সুতরাং বোঝা যায়, মাল হস্তান্তরের মাধ্যমে ঋণদাতার মালিকানা বা কর্তৃত্ব কর্তিত হয়ে যায়।
খ. ঋণগ্রহীতার নিকট মাল হস্তান্তরের পর সে ঋণদাতার অনুমতি ছাড়াই তা ক্রয়-বিক্রয়, হিবা (দান), সদকাসহ যাবতীয় খরচের অধিকার লাভ করে।
গ. ঋণ এমন একটি চুক্তি যেখানে বিনিময় ও অনুদান দু'টি দিকই বিদ্যমান। তবে অনুদানের দিকটিই ঋণচুক্তিিতে প্রাধান্য পেয়েছে।

দুই. মালেকী মাযহাবের মত হচ্ছে, ঋণগ্রহীতা ঋণচুক্তিির মাধ্যমেই সম্পদের পূর্ণ মালিকানা লাভ করবে, যদিও সে তা কব্জা না করে।
তিন. শাফেয়ীদের এ মতটি তাদের বিশুদ্ধতর মতের বিপরীত। তা হচ্ছে, ঋণগ্রহীতা ঋণের সম্পদে তাসাররুফ (التصرف) করার দ্বারাই তার মালিক হয়ে যাবে।
চার. ইমাম আবু ইউসুফের অভিমত হলো, ঋণের সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে ফুরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত কেবল হস্তগত হওয়ার মাধ্যমে মালিকানা অর্জিত হয় না।

খ. ঋণের বাধ্যবাধকতা
ফকীহগণের মতে, ঋণের সম্পদের মালিকানা লাভ করা মাত্রই ঋণদাতার নিকট তার বিনিময় ফেরত দেওয়া ঋণগ্রহীতার দায়িত্ব। সেই সাথে সে ঋণের বিনিময় ফেরত দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

টিকাঃ
৭১. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭৩; বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৭, পৃ. ৩৯৬; ইবনে নুজাইম-এর আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, খ. ২, পৃ. ২০৪; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ৭৯৭; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৪৩; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৪, পৃ. ৩৫; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১০; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২২৬; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪৮; ফাতহুল আযীয, খ. ৯, পৃ. ৩৯১; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩০১; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২২৫, আল-মুবদি', খ. ৪, পৃ. ২০৬
৭২. শীরাযীর আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১০
৭৩. আল-খিরাশী, খ. ৫, পৃ. ২৩২; আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২৮৮; কিফায়াতুত তালিব আর-রাব্বানী এবং হাশিয়া আদাভী, খ. ২, পৃ. ১৫০; দারদীর কৃত আশ-শারহুল কাবীর ও হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২২৬
৭৪. শাওকানীর হাদায়েকুল আযহার-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ আস-সাইলুল জাররার, খ. ৩, পৃ. ১৪৪
৭৫. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২২৬; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৪, পৃ. ৩৫; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২০; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১০; সুয়ূতীর আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩২০
৭৬. রাফেয়ী কৃত ফাতহুল আযীয, খ. ৯, পৃ. ৩৯২
৭৭. নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধের ভিত্তিতে মুক্তিলাভের চুক্তিতে আবদ্ধ দাসকে মুকাতাব বলে।
৭৮. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭৩; বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৭, পৃ. ৩৯৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00