📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দেনা-এর তাৎপর্য

📄 দেনা-এর তাৎপর্য


দাইন (الدَّينُ) বা দেনা ব্যক্তির দায়িত্বে প্রতিষ্ঠিত একটি বৈশিষ্ট্য। এভাবেও বলা যায়, এটি কোনো কারণে দায়িত্বে আবশ্যিক একটি আর্থিক দায়বদ্ধতা। সে কারণটি কোনো চুক্তি হোক; যেমন বেচাকেনা, কাফালত, সন্ধি বা খুলা, কিংবা চুক্তির অনুগামী বিষয় হোক; যেমন খোরপোষ। অথবা এজাতীয় কারণ ছাড়া অন্য কারণে আবশ্যক হোক; যেমন গসব-ছিনতাই, আত্মসাৎ, যাকাত বা নষ্টকৃত সম্পদের ক্ষতিপূরণ। রূপকার্থে ব্যক্তির দায়িত্বে আবশ্যক সম্পদকেও দায়ন বা দেনা বলা হয়। কারণ দায়িত্বে আবশ্যক এ বিষয়গুলো সম্পদে পরিণত হয়।

টিকাঃ
১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ১৭৪; আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, ইবনে নুজাইম কৃত, খ. ২, পৃ. ২০৯; আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, সুয়ূতী কৃত, পৃ. ৩২৯; কাশশাফু ইসতিলাহাতিল ফুনুন, খ. ২, পৃ. ৫০২; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১৭৬ ও খ. ৩, পৃ. ৩২৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৯৩

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দেনা পরিশোধের বিধান

📄 দেনা পরিশোধের বিধান


দেনা যেভাবে আবশ্যক হয়েছে ঐ গুণ ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে তা পরিশোধ করা সর্বসম্মতিক্রমে ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন : فَإِلَيْهِ اؤْتُمِنَ أَمَانَتَهُ “যাকে বিশ্বাস করা হয় সে যেন আমানত অর্পণ করে।” কতক ফকীহের মতে এটি মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। যদি দেনা নগদে পরিশোধযোগ্য হয় তাহলে তাগাদা দেওয়া হলে তৎক্ষণাৎ তা আদায় করা আবশ্যক। এমন দেনাকে আদ-দায়নুল মুআজজাল (الدِّينُ الْمُسَجَّল) বলা হয়। তৎক্ষণাৎ আদায়ের অর্থ হলো যখন সক্ষম হবে তখনই আদায় করবে। এর কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : "مطل الغني ظلم "দেনা পরিশোধে সামর্থ্যবানের বিলম্ব করা জুলুম।"

আর দেনা যদি মেয়াডে পরিশোধযোগ্য হয় তাহলে মেয়াডের আগে তা পরিশোধ করা আবশ্যক নয়। তবে পরিশোধ করলে তা পরিশোধ বলে গণ্য হবে এবং দেনাদার দেনার দায় থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।

টিকাঃ
২. সূরা বাকারা, আয়াত ২৮৩
৩. সহীহ বুখারী, খ. ৩, পৃ. ১১৭, প্রকাশক: মুহাম্মদ আলী ছাবীহ; সহীহ মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১১৯৭, তাহকীক: মুহাম্মদ আবদুল বাকী

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দেনা পরিশোধের পদ্ধতি

📄 দেনা পরিশোধের পদ্ধতি


আদায় বা পরিশোধ হলো পাওনাদার বা হকদার ব্যক্তির কাছে হক/পাওনা অর্পণ করা। কারো পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে তার অনুরূপ বস্তু দ্বারা পরিশোধ করতে হয়। কেননা অনুরূপ বস্তু প্রদান ছাড়া দেনা পরিশোধের অন্য কোন পন্থা নেই। এ কারণেই সরফ ও সালাম চুক্তিতে কজাকৃত বস্তু মূল বস্তু বলে গণ্য হয়। যদি এই কজাকৃত বস্তু মূল বস্তুর বিধান গ্রহণ না করত, তাহলে কব্জা করার পূর্বে সরফের বিনিময়, সালাম চুক্তির মূলপুঁজি এবং সালামকৃত বস্তুর বিনিময় গ্রহণ করা হতো, যা হারাম। অনুরূপভাবে সরফ ও সালাম চুক্তিতে এই বস্তু মূল অধিকারকৃত বস্তুর বিধান গ্রহণ করে। এর প্রমাণ হলো, পাওনাদারকে তা কজা করতে বাধ্য করা হয়। যদি এ বস্তু তার যথাযথ প্রাপ্য না হতো তাহলে এই বস্তু কজা করার জন্য তাকে বাধ্য করা যেত না।

দায়িত্বে আবশ্যক হওয়া যে বস্তুগুলোর সদৃশ বর্তমানে অনুপস্থিত সেগুলোর ক্ষেত্রে বস্তুর বাজারমূল্য আবশ্যক হবে, যেমন গসব (জবরদখল/ছিনতাই) ও নষ্টকৃত বস্তুসমূহের বিধান। একটি মত হলো, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে যদি অনুরূপ বস্তু প্রদান অসম্ভব হয় তাহলে গঠনগত ও দৃশ্যত সদৃশ বস্তু দ্বারা ঋণ পরিশোধ করা আবশ্যক হবে। এর দলিল আবু রাফে রা.-এর বর্ণিত হাদীস। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পুরুষ উটের পরিবর্তে পুরুষ উট দিতে বলেছেন। তা ছাড়া সালাম-চুক্তি দ্বারা যা দায়বদ্ধ হওয়া সাব্যস্ত হয়েছে, কর্জ দ্বারাও তা সাব্যস্ত হবে, উভয়ের মধ্যে যে সামঞ্জস্য রয়েছে তার উপর ভিত্তি করে।

ঋণ পরিশোধ করার ক্ষেত্রে শর্তহীনভাবে গৃহীত ঋণ-এর তুলনায় উত্তম ও উৎকৃষ্ট বস্তু দ্বারা শোধ করা বৈধ। কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির নিকট থেকে কম বয়সী উট ঋণ নিয়েছিলেন। এরপর নবী স.-এর দরবারে যাকাতের উটের পাল এলে তিনি আবু রাফে রা.-কে আদেশ করলেন লোকটিকে অল্পবয়সী একটি উট দিয়ে দিতে। আবু রাফে রা. ফিরে এসে বললেন, পালে উত্তম ও সপ্তবর্ষী উট ছাড়া আর উট পাইনি। নবী স. বললেন : أَعْطِهِ إِيَّاهُ ، إِنَّ خِيَارَ النَّاسِ أَحْسَنُهُمْ قَضَاءً "তুমি তাকে তা-ই দাও। মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো সে যে উত্তমরূপে তার প্রাপ্য/দেনা শোধ করে।”

ঋণ প্রদানের জায়গা বাদে অন্য দেশে, যেখানে বহন করতে ভাড়ার প্রয়োজন নেই, সেখানে যদি কাউকে পরিশোধের তাগাদা দেওয়া হয় তাহলে পরিশোধ করা আবশ্যক।

টিকাঃ
৪. কুরতুবী, খ. ৩, পৃ. ৪১৫; আল-কাওয়াইদ ওয়াল ফাওয়াইদ আল-উসুলিয়্যা, পৃ. ১৮২; ইবনে আবিদীন, খ. ২, পৃ. ৬; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১১; মিনাহুল জালীল, খ. ৩, পৃ. ১১২; আল-হাত্তাব, খ. ৫, পৃ. ৩৯; কিফায়াতুত তালিব, খ. ২, পৃ. ২৯০; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৪৮১
৫. কাশফুল আসরার, খ. ১, পৃ. ১৬০; আত-তালভীহ, খ. ১, পৃ. ১৬৮; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ১৫০ ও ৩৯৫; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৫২; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২২৬; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১১
৬. সহীহ মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৪; তাহকীক : ফুয়াদ আবদুল বাকী, উল্লিখিত শব্দ সহীহ মুসলিমের। সহীহাইনে এ অর্থবোধক হাদীস রয়েছে আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে। (আত-তালখীসুল হাবীর, খ. ৩, পৃ. ৩৪।)
৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩৯৫; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৫৬; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২২৭; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দেনা পরিশোধের স্থলবর্তী পদ্ধতি

📄 দেনা পরিশোধের স্থলবর্তী পদ্ধতি


কোনো দেনাদার যদি নিজ দায়িত্বে থাকা দেনা আবশ্যকীয় গুণসম্পন্ন বস্তু দ্বারা পরিশোধ করে তবে তার দেনা রহিত হয়ে যায় এবং সে দায়মুক্ত হয়। এ ছাড়া পাওনাদার দেনাদারের দেনা রহিত করে দিলে বা হেবা বা দান করে দিলেও তা পরিশোধ হয়ে যায় এবং সে দায়মুক্ত হয়। অনুরূপভাবে সামগ্রিক বিচারে দেনা পরিশোধের স্থলবর্তী হয়- কাউকে তা হাওয়ালা করা, ঋণের বিপরীতে ঋণ কাটাকাটি করা, চুক্তির বা সন্ধির মেয়াদ শেষ হওয়া অথবা কিতাবাত চুক্তির বদলা আদায়ে গোলাম নিজেকে অক্ষম সাব্যস্ত করা ইত্যাদি। এ সবকিছু হয় পাওনাদারের তা কবুল করা জরুরি হওয়া বা না হওয়ার বিভিন্ন অবস্থা এবং কোন্ কোন্ অবস্থায় ঋণ বৈধ বা অবৈধ ইত্যাদি বিষয়ে ফকীহদের বাতলানো শর্তানুসারে।

টিকাঃ
৮. ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫২১, ১৪, ২৫১, ২৬৩; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ১১, ১৫ ও খ. ৭, পৃ. ২৯৫; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৪, পৃ. ২৯০; আল-মুহাযযাৰ, খ. ১, পৃ. ৪৫৫ ও খ. ২, পৃ. ১৫; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫৭৭-৬০৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00