📄 ঋণের বৈধতা
কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার মাধ্যমে ঋণের বৈধতা প্রমাণিত। কুরআনের অনেক আয়াতে ঋণ প্রদানে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহর বাণী:
مَنْ ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضَاعِفَهُ لَهُ أَضْعَافًا كَثِيرَةً
“কে আছে যে আল্লাহকে ঋণ প্রদান করবে? তিনি তার জন্য এটি বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন।"
এখানে আয়াতের মাধ্যমে প্রমাণের তাৎপর্য হচ্ছে, মহান আল্লাহ সৎকাজ এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে ঋণের সম্পদের সাথে তুলনা করেছেন। এর প্রতিদানকে প্রদত্ত ঋণের বদল বলে ঘোষণা করেছেন এবং সৎকাজকে ঋণ হিসাবে অভিহিত করেছেন। কেননা সৎকর্মশীল ব্যক্তি প্রতিদান পাওয়ার জন্য তা করে। যেমন যে ঋণ দেয় সে তার বদল পাওয়ার জন্য তা করে।
রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাদীসও একে সমর্থন করে। নবী স. নিজেই কর্জ নিয়েছেন। যেমন আবু রাফে রা. একটি হাদীস বর্ণনা করেন:
أَنْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَسْلَفَ مِنْ رَجُلٍ بَكْرًا ، فَقَدِمَتْ عَلَيْهِ إِبِلٌ مِنْ إِبِلِ الصَّدَقَةِ ، فَأَمَرَ أَبَا رَافِعٍ أَنْ يَقْضِيَ الرَّجُل بَكْرَهُ ، فَرَجَعَ إِلَيْهِ أَبُو رَافِعٍ فَقَالَ : لَمْ أَجِدْ فِيهَا إِلَّا خيَارًا رُبَاعِيًا ، فَقَالَ : أَعْطِهِ إِيَّاهُ ، إِنْ خِيَارَ النَّاسِ أَحْسَنُهُمْ قَضَاءً
"একদা রাসূলুল্লাহ স. এক লোকের কাছ থেকে উটের একটি বাচ্চা ধার নিলেন। এরপর রাসূল স.-এর কাছে যাকাতের উট আসল। তখন রাসূল সা. লোকটিকে (ঋণের) উটের বাচ্চা ফেরত দেওয়ার জন্য আবু রাফেকে নির্দেশ দিলেন। আবু রাফে এসে রাসূলকে বললেন, এখানে শুধু উৎকৃষ্ট ও বড় উট আছে (আর সে তো পাবে উটের বাচ্চা)। তখন রাসূলুল্লাহ স. বললেন, তাকে এখান থেকেই দিয়ে দাও। নিশ্চয় সর্বোত্তম মানুষ হচ্ছেন যিনি উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধ করেন।”
অপর এক হাদীসে ঋণের প্রতিদান সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ স. বলেন: مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُقْرِضُ مُسْلِمًا قَرْضًا مَرَّتَيْنِ إِلَّا كَانَ كَصَدَقَتِهَا مَرَّةً "কোনো মুসলিম অন্য মুসলিমকে দুবার ঋণ প্রদান করা যেন তা তাকে একবার দান করে দেওয়া।”
আর ইজমার দিক হলো, সকল মুসলিম ঋণ জায়েয হওয়ার কথায় একমত।
টিকাঃ
৮. সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৪৫
৯. ইবনে আবদুস সালাম, আল-ইশারা ইলাল ইজায, পৃ. ১২০
১০. হাদীসটি আবু রাফে রা. কর্তৃক বর্ণিত। মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৪
১১. ইবনে মাজাহ, খ. ২, পৃ. ৮১২, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর বর্ণনা। মিসবাহুয যুজাজায় বুসীরী হাদীসটির সনদ দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন, খ. ২, পৃ. ২০৭৪
১২. ইবনে কুদামা-এর আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৪২৯; আল-মুবদি, খ. ৪, পৃ. ২০৪; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৯৮
📄 ঋণের শরয়ী বিধান
এ কথায় সকল ফকীহ একমত, ঋণের ক্ষেত্রে ঋণদাতার ভূমিকা মহৎ, তার ঋণপ্রদান এক উত্তম কাজ হিসেবে বিবেচিত। কেননা এর দ্বারা ঋণগ্রহীতাকে তার প্রয়োজন পূরণ ও বিপদ থেকে উদ্ধারের মাধ্যমে উপকার করা হয়। আর মূলত ঋণের বিধান হচ্ছে তা বৈধ ও মুস্তাহাব।
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. বলেন: “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি বিপদ দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামত দিবসের বিপদরাশি থেকে একটি বিপদ দূর করে দেবেন। যে অভাবগ্রস্তকে সচ্ছল করবে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সচ্ছলতা দান করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ ঢেকে রাখবে আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষত্রুটি ঢেকে রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে আল্লাহ ততক্ষণ তার সাহায্য করতে থাকেন।"
অবস্থা ও পরিবেশের প্রেক্ষিতে ঋণ প্রদানের বিধান ওয়াজিব, মাকরূহ ও হারাম অথবা মুবাহও হতে পারে, যেহেতু মূল বিষয়ের যে বিধান, তার মাধ্যমেরও সে বিধান হয়। যদি ঋণদাতা জানে অথবা তার প্রবল ধারণা হয় যে, ঋণগ্রহীতা ঋণের সম্পদ অন্যায় ও শরীয়তবিরোধী কাজে ব্যয় করবে, সেক্ষেত্রে ঋণপ্রদান অবস্থানুযায়ী হারাম অথবা মাকরূহ। যদি কেউ অভাবের কারণে নয়; বরং ব্যবসায়ে বিনিয়োগের জন্য ঋণ চায় তাহলে তাকে ঋণ প্রদান মুবাহ (বৈধ)।
ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে নীতি হলো তার ঋণগ্রহণ বৈধ- যদি সে তার ভবিষ্যতে অর্জিত সম্পদ দ্বারা তা পরিশোধ করতে পারবে বলে দৃঢ় আশাবাদী এবং ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করে। অন্যথায় তার জন্যে ঋণ গ্রহণ করা নাজায়েয।
দলিল প্রমাণ দ্বারা ঋণ অকাট্যকরণ (تَوْثِيقُ الْقَرْضِ):
ফকীহগণের মতে, ঋণ লিখে রাখা এবং তাতে কাউকে সাক্ষী রাখা উভয়ই নফল, ওয়াজিব নয়। আর আয়াতে এ ব্যাপারে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা সতর্কতার জন্য, তা দ্বারা ওয়াজিব উদ্দেশ্য নয়।
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, যখন লোকেরা দলিল লেখক না পাবে তাদেরকে বন্ধক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বন্ধক না রাখার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُم بَعْضًا فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَانَتَهُ “তোমাদের একে অপরকে বিশ্বাস করলে, যাকে বিশ্বাস করা হয় সে যেন আমানত প্রত্যার্পণ করে।”
টিকাঃ
১৩. শাবরামাল্লিসী বলেন, দৃশ্যত ঋণগ্রহীতা মুসলিম কিংবা অমুসলিম হওয়াতে কোন পার্থক্য নেই। -হাশিয়া শাবরামাল্লিসী আলা নিহায়াতিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২১৫
১৪. ইমাম মুসলিম হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন, খ. ৪, পৃ. ২০৭৪
১৫. আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৪২৯; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২২৫; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৯৯; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩০৯; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৪০; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২১৫; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৩৬; মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৫৪৫; আয-যুরকানী আলা খলীল, খ. ৫, পৃ. ২২৬; ইবনে হাজর আল-হাইতামীর আল-ইনাফা, পৃ. ১৫৫
১৬. তুহফাতুল মুহতাজ, হাশিয়া শিরওয়ানী, খ. ৫, পৃ. ৩৬; নিহায়াতুল মুহতাজ, হাশিয়া শাবরামাল্লিসী, খ. ৪, পৃ. ২১৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৯৯; আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৪২৯
১৭. ইবনে হাজর আল-হাইতামী বলেন, অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণগ্রহণের সময় কৃত্রিম ধনাঢ্যতা প্রকাশ বৈধ নয়। -আল-ইনাফাতু ফিস সাদাকা ওয়াদ দিয়াফা, পৃ. ১৫৫
১৮. তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৩৮
১৯. জাসসাস-এর আহকামুল কুরআন, খ. ১, পৃ. ৪৮১; ইমাম শাফেয়ীর আল-উম্ম, খ. ৩, পৃ. ৮৯; ইবনে কুদামার আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৬২
২০. সূরা বাকারা, আয়াত ২৮৩
২১. ইমাম শাফেয়ীর আহকামুল কুরআন, খ. ২, পৃ. ১২৭
📄 ঋণের আরকান
অধিকাংশ ফকীহের মতে, ঋণের আরকান বা মূল অংশ তিনটি: ১. ঈজাব বা প্রস্তাব ও কবুল বা গ্রহণের শব্দ। ২. ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা। ৩. ঋণের ক্ষেত্র বা সম্পদ।
হানাফী ফকীহদের মতে, ঋণের রুকন হচ্ছে, ঈজাব ও কবুলের শব্দদ্বয়, যা এই চুক্তি বাস্তবায়নে উভয়পক্ষের ইচ্ছা ও ঐকমত্যের প্রমাণ বহন করে।
📄 প্রথম রুকন
ঈজাব ও কবুল-এর শব্দঃ
ফকীহগণ এ কথায় একমত, ঋণ (الْقَرْضُ), অগ্রিম প্রদান (السَّلَفُ) এবং এ দুটি অর্থের যে কোনোটির দিকে নির্দেশ করে এমন যে-কোনো শব্দ দ্বারা ঋণের ঈজাব (প্রস্তাব) করা শুদ্ধ। যেমন: আমি তোমাকে কর্জ দিলাম, আমি তোমাকে অগ্রিম প্রদান করলাম, আমি তোমাকে ঋণ হিসাবে প্রদান করলাম, তোমাকে আমি এর মালিক বানিয়ে দিলাম এভাবে যে, তুমি আমাকে এর বিনিময় ফেরত দেবে অথবা নাও এটি তোমার প্রয়োজনে খরচ করো, এর বিনিময় আমাকে ফেরত দেবে ইত্যাদি...। অথবা ঋণ প্রদানের ইচ্ছার দিকে ইঙ্গিত করে এমন কোনো কাজ।
তেমনি প্রস্তাব গ্রহণ করা এবং সম্মতি বোঝায় এরূপ যে কোনো শব্দ দ্বারা কবুল বা গ্রহণ শুদ্ধ হবে। যেমন: আমি ঋণ চেয়েছিলাম (আপনি সেই প্রেক্ষিতেই দিচ্ছেন।) বা আমি গ্রহণ করলাম বা আমি এ ব্যাপারে রাজী আছি ইত্যাদি।
শায়খ যাকারিয়া আল-আনসারী বলেন, কাউকে ঋণ প্রদানের আবেদন ঋণদাতার পক্ষ থেকেও আসতে পারে। যেমন: আমার কাছ থেকে ঋণ নাও, যা ঈজাবের স্থলাভিষিক্ত। ঋণগ্রহীতা বলবে, আমাকে ঋণ দাও, যা কবুলের স্থলাভিষিক্ত।
শাফেয়ীদের বিশুদ্ধতম মতে, সকল লেনদেনের মতো ঋণ শুদ্ধ হওয়ার জন্যেও ঈজাব ও কবুল শর্ত। তবে তারা পরোক্ষ ঋণকে এক্ষেত্রে আলাদা করেছেন, সেক্ষেত্রে প্রস্তাব ও গ্রহণের শর্ত আরোপ করেননি। রামলী (الرَّمْلِيُّ) বলেন: পরোক্ষ বা বিধানগত ঋণের ক্ষেত্রে ঈজাব ও কবুলের শর্ত নেই। যেমন: ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দেওয়া, কুড়িয়ে পাওয়া অসহায় শিশুর জন্য খরচ করা।
টিকাঃ
২২. হানাফীগণের মতে ইআরাহ (ধার দেওয়া) শব্দ দ্বারা ঋণ প্রদান বৈধ, যেহেতু মিছলী বস্তু ধার দেওয়া প্রকৃতপক্ষে ঋণ। রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭১; ফাতহুল কাদীর, খ. ৭, পৃ. ৪৭৪; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩৯৪; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৯৯; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩০৯; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৩৭-৩৯; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৪, পৃ. ৩২
২৩. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৪১
২৪. রওজাতুত তালেবীন, খ. ৪, পৃ. ৩২
২৫. তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪০; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৪১
২৬. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২১৮
২৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩৯৪
২৮. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৭, পৃ. ৩৯৪
২৯. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১০