📄 দেনা পরিশোধ করা থেকে বিরত থাকা
ঋণগ্রহীতা যদি সচ্ছল হয় তাহলে তার ঋণ পরিশোধ করা আবশ্যক। পক্ষান্তরে সে ঋণ পরিশোধ না করে যদি টালবাহানা করে, তাহলে পাওনাদারদের দাবির প্রেক্ষিতে বিচারক তাকে ঋণ পরিশোধে বাধ্য করবেন। যদি সে পরিশোধ না করে, তবে বিনা প্রয়োজনে অন্যের প্রাপ্য পরিশোধে বিলম্ব করে জুলুম করার কারণে শাসক তাকে বন্দী করবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “সচ্ছলের টালবাহানার কারণে তাকে শাস্তি দেওয়া ও মর্যাদায় আঘাত করা বৈধ।" আর বন্দী করা একটি শাস্তি। যদি সে ঋণ পরিশোধ না করে, অথচ তার প্রকাশ্য সম্পদও রয়েছে, তাহলে বিচারক তার পক্ষ থেকে তার সে সম্পদ বিক্রি করে ঋণদাতাকে দেবেন। বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়াজ রা.-এর পক্ষ থেকে তার সম্পদ বিক্রয় করে তার ঋণ আদায় করেছেন। অনুরূপভাবে উমর রা. উসাইফি রহ.-এর পক্ষ হতে তার সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদারদের মাঝে তা বণ্টন করেছেন।
ঋণগ্রহীতার সম্পদ যদি ঋণ পরিশোধ পরিমাণ না হয়, আর পাওনাদারগণ তার লেনদেন নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানায়, তাহলে বিচারক তাদের ডাকে অবশ্যই সাড়া দেবেন। যেন পাওনাদারদের কোনো ক্ষতি সে না করতে পারে, তাই ঋণগ্রহীতাকে যে কোনো কার্যক্রম থেকে বাধাদানের অধিকার বিচারকের রয়েছে। বিচারক তার সম্পদ বিক্রি করবেন, যদি সে নিজে সম্পদ বিক্রিতে অসম্মত হয়। এবং বিচারক ওই সম্পদের মূল্য পাওনাদারদের মাঝে অংশ অনুপাতে বণ্টন করবেন। এটি শাফেয়ী, হাম্বলী ও মালেকী ফকীহগণ এবং ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ রহ.-এর মত। আবু হানীফা রহ. ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন: ঋণগ্রহীতাকে লেনদেন করা থেকে নিষেধ করা যাবে না। কারণ এর দ্বারা তার মানবসম্মানের অপমান হয়, মানবাধিকারের লঙ্ঘন হয়। তাই সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করা পর্যন্ত বিচারক তাকে বন্দী করে রাখবেন- যদি তার সম্পদ থাকে। তবে যদি তার সম্পদ হয় দিরহাম বা দীনার (কিংবা নগদ মুদ্রা), আর ঋণও অনুরূপ বস্তু হয়, তাহলে বিচারক তার অনুমতি ছাড়া তার পক্ষ থেকে ঋণ শোধ করবেন।
ঋণগ্রহীতা অসচ্ছল হলে এবং তার অসচ্ছলতা প্রমাণিত হলে তাকে তাগাদা দেওয়া যাবে না। বরং তাকে অবকাশ দেওয়া আবশ্যক, যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেন : وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَة فَنَظَرَةٌ إِلَى مَيْسَرَة “আর যদি খাতক অসচ্ছল হয় তাহলে তাকে সচ্ছলতার সময় পর্যন্ত অবকাশ দেওয়া....।”
অসচ্ছল দেনাদারের জন্য দেনা পরিশোধ পরিমাণ সম্পদ উপার্জন করা আবশ্যক। তবে তাকে উপার্জন করা এবং হাদিয়া ও যাকাত-সদকা কবুল করার জন্য বাধ্য করা যাবে না। তবে তার যে সম্পদ উপার্জিত হবে তাতেই পাওনাদারদের অধিকার যুক্ত হবে। ঋণগ্রহীতা যদি গোনাহ ও পাপ কাজ ছাড়া নিজ প্রয়োজনে ঋণ করে, তাহলে তাকে যাকাত দিয়ে তার ঋণ শোধ করা যাবে। কারণ, ঋণ শোধ করাও যাকাতের একটি খাত।
উল্লিখিত বিধান জীবিত ব্যক্তির জন্য। যদি কেউ ঋণ রেখে মারা যায়, তার ঋণ পরিত্যক্ত সম্পদের সাথে যুক্ত হবে। অসিয়ত বাস্তবায়ন এবং ওয়ারিসদের মাঝে বণ্টনের পূর্বে মীরাছ থেকে তার ঋণ শোধ করা হবে। কেননা ঋণ অন্যের অধিকারভুক্ত বিষয়। তাছাড়া কেউ দায়মুক্ত হওয়া তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “ব্যক্তি ও জান্নাতের মাঝে অন্তরায় হচ্ছে ঋণ।”
তাছাড়া দান-খয়রাত, অনুদান-স্বেচ্ছাদানের তুলনায় ঋণ শোধ করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা মৃত ব্যক্তির মীরাছ বণ্টনের পূর্বে তার ঋণ পরিশোধ করতে বলেছেন। ইরশাদ হচ্ছে : مِّنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ (এ সবকিছু হবে) তার অসিয়ত ও ঋণ পরিশোধ করার পর। তাই কল্যাণে অগ্রগামী হওয়ার জন্য ঋণ দ্রুত আদায় করা আবশ্যক। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : “মুমিনের প্রাণ ঋণের সাথে ঝুলে থাকে, (অর্থাৎ জান্নাতের ফয়সালা হয় না) যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে ঋণ আদায় করা হয়।"
টিকাঃ
৯. সুনানে আবু দাউদ, খ. ৩, পৃ. ৪২৬; সুনানে ইবনে মাজা, খ. ২, পৃ. ৮১১; মুসনাদে আহমদ, খ. ৪, পৃ. ২২২
১০. হাদীসটি উল্লেখ করেছেন দারাকুতনী ও হাকেম।
১১. ইমাম মালেক রহ. মুয়াত্তায় হাদীসটি বিচ্ছিন্ন সনদে উল্লেখ করেছেন। দারাকুতনী তার ইলাল গ্রন্থে যুক্ত সনদসহ উল্লেখ করেছেন। (আত-তালখীসুল হাবীর, খ. ৩, পৃ. ৪০।)
১২. সূরা বাকারা, আয়াত ২৮০
১৩. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ১৭৩; আল-ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ৯৬-৯৮; আল-হাত্তাব, খ. ৫, পৃ. ৪৪-৪৮; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৮০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৪৬; কালয়ূবী, খ. ৪, পৃ. ৩২৪ ও খ. ৩, পৃ. ১৯৭; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৪৮৪-৪৯৫
১৪. কালয়ূবী, খ. ৩, পৃ. ১৯৭; আল-মুগনী, খ. ২, পৃ. ৬৬৭; আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ১১৯
১৫. আল-ইখতিয়ার লি তালীলিল মুখতার-এর গ্রন্থকার এটি উল্লেখ করেছেন, খ. ৫, পৃ. ৮৬।
১৬. সূরা নিসা, আয়াত ১১
১৭. কালয়ূবী, খ. ১, পৃ. ৩৪৪; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৪, পৃ. ৬১৮; আল-ইখতিয়ার, খ. ৫, পৃ. ৮৫; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫০২; ইবনে মাজাহ, খ. ২, পৃ. ৮০৬; মুসনাদে আহমদ, খ. ২, পৃ. ৪৪০